📄 দরজিয়া (The Druze) সম্প্রদায়ের আত্মপ্রকাশ
৪১১ হিজরি সনে (১০২০ খ্রিষ্টাব্দে) হাকিম বি আমরিল্লাহ খ্রিষ্টানদের ওপর কঠোরতা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেন।
হাকিমের পর মিশরের ক্ষমতা লাভ করেন তার পুত্র যাহির। তিনি ইহুদি-খ্রিষ্টানদের সঙ্গে কোমল ও উদার আচরণ করেন।
অষ্টম উবায়দি শাসক মুসতানসির বিল্লাহর শাসনামলের শুরুর দিকে আবু সাদ ইবরাহিম বিন সাহল তুসতারি নামক জনৈক ইহুদি উবায়দি সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিতে পরিণত হয়। খলিফা মুসতানসিরের মা ইতিপূর্বে এই আবু সাদের বাড়ির দাসী ছিল। তার পুত্র মুসতানসির খলিফা পদে অধিষ্ঠিত হলে সে তার প্রাক্তন মালিক আবু সাদ তুসতারিকে সচিব পদে নিয়োগদান করে। তুসতারির বদান্যতায় ইহুদিরা উবায়দি সাম্রাজ্যে মর্যাদাকর অবস্থান তৈরিতে সক্ষম হয়; ইহুদিসমাজের অনেকেই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদ লাভ করে। ৪৩৯ হিজরি সনে (১০৪৭ খ্রিষ্টাব্দে) আবু সাদ তুসতারি নিহত হয়।
দরজিয়া (The Druze) সম্প্রদায়ের আত্মপ্রকাশ
পারস্য হতে মিশরে আগমনকারী কিছু লোক হাকিম বি আমরিল্লাহর শাসনামলের শেষদিকে ইসমাইলিয়া মতাদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে নিজেদের ধর্মমত পরিবর্তন করে এবং ইসমাইলিয়া শিয়া মতাদর্শ গ্রহণ করে। পরবর্তী সময়ে তারা খলিফা হাকিমের মাঝে স্রষ্টা অধিষ্ঠিত হওয়ার দাবি তুলে তা প্রচার করতে থাকে। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর অনুসারীগণ তাদের এই গর্হিত আকিদার প্রচারে বিক্ষুব্ধ হয়ে তাদেরকে বিতাড়িত করেন। ধর্মত্যাগী এই দলটির অন্যতম প্রসিদ্ধ ব্যক্তি ও খলিফা হাকিমের অত্যন্ত আস্থাভাজন ব্যক্তি ছিল মুহাম্মাদ বিন ইসমাইল দরজি। সে পালিয়ে (দামেশকের পশ্চিমের এক ক্ষুদ্র জনপদ) ইনয়াসের এক গ্রামে চলে যায় এবং সেখানে হাকিমের স্রষ্টা হওয়ার আকিদা প্রচার করতে থাকে। ধীরে ধীরে সে অনেককে তার এই নতুন মতাদর্শের প্রতি আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়। এই নতুন দলটিই দরজিয়া সম্প্রদায় নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। (৫৯)
যেহেতু এই মতাদর্শ ছিল খলিফা হাকিম বি আমরিল্লাহকে পবিত্রতা ও শ্রেষ্ঠত্বের এক ধর্মীয় আলোকবলয়ে আবৃত করার প্রয়াস, তাই খলিফা হাকিম এর পৃষ্ঠপোষকতা করেন এবং এর মাধ্যমে জনগণকে নিজের ইচ্ছার অনুগত করার প্রয়াস চালান।
হাকিমের মৃত্যুর তিন বছর পর তার পুত্র যাহির তার পিতার প্রতি সম্বন্ধিত এই গর্হিত মতবাদ হতে নিজেকে দায়মুক্ত ঘোষণা করেন।
অষ্টম খলিফা মুসতানসির বিল্লাহর শাসনামলে (৪২৭-৪৮৭ হিজরি/১০৩৫-১০৯৪ খ্রিষ্টাব্দ) উবায়দি সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে একাধিক বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে।
সুদানি সৈন্যরা ওয়াজহে কাবলি(৬০) অঞ্চলে বিদ্রোহ ঘোষণা করে।
লাওয়াতাহ গোত্র ও বেদুইনদের সমন্বয়ে গঠিত প্রায় চল্লিশ হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী উবায়দি সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণাকারী সাবেক উবায়দি গভর্নর নাসিরুদ্দৌলা হাসান বিন হুসাইন বিন হামদান তাগলিবির নেতৃত্বে ওয়াজহে বাহরি(৬১) অঞ্চলে হামলা চালায় এবং ব্যাপক লুটতরাজ চালানোর পাশাপাশি বিভিন্ন পুল-সেতু ও শাখা-নদীপথ ধ্বংস করে দেয়। এর ফলে কায়রো ও ফুসতাত থেকে এ অঞ্চলে সাহায্য সরবরাহের পথ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
৪৬২ হিজরি সনে নাসিরুদ্দৌলা মিশরে আব্বাসি খিলাফতের প্রচারণা চালানোর লক্ষ্যে ইরাকের সেলজুক সুলতান আলপ আরসালানের কাছে দূত প্রেরণ করে সামরিক সহায়তা প্রেরণের অনুরোধ করেন। তিনি দাবি জানান যে, মিশরে আব্বাসি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হলে তাকে মিশরের গভর্নরের দায়িত্ব দিতে হবে। আরসালান তার প্রস্তাবকে স্বাগত জানান। তবে তখন তিনি রোমানদের সঙ্গে যুদ্ধে ব্যস্ত থাকায় মিশরের প্রতি মনোযোগী হতে পারেননি।
৪৬৪ হিজরি সনে নাসিরুদ্দৌলা ওয়াজহে বাহরি অঞ্চলে খুতবা থেকে মুসতানসিরের নাম বাদ দেন এবং বাগদাদের তৎকালীন আব্বাসি খলিফা কায়িম বি আমরিল্লাহর কাছে খেলাত (সম্মানসূচক পোশাক) প্রার্থনা করেন।
এর কিছুদিন পর তিনি ফুসতাতে পৌঁছে রাজধানী কায়রোর ওপরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। খলিফা মুসতানসিরের পরিবর্তে নাসিরুদ্দৌলা হাসানই এবার উবায়দি সাম্রাজ্য পরিচালনা করতে থাকেন। তিনি খলিফা মুসতানসিরের জন্য মাসিক একশ দিনার ভাতা নির্ধারণ করে দেন। কায়রোতে নাসিরুদ্দৌলার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় উবায়দি সাম্রাজ্যের মূল সামরিক শক্তি তুর্কিরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। তারা এবার ষড়যন্ত্র করে নাসিরুদ্দৌলাকে হত্যা করে। এরপর মিশরে নাসিরুদ্দৌলার পরিবারের সবাইকে খুঁজে বের করে তাদেরকেও হত্যা করা হয়।
এরপর উবায়দি সাম্রাজ্যের লাগাম চলে যায় তুর্কিদের হাতে। অসহায় খলিফা মুসতানসির অবশেষে আক্কার (Acre) গভর্নর বদরুদ্দিন জামালির কাছে বার্তা পাঠিয়ে তাকে কায়রোয় এসে সাম্রাজ্যের দায়িত্ব গ্রহণের অনুরোধ জানান। বদরুদ্দিন শর্তারোপ করেন যে, তিনি কায়রোতে অবস্থানরত তুর্কি, মাগরিবি ও সুদানি সৈন্যদের দমন করার জন্য শামের (আর্মেনীয়) নির্বাচিত সৈন্যদের সঙ্গে নিয়ে আসবেন।
বদরুদ্দিন জামালি ছিলেন আমির জামালুদ্দৌলা বিন আম্মারের একজন আর্মেনীয় ক্রীতদাস। শামে সংঘটিত বিভিন্ন যুদ্ধে আপন সামরিক দক্ষতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে তিনি বিভিন্ন পদ লাভ করতে থাকেন। অবশেষে ৪৫৬ হিজরি সনে (১০৬৪ খ্রিষ্টাব্দে) তিনি মুসতানসির বিল্লাহর পক্ষ থেকে দামেশকের গভর্নর নিযুক্ত হন। দামেশকে তুর্কিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন লড়াইয়ে সাফল্য লাভের পর তিনি ৪৬০ হিজরি সনে (১০৬৮ খ্রিষ্টাব্দে) আক্কার গভর্নর পদ লাভ করেন।
মুসতানসির বিল্লাহর অনুরোধে বদরুদ্দিন কায়রোয় আগমন করেন এবং তুর্কি সেনাপতিদের হত্যা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন। তিনি ওয়াজহে কাবলি ও ওয়াজহে বাহরি অঞ্চলে খলিফা মুসতানসিরের কর্তৃত্ব ফিরিয়ে আনেন। এরপর তিনি আলেকজান্দ্রিয়ায় 'জামে আত্তারিন' নির্মাণ করেন। বদরুদ্দিন জামালির কঠোর নেতৃত্বে মিশরের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ফিরে আসে। ৪৫৭-৪৬৪ হিজরি সনে মিশরের বার্ষিক রাজস্বের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে বিশ লক্ষ দিনার থেকে একত্রিশ লক্ষ দিনারে উন্নীত হয়।
জামালি ৪৮৭ হিজরি সনে (১০৯৪ খ্রিষ্টাব্দে) মৃত্যুবরণ করেন এবং তার ছেলে আফজাল শাহানশাহকে পরবর্তী উজির নির্বাচিত করে যান।
উজিরদের অবাধ কর্তৃত্বের কারণে মুসতানসির বিল্লাহ তার শাসনামলের অধিকাংশ সময় অনেকটা হাত-পা-বাঁধা ব্যক্তির মতোই ছিলেন। ৪৮৭ হিজরি সনের ১৭ জিলহজ (১০৯৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ ডিসেম্বর) তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মুসতানসিরের মৃত্যুর মাধ্যমেই উবায়দি সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় যুগের সূচনা ঘটে, যাকে আমরা অভিহিত করতে পারি 'উজিরদের কর্তৃত্বের যুগ' নামে।
টিকাঃ
৫৯. বর্তমানে বিশ্বে দরজিয়া ধর্মাবলম্বী লোকের সংখ্যা দশ লক্ষের ঊর্ধ্বে। তাদের অধিকাংশ বাস করে সিরিয়া, লেবানন, ইসরাইল ও ভেনেজুয়েলায়।
৬০. ওয়াজহে কাবলি: মিশরের দক্ষিণ-পূর্ব অংশের একটি অঞ্চলের নাম ওয়াজহে কাবলি বা সাইদে মিশর, ইংরেজিতে Upper Egypt।
৬১. ওয়াজহে বাহরি: মিশরের উত্তরাঞ্চলে বদ্বীপ সদৃশ একটি অঞ্চলের নাম ওয়াজহে বাহরি বা দালতান নীল; ইংরেজিতে The Nile Delta।