📄 ইসলামি প্রাচ্যে ক্রুসেড আগ্রাসনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
মুসলিম ভূখণ্ডে খ্রিষ্টান ক্রুসেডারদের হিংস্র ও বর্বর আগ্রাসন দুটি মহান রাষ্ট্রের প্রবল বাধার সম্মুখীন হয়— জিনকি রাষ্ট্র ও আইয়ুবি রাষ্ট্র। এই দুটি রাষ্ট্রের সৃষ্টিই যেন হয়েছিল ইসলামি প্রাচ্যে ইউরোপীয়দের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াতে এবং তাদের এই কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে ছয়শ বছরেরও অধিক সময়ের জন্য পিছিয়ে দিতে।
কোমলতা-উদারতা, সততা-বিশ্বস্ততা ও সাম্প্রদায়িক আচরণ পরিহারের গুণে সজ্জিত হয়ে আইয়ুবি রাষ্ট্র ক্রুসেডারদের সামনে এক মঙ্গলকামী শিক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল। আইয়ুবি শাসকগণ নিজেদের সমুন্নত আচরণের মাধ্যমে ক্রুসেডারদের সামনে তুলে ধরেছিলেন শত্রুর সঙ্গে আচরণের এক অনুপম নীতি; শিখিয়েছিলেন মানুষের সঙ্গে কীরূপ সদাচরণ করতে হয়; চরম নিন্দনীয় পাশবিক গোঁড়ামি, সাম্প্রদায়িকতা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ এবং প্রতারণা ও প্রবঞ্চনা ইত্যাদি কীভাবে পরিহার করতে হয়।
মুসলিম ভূখণ্ডে খ্রিষ্টান ক্রুসেডারদের হিংস্র ও বর্বর আগ্রাসন দুটি মহান রাষ্ট্রের প্রবল বাধার সম্মুখীন হয়— জিনকি রাষ্ট্র ও আইয়ুবি রাষ্ট্র। এই দুটি রাষ্ট্রের সৃষ্টিই যেন হয়েছিল ইসলামি প্রাচ্যে ইউরোপীয়দের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াতে এবং তাদের এই কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে ছয়শ বছরেরও অধিক সময়ের জন্য পিছিয়ে দিতে।
কোমলতা-উদারতা, সততা-বিশ্বস্ততা ও সাম্প্রদায়িক আচরণ পরিহারের গুণে সজ্জিত হয়ে আইয়ুবি রাষ্ট্র ক্রুসেডারদের সামনে এক মঙ্গলকামী শিক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল। আইয়ুবি শাসকগণ নিজেদের সমুন্নত আচরণের মাধ্যমে ক্রুসেডারদের সামনে তুলে ধরেছিলেন শত্রুর সঙ্গে আচরণের এক অনুপম নীতি; শিখিয়েছিলেন মানুষের সঙ্গে কীরূপ সদাচরণ করতে হয়; চরম নিন্দনীয় পাশবিক গোঁড়ামি, সাম্প্রদায়িকতা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ এবং প্রতারণা ও প্রবঞ্চনা ইত্যাদি কীভাবে পরিহার করতে হয়।
📄 প্রথম ও দ্বিতীয় ক্রুসেড হামলার মধ্যবর্তী সময়ের পরিস্থিতি
ক্রুসেডাররা বাইতুল মুকাদ্দাস দখল করার পর এক বছর অতিবাহিত না হতেই চতুর্দিক থেকে ঘিরে থাকা ইসলামি শক্তিগুলোর পক্ষ থেকে ব্যাপক আক্রমণের সম্মুখীন হয়। পরবর্তী প্রায় অর্ধ শতাব্দী বলতে গেলে প্রতি বছর তারা মুসলমানদের হামলার শিকার হতে থাকে। এর ফলে খ্রিস্টানদের জানমালের প্রচুর ক্ষতি সাধিত হয় এবং তারা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। সেলজুকদের বিরুদ্ধে ক্রুসেডারদের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপনকারী উবায়দিদের সামনে যখন ক্রুসেডারদের প্রতারণা-বিশ্বাসঘাতকতা ও চুক্তিরক্ষায় উদাসীনতার স্বভাব সুস্পষ্ট হয়ে যায়, তখন তারাও ক্রুসেডারদের ওপর হামলা চালাতে থাকে।
৫২১ হিজরি-পরবর্তী সময়ে ক্রুসেডারদের মোকাবিলায় অনন্যসাধারণ ভূমিকা রাখেন সুলতান ইমাদুদ্দিন জিনকি ও তার বংশধরগণ। ঐতিহাসিক ইবনুল আছির রহ. বলেন—
আল্লাহ তাআলা যদি শহিদ ইমাদুদ্দিন জিনকির শাসনের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর ওপর অনুগ্রহ না করতেন, তাহলে ফিরিঙ্গিরা পুরো শাম অঞ্চল দখল করে নিত। (৭২)
ক্রুসেডাররা বাইতুল মুকাদ্দাস দখল করার পর এক বছর অতিবাহিত না হতেই চতুর্দিক থেকে ঘিরে থাকা ইসলামি শক্তিগুলোর পক্ষ থেকে ব্যাপক আক্রমণের সম্মুখীন হয়। পরবর্তী প্রায় অর্ধ শতাব্দী বলতে গেলে প্রতি বছর তারা মুসলমানদের হামলার শিকার হতে থাকে। এর ফলে খ্রিস্টানদের জানমালের প্রচুর ক্ষতি সাধিত হয় এবং তারা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। সেলজুকদের বিরুদ্ধে ক্রুসেডারদের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপনকারী উবায়দিদের সামনে যখন ক্রুসেডারদের প্রতারণা-বিশ্বাসঘাতকতা ও চুক্তিরক্ষায় উদাসীনতার স্বভাব সুস্পষ্ট হয়ে যায়, তখন তারাও ক্রুসেডারদের ওপর হামলা চালাতে থাকে।
৫২১ হিজরি-পরবর্তী সময়ে ক্রুসেডারদের মোকাবিলায় অনন্যসাধারণ ভূমিকা রাখেন সুলতান ইমাদুদ্দিন জিনকি ও তার বংশধরগণ। ঐতিহাসিক ইবনুল আছির রহ. বলেন—
আল্লাহ তাআলা যদি শহিদ ইমাদুদ্দিন জিনকির শাসনের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর ওপর অনুগ্রহ না করতেন, তাহলে ফিরিঙ্গিরা পুরো শাম অঞ্চল দখল করে নিত। (৭২)
📄 ইমাদুদ্দিন জিনকির পিতা হাজিব আক সুনকুর তুর্কমানির পরিচিতি
তুর্কি বংশোদ্ভূত আক সুনকুর ছিলেন তুর্কি শাখাগোত্র ‘সাবয়ু’-এর সদস্য। তিনি বৃহত্তর সেলজুক সাম্রাজ্যের সুলতান মালিক শাহের প্রিয়পাত্র ছিলেন। সুলতান মালিক শাহ তার প্রতি এতটা আস্থাশীল ছিলেন যে, তিনি আক সুনকুরকে ‘কাসিমুদ্দৌলা’ (সাম্রাজ্যের অংশীদার) উপাধি প্রদান করেন। অর্থাৎ সুলতান মনে করতেন, সাম্রাজ্য পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে আক সুনকুর তার সঙ্গে শরিক আছেন! ৪৭৯ হিজরি সনের শাওয়াল মাসে (১০৮৭ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে) আলেপ্পো নগরীতে সুলতান মালিক শাহের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তিনি আক সুনকুরকে আলেপ্পোর প্রশাসক নিযুক্ত করেন। সুলতান তাকে আলেপ্পোর পাশাপাশি হামা, মানবিজ ও লাতাকিয়াসহ এ অঞ্চলের আরও কিছু নগরীর শাসনক্ষমতাও প্রদান করেন। হাজিব আক সুনকুর আপন প্রশাসনিক দক্ষতা ও প্রজ্ঞাপূর্ণ কর্মনীতির মাধ্যমে অল্পসময়ের মধ্যে আলেপ্পোর প্রতিটি অঙ্গনে ব্যাপক সংস্কার সাধন করেন এবং ভঙ্গুরপ্রায় নগরীটিকে নতুন করে দাঁড় করান। আপন কর্মগুণে তিনি সকল মানুষের আলোচনায় পরিণত হন এবং আলেপ্পোবাসীর অগাধ ভালোবাসা লাভ করেন।
৪৮৫ হিজরি সনের শাওয়াল মাসে (১০৯২ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে) সুলতান মালিক শাহ ইন্তেকাল করার পর তার জ্যেষ্ঠ পুত্র বারকিয়ারুক সুবিশাল সেলজুক সাম্রাজ্যের সুলতান পদে অধিষ্ঠিত হন। কিন্তু মালিক শাহের ভাই তুতুশ আপন ভ্রাতুষ্পুত্র বারকিয়ারুকের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে জোরপূর্বক সালতানাতের অধিকার অর্জনের সিদ্ধান্ত নেন। ৪৮৬ হিজরি সনে তুতুশ ও বারকিয়ারুকের বাহিনী পারস্যের রায় নগরীতে মুখোমুখি হয়। আক সুনকুর শুরুতে তুতুশের বাহিনীর সঙ্গে থাকলেও যুদ্ধ শুরু হতেই তার বাহিনী নিয়ে সটকে পড়েন এবং বারকিয়ারুকের বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হন। এর ফলে তুতুশের বাহিনীর শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তারা যুদ্ধে পরাজিত হয়। বিক্ষুব্ধ তুতুশ কিছুদিন পরই প্রতিশোধ গ্রহণের লক্ষ্যে আলেপ্পোতে হামলা চালান। ৪৮৭ হিজরি সনের জুমাদাল উলা মাসে (১০৯৪ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে) তুতুশের বাহিনীর হাতে আক সুনকুর বন্দি হন। দুরাচারী তুতুশ তৎক্ষণাৎ তাকে হত্যা করেন।
ঐতিহাসিক ইবনুল আছির হাজিব আক সুনকুর সম্পর্কে বলেন—
কাসিমুদ্দৌলা ছিলেন প্রজার প্রতি সদাচরণ ও জন-অধিকার রক্ষার বিবেচনায় শ্রেষ্ঠতম রাজন্য। তার রাজ্যে ছিল পণ্যের সহজলভ্যতা, পূর্ণ ন্যায়বিচার ও বিস্তৃত নিরাপত্তা। (৭৩)
আরেক ঐতিহাসিক ইবনে কাছির বলেন—
কাসিমুদ্দৌলা ছিলেন শ্রেষ্ঠতম সদাচারী, নিষ্কলুষ ও সত্যনিষ্ঠ শাসক। তার আমলে জনজীবনে ছিল নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও পণ্যের সুলভ ব্যবস্থা। (৭৪)
টিকাঃ
৭২. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত তারীখ, ৯/১২।
৭৩. প্রাগুক্ত, ৮/৪৯৫।
৭৪. ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১২/১৪৭।
তুর্কি বংশোদ্ভূত আক সুনকুর ছিলেন তুর্কি শাখাগোত্র ‘সাবয়ু’-এর সদস্য। তিনি বৃহত্তর সেলজুক সাম্রাজ্যের সুলতান মালিক শাহের প্রিয়পাত্র ছিলেন। সুলতান মালিক শাহ তার প্রতি এতটা আস্থাশীল ছিলেন যে, তিনি আক সুনকুরকে ‘কাসিমুদ্দৌলা’ (সাম্রাজ্যের অংশীদার) উপাধি প্রদান করেন। অর্থাৎ সুলতান মনে করতেন, সাম্রাজ্য পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে আক সুনকুর তার সঙ্গে শরিক আছেন! ৪৭৯ হিজরি সনের শাওয়াল মাসে (১০৮৭ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি মাসে) আলেপ্পো নগরীতে সুলতান মালিক শাহের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তিনি আক সুনকুরকে আলেপ্পোর প্রশাসক নিযুক্ত করেন। সুলতান তাকে আলেপ্পোর পাশাপাশি হামা, মানবিজ ও লাতাকিয়াসহ এ অঞ্চলের আরও কিছু নগরীর শাসনক্ষমতাও প্রদান করেন। হাজিব আক সুনকুর আপন প্রশাসনিক দক্ষতা ও প্রজ্ঞাপূর্ণ কর্মনীতির মাধ্যমে অল্পসময়ের মধ্যে আলেপ্পোর প্রতিটি অঙ্গনে ব্যাপক সংস্কার সাধন করেন এবং ভঙ্গুরপ্রায় নগরীটিকে নতুন করে দাঁড় করান। আপন কর্মগুণে তিনি সকল মানুষের আলোচনায় পরিণত হন এবং আলেপ্পোবাসীর অগাধ ভালোবাসা লাভ করেন।
৪৮৫ হিজরি সনের শাওয়াল মাসে (১০৯২ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে) সুলতান মালিক শাহ ইন্তেকাল করার পর তার জ্যেষ্ঠ পুত্র বারকিয়ারুক সুবিশাল সেলজুক সাম্রাজ্যের সুলতান পদে অধিষ্ঠিত হন। কিন্তু মালিক শাহের ভাই তুতুশ আপন ভ্রাতুষ্পুত্র বারকিয়ারুকের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে জোরপূর্বক সালতানাতের অধিকার অর্জনের সিদ্ধান্ত নেন। ৪৮৬ হিজরি সনে তুতুশ ও বারকিয়ারুকের বাহিনী পারস্যের রায় নগরীতে মুখোমুখি হয়। আক সুনকুর শুরুতে তুতুশের বাহিনীর সঙ্গে থাকলেও যুদ্ধ শুরু হতেই তার বাহিনী নিয়ে সটকে পড়েন এবং বারকিয়ারুকের বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হন। এর ফলে তুতুশের বাহিনীর শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তারা যুদ্ধে পরাজিত হয়। বিক্ষুব্ধ তুতুশ কিছুদিন পরই প্রতিশোধ গ্রহণের লক্ষ্যে আলেপ্পোতে হামলা চালান। ৪৮৭ হিজরি সনের জুমাদাল উলা মাসে (১০৯৪ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে) তুতুশের বাহিনীর হাতে আক সুনকুর বন্দি হন। দুরাচারী তুতুশ তৎক্ষণাৎ তাকে হত্যা করেন।
ঐতিহাসিক ইবনুল আছির হাজিব আক সুনকুর সম্পর্কে বলেন—
কাসিমুদ্দৌলা ছিলেন প্রজার প্রতি সদাচরণ ও জন-অধিকার রক্ষার বিবেচনায় শ্রেষ্ঠতম রাজন্য। তার রাজ্যে ছিল পণ্যের সহজলভ্যতা, পূর্ণ ন্যায়বিচার ও বিস্তৃত নিরাপত্তা। (৭৩)
আরেক ঐতিহাসিক ইবনে কাছির বলেন—
কাসিমুদ্দৌলা ছিলেন শ্রেষ্ঠতম সদাচারী, নিষ্কলুষ ও সত্যনিষ্ঠ শাসক। তার আমলে জনজীবনে ছিল নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও পণ্যের সুলভ ব্যবস্থা। (৭৪)
টিকাঃ
৭২. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত তারীখ, ৯/১২।
৭৩. প্রাগুক্ত, ৮/৪৯৫।
৭৪. ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১২/১৪৭।
📄 ক্রুসেডারদের মোকাবিলায় ইমাদুদ্দিন জিনকি
পিতা আক সুনকুরের মৃত্যুর সময় ইমাদুদ্দিন জিনকির বয়স ছিল দশেরও কম। পিতৃবিয়োগের কিছুদিন পরই তিনি আলেপ্পো ত্যাগ করে মসুলে চলে যান। তখন মসুলের প্রশাসক-পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন তার পিতার বন্ধু কারবুগা। কারবুগার তত্ত্বাবধানে ইমাদুদ্দিন জিনকি যুদ্ধবিদ্যা, রণকৌশল ও সেনাপরিচালনার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে থাকেন। ৪৯৫ হিজরি সনে (১১০২ খ্রিষ্টাব্দে) কারবুগা ইন্তেকাল করার পর মসুলের প্রশাসক নির্বাচিত হন আমির জাকারমিশ। কারবুগার মতো তিনিও কাসিমুদ্দৌলা আক সুনকুরের নিষ্ঠাবান বন্ধু ছিলেন। জাকারমিশ কারবুগার অসমাপ্ত দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে ইমাদুদ্দিনের যথার্থ প্রতিপালন করতে থাকেন। তিনি তাকে নেতৃত্ব ও পরিচালনার সব ধরনের কলাকৌশল শিক্ষা দেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে তাকে অন্যদের তুলনায় যোগ্য ও অগ্রগামী করে গড়ে তোলেন।
৫০৭ হিজরি সনে (১১১৩ খ্রিষ্টাব্দে) ইমাদুদ্দিন জিনকি মসুলের তৎকালীন প্রশাসক মওদুদ বিন তুনতেকিনের অধীনে সিন্নাবরার যুদ্ধে অংশ নেন এবং ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অপূর্ব বীরত্বের স্বাক্ষর রাখেন। এ সময় সমগ্র মুসলিমবিশ্বে তার সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে এবং তিনি জনমানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন।
এরপর মসুলের প্রশাসক পদে অধিষ্ঠিত হন আক সুনকুর আল-বুরসুকি। ইমাদুদ্দিন জিনকি তার অধীনেও ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযানে পূর্ণ উদ্যমে অংশগ্রহণ করেন এবং এডেসা, সুমাইসাত ও সারুজ অবরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এর পাশাপাশি তিনি সেলজুক সুলতান কর্তৃক দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে সফলতার সঙ্গে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন।
ইমাদুদ্দিন জিনকির একের পর এক ধারাবাহিক সাফল্যে প্রীত হয়ে বৃহত্তর সেলজুক সাম্রাজ্যের সুলতান মুগিছুদ্দিন মাহমুদ তাকে ৫১৮ হিজরি সনে বসরার প্রশাসক পদে অধিষ্ঠিত করেন। ৫২১ হিজরি সনে সুলতান তাকে 'শিহনাতুল ইরাক' বা ইরাক অঞ্চলের নিরাপত্তা-প্রধানের দায়িত্ব প্রদান করেন। একই বছরের ৩ রমজান (১১২৭ খ্রিষ্টাব্দের ১২ সেপ্টেম্বর) সুলতান মাহমুদ ইমাদুদ্দিন জিনকিকে মসুল, জাযিরা ও শামের বিজিত অঞ্চলের আতাবিক(৭৫) হিসেবে নিয়োগ দেন। এর মাধ্যমে ইমাদুদ্দিন জিনকির হাতে সূচিত হয় ইসলামি ইতিহাসের সুপরিচিত ও গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায় 'জিনকি রাজ্য'।
ইমাদুদ্দিন জিনকি প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে আপন অত্যুচ্চ যোগ্যতা, শক্তিমত্তা ও কীর্তির বহিঃপ্রকাশ ঘটান। বিশেষ করে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে জিহাদে তিনি যে বীরত্ব ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন, তা ইসলামি ইতিহাসের পাতায় তার নাম চির অম্লান করে রাখবে। তার প্রশাসন আমলে এমন কোনো বছর অতিবাহিত হয়নি, যে বছর তিনি ফিরিঙ্গিদের হাত থেকে অধিকৃত কোনো ভূমি পুনরুদ্ধার করেননি। অথচ ইমাদুদ্দিন জিনকির শাসনামল মোটেও নিষ্কণ্টক ছিল না। অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সমস্যা সবসময় তার প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে বাধা হয়ে দাঁড়াত। কখনো সমস্যা তৈরি হতো সেলজুক সুলতানদের প্রভাব দমনের চেষ্টারত আব্বাসি খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহর পক্ষ থেকে; আবার কখনো তার ক্ষমতা হুমকির মুখে পড়ে যেত সেলজুক পরিবারের সদস্যদের অন্তর্বিরোধের কারণে। মাথার ওপর চেপে বসা এই সার্বক্ষণিক হুমকি উপেক্ষা করেই তিনি লড়াই চালিয়ে যেতেন খ্রিষ্টান ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে।
ঐতিহাসিক ইবনে কাছির রহ.-এর নিম্নোক্ত বর্ণনায় তৎকালীন মুসলিম উম্মাহর অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির চিত্র কিছুটা হলেও আন্দাজ করা যেতে পারে। তিনি বলেন-
৫২১ হিজরির কথা। বছর শুরু হয় খলিফা মুসতারশিদ বিল্লাহ ও সেলজুক সুলতান মাহমুদের পারস্পরিক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে। খলিফা তখন পশ্চিমাঞ্চলে তাঁবুতে অবস্থান করছিলেন। মুহাররমের চার তারিখ বুধবার সুলতানের একদল সৈন্য খলিফার প্রাসাদে পৌঁছায়। অস্ত্রধারী এক হাজার সৈন্যের বাহিনীটি ব্যাপক লুটতরাজ চালায়। রাজপ্রাসাদ হতে দাসীরা সাহায্যপ্রার্থনা করতে করতে উন্মুক্ত চেহারায় বের হয়ে আসে।
...এ ঘটনা জানতে পেরে খলিফা তার বাহিনী নিয়ে রওনা হন। কিছু নৌযান নিয়ে আসা হয়। বাগদাদজুড়ে হইচই ও অস্থিরতা শুরু হয়ে যায়। মনে হচ্ছিল—পৃথিবীজুড়ে প্রবল ভূকম্পন শুরু হয়েছে! খলিফার বাহিনীর সঙ্গে বিক্ষুব্ধ জনসাধারণও যোগ দেয় এবং সকলে মিলে সুলতানের বাহিনীকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। সুলতানের পক্ষাবলম্বী সৈন্যদের অনেকে নিহত হয়, বন্দিও হয় অনেকে। বাগদাদজুড়ে ব্যাপক গন্ডগোল ছড়িয়ে পড়ে। জনসাধারণ সুলতান মাহমুদের নাগাল পেয়ে যায় এবং তাকে বলতে থাকে—আরে বাতিনি! ফরাসি ও রোমানদের বাদ দিয়ে তুমি লড়াই করছ খলিফার সঙ্গে?!
... আশুরার দিন পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসে এবং সুলতান খলিফার কাছে নিরাপত্তা ও সন্ধি প্রার্থনা করেন। (৭৬)
একটু পর ইবনে কাছির রহ. বলেন—
৫২৩ হিজরি সনে ফিরিঙ্গিরা দামেশক অবরোধ করে। দামেশকের অধিবাসীরা নগরী ছেড়ে বেরিয়ে এসে ফিরিঙ্গি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রচণ্ড লড়াই করে। এ সময় দামেশকবাসী খলিফার কাছে সাহায্যপ্রার্থনার জন্য আবদুল্লাহ ওয়ায়েয ও একদল ব্যবসায়ীকে বাগদাদে প্রেরণ করে। বিক্ষুব্ধ প্রতিনিধিদল জামে মসজিদের মিম্বর ভেঙে ফেলতে উদ্যত হলে খলিফা তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দেন যে, শীঘ্রই তিনি সুলতানের কাছে বার্তা পাঠিয়ে ফিরিঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য বাহিনী প্রেরণ করতে অনুরোধ করবেন। খলিফার প্রতিশ্রুতি পাওয়ার পর পরিস্থিতি শান্ত হয়। কিন্তু এরপর সুলতান দামেশকে কোনো সৈন্যদল প্রেরণ করেননি। আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহে দামেশকবাসী নিজেরাই ফিরিঙ্গিদের পরাজিত করতে সক্ষম হয় এবং তাদের দশ হাজার সৈন্যকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দেয়। (৭৭)
৫৩৯ হিজরি সনে (১১৪৪ খ্রিষ্টাব্দে) সুলতান ইমাদুদ্দিন জিনকি এডেসা অবরোধ করেন এবং অর্ধ শতাব্দী ক্রুসেডারদের অধিকৃত নগরীটিকে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হন। এডেসা নগরী জয় করার পর সুলতান ইমাদুদ্দিন জিনকি সেখানকার খ্রিষ্টান অধিবাসীদের সঙ্গে কোমল ও উদার আচরণ করেন। খ্রিষ্টান নাগরিকরা অবাক বিস্ময়ে প্রত্যক্ষ করে জিনকির ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতা এবং ইসলামের দয়া ও উদারতা।
ইমাদুদ্দিন জিনকি ৫৪১ হিজরি সনের ৬ রবিউস সানি (১১৪৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ সেপ্টেম্বর) ফুরাত তীরবর্তী জাবার দুর্গ অবরোধকালে গুপ্তঘাতকের হাতে নিহত হন। তাকে হত্যার অভিযোগের তির শিয়া ইসমাইলি (বাতিনি) সম্প্রদায়ের দিকেই তাক করা হয়। শিয়া বাতিনি সম্প্রদায় হিজরি তৃতীয় শতাব্দী থেকেই বিভিন্ন মহান মুসলিম নেতা ও সেনাপতিদের গুপ্তহত্যার মাধ্যমে ইসলামকে ধ্বংস করার মিশন শুরু করেছিল।
প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনুল আছির ইমাদুদ্দিন জিনকির গুণ ও বৈশিষ্ট্য আলোচনা করতে গিয়ে বলেন—
তিনি আপন সেনাবাহিনী ও জনসাধারণের ওপর অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিলেন। সুমহান প্রশাসননীতির অধিকারী ইমাদুদ্দিনের শাসনামলে সবল দুর্বলের ওপর অত্যাচার করতে পারত না। তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করার পূর্বে অন্যায়-অনাচার, প্রশাসকগণের ঘন ঘন স্থানান্তর ও পাশেই খ্রিষ্টরাজ্যের অবস্থানের কারণে উক্ত অঞ্চল বিরানপ্রায় ছিল। ইমাদুদ্দিন দায়িত্ব গ্রহণ করার পর অঞ্চলটি আবাদ করেন। পুরো অঞ্চল জনসাধারণের আবাসনে মুখরিত হয়ে ওঠে। ইমাদুদ্দিন অত্যন্ত আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন ছিলেন। বিশেষত সৈন্যদের স্ত্রীদের মর্যাদা রক্ষায় তিনি পূর্ণ সচেতন ছিলেন। এককথায় তিনি ছিলেন সমকালের শ্রেষ্ঠতম বীর সেনানী। (৭৮)
ইমাদুদ্দিনের ইন্তেকালের পর তার প্রতিষ্ঠিত জিনকি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ দু-ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। পূর্ব অংশের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন তার জ্যেষ্ঠ পুত্র সাইফুদ্দিন গাজি, এ অংশের কেন্দ্র ছিল মসুল; আর পশ্চিম অংশের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তার দ্বিতীয় পুত্র নুরুদ্দিন মাহমুদ, এ অংশের কেন্দ্র ছিল আলেপ্পো। উভয়ের রাজ্যের সীমানা ছিল জাযিরা অঞ্চলের খাবুর নদী (The Khabur River)।
জিনকি পরিবারের আতাবিক পদবিধারীদের বংশলতিকা [৫২১-৬৬০ হিজরি-১১২৭-১২৬১ খ্রিষ্টাব্দ]
আল-মালিকুশ শাহিদ আবুল মুযাফফার ইমাদুদ্দিন জিনকি বিন আক সুনকুর (৫২১-৫৪১ হি./১১২৭-১১৪৬ খ্রি.)
নুরুদ্দিন মাহমুদ (৫৪১-৫৬৯ হি.) (১১৪৬-১১৭৪ খ্রি.)
সাইফুদ্দিন গাজি (৫৪১-৫৪৪ হি.) (১১৪৬-১১৪৯ খ্রি.)
কুতুবুদ্দিন মওদুদ (৫৪৪-৫৬৫ হি.) (১১৪৯-১১৭০ খ্রি.)
আল-মালিকুস সালিহ ইসমাইল (৫৬৯-৫৭৭ হি.) (১১৭৪-১১৮১ খ্রি.)
(আলেপ্পো অংশ। আইয়ুবিদের হাতে পতন ঘটে।)
২য় ইমাদুদ্দিন জিনকি (৫৬৫-৬১৭ হি.) (১১৭০-১১২০ খ্রি.)
(সিনজার অংশ। আইয়ুবিদের হাতে পতন ঘটে।)
২য় সাইফুদ্দিন গাজি (৫৬৫-৫৭৬ হি.) (১১৭০-১১৮০ খ্রি.)
১ম ইযযুদ্দিন মাসউদ (৫৭৬-৫৮৯ হি.) (১১৮০-১১৯৩ খ্রি.)
সানজার শাহ
১ম নুরুদ্দিন আরসালান শাহ (৫৮৯-৬০৭ হি./১১৯৩-১২১১ খ্রি.)
(জাযিরা অংশ। আইয়ুবিদের হাতে পতন ঘটে।)
২য় ইযযুদ্দিন মাসউদ (৬০৭-৬১৫ হি./১২১১-১২১৮ খ্রি.)
নাসিরুদ্দিন মাহমুদ (৬১৬-৬৩১ হি./১২১৯-১২৩৩ খ্রি.)
২য় নুরুদ্দিন আরসালান শাহ (৬১৫-৬১৬ হি./১২১৮-১২১৯ খ্রি.)
বদরুদ্দিন লু'লু(১) (ক্রীতদাস) (৬৩১-৬৫৭ হি./১২৩৩-১২৫৮ খ্রি.)
(মসুল অংশ তাতারদের হাতে পতন ঘটে)
ইসমাইল বিন বদরুদ্দিন (৬৫৭-৬৬০ হি./১২৫৮-১২৬১ খ্রি.)
টিকাঃ
৭৫. 'আতাবিক' একটি তুর্কি শব্দ। তুর্কি 'আতাবিক' শব্দের অর্থ রাজপুত্রের দীক্ষক। সেলজুক সুলতানগণ শুরুতে সুলতান-পুত্রদের শিক্ষাদীক্ষায় নিয়োজিত ব্যক্তিদেরকে সম্মানসূচক পদবি হিসেবে 'আতাবিক' উপাধি প্রদান করতেন। পরবর্তী সময়ে সালতানাতের অধীনস্থ বিভিন্ন প্রশাসক, সেনাপতি ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদেরকেও উক্ত উপাধি প্রদান করা হয়। প্রথমে আতাবিক উপাধি লাভ করেন সেলজুক সুলতান মালিক শাহের উজির নিজামুল মুলক আবু আলি হাসান বিন আলি।
সেলজুক সুলতানগণ আতাবিক উপাধিধারী অনেককেই বিশাল জায়গির ভূমি প্রদান করেছিলেন। পরবর্তীকালে সেলজুক সুলতানদের কর্তৃত্ব দুর্বল হয়ে পড়লে তাদের অনেকেই স্বাধীন রাষ্ট্রক্ষমতা ভোগ করতে থাকে। আবার অনেকে সেলজুক সুলতানের প্রতি আনুগত্য অব্যাহত রাখলেও মোটামুটি স্বাধীনতা ভোগ করত। প্রতিষ্ঠাতাদের প্রতি সম্বন্ধ করে এসব রাষ্ট্র আতাবিকি রাষ্ট্র নামে পরিচিতি লাভ করে। সুবিশাল সেলজুক সাম্রাজ্যের ভাঙনের পেছনে আতাবিকদের আলাদা রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠাও ব্যাপক ভূমিকা রেখেছিল।
৭৬. ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১২/১৮৪।
৭৭. প্রাগুক্ত, ১২/১৮৭।
৭৮. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত তারীখ, ৯/১৪২-৪৩।
১. বদরুদ্দিন লু'লু জিনকি বংশীয় ছিলেন না। তিনি ছিলেন ১ম নুরুদ্দিন আরসালান শাহ-এর ক্রীতদাস। মনিবপুত্র ২য় ইযযুদ্দিন মাসউদের ইন্তেকালের পর তিনি ইযযুদ্দিনের দুই পুত্রকে একে একে ক্ষমতায় বসান। অবশেষে নাসিরুদ্দিন মাহমুদের ইন্তেকালের পর তিনি নিজেই মসুলের জিনকি সাম্রাজ্যের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।