📄 প্রথম ক্রুসেড
ক্রুসেড আগ্রাসনের কার্যকারণসমূহ এবং ক্রুসেড আগ্রাসন মোকাবিলায় মুসলিম উম্মাহর সংগ্রামী জিহাদ
প্রথম ক্রুসেড [৪৮৮-৪৯২ হিজরি-১০৯৫-১০৯৯ খ্রিষ্টাব্দ]
৪৮০ হিজরি সনে ২য় আরবান (Pope Urban II) রোমান ক্যাথলিক চার্চের পোপ নির্বাচিত হওয়ার পর তৎকালীন খ্রিষ্টান বিশ্বের জনগণের অনুসরণীয় নেতায় পরিণত হন। তিনি মুসলমানদের হাত থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস পুনরুদ্ধার এবং বাইতুল মুকাদ্দাসের মুসলিম সেলজুক শাসকদের নিপীড়ন (!) থেকে খ্রিষ্টান তীর্থযাত্রীদের রক্ষা করার জন্য সমকালীন খ্রিষ্টান রাজন্যবর্গকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার আহ্বান জানান। (৬৬)
পোপ ২য় আরবানের আহ্বানে উদ্দীপ্ত হয়ে যারা ক্রুসেড অভিযান সফল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, তাদের অন্যতম হলেন পিটার (Peter the Hermit) নামক জনৈক সন্ন্যাসী। তিনি ক্রুসেড অভিযানের জন্য প্রচুর পরিমাণে স্বেচ্ছাসেবী সৈনিক সংগ্রহ করেন। তবে তার সংগৃহীত অধিকাংশ সৈনিক ছিল খ্রিষ্টানসমাজের চোর-ডাকাত ও উচ্ছৃঙ্খল শ্রেণির লোকজন। নিয়মিত সৈন্যদের মূল বাহিনী রওনা হওয়ার পূর্বেই পিটার তার এই উচ্ছৃঙ্খল বাহিনী নিয়ে বাইতুল মুকাদ্দাস অভিমুখে রওনা হন। এই বাহিনীটি পথে ব্যাপক নৈরাজ্য ও অরাজকতা সৃষ্টি করে এবং আশেপাশের প্রতিটি জনপদের অধিবাসীদের ওপর নিপীড়ন চালায়। খ্রিষ্টান জনপদগুলোও তাদের নৈরাজ্যের শিকার হয়। তাদের আচরণে বাইজান্টাইন সম্রাট ১ম অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোস (Alexios I Komnenos)-ও বীতশ্রদ্ধ হয়ে ওঠেন। উচ্ছৃঙ্খল জনতার এই অনিয়মিত বাহিনীটি মুসলিম ভূখণ্ডের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। অবশেষে সেলজুকরা নিকিয়া(৬৭) এলাকায় তাদের প্রতিরোধ করে তাদেরকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। এটি ৪৮৯ হিজরি সনের (১০৯৬ খ্রিষ্টাব্দের) ঘটনা।
এরইমাঝে ক্রুসেডারদের নিয়মিত বাহিনী ফ্রান্স থেকে মুসলিম ভূখণ্ডের উদ্দেশে রওনা হয়। সুবিশাল ক্রুসেড বাহিনীতে সৈন্যের সংখ্যাই ছিল তিন লক্ষ। ক্রুসেড বাহিনীর একক কোনো নেতৃত্ব ছিল না। অধিকাংশ অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছিল ফ্রান্সের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রশাসক ও সেনাপতিগণ। তৎকালীন ইউরোপের অধিকাংশ শাসক এ অভিযানে যোগ দিতে পারেনি। আন্দালুসের খ্রিষ্টরাজ্যগুলোর শাসকগণ আন্দালুসের মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ব্যস্ত ছিল। অপরদিকে ফ্রান্সের রাজা ১ম ফিলিপ ও জার্মানির রাজা ৪র্থ হেনরি তখন রোমান চার্চের সন্তুষ্টিবঞ্চিত(৬৮) থাকায় অভিযানে যোগ দিতে পারেননি।
মূল ক্রুসেড বাহিনী ফ্রান্স থেকে রওনা হয়ে রোম হয়ে কনস্টান্টিনোপলে পৌঁছায়, এরপর সেখান থেকে রোমান সেলজুক সাম্রাজ্যের রাজধানী নিকিয়া অভিমুখে রওনা হয়। রোমান সেলজুক সাম্রাজ্যের শাসক ১ম কিলিজ আরসালানের অনুপস্থিতির সুযোগে তারা উত্তর ও দক্ষিণ দিক থেকে নিকিয়া নগরী অবরোধ করে। কিলিজ ফিরে এসে নিকিয়ায় প্রবেশের চেষ্টা করেন এবং ক্রুসেডারদের সাথে তুমুল লড়াই করেন। কিন্তু তিনি নিকিয়ায় প্রবেশ করতে ব্যর্থ হন। ক্রুসেডারদের হাতে নিকিয়ার পতন ঘটে এবং নগরীটি বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। উল্লেখ্য, নিকিয়ার অধিকাংশ অধিবাসী ছিল খ্রিষ্টান।
এরপর ক্রুসেডার বাহিনী অভিযান অব্যাহত রেখে অতি সহজে বরং বলতে গেলে বিনা বাধায় জনশূন্য কোনিয়া (Konya) নগরী দখল করে নেয়। কিলিজ এর পূর্বেই কোনিয়ার অধিবাসীদের সেখান থেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন। এরপর ক্রুসেডার বাহিনী একে একে হিরাক্লিয়া (Heraclea Cybistra), কিলিকিয়া (Cilicia), কায়সারিয়া (Kayseri) ও মারআশ (Kahramanmaraş) নগরী দখল করে নেয়। এই অভিযানের ফলে ক্রুসেডার বাহিনীর হাতে রোমান সেলজুকদের পতন ঘটে। রোমান সেলজুকদের ভূখণ্ডে সৃষ্টি হয় আর্মেনিয়া ও এডেসা-সহ বিভিন্ন খ্রিষ্টরাজ্য।
এরপর ক্রুসেডার বাহিনী শাম অভিমুখে অগ্রসর হয় এবং এন্টিয়কের পূর্বে আছি(৬৯) নদীর (Orontes river) ওপর নির্মিত লৌহ সেতু পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তারা পারসিক সেলজুক রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত এন্টিয়ক নগরী দখল করে নেয়। এন্টিয়কেও গড়ে ওঠে একটি খ্রিষ্টরাজ্য। ক্রুসেড বাহিনী প্রচণ্ড যুদ্ধের পর শামীয় সেলজুক রাষ্ট্রের লাতাকিয়া (Latakia) নগরীও দখল করে নেয়।
এ সময় ক্রুসেডাররা এন্টিয়কে নিজেদের অবস্থান নিরাপদ ও সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে মিশরের উবায়দি সরকারের সঙ্গে এ মর্মে চুক্তি করে যে, শামের উত্তরাঞ্চল ক্রুসেডারদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে আর ফিলিস্তিন থাকবে উবায়দিদের নিয়ন্ত্রণে। উবায়দিরা তো দীর্ঘদিন যাবৎ শাম অঞ্চলে মুসলিম (সুন্নি) সেলজুকদের কর্তৃত্ব চিরতরে শেষ করার সুযোগ খুঁজে বেড়াচ্ছিল। তাই তারা কালবিলম্ব না করে এ চুক্তিতে সম্মত হয়।
এরপর ক্রুসেডাররা বাইতুল মুকাদ্দাস অভিমুখে রওনা হয়। বাইতুল মুকাদ্দাসে তখন উবায়দিদের কর্তৃত্ব ছিল। পথে তাদেরকে প্রতিরোধ করার জন্য বিভিন্ন প্রচেষ্টা চালানো হলেও তারা প্রতিটি বাধা সফলতার সঙ্গে অতিক্রম করে এবং উবায়দিদের সঙ্গে কৃত চুক্তির সামান্য পরোয়া না করে আল-কুদস নগরীর দ্বারে পৌঁছে যায়। আক্কার (উবায়দি) প্রশাসক ও বৈরুতের অধিবাসীরা তাদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করে। দীর্ঘ একচল্লিশ দিনের অবরোধের পর ক্রুসেডারদের হাতে আল-কুদস নগরীর পতন ঘটে। কুদসের নিরাপত্তায় নিয়োজিত উবায়দি সৈন্যরা কোনো ধরনের প্রতিরোধ প্রচেষ্টার পরিবর্তে মসজিদে আশ্রয় নেয়। ক্রুসেডাররা আল-কudস নগরীতে প্রবেশ করার পর সেখানে গণহত্যা ঘটায়। মুসলমানদের রক্তে বাইতুল মুকাদ্দাস নামে খ্যাত আল-কুদস নগরী প্লাবিত হয়ে যায়। প্রায় সত্তর হাজার সাধারণ মুসলমান ক্রুসেডারদের হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়।
৪৯২ হিজরি সনের শাবান মাসে (১০৯৯ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে) বাইতুল মুকাদ্দাসের পতন ঘটে।
এই অভিযানের মাধ্যমে ক্রুসেডাররা ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের বাইতুল মুকাদ্দাস, বেথেলহাম, হেবরন, রামলা, রামাল্লা, জাফা (Jaffa), নাবলুস, বায়সান, তাবারিয়া (Tiberias) ও নাসিরিয়া নগরী দখল করে নেয়। আসকালানসহ কয়েকটি গ্রাম থেকে যায় মুসলমানদের হাতে।
জনৈক ঐতিহাসিক তখনকার ফিলিস্তিনের চিত্র নিম্নোক্ত ভাষায় তুলে ধরেছেন—
তৎকালে শামে বিদ্যমান খ্রিষ্টরাজ্যগুলোকে তুলনা করা যেতে পারে প্রতিশোধ গ্রহণ ও হৃত অধিকার পুনরুদ্ধারের উপযুক্ত সুযোগের প্রতীক্ষায় ওঁত পেতে থাকা শত্রুপক্ষের বিশাল মহাসাগরের মাঝে অবস্থিত বিক্ষিপ্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপের সঙ্গে। (৭০)
এখানে এ তথ্যটিও উল্লেখযোগ্য যে, ক্রুসেডাররা বাইতুল মুকাদ্দাস দখল করতে সক্ষম হলেও এর জন্য তাদের বিরাট মূল্য চুকাতে হয়। অভিযানের শুরুতে ক্রুসেডার বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ছিল তিন লক্ষ আর যখন তারা বাইতুল মুকাদ্দাসে প্রবেশ করে, তখন তাদের সৈন্যসংখ্যা চল্লিশ হাজারের বেশি ছিল না। এডেসা অভিযানে অংশগ্রহণের জন্য মূল বাহিনী হতে যেসব ক্রুসেডার সৈন্য আলাদা হয়ে গিয়েছিল, তাদের সংখ্যা নিয়ে যত অতিরঞ্জন করা হোক না কেন, তা চল্লিশ হাজারের বেশি হবে না। অর্থাৎ ক্রুসেডার বাহিনীর মাত্র আশি হাজার সৈন্য প্রথম ক্রুসেড অভিযান শেষে জীবিত ছিল; নিহত হয়েছিল দুই লক্ষ বিশ হাজার সৈন্য। এ তথ্য দ্বারাই অনুমান করা যায় যে, ক্রুসেডার বাহিনী কী পরিমাণ প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছিল। তাদের সবাই যে প্রতিপক্ষের সৈন্যদের হাতে নিহত হয়েছিল এমন নয়; অনেক ক্রুসেডার সৈন্য নিহত হয়েছিল সেসব সাধারণ জনগণের হাতে, যারা ক্রুসেডার বাহিনীর সৈন্যদের আচরণে অতিষ্ঠ হয়ে বিদ্রোহ করেছিল। সাধারণ জনগণ যদিও জানত যে, এই বিদ্রোহের কারণে তাদের পরিণাম হবে অত্যন্ত ভয়াবহ, তারপরও তারা অনিচ্ছাসত্ত্বেও বিদ্রোহ করতে বাধ্য হয়েছিল। বর্বর ক্রুসেডার সৈন্যদের আচরণ এত জঘন্য, কঠোর ও নিকৃষ্ট পর্যায়ের ছিল যে, একজন মানুষ যতই লাঞ্ছনা ও ভীতির শিকার হোক না কেন, বিদ্রোহী হতে বাধ্য হবে।
প্রিয় পাঠক! এবার ভেবে দেখুন, তখন যদি সকল মুসলিম শক্তি ক্রুসেডারদের মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধ হতো, তাহলে কেমন হতো ক্রুসেডারদের পরিণতি?!
প্রথম ক্রুসেড অভিযানের মাধ্যমে শামের ইসলামি ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে চারটি খ্রিষ্টরাজ্য গড়ে ওঠে—এডেসা, এন্টিয়ক, বাইতুল মুকাদ্দাস ও ত্রিপোলি(৭১)। রাজ্যচারটির প্রতিষ্ঠাকাল যথাক্রমে:
১. এডেসা রাজ্য: রবিউল আউয়াল ৪৯১ হিজরি (ফেব্রুয়ারি ১০৯৮ খ্রিষ্টাব্দ)।
২. এন্টিয়ক রাজ্য: রজব ৪৯১ হিজরি (জুন ১০৯৮ খ্রিষ্টাব্দ)।
৩. বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্য: শাবান ৪৯২ হিজরি (জুলাই ১০৯৯ খ্রিষ্টাব্দ)।
৪. ত্রিপোলি রাজ্য: জিলহজ ৫০২ হিজরি (জুলাই ১১০৯ খ্রিষ্টাব্দ)।
টিকাঃ
৬৫. ক্রুসেড ইতিহাস সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে অধ্যয়ন করা যেতে পারে মাকতাবাতুল হাসান থেকে প্রকাশিত ড. রাগিব সারজানির ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস।
৬৬. পোপ ২য় আরবান যদিও খ্রিষ্টানসমাজকে ক্রুসেড অভিযানে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করার জন্য দাবি তুলেছিলেন যে, মুসলিম শাসকগণ বাইতুল মুকাদ্দাসগামী খ্রিষ্টান তীর্থযাত্রীদের ওপর প্রচণ্ড নির্যাতন-নিপীড়ন চালিয়ে থাকে; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এ দাবি ছিল সম্পূর্ণই মিথ্যা ও অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
প্রখ্যাত ইউরোপিয়ান ঐতিহাসিক আলেকজান্ডার ভ্যাসিলিভ (Alexander Alexandrovich Vasiliev) [মৃত্যু: ১৯৫৩ খ্রি.] Istoria Imperiului Bizantin [History of the Byzantine Empire] গ্রন্থে লিখেছেন—
খ্রিষ্টানরা নির্বিশেষে সকলে ইসলামি শাসনের ছায়ায় ধর্মীয় ও অন্যান্য ক্ষেত্রে পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করত। তাদেরকে শুধু তাদের নিজেদের পুরোনো গির্জাগুলো সংরক্ষণের অনুমতিই দেওয়া হয়নি; বরং নতুন নতুন গির্জা ও মঠ নির্মাণের অনুমতিও দেওয়া হয়েছিল। নিজেদের গ্রন্থাগারে তারা ধর্মতত্ত্ব বিষয়ের বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থও রাখত।
আমেরিকান বিখ্যাত ঐতিহাসিক জেমস থমসন (James Westfall Thompson) [মৃত্যু : ১৯৪১ খ্রি.] Economic and social history of the Middle Ages গ্রন্থে লিখেছেন—সেলজুক রাষ্ট্রের অধীনে যেসব খ্রিষ্টান নাগরিক বসবাস করত, তারা খোদ বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের প্রাণকেন্দ্রে বসবাসকারী খ্রিষ্টানদের চেয়েও অধিক সুখে-শান্তিতে ছিল।
জেমস থমসন প্রাগুক্ত গ্রন্থে আরও উল্লেখ করেছেন যে, স্বয়ং বাইতুল মুকাদ্দাসের গির্জাধ্যক্ষ (Patriarch of Jerusalem) থিওডোসিয়াস (Theodosius) কনস্টান্টিনোপলের গির্জাধ্যক্ষের কাছে ২৫৫ হিজরিতে (৮৬৯ খ্রিষ্টাব্দে) পাঠানো এক পত্রে মুসলমানদের উদার আচরণ ও সহমর্মিতার ভূয়সী প্রশংসা করেন। পত্রে তিনি এ কথাও উল্লেখ করেন যে, মুসলমানরা খ্রিষ্টানদের একান্ত ধর্মীয় বিষয়াদিতে কোনোপ্রকার হস্তক্ষেপ করে না এবং তাদেরকে নির্দ্বিধায় অধিক হারে গির্জা নির্মাণের সুযোগ দেয়। পত্রে বাইতুল মুকাদ্দাসের গির্জাধ্যক্ষ একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরে বলেন, 'মুসলিম জাতি হলো ন্যায়পরায়ণ জাতি। আমরা তাদের কাছ থেকে কোনো ধরনের ক্ষতি বা সীমালঙ্ঘনের সম্মুখীন হই না।' এসব সাক্ষ্য এবং এ জাতীয় অসংখ্য সাক্ষ্যপ্রমাণ সন্দেহাতীতভাবে এ কথা প্রমাণ করে যে, পোপ ২য় আরবানের উল্লিখিত দাবি অসার রটনা ছাড়া কিছুই নয়। প্রকৃতপক্ষে খ্রিষ্টানদের ক্রুসেড অভিযান পরিচালনার পেছনে যেসব অনৈতিক স্বার্থ কার্যকর ছিল, সেগুলোকে ঢেকে রাখার অপচেষ্টা হিসেবেই এই বানোয়াট ও মিথ্যা দাবি তোলা হয়েছিল। [এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে দ্রষ্টব্য মাকতাবাতুল হাসান থেকে প্রকাশিত ড. রাগিব সারজানির ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস।]
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ইউরোপীয় খ্রিষ্টানদের প্রথম ক্রুসেড অভিযানে বের হওয়ার ক্ষেত্রে পোপ ২য় আরবানের কর্মপ্রচেষ্টা যেমন কার্যকর ভূমিকা রেখেছিল, তেমনই শিয়া উবায়দি সাম্রাজ্যের কর্ণধারদের প্ররোচনাও এ ক্ষেত্রে অন্যতম কার্যকারণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। ইসলামি বিশ্বে সেলজুক সাম্রাজ্যের ক্রমবর্ধমান শক্তিবৃদ্ধিতে কোণঠাসা হয়ে পড়ায় উবায়দি সাম্রাজ্যের নেতৃবৃন্দ পত্রপ্রেরণের মাধ্যমে ইউরোপীয়দের ইসলামি প্রাচ্যে সেলজুক সাম্রাজ্যে হামলা চালাতে প্ররোচিত করেছিল। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে সেলজুকদের মোকাবিলায় উবায়দি খলিফা ও বাইজান্টাইন সম্রাটের মধ্যে গোপন চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছিল।
৬৭. নিকিয়া : আরবিতে (نيقية )নিকিয়া), ইংরেজিতে Nicaea (নিকায়া) এশিয়া মাইনর অঞ্চলের পশ্চিম উপকূলে মর্মর সাগরের নিকটে অবস্থিত সুপ্রাচীন একটি নগরী। আধুনিক তুরস্কের বুরছা প্রদেশে অবস্থিত অঞ্চলটির বর্তমান নাম ইজনিক (İznik)। ৩২৫ খ্রিষ্টাব্দে খ্রিষ্টধর্মের প্রথম সর্বজনীন মহাসভা নিকিয়াতে অনুষ্ঠিত হয় বলে খ্রিষ্টধর্মীয় ইতিহাসে নগরীটির বিশেষ অবস্থান রয়েছে।
৬৮. খ্রিষ্টীয় নবম, দশম ও একাদশ শতকে ইউরোপের ঘটনাপ্রবাহে গির্জা ও পোপদের বিরাট প্রতিপত্তি ও প্রভাব ছিল। কেবল চিন্তা ও ধর্মগত দিক থেকেই নয়; বরং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক সর্বক্ষেত্রে ইউরোপীয় সমাজের ওপর গির্জাগুলোর ছিল একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ। গির্জাগুলো চাইলেই কোনো শাসক ও রাজার ওপর থেকে আস্থা ও সন্তুষ্টি প্রত্যাহার করে নিতে পারত। আস্থা প্রত্যাহার করামাত্র পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যেত এবং জনগণ দলমতনির্বিশেষে সকলে সন্তুষ্টিবঞ্চিত শাসককে প্রত্যাখ্যান করত। এ কারণেই শাসক ও রাজন্যবর্গ গির্জার মতামতের প্রতি অত্যন্ত ভীতি ও আতঙ্ক এবং মর্যাদা ও সম্মানের চোখে তাকিয়ে থাকত।
তৎকালীন পোপদের প্রভাব-প্রতিপত্তির পরিমাণ উপলব্ধি করতে জার্মান রাজা চতুর্থ হেনরির সঙ্গে (২য় আরবানের পূর্বতন) পোপ ৭ম গ্রেগরি (Gregory VII)-এর কৃত একটি আচরণ উল্লেখ করাই বোধকরি যথেষ্ট হবে। জার্মান রাজা চতুর্থ হেনরি ছিলেন সমকালীন ইউরোপের সবচেয়ে প্রতাপশালী শাসক। তা সত্ত্বেও কোনো এক বিষয়ে পোপ তার প্রতি বিরাগভাজন হন। হেনরি প্রথমে পোপের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করতে অস্বীকৃতি জানান। তখন পোপ গ্রেগরি রাজা হেনরির ওপর থেকে তার আস্থা প্রত্যাহার করে নেন এবং তাকে গির্জার সন্তুষ্টি-বঞ্চিত ও (এর অনিবার্য পরিণতি হিসেবে) স্বর্গ-বঞ্চিত ঘোষণা করেন। পোপের ফরমান জারি হতেই জনগণ তার প্রতি আনুগত্য প্রত্যাহার করতে শুরু করে। ফলে রাজার রাজক্ষমতাই হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়ে। অবস্থাদৃষ্টে রাজার ঘনিষ্ঠজন ও শুভানুধ্যায়ীরা তাকে পোপের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করার পরামর্শ দেয়।
প্রচণ্ড ক্ষমতাধর জার্মান রাজা চতুর্থ হেনরি তখন পোপের আস্থা ও সন্তুষ্টি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে এক অভিনব পন্থা অবলম্বন করেন। পূর্ণ অনুতাপ ও অনুশোচনা প্রকাশের উদ্দেশ্যে তিনি জার্মানি থেকে খালি পায়ে হেঁটে রোমে পৌঁছান। কিন্তু এরপরও পোপ পূর্ণ তিন দিন তার সঙ্গে সাক্ষাতে অস্বীকৃতি জানান। এই তিন দিন হেনরি পোপের সাক্ষাৎলাভের অনুমতির অপেক্ষায় বৃষ্টি ও প্রচণ্ড ঠান্ডার মধ্যে গির্জার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকেন। এরপর অনুমতি পেয়ে তিনি ক্ষমালাভের উদ্দেশ্যে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং পোপের পদযুগলে চুম্বন করতে থাকেন! আপন রাজত্ব রক্ষায় রাজা চতুর্থ হেনরির সামনে এটাই ছিল একমাত্র সমাধান!
৬৯. উক্ত অঞ্চলের অন্যান্য নদীর ধারার বিপরীতে এ নদীটি দক্ষিণ থেকে উত্তরে প্রবাহিত হওয়ায় এর নামকরণ করা হয় 'আছি' বা অবাধ্য নদী।
৭০. খালিদ বিন মুহাম্মাদ মুবারক কাসিমি, আল-আলাকাতুল খারিজিয়্যাহ ফিল আছরিল ইসলামি, পৃষ্ঠা: ১১৫।
৭১. ত্রিপোলি: এটি লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলি নয়; বরং লেবানিজ নগরী। রাজধানী বৈরুতের পর ত্রিপোলি লেবাননের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী। উল্লেখ্য, লেবাননের ত্রিপোলি ও লিবিয়ার ত্রিপোলি উভয়টির আরবি নাম (তারাবলুস) এবং উভয়টির ইংরেজি নাম Tripoli (ত্রিপোলি)। আরবিতে পার্থক্যকরণের জন্য প্রথমটিকে (শামের তারাবলুস) এবং দ্বিতীয়টিকে (পশ্চিমা তারাবলুস) বলা হয়।
ক্রুসেড আগ্রাসনের কার্যকারণসমূহ এবং ক্রুসেড আগ্রাসন মোকাবিলায় মুসলিম উম্মাহর সংগ্রামী জিহাদ
প্রথম ক্রুসেড [৪৮৮-৪৯২ হিজরি-১০৯৫-১০৯৯ খ্রিষ্টাব্দ]
৪৮০ হিজরি সনে ২য় আরবান (Pope Urban II) রোমান ক্যাথলিক চার্চের পোপ নির্বাচিত হওয়ার পর তৎকালীন খ্রিষ্টান বিশ্বের জনগণের অনুসরণীয় নেতায় পরিণত হন। তিনি মুসলমানদের হাত থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস পুনরুদ্ধার এবং বাইতুল মুকাদ্দাসের মুসলিম সেলজুক শাসকদের নিপীড়ন (!) থেকে খ্রিষ্টান তীর্থযাত্রীদের রক্ষা করার জন্য সমকালীন খ্রিষ্টান রাজন্যবর্গকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার আহ্বান জানান। (৬৬)
পোপ ২য় আরবানের আহ্বানে উদ্দীপ্ত হয়ে যারা ক্রুসেড অভিযান সফল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন, তাদের অন্যতম হলেন পিটার (Peter the Hermit) নামক জনৈক সন্ন্যাসী। তিনি ক্রুসেড অভিযানের জন্য প্রচুর পরিমাণে স্বেচ্ছাসেবী সৈনিক সংগ্রহ করেন। তবে তার সংগৃহীত অধিকাংশ সৈনিক ছিল খ্রিষ্টানসমাজের চোর-ডাকাত ও উচ্ছৃঙ্খল শ্রেণির লোকজন। নিয়মিত সৈন্যদের মূল বাহিনী রওনা হওয়ার পূর্বেই পিটার তার এই উচ্ছৃঙ্খল বাহিনী নিয়ে বাইতুল মুকাদ্দাস অভিমুখে রওনা হন। এই বাহিনীটি পথে ব্যাপক নৈরাজ্য ও অরাজকতা সৃষ্টি করে এবং আশেপাশের প্রতিটি জনপদের অধিবাসীদের ওপর নিপীড়ন চালায়। খ্রিষ্টান জনপদগুলোও তাদের নৈরাজ্যের শিকার হয়। তাদের আচরণে বাইজান্টাইন সম্রাট ১ম অ্যালেক্সিয়াস কমনিনোস (Alexios I Komnenos)-ও বীতশ্রদ্ধ হয়ে ওঠেন। উচ্ছৃঙ্খল জনতার এই অনিয়মিত বাহিনীটি মুসলিম ভূখণ্ডের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। অবশেষে সেলজুকরা নিকিয়া(৬৭) এলাকায় তাদের প্রতিরোধ করে তাদেরকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। এটি ৪৮৯ হিজরি সনের (১০৯৬ খ্রিষ্টাব্দের) ঘটনা।
এরইমাঝে ক্রুসেডারদের নিয়মিত বাহিনী ফ্রান্স থেকে মুসলিম ভূখণ্ডের উদ্দেশে রওনা হয়। সুবিশাল ক্রুসেড বাহিনীতে সৈন্যের সংখ্যাই ছিল তিন লক্ষ। ক্রুসেড বাহিনীর একক কোনো নেতৃত্ব ছিল না। অধিকাংশ অংশের নেতৃত্ব দিচ্ছিল ফ্রান্সের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রশাসক ও সেনাপতিগণ। তৎকালীন ইউরোপের অধিকাংশ শাসক এ অভিযানে যোগ দিতে পারেনি। আন্দালুসের খ্রিষ্টরাজ্যগুলোর শাসকগণ আন্দালুসের মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ব্যস্ত ছিল। অপরদিকে ফ্রান্সের রাজা ১ম ফিলিপ ও জার্মানির রাজা ৪র্থ হেনরি তখন রোমান চার্চের সন্তুষ্টিবঞ্চিত(৬৮) থাকায় অভিযানে যোগ দিতে পারেননি।
মূল ক্রুসেড বাহিনী ফ্রান্স থেকে রওনা হয়ে রোম হয়ে কনস্টান্টিনোপলে পৌঁছায়, এরপর সেখান থেকে রোমান সেলজুক সাম্রাজ্যের রাজধানী নিকিয়া অভিমুখে রওনা হয়। রোমান সেলজুক সাম্রাজ্যের শাসক ১ম কিলিজ আরসালানের অনুপস্থিতির সুযোগে তারা উত্তর ও দক্ষিণ দিক থেকে নিকিয়া নগরী অবরোধ করে। কিলিজ ফিরে এসে নিকিয়ায় প্রবেশের চেষ্টা করেন এবং ক্রুসেডারদের সাথে তুমুল লড়াই করেন। কিন্তু তিনি নিকিয়ায় প্রবেশ করতে ব্যর্থ হন। ক্রুসেডারদের হাতে নিকিয়ার পতন ঘটে এবং নগরীটি বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। উল্লেখ্য, নিকিয়ার অধিকাংশ অধিবাসী ছিল খ্রিষ্টান।
এরপর ক্রুসেডার বাহিনী অভিযান অব্যাহত রেখে অতি সহজে বরং বলতে গেলে বিনা বাধায় জনশূন্য কোনিয়া (Konya) নগরী দখল করে নেয়। কিলিজ এর পূর্বেই কোনিয়ার অধিবাসীদের সেখান থেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন। এরপর ক্রুসেডার বাহিনী একে একে হিরাক্লিয়া (Heraclea Cybistra), কিলিকিয়া (Cilicia), কায়সারিয়া (Kayseri) ও মারআশ (Kahramanmaraş) নগরী দখল করে নেয়। এই অভিযানের ফলে ক্রুসেডার বাহিনীর হাতে রোমান সেলজুকদের পতন ঘটে। রোমান সেলজুকদের ভূখণ্ডে সৃষ্টি হয় আর্মেনিয়া ও এডেসা-সহ বিভিন্ন খ্রিষ্টরাজ্য।
এরপর ক্রুসেডার বাহিনী শাম অভিমুখে অগ্রসর হয় এবং এন্টিয়কের পূর্বে আছি(৬৯) নদীর (Orontes river) ওপর নির্মিত লৌহ সেতু পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তারা পারসিক সেলজুক রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত এন্টিয়ক নগরী দখল করে নেয়। এন্টিয়কেও গড়ে ওঠে একটি খ্রিষ্টরাজ্য। ক্রুসেড বাহিনী প্রচণ্ড যুদ্ধের পর শামীয় সেলজুক রাষ্ট্রের লাতাকিয়া (Latakia) নগরীও দখল করে নেয়।
এ সময় ক্রুসেডাররা এন্টিয়কে নিজেদের অবস্থান নিরাপদ ও সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে মিশরের উবায়দি সরকারের সঙ্গে এ মর্মে চুক্তি করে যে, শামের উত্তরাঞ্চল ক্রুসেডারদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে আর ফিলিস্তিন থাকবে উবায়দিদের নিয়ন্ত্রণে। উবায়দিরা তো দীর্ঘদিন যাবৎ শাম অঞ্চলে মুসলিম (সুন্নি) সেলজুকদের কর্তৃত্ব চিরতরে শেষ করার সুযোগ খুঁজে বেড়াচ্ছিল। তাই তারা কালবিলম্ব না করে এ চুক্তিতে সম্মত হয়।
এরপর ক্রুসেডাররা বাইতুল মুকাদ্দাস অভিমুখে রওনা হয়। বাইতুল মুকাদ্দাসে তখন উবায়দিদের কর্তৃত্ব ছিল। পথে তাদেরকে প্রতিরোধ করার জন্য বিভিন্ন প্রচেষ্টা চালানো হলেও তারা প্রতিটি বাধা সফলতার সঙ্গে অতিক্রম করে এবং উবায়দিদের সঙ্গে কৃত চুক্তির সামান্য পরোয়া না করে আল-কুদস নগরীর দ্বারে পৌঁছে যায়। আক্কার (উবায়দি) প্রশাসক ও বৈরুতের অধিবাসীরা তাদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করে। দীর্ঘ একচল্লিশ দিনের অবরোধের পর ক্রুসেডারদের হাতে আল-কুদস নগরীর পতন ঘটে। কুদসের নিরাপত্তায় নিয়োজিত উবায়দি সৈন্যরা কোনো ধরনের প্রতিরোধ প্রচেষ্টার পরিবর্তে মসজিদে আশ্রয় নেয়। ক্রুসেডাররা আল-কudস নগরীতে প্রবেশ করার পর সেখানে গণহত্যা ঘটায়। মুসলমানদের রক্তে বাইতুল মুকাদ্দাস নামে খ্যাত আল-কুদস নগরী প্লাবিত হয়ে যায়। প্রায় সত্তর হাজার সাধারণ মুসলমান ক্রুসেডারদের হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়।
৪৯২ হিজরি সনের শাবান মাসে (১০৯৯ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে) বাইতুল মুকাদ্দাসের পতন ঘটে।
এই অভিযানের মাধ্যমে ক্রুসেডাররা ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের বাইতুল মুকাদ্দাস, বেথেলহাম, হেবরন, রামলা, রামাল্লা, জাফা (Jaffa), নাবলুস, বায়সান, তাবারিয়া (Tiberias) ও নাসিরিয়া নগরী দখল করে নেয়। আসকালানসহ কয়েকটি গ্রাম থেকে যায় মুসলমানদের হাতে।
জনৈক ঐতিহাসিক তখনকার ফিলিস্তিনের চিত্র নিম্নোক্ত ভাষায় তুলে ধরেছেন—
তৎকালে শামে বিদ্যমান খ্রিষ্টরাজ্যগুলোকে তুলনা করা যেতে পারে প্রতিশোধ গ্রহণ ও হৃত অধিকার পুনরুদ্ধারের উপযুক্ত সুযোগের প্রতীক্ষায় ওঁত পেতে থাকা শত্রুপক্ষের বিশাল মহাসাগরের মাঝে অবস্থিত বিক্ষিপ্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বীপের সঙ্গে। (৭০)
এখানে এ তথ্যটিও উল্লেখযোগ্য যে, ক্রুসেডাররা বাইতুল মুকাদ্দাস দখল করতে সক্ষম হলেও এর জন্য তাদের বিরাট মূল্য চুকাতে হয়। অভিযানের শুরুতে ক্রুসেডার বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ছিল তিন লক্ষ আর যখন তারা বাইতুল মুকাদ্দাসে প্রবেশ করে, তখন তাদের সৈন্যসংখ্যা চল্লিশ হাজারের বেশি ছিল না। এডেসা অভিযানে অংশগ্রহণের জন্য মূল বাহিনী হতে যেসব ক্রুসেডার সৈন্য আলাদা হয়ে গিয়েছিল, তাদের সংখ্যা নিয়ে যত অতিরঞ্জন করা হোক না কেন, তা চল্লিশ হাজারের বেশি হবে না। অর্থাৎ ক্রুসেডার বাহিনীর মাত্র আশি হাজার সৈন্য প্রথম ক্রুসেড অভিযান শেষে জীবিত ছিল; নিহত হয়েছিল দুই লক্ষ বিশ হাজার সৈন্য। এ তথ্য দ্বারাই অনুমান করা যায় যে, ক্রুসেডার বাহিনী কী পরিমাণ প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছিল। তাদের সবাই যে প্রতিপক্ষের সৈন্যদের হাতে নিহত হয়েছিল এমন নয়; অনেক ক্রুসেডার সৈন্য নিহত হয়েছিল সেসব সাধারণ জনগণের হাতে, যারা ক্রুসেডার বাহিনীর সৈন্যদের আচরণে অতিষ্ঠ হয়ে বিদ্রোহ করেছিল। সাধারণ জনগণ যদিও জানত যে, এই বিদ্রোহের কারণে তাদের পরিণাম হবে অত্যন্ত ভয়াবহ, তারপরও তারা অনিচ্ছাসত্ত্বেও বিদ্রোহ করতে বাধ্য হয়েছিল। বর্বর ক্রুসেডার সৈন্যদের আচরণ এত জঘন্য, কঠোর ও নিকৃষ্ট পর্যায়ের ছিল যে, একজন মানুষ যতই লাঞ্ছনা ও ভীতির শিকার হোক না কেন, বিদ্রোহী হতে বাধ্য হবে।
প্রিয় পাঠক! এবার ভেবে দেখুন, তখন যদি সকল মুসলিম শক্তি ক্রুসেডারদের মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধ হতো, তাহলে কেমন হতো ক্রুসেডারদের পরিণতি?!
প্রথম ক্রুসেড অভিযানের মাধ্যমে শামের ইসলামি ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে চারটি খ্রিষ্টরাজ্য গড়ে ওঠে—এডেসা, এন্টিয়ক, বাইতুল মুকাদ্দাস ও ত্রিপোলি(৭১)। রাজ্যচারটির প্রতিষ্ঠাকাল যথাক্রমে:
১. এডেসা রাজ্য: রবিউল আউয়াল ৪৯১ হিজরি (ফেব্রুয়ারি ১০৯৮ খ্রিষ্টাব্দ)।
২. এন্টিয়ক রাজ্য: রজব ৪৯১ হিজরি (জুন ১০৯৮ খ্রিষ্টাব্দ)।
৩. বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্য: শাবান ৪৯২ হিজরি (জুলাই ১০৯৯ খ্রিষ্টাব্দ)।
৪. ত্রিপোলি রাজ্য: জিলহজ ৫০২ হিজরি (জুলাই ১১০৯ খ্রিষ্টাব্দ)।
টিকাঃ
৬৫. ক্রুসেড ইতিহাস সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে অধ্যয়ন করা যেতে পারে মাকতাবাতুল হাসান থেকে প্রকাশিত ড. রাগিব সারজানির ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস।
৬৬. পোপ ২য় আরবান যদিও খ্রিষ্টানসমাজকে ক্রুসেড অভিযানে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করার জন্য দাবি তুলেছিলেন যে, মুসলিম শাসকগণ বাইতুল মুকাদ্দাসগামী খ্রিষ্টান তীর্থযাত্রীদের ওপর প্রচণ্ড নির্যাতন-নিপীড়ন চালিয়ে থাকে; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এ দাবি ছিল সম্পূর্ণই মিথ্যা ও অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
প্রখ্যাত ইউরোপিয়ান ঐতিহাসিক আলেকজান্ডার ভ্যাসিলিভ (Alexander Alexandrovich Vasiliev) [মৃত্যু: ১৯৫৩ খ্রি.] Istoria Imperiului Bizantin [History of the Byzantine Empire] গ্রন্থে লিখেছেন—
খ্রিষ্টানরা নির্বিশেষে সকলে ইসলামি শাসনের ছায়ায় ধর্মীয় ও অন্যান্য ক্ষেত্রে পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করত। তাদেরকে শুধু তাদের নিজেদের পুরোনো গির্জাগুলো সংরক্ষণের অনুমতিই দেওয়া হয়নি; বরং নতুন নতুন গির্জা ও মঠ নির্মাণের অনুমতিও দেওয়া হয়েছিল। নিজেদের গ্রন্থাগারে তারা ধর্মতত্ত্ব বিষয়ের বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থও রাখত।
আমেরিকান বিখ্যাত ঐতিহাসিক জেমস থমসন (James Westfall Thompson) [মৃত্যু : ১৯৪১ খ্রি.] Economic and social history of the Middle Ages গ্রন্থে লিখেছেন—সেলজুক রাষ্ট্রের অধীনে যেসব খ্রিষ্টান নাগরিক বসবাস করত, তারা খোদ বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের প্রাণকেন্দ্রে বসবাসকারী খ্রিষ্টানদের চেয়েও অধিক সুখে-শান্তিতে ছিল।
জেমস থমসন প্রাগুক্ত গ্রন্থে আরও উল্লেখ করেছেন যে, স্বয়ং বাইতুল মুকাদ্দাসের গির্জাধ্যক্ষ (Patriarch of Jerusalem) থিওডোসিয়াস (Theodosius) কনস্টান্টিনোপলের গির্জাধ্যক্ষের কাছে ২৫৫ হিজরিতে (৮৬৯ খ্রিষ্টাব্দে) পাঠানো এক পত্রে মুসলমানদের উদার আচরণ ও সহমর্মিতার ভূয়সী প্রশংসা করেন। পত্রে তিনি এ কথাও উল্লেখ করেন যে, মুসলমানরা খ্রিষ্টানদের একান্ত ধর্মীয় বিষয়াদিতে কোনোপ্রকার হস্তক্ষেপ করে না এবং তাদেরকে নির্দ্বিধায় অধিক হারে গির্জা নির্মাণের সুযোগ দেয়। পত্রে বাইতুল মুকাদ্দাসের গির্জাধ্যক্ষ একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা তুলে ধরে বলেন, 'মুসলিম জাতি হলো ন্যায়পরায়ণ জাতি। আমরা তাদের কাছ থেকে কোনো ধরনের ক্ষতি বা সীমালঙ্ঘনের সম্মুখীন হই না।' এসব সাক্ষ্য এবং এ জাতীয় অসংখ্য সাক্ষ্যপ্রমাণ সন্দেহাতীতভাবে এ কথা প্রমাণ করে যে, পোপ ২য় আরবানের উল্লিখিত দাবি অসার রটনা ছাড়া কিছুই নয়। প্রকৃতপক্ষে খ্রিষ্টানদের ক্রুসেড অভিযান পরিচালনার পেছনে যেসব অনৈতিক স্বার্থ কার্যকর ছিল, সেগুলোকে ঢেকে রাখার অপচেষ্টা হিসেবেই এই বানোয়াট ও মিথ্যা দাবি তোলা হয়েছিল। [এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানতে দ্রষ্টব্য মাকতাবাতুল হাসান থেকে প্রকাশিত ড. রাগিব সারজানির ক্রুসেড যুদ্ধের ইতিহাস।]
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ইউরোপীয় খ্রিষ্টানদের প্রথম ক্রুসেড অভিযানে বের হওয়ার ক্ষেত্রে পোপ ২য় আরবানের কর্মপ্রচেষ্টা যেমন কার্যকর ভূমিকা রেখেছিল, তেমনই শিয়া উবায়দি সাম্রাজ্যের কর্ণধারদের প্ররোচনাও এ ক্ষেত্রে অন্যতম কার্যকারণ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। ইসলামি বিশ্বে সেলজুক সাম্রাজ্যের ক্রমবর্ধমান শক্তিবৃদ্ধিতে কোণঠাসা হয়ে পড়ায় উবায়দি সাম্রাজ্যের নেতৃবৃন্দ পত্রপ্রেরণের মাধ্যমে ইউরোপীয়দের ইসলামি প্রাচ্যে সেলজুক সাম্রাজ্যে হামলা চালাতে প্ররোচিত করেছিল। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে সেলজুকদের মোকাবিলায় উবায়দি খলিফা ও বাইজান্টাইন সম্রাটের মধ্যে গোপন চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছিল।
৬৭. নিকিয়া : আরবিতে (نيقية )নিকিয়া), ইংরেজিতে Nicaea (নিকায়া) এশিয়া মাইনর অঞ্চলের পশ্চিম উপকূলে মর্মর সাগরের নিকটে অবস্থিত সুপ্রাচীন একটি নগরী। আধুনিক তুরস্কের বুরছা প্রদেশে অবস্থিত অঞ্চলটির বর্তমান নাম ইজনিক (İznik)। ৩২৫ খ্রিষ্টাব্দে খ্রিষ্টধর্মের প্রথম সর্বজনীন মহাসভা নিকিয়াতে অনুষ্ঠিত হয় বলে খ্রিষ্টধর্মীয় ইতিহাসে নগরীটির বিশেষ অবস্থান রয়েছে।
৬৮. খ্রিষ্টীয় নবম, দশম ও একাদশ শতকে ইউরোপের ঘটনাপ্রবাহে গির্জা ও পোপদের বিরাট প্রতিপত্তি ও প্রভাব ছিল। কেবল চিন্তা ও ধর্মগত দিক থেকেই নয়; বরং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক সর্বক্ষেত্রে ইউরোপীয় সমাজের ওপর গির্জাগুলোর ছিল একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ। গির্জাগুলো চাইলেই কোনো শাসক ও রাজার ওপর থেকে আস্থা ও সন্তুষ্টি প্রত্যাহার করে নিতে পারত। আস্থা প্রত্যাহার করামাত্র পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যেত এবং জনগণ দলমতনির্বিশেষে সকলে সন্তুষ্টিবঞ্চিত শাসককে প্রত্যাখ্যান করত। এ কারণেই শাসক ও রাজন্যবর্গ গির্জার মতামতের প্রতি অত্যন্ত ভীতি ও আতঙ্ক এবং মর্যাদা ও সম্মানের চোখে তাকিয়ে থাকত।
তৎকালীন পোপদের প্রভাব-প্রতিপত্তির পরিমাণ উপলব্ধি করতে জার্মান রাজা চতুর্থ হেনরির সঙ্গে (২য় আরবানের পূর্বতন) পোপ ৭ম গ্রেগরি (Gregory VII)-এর কৃত একটি আচরণ উল্লেখ করাই বোধকরি যথেষ্ট হবে। জার্মান রাজা চতুর্থ হেনরি ছিলেন সমকালীন ইউরোপের সবচেয়ে প্রতাপশালী শাসক। তা সত্ত্বেও কোনো এক বিষয়ে পোপ তার প্রতি বিরাগভাজন হন। হেনরি প্রথমে পোপের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করতে অস্বীকৃতি জানান। তখন পোপ গ্রেগরি রাজা হেনরির ওপর থেকে তার আস্থা প্রত্যাহার করে নেন এবং তাকে গির্জার সন্তুষ্টি-বঞ্চিত ও (এর অনিবার্য পরিণতি হিসেবে) স্বর্গ-বঞ্চিত ঘোষণা করেন। পোপের ফরমান জারি হতেই জনগণ তার প্রতি আনুগত্য প্রত্যাহার করতে শুরু করে। ফলে রাজার রাজক্ষমতাই হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়ে। অবস্থাদৃষ্টে রাজার ঘনিষ্ঠজন ও শুভানুধ্যায়ীরা তাকে পোপের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করার পরামর্শ দেয়।
প্রচণ্ড ক্ষমতাধর জার্মান রাজা চতুর্থ হেনরি তখন পোপের আস্থা ও সন্তুষ্টি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে এক অভিনব পন্থা অবলম্বন করেন। পূর্ণ অনুতাপ ও অনুশোচনা প্রকাশের উদ্দেশ্যে তিনি জার্মানি থেকে খালি পায়ে হেঁটে রোমে পৌঁছান। কিন্তু এরপরও পোপ পূর্ণ তিন দিন তার সঙ্গে সাক্ষাতে অস্বীকৃতি জানান। এই তিন দিন হেনরি পোপের সাক্ষাৎলাভের অনুমতির অপেক্ষায় বৃষ্টি ও প্রচণ্ড ঠান্ডার মধ্যে গির্জার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকেন। এরপর অনুমতি পেয়ে তিনি ক্ষমালাভের উদ্দেশ্যে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং পোপের পদযুগলে চুম্বন করতে থাকেন! আপন রাজত্ব রক্ষায় রাজা চতুর্থ হেনরির সামনে এটাই ছিল একমাত্র সমাধান!
৬৯. উক্ত অঞ্চলের অন্যান্য নদীর ধারার বিপরীতে এ নদীটি দক্ষিণ থেকে উত্তরে প্রবাহিত হওয়ায় এর নামকরণ করা হয় 'আছি' বা অবাধ্য নদী।
৭০. খালিদ বিন মুহাম্মাদ মুবারক কাসিমি, আল-আলাকাতুল খারিজিয়্যাহ ফিল আছরিল ইসলামি, পৃষ্ঠা: ১১৫।
৭১. ত্রিপোলি: এটি লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলি নয়; বরং লেবানিজ নগরী। রাজধানী বৈরুতের পর ত্রিপোলি লেবাননের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী। উল্লেখ্য, লেবাননের ত্রিপোলি ও লিবিয়ার ত্রিপোলি উভয়টির আরবি নাম (তারাবলুস) এবং উভয়টির ইংরেজি নাম Tripoli (ত্রিপোলি)। আরবিতে পার্থক্যকরণের জন্য প্রথমটিকে (শামের তারাবলুস) এবং দ্বিতীয়টিকে (পশ্চিমা তারাবলুস) বলা হয়।