📄 উজিরদের কর্তৃত্বের যুগ
মুসতানসির-পরবর্তী উবায়দি সাম্রাজ্য মূলত উজিরদের মাধ্যমেই পরিচালিত হতো। এ স্তরের সূচনা হয় মুসতানসিরের জ্যেষ্ঠ পুত্র নিযার ও তুলনামূলক অল্পবয়সী আরেক পুত্র আহমাদ আবুল কাসিমের পারস্পরিক দ্বন্দ্বের মাধ্যমে। নিযার ছিলেন তার পিতার নির্ধারিত ওলিয়ে আহদ ও ভাবী খলিফা; অপরদিকে ক্ষমতার একচ্ছত্র অধিকারী প্রধান উজির বদরুদ্দিন জামালি খলিফা হিসেবে দেখতে চাচ্ছিলেন আহমাদকে।
হাসান বিন সাবাহ ছিলেন ইস্পাহানে ইসমাইলি মতাদর্শের দাঈ ও প্রচারক। মিশরের উবায়দি রাজপরিবারে যখন খলিফা পদ নিয়ে নিযার-আহমাদ-দু-ভাইয়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছিল, সে সময়ই হাসান বিন সাবাহ ইসমাইলি মতাদর্শ সম্পর্কে গভীর অধ্যয়ন ও জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্যে মিশরে আগমন করেন। যেহেতু ইসমাইলি মতাদর্শের নীতি অনুসারে একজন ইমামের মৃত্যুর পর তার জ্যেষ্ঠ পুত্র পরবর্তী ইমাম হওয়ার অধিকার লাভ করে থাকে, তাই হাসান বিন সাবাহ মুসতানসিরের পর তার জ্যেষ্ঠ পুত্র নিযারের খলিফা ও ইমাম হওয়াকেই সঠিক মনে করেন এবং নিজের এই চিন্তাধারা মিশরে প্রচার শুরু করেন। এর ফলে উজির জামালি শঙ্কিত হয়ে পড়েন। তিনি কৌশলে হাসানকে বন্দি করে ফেলেন এবং মাগরিবে নির্বাসিত করেন। এটি ৪৭২ হিজরি সনের ঘটনা। কিন্তু হাসানকে বহনকারী জাহাজ পথিমধ্যে ঝড়ের কবলে পড়ে বাতাসের টানে শামের উপকূলীয় এলাকায় চলে যায়। তখন হাসান বিন সাবাহ আক্কার উপকূলীয় এলাকায় অবতরণ করেন এবং সেখান থেকে নিজের এলাকা ইস্পাহানে ফিরে যান।
ইস্পাহানে পৌঁছে হাসান বিন সাবাহ মুসতানসিরের পর তার পুত্র নিযারের ইমাম হওয়ার দাবি প্রচার করতে থাকেন। এ কারণেই পরবর্তীকালে উবায়দি সম্প্রদায়ের এই শাখাটি 'ইসমাইলিয়া নিযারিয়া' নামে পরিচিতি লাভ করে।
পূর্বেও বলা হয়েছে—উবায়দি সাম্রাজ্যের এই স্তরে উজিররাই ছিল ক্ষমতার মূল নিয়ন্ত্রক। বদরুদ্দিনের পর তার পুত্র আফজালও একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করতে থাকেন। ৪৯৫ হিজরি সনে (১১০১ খ্রিষ্টাব্দে) খলিফা আহমাদ আবুল কাসিমের মৃত্যু হলে আফজাল আহমাদের পাঁচ বছর বয়সী পুত্র আবু আলিকে 'আমির' উপাধি প্রদান করে খলিফা পদে অধিষ্ঠিত করেন। পরিণত বয়সে উপনীত হওয়ার পর আমির তার প্রধান উজির আফজালের অবাধ কর্তৃত্বের কারণে তাকে সরিয়ে দেওয়ার মনস্থ করেন। খলিফার পরিকল্পনায় ৫১৫ হিজরি সনে (১১২১ খ্রিষ্টাব্দে) আফজাল নিহত হন। আফজালকে হত্যা করার পর খলিফা তার পরিবারের সকল সদস্যকে বন্দি করে রাখেন।
৫২৪ হিজরি সনে (১১৩০ খ্রিষ্টাব্দে) খলিফা আবু আলি আমির নিহত হলে তার চাচাতো ভাই আবদুল মাজিদ আবুল মাইমুন 'হাফিজ' উপাধি ধারণ করে উবায়দি সাম্রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করেন। কিন্তু সেনাবাহিনী তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং আফজালের পুত্র আবু আলি আহমাদকে কারাগার থেকে মুক্ত করে উজির পদে আসীন করে। উজির পদে অধিষ্ঠিত হয়েই আবু আলি খলিফা হাফিজকে বন্দি করেন। এরপর তিনিও তার পিতার ন্যায় একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠেন। উবায়দি রাজপরিবার যদিও শিয়া ইসমাইলিয়া মতাদর্শী ছিল; কিন্তু উজির আবু আলি ছিলেন শিয়া ইমামিয়া মতাদর্শী। তাই তিনি ইমামিয়া মতাদর্শের প্রচার ও ইসমাইলিয়া মতাদর্শকে দুর্বল করার লক্ষ্যে কাজ করতে থাকেন। আবু আলি চারজন কেন্দ্রীয় বিচারক নিযুক্ত করেন; যাদের একজন ইমামিয়া মতাদর্শী, একজন ইসমাইলিয়া মতাদর্শী, একজন শাফেয়ি মাজহাবের অনুসারী এবং একজন মালিকি মাজহাবের অনুসারী। তিনি প্রত্যেককে আপন আপন মাজহাব অনুসারে বিধান জারি করার ক্ষমতা প্রদান করেন। ইসলামি ইতিহাসে এরূপ অভিনব ঘটনার অতীত দৃষ্টান্ত নেই।
৫২৬ হিজরি সনে (১১৩২ খ্রিষ্টাব্দে) ইসমাইলিয়া মতাদর্শীরা উজির আবু আলিকে হত্যা করে এবং খলিফা হাফিজকে কারামুক্ত করে। হাফিজ পুনরায় খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
৫২৯ হিজরি সনে (১১৩৫ খ্রিষ্টাব্দে) গারবিয়া অঞ্চলের (খ্রিষ্টান) প্রশাসক বাহরাম আর্মানি উবায়দি সাম্রাজ্যের প্রধান উজির হওয়ার লক্ষ্যে কায়রোতে আগমন করে একদিন পুরো নগরী অবরোধ করে রাখেন। বাহরাম মুসলমান না হওয়া সত্ত্বেও হাফিজ তাকে প্রধান উজির পদে নিযুক্ত করতে বাধ্য হন। পরবর্তী এক বছর মিশরবাসী আর্মেনীয়দের অত্যাচার ভোগ করতে থাকে। বাহরাম উজির হয়েই মিশরে খ্রিষ্টানদের অবস্থা উন্নয়নে কাজ করেন। এ সময় আর্মেনীয়রা মিশরে প্রচুর গির্জা নির্মাণ করে। প্রত্যেক সেনাপতি ও পদস্থ কর্মকর্তার বাড়ির পাশে একটি করে গির্জা নির্মিত হতে থাকে।
৫৩০ হিজরি সনে (১১৩৬ খ্রিষ্টাব্দে) গারবিয়ার নতুন প্রশাসক রিজওয়ান বিন ওয়ালাখশি বাহরামকে বিতাড়িত করতে সক্ষম হন এবং নিজে প্রধান উজির পদে অধিষ্ঠিত হন। রিজওয়ান খলিফা পদ থেকে হাফিজকে অপসারণ করারও চেষ্টা চালান। একে কেন্দ্র করে উভয়ের মধ্যে বিরোধ চলতে থাকে এবং ৫৪২ হিজরিতে (১১৪৭ খ্রিষ্টাব্দে) রিজওয়ানের হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে এর সমাপ্তি ঘটে।
এভাবেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মিশরের উজির পদ নিয়ে খলিফা-উজির বিরোধ ও লড়াই চলতে থাকে। উজিররা খলিফা নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করতে থাকে এবং এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনে ইসমাইলিয়া মতাদর্শের নীতি ও শিক্ষা উপেক্ষা করতে থাকে।
উবায়দি শাসনের শেষদিকে এসে মিশরে উজির পদ নিয়ে প্রতিযোগিতা চরম পর্যায়ে পৌঁছায়। এ সময় উজির পদ প্রত্যাশী কেউ কেউ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন রাষ্ট্রের শাসকদের কাছেও ধরনা দেয়। তাদেরই একজন ছিলেন শাওয়ার বিন মুজির। তিনি ৫৫৮ হিজরি সনে (১১৬৩ খ্রিষ্টাব্দে) যিরগাম নামক জনৈক সেনাপতির কাছে পরাজিত হন এবং উজির পদ হতে পদচ্যুত হয়ে দামেশকের অধিপতি জিনকি সুলতান নুরুদ্দিন মাহমুদের কাছে আশ্রয় নেন। শাওয়ার নুরুদ্দিনকে প্রস্তাব দেন যে, তিনি যদি শাওয়ারকে মিশরের ক্ষমতা পুনরুদ্ধারে সামরিক সহায়তা করেন, তাহলে শাওয়ার তাকে মিশরের রাজস্বের এক-তৃতীয়াংশ প্রদান করবেন। নুরুদ্দিন শাওয়ারের প্রস্তাবে রাজি হন এবং আসাদুদ্দিন শিরকুহের নেতৃত্বাধীন একটি বাহিনী দিয়ে শাওয়ারকে সহায়তা করেন। দামেশকের বাহিনীর সহায়তায় শাওয়ার যিরগামকে পরাজিত করে ৫৫৯ হিজরি সনে পুনরায় মিশরের উজির পদে আসীন হন। কিন্তু কর্তৃত্ব ফিরে পেয়েই শাওয়ার তার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন। তিনি একদিকে শিরকুহকে মিশর ত্যাগ করে শামে ফিরে যেতে নির্দেশ দেন, অন্যদিকে বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যের (The Kingdom of Jerusalem)(৬২) খ্রিষ্টান শাসক অ্যামালরিকের কাছে সাহায্য চেয়ে বার্তা পাঠান। তিনি অ্যামালরিককে বোঝান যে, নুরুদ্দিন মিশর ভূমি দখল করতে পারলে ভবিষ্যতে তার রাজ্যের জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়াবেন। অ্যামালরিক দ্রুত শাওয়ারের সহায়তায় ছুটে আসেন এবং আসাদুদ্দিন শিরকুহকে মিশর ত্যাগে বাধ্য করেন।
শাওয়ারের বিশ্বাসঘাতকতার সমুচিত জবাব দিতে সুলতান নুরুদ্দিন মাহমুদ ৫৬২ হিজরি সনে (১১৬৭ খ্রিষ্টাব্দে) শিরকুহের নেতৃত্বেই আরেকটি বাহিনী মিশরে প্রেরণ করেন। শিরকুহের ভ্রাতুষ্পুত্র সালাহুদ্দিন ইউসুফ বিন নাজমুদ্দিন আইয়ুবও এই অভিযানে অংশ নেন।
শাওয়ার এবারও অ্যামালরিকের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করলে তিনিও আবার তার মিত্রের সাহায্যে ছুটে আসেন।
(মিশরের ওয়াজহে কাবলি অঞ্চলের মিনইয়া নগরীর নিকটবর্তী) বাবাইন এলাকায় শিরকুহের নেতৃত্বাধীন বাহিনী শাওয়ার ও অ্যামালরিকের যৌথ বাহিনীর মুখোমুখি হয়। যুদ্ধে শিরকুহের বাহিনী জয়লাভ করে। শিরকুহ সার্বিক দিক বিবেচনা করে কায়রো অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার পরিবর্তে বিজিত ওয়াজহে কাবলি অঞ্চলে কর্তৃত্ব দৃঢ়করণে মনোযোগ দেন এবং সেখান থেকে কর উসুল করেন। এরপর তিনি মরুভূমি পাড়ি দিয়ে আলেকজান্দ্রিয়ায় পৌঁছান এবং ভ্রাতুষ্পুত্র সালাহুদ্দিনকে সেখানকার প্রশাসক নিযুক্ত করে সামনে অগ্রসর হন। কিন্তু খ্রিষ্টান-মিশরীয় সম্মিলিত বাহিনী জল-স্থল উভয় দিক থেকে আলেকজান্দ্রিয়া অবরোধ করলে শিরকুহ দ্রুত সালাহুদ্দিনকে সহায়তা করতে ফিরে আসেন। তখন সম্মিলিত বাহিনী তার সঙ্গে সন্ধিচুক্তি করতে চাইলে তিনি এই শর্তে চুক্তি করতে সম্মত হন যে, খ্রিষ্টান বাহিনী মিশরে অবস্থান করতে পারবে না। এরপর শিরকুহ দামেশকে ফিরে যান। খ্রিষ্টানরা এবার মিশর ত্যাগের পরিবর্তে শাওয়ারের সঙ্গে মিত্রতার চুক্তি করে। চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল—কায়রোতে সবসময় একটি ক্রুসেডার বাহিনী অবস্থান করবে এবং কায়রো নগরদ্বারসমূহের নিয়ন্ত্রণ খ্রিষ্টান সৈন্যদের হাতে থাকবে। তারা মিশরে নুরুদ্দিনের প্রেরিত বাহিনীকে বাধা প্রদান করবে। উভয় পক্ষ এই মর্মেও সম্মত হয় যে, ক্রুসেডাররা প্রতি বছর মিশরের রাজস্ব থেকে এক লক্ষ দিনার লাভ করবে।
মিশরের উবায়দি সাম্রাজ্যের এই দুর্বল ও পরাশ্রয়ী নীতি বাইতুল মুকাদ্দাসের অধিপতি অ্যামালরিককে নতুন করে মিশর নিয়ে ভাবতে প্ররোচিত করে। তিনি ৫৬৪ হিজরি সনে (১১৬৮ খ্রিষ্টাব্দে) মিশর জয় করার জন্য বাহিনী নিয়ে রওনা হন। নিরুপায় শাওয়ার খ্রিষ্টান বাহিনীকে প্রতিরোধ করার জন্য আর কোনো উপায় না পেয়ে শেষপর্যন্ত এমন এক পদ্ধতি অবলম্বন করেন, যার দৃষ্টান্ত ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া ভার। খ্রিষ্টান ক্রুসেডাররা যেন মিশর আক্রমণে নিরুৎসাহিত হয়, এ লক্ষ্যে তিনি ফুসতাত নগরীতে আগুন লাগিয়ে দেন। একটানা চুয়ান্ন দিন আগুন জ্বলতে থাকে। এরপর তিনি অ্যামালরিকের কাছে বার্তা পাঠান যে, আপনি যদি মিশরে প্রবেশ করেন, তাহলে নুরুদ্দিন মাহমুদ মিশর দখল করতে অগ্রসর হতে পারেন। পাশাপাশি তিনি অ্যামালরিককে বার্ষিক দশ লক্ষ দিনার প্রদানের শর্তে সন্ধি করারও প্রস্তাব দেন।
শাওয়ার জানতেন যে, তার এই প্রস্তাব পাওয়ার পরও অ্যামালরিক ছলচাতুরীর আশ্রয় নিতে পারেন। তাই তিনি নুরুদ্দিনের কাছেও সাহায্য প্রার্থনা করে বার্তা পাঠান। তিনি নুরুদ্দিনকে প্রতিশ্রুতি দেন যে, মিশরের এক-তৃতীয়াংশ ভূমি তিনি নুরুদ্দিনকে ছেড়ে দেবেন এবং আসাদুদ্দিন শিরকুহকে সসৈন্য কায়রোতে অবস্থানের অনুমতি দেবেন। শিরকুহের বাহিনীর সৈন্যদেরকে জায়গির হিসেবে প্রচুর জমি প্রদান করা হবে, যা নুরুদ্দিনকে প্রদত্ত এক-তৃতীয়াংশ ভূমির বাইরে অতিরিক্ত বিবেচিত হবে।
নুরুদ্দিন মিশর অভিযানের জন্য দ্রুততার সঙ্গে আসাদুদ্দিন শিরকুহের নেতৃত্বে বিশাল এক বাহিনী প্রস্তুত করেন। অ্যামালরিকের ক্রুসেডার বাহিনী এ সংবাদ জানতে পেরে যুদ্ধ না করেই ফিলিস্তিনে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ৫৬৪ হিজরি সনের রবিউল আউয়াল মাসে (১১৬৮ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে) আসাদুদ্দিন শিরকুহ কায়রোতে প্রবেশ করেন। কায়রোবাসী তাকে স্বাগত জানায়। স্বয়ং উবায়দি খলিফা আবদুল্লাহ আল-আযিদ তাকে অভ্যর্থনা জানিয়ে খেলাত প্রদান করেন। এরপর আসাদুদ্দিন খলিফার প্রধান উজির মনোনীত হন। তিনি তার স্বল্প সময়ের উজির আমলেই সাম্রাজ্যের ক্ষমতার লাগাম নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিতে সক্ষম হন।
ক্ষমতাচ্যুত উজির শাওয়ার এ সময় আসাদুদ্দিন শিরকুহ ও তার সঙ্গী সেনাপতিদের হত্যা করার জন্য চক্রান্ত করার মনস্থ করেন। কিন্তু তার পুত্র কামিল তাকে এরূপ করতে নিষেধ করে বলেন, 'আল্লাহর শপথ! আপনি যদি এরূপ কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন, আমি অবশ্যই তা আসাদুদ্দিনকে জানিয়ে দেবো।'
'আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমরা যদি এমন কিছু না করি, তাহলে আমাদের সকলকে হত্যা করা হবে।' শাওয়ার তার পুত্রকে বোঝানোর চেষ্টা করেন।
পিতার যুক্তির উত্তরে কামিল বলেন, 'আপনি ঠিক বলেছেন। তবে খ্রিষ্টানদের হাতে আমাদের ভূমি চলে যাওয়ার পর তাদের হাতে নিহত হওয়ার চেয়ে আমাদের দেশ মুসলমানদের হাতে থাকা অবস্থায় মুসলিম পরিচয়ে মৃত্যুবরণ করা আমাদের জন্য অনেক শ্রেয়তর।'
কামিলের যুক্তি শোনার পর শাওয়ার আপন সংকল্প পরিত্যাগ করেন। এর কিছুদিন পর আসাদুদ্দিন তাকে হত্যা করেন।
আসাদুদ্দিন কায়রোয় প্রবেশের মাসতিনেক পরই ইন্তেকাল করেন। তার মৃত্যুর পর উবায়দি খলিফা আযিদ সালাহুদ্দিন ইউসুফ বিন আইয়ুবকে নতুন উজির মনোনীত করেন।
দায়িত্ব গ্রহণ করার পর সালাহুদ্দিন আইয়ুবি জনকল্যাণে প্রচুর অর্থ ব্যয় করেন। ফলে মিশরে তার অগাধ জনপ্রিয়তা তৈরি হয়। তিনি খুতবায় উবায়দি খলিফার পর নুরুদ্দিনের নাম পাঠের নির্দেশ জারি করেন। উজির সালাহুদ্দিন আইয়ুবি তার বাহিনীর সেনাপতিদের বিভিন্ন অঞ্চলের জায়গির দান করেন এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে তাদের অধিষ্ঠিত করেন।
সালাহুদ্দিন আইয়ুবির এসব পদক্ষেপ উবায়দি রাজপরিবারের শুভাকাঙ্ক্ষীদের সন্ত্রস্ত করে তোলে। তারা এবার সালাহুদ্দিনকে দমন করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। বিরুদ্ধবাদীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে খ্রিষ্টান শাসক অ্যামালরিকের কাছে বার্তা পাঠিয়ে তাকে মিশরে অভিযান পরিচালনার আহ্বান জানানোর সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের পরিকল্পনা ছিল, সালাহুদ্দিন যখন খ্রিষ্টান বাহিনীর মোকাবিলা করার জন্য কায়রো ত্যাগ করবেন, তখন তারা কায়রোতে অবস্থানরত সালাহুদ্দিন আইয়ুবির সঙ্গীদের হত্যা করবে, এরপর খ্রিষ্টান বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হয়ে সালাহুদ্দিন আইয়ুবির দফারফা করবে।
কিন্তু বিরুদ্ধবাদীদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সালাহুদ্দিন আইয়ুবি পূর্ব থেকেই সতর্ক ছিলেন। তিনি দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করে তাদের চক্রান্ত-পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দিতে সক্ষম হন। প্রথমেই তিনি খলিফা আযিদের মুতামিন(৬৩) জাওহারকে হত্যা করেন। তখন সুদানি সৈন্যরা তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। উবায়দি সেনাবাহিনীতে সুদানি সৈন্যের সংখ্যা ছিল পঞ্চাশ হাজারের অধিক। সালাহুদ্দিনের বাহিনীর সঙ্গে সুদানি বাহিনীর তুমুল যুদ্ধ হয়। সালাহুদ্দিন আইয়ুবি তাদেরকে পরাভূত করার পর ওয়াজহে কাবলি অঞ্চল পর্যন্ত তাদের পশ্চাদ্ধাবন করেন এবং ৫৭২ হিজরি সনে তাদের পুরোপুরি দমন করতে সক্ষম হন।
এদিকে সুলতান নুরুদ্দিন মাহমুদের কর্তৃত্ব মিশরেও বিস্তৃত হওয়ায় বাইতুল মুকাদ্দাস রাষ্ট্রের ক্রুসেড প্রশাসন নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়ে। তারা এবার নতুন করে মিশরে অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। এ সময় বাইজান্টাইন সম্রাট ১ম ম্যানুয়েল কমনিনোস (Manuel I Komnenos) অ্যামালরিকের সাহায্যপ্রার্থনায় সাড়া দিয়ে প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামে সমৃদ্ধ একটি বাইজান্টাইন নৌবহর প্রেরণ করেন। মিশর জয়ের উদ্দেশ্যে খ্রিষ্টান বাহিনী রওনা হয়ে ৫৬৫ হিজরি সনের সফর মাসে (১১৬৯ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে) দিমইয়াতে (Damietta) পৌঁছায়।
নিজে কায়রো ত্যাগ করলে উবায়দিরা ষড়যন্ত্র করতে পারে এই আশঙ্কায় সালাহুদ্দিন আইয়ুবি কায়রোতেই অবস্থান করেন এবং খালিদ শিহাবুদ্দিন মাহমুদ ও নিজের ভ্রাতুষ্পুত্র তাকিউদ্দিন উমরের নেতৃত্বে একটি বাহিনী খ্রিষ্টান বাহিনীর মোকাবিলায় প্রেরণ করেন। পাশাপাশি তিনি সুলতান নুরুদ্দিনের কাছে বার্তা পাঠিয়ে সাহায্য প্রেরণের অনুরোধ জানালে নুরুদ্দিন সহায়তাবাহিনী প্রেরণ করেন। উবায়দি খলিফা আযিদও খ্রিষ্টান বাহিনী কর্তৃক দিমইয়াত অবরোধের সময় সালাহুদ্দিনকে আর্থিক সাহায্য করেন। এ বিষয়ে স্বয়ং সালাহুদ্দিন আইয়ুবি বলেন, 'আমি আযিদের চেয়ে সম্ভ্রান্ত কাউকে দেখিনি। খ্রিষ্টানরা দিমইয়াতে অবস্থানের সময় তিনি আমার কাছে সামরিক সাহায্য হিসেবে সামরিক পোশাক ও অন্যান্য বস্ত্র ছাড়াও নগদ দশ লক্ষ দিনার পাঠিয়েছেন।'
মুসলিম বাহিনীর প্রবল প্রতিরোধের মুখে ক্রুসেডারদের যুদ্ধ-উদ্দীপনা স্তিমিত হয়ে পড়ে। ৫৬৫ হিজরি সনের রবিউল আউয়াল মাসে (১১৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে) তারা অবরোধ উঠিয়ে নিজেদের অঞ্চলে প্রস্থান করে।
সালাহুদ্দিন আইয়ুবি মিশরে পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে নিশ্চিন্ত হওয়ার পর মিশরের শিয়া মতবাদ দমন করার প্রতি মনোযোগী হন। তিনি ৫৬৬ হিজরি সনে শাফেয়ি মাজহাবের শিক্ষা প্রদানের জন্য একটি এবং মালিকি মাজহাবের শিক্ষাদানের জন্য আরেকটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি শিয়া বিচারকদের বরখাস্ত করেন এবং সদরুদ্দিন আবদুল মালিক বিন দিরবাসকে পুরো মিশরের প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত করেন। এসব পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে মিশরে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।
সুলতান নুরুদ্দিন সালাহুদ্দিন আইয়ুবির কাছে নির্দেশ পাঠান যে, মিশরে যেন উবায়দি খলিফার পরিবর্তে সমকালীন আব্বাসি খলিফার নাম খুতবায় পাঠ করা হয়। কিন্তু সালাহুদ্দিন মিশরবাসীর বিক্ষুব্ধ হওয়ার আশঙ্কায় এই নির্দেশ জারি করতে দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েন। নুরুদ্দিন বারবার একই নির্দেশ প্রেরণ করতে থাকলে একপর্যায়ে সালাহুদ্দিন মিশরের সকল খতিবকে পরবর্তী জুমা হতে খুতবায় আব্বাসি খলিফা আল-মুসতাযি বি আমরিল্লাহর নাম পাঠের নির্দেশনা জারি করেন। উবায়দি খলিফা আযিদ তখন অসুস্থ থাকায় তার পরিবার তাকে এ বিষয়ে অবগত করেনি। ৫৬৭ হিজরি সনের ১০ মুহাররম (১১৭১ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ সেপ্টেম্বর) খলিফা আযিদ মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মিশরে শিয়া উবায়দি সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত পতন ঘটে।
টিকাঃ
৬২. প্রথম ক্রুসেড অভিযানের সময় ৪৯২ হিজরি সনে (১০৯৯ খ্রিষ্টাব্দে) শামের অভ্যন্তরে খ্রিষ্টরাজ্য 'বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্য' গড়ে ওঠে এবং প্রাচ্যে খ্রিষ্টানদের সর্ববৃহৎ রাজ্য ও মূল সামরিক ঘাঁটিতে পরিণত হয়। শুরুতে গুটিকয়েক নগরী ও গ্রাম মিলে রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠিত হলেও কালক্রমে এর আয়তন বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং খ্রিষ্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যভাগে এসে লেবানন, ঐতিহাসিক ফিলিস্তিন (পশ্চিম তীর, গাজা, ইসরাইল) এবং জর্ডান, সিরিয়া ও সিনাই উপদ্বীপের কিছু অংশ বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যের অধিভুক্ত হয়। প্রথমে মহাবীর সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি ৫৮৩ হিজরি সনে (১১৮৭ খ্রিষ্টাব্দে) বাইতুল মুকাদ্দাসসহ রাজ্যটির বিভিন্ন নগরী পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হন। অবশেষে ৬৯০ হিজরি সনে (১২৯১ খ্রিষ্টাব্দে) মামলুক সুলতান আল-আশরাফ খলিলের হাতে আক্কা নগরীর পতনের মাধ্যমে বাইতুল মুকাদ্দাস রাজ্যের চূড়ান্ত পতন ঘটে। এর বিস্তারিত বিবরণ সামনে আসবে, ইনশাআল্লাহ।
৬৩. মিশরে উবায়দি সাম্রাজ্যের শেষ সময়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পদ ছিল মুতামিনের পদ। মুতামিন পদধারীকে আধুনিক যুগের বিশেষ রাজকীয় নিরাপত্তা বাহিনীর প্রধানের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে।