📄 কায়রো নগরীর পত্তন এবং জামে আযহার প্রতিষ্ঠা
উবায়দি সাম্রাজ্যের অধীনে মিশরে এক নতুন যুগের সূচনা হয়। ৩৫৮ হিজরি সনের ১৭ শাবান (৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ৬ জুলাই) ফুসতাতের উত্তরে মানসুরিয়া (কায়রো) নগরীর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। পাশাপাশি উবায়দি খলিফা মুইযের বসবাসের জন্য একটি রাজপ্রাসাদের ভিত্তিও স্থাপিত হয়। পরে প্রাসাদটি 'প্রাচ্য প্রাসাদ' ও 'মহান প্রাসাদ' নামে পরিচিতি লাভ করে।
পত্তনের পর প্রথম চার বছর কায়রো নগরী মানসুরিয়া নামে পরিচিত ছিল। এরপর মুইয শুভলক্ষণ হিসেবে নগরীটির 'কায়রো'(৫৮) নামকরণ করেন এবং আশা প্রকাশ করেন যে, শীঘ্রই তিনি এই নগরীর নামের বরকতে আব্বাসিদের পরাভূত করবেন। জাওহার কায়রোর নগরপ্রাচীরে চারটি দ্বার নির্মাণ করেন—আন-নাসর দ্বার, আল-ফুতুহ দ্বার, যুবাইলা দ্বার (Bab Zuweila) ও আল-কাওস দ্বার।
এরপর সেনাপতি জাওহার ৩৫৯ হিজরি সনে (৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে) জামে আযহার মসজিদের নির্মাণ শুরু করেন। দুই বছরের মধ্যে জামে আযহারের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। জামে আযহার নির্মাণ করা হয়েছিল মিশরে উবায়দি মতাদর্শের বিশেষ প্রতীক হিসেবে। উবায়দিরা আশঙ্কা করছিল যে, মিশরের অন্যান্য মসজিদে যদি উবায়দি মতাদর্শ প্রচার করা হয়, তাহলে মিশরবাসী বিদ্রোহ করতে পারে। ৩৬১ হিজরি সনের ৭ রমজান (৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ২২ জুন) জামে আযহারে নামাজ আদায় শুরু হয় এবং মিম্বরে উবায়দি খলিফা মুইযের নামে দোয়া করা হয়। এরপর মিশরে আব্বাসি খলিফার পরিবর্তে উবায়দি খলিফার নামে মুদ্রা প্রচলন করা হয়। জাওহার মিশরবাসীর জন্য (আব্বাসিদের প্রতীক) কৃষ্ণ পোশাক পরিধান নিষিদ্ধ করেন। তিনি শিয়াদের রীতি অনুযায়ী খুতবায় নিম্নোক্ত অংশটুকু বৃদ্ধি করার নির্দেশ দেন-
হে আল্লাহ, আপনি মুহাম্মাদ মুসতাফার ওপর শান্তি বর্ষণ করুন; শান্তি বর্ষণ করুন আলি মুরতাযা ও ফাতেমা বাতুলের ওপর। আরও শান্তি বর্ষণ করুন রাসুলের দুই দৌহিত্র হাসান-হুসাইনের ওপর, যাদেরকে আপনি পাপমুক্ত করেছেন এবং পূত-পবিত্র করেছেন। হে আল্লাহ, আপনি শান্তি বর্ষণ করুন আমিরুল মুমিনিনের পিতৃপুরুষগণের ওপর; যারা ছিলেন সুপথপ্রাপ্ত, পথপ্রদর্শক ও হিদায়াতের পথের ইমাম।
উবায়দিরা যদিও অঙ্গীকার করেছিল যে, তারা মিশরবাসীকে সুন্নি মতাদর্শ পরিবর্তন করে শিয়া মতবাদ গ্রহণে বাধ্য করবে না; কিন্তু তারা নিজেদের অঙ্গীকার রক্ষার পরিবর্তে নিম্নোক্ত পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করে।
• উবায়দিরা বিচারকসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে শিয়াদেরকে নিযুক্ত করে।
• তারা বড় বড় মসজিদগুলোকে শিয়া মতবাদ প্রচারের কেন্দ্রে পরিণত করে।
• শিয়া মতাদর্শের প্রচারের জন্য 'দাঈ আদ-দুআত' নামে একটি নতুন পদ তৈরি করা হয়। এ পদে শিয়া মতাদর্শধারী বড় কোনো আলিমকে নিযুক্ত করা হতো। দাঈ আদ-দুআত পদবিধারী ব্যক্তি প্রধান বিচারকের সমমর্যাদাসম্পন্ন বিবেচিত হতেন। তার অধীনে বারোজন প্রধান সহকারী ও সারাদেশে নিযুক্ত অসংখ্য প্রতিনিধি কাজ করত। অনেক সময় একই ব্যক্তি প্রধান বিচারপতি ও দাঈ আদ-দুআত পদে দায়িত্ব পালন করতেন।
• উবায়দি সরকার মিশরে বিভিন্ন শিয়া প্রথা ও রীতি চালু করে। মিশরে ঈদুল গাদির ও হুসাইন রাযি.-এর মৃত্যুদিবস উদ্যাপন শুরু হয় এবং একে কেন্দ্র করে মিশরবাসীর ওপর নানাভাবে নিপীড়ন চালানো হয়।
৩৯৫ হিজরি সনে (১০০৫ খ্রিষ্টাব্দে) ষষ্ঠ উবায়দি খলিফা হাকিম বি আমরিল্লাহ নগরীর দেয়ালে দেয়ালে এবং বাজারগুলোতে সাহাবায়ে কেরামের প্রতি নিন্দামূলক বাণী উৎকীর্ণ করার নির্দেশ জারি করেন। পরে ৩৯৮ হিজরি সনে (১০০৮ খ্রিষ্টাব্দে) উক্ত নির্দেশ প্রত্যাহার করা হয়।
মিশরে নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মিলাদ শরিফ (জন্ম উৎসব) এবং নবী-কন্যা ফাতিমা রাযি. ও নবী-জামাতা আলি রাযি.-এর জন্ম উৎসব পালনের রীতি চালু হয়।
শিয়া-রীতি অনুযায়ী সকল মসজিদে আজানে (حى على خير العمل) বলার নির্দেশ জারি করা হয়।
এ সকল পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে জাওহার মিশরে খলিফা মুইযের আগমনের পথ সুগম করেন। ৩৬২ হিজরি সনে (৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে) মুইয মিশরে আগমন করেন। তিনি তার জন্য নির্মিত প্রাসাদে প্রবেশ করে কৃতজ্ঞতায় সিজদাবনত হয়ে পড়েন। তার কাছে বিভিন্ন বহুমূল্য উপহারসামগ্রী পেশ করা হয়। এরপর তিনি কায়রোকে উবায়দি সাম্রাজ্যের রাজধানী নির্বাচিত করেন।
উবায়দি খলিফার মিশরে আগমন এবং কায়রোকে রাজধানী নির্বাচনের কারণে মাগরিবে উবায়দিদের প্রভাব-কর্তৃত্ব আরও নড়বড়ে হয়ে পড়ে এবং মাগরিবের অভ্যন্তরে উবায়দিদের প্রভাবমুক্ত বিভিন্ন স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে।
খলিফা মুইযও মাগরিবের পরিবর্তে মিশরেই ক্ষমতা বিস্তৃতিতে মনোযোগ দেন। ভবিষ্যতে তার ক্ষমতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে এই আশঙ্কায় তিনি সেনাপতি জাওহারের কর্তৃত্ব হ্রাস করতে থাকেন। ফলে ধীরে ধীরে জাওহারও আপন প্রভাব-প্রতিপত্তি হারিয়ে ফেলেন।
উবায়দি সাম্রাজ্যের অন্যতম সুস্পষ্ট ও দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্য হলো, উবায়দি শাসকগণ ইহুদি-খ্রিষ্টানদেরকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন করতেন এবং আস্থাভাজন বিবেচনা করতেন। যেমন:
• চতুর্থ উবায়দি শাসক মুইয লি দ্বীনিল্লাহ বিভিন্ন ইহুদি চিকিৎসককে গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত করেন। তাদের কেউ কেউ রাষ্ট্রের উচ্চ পদেও আসীন হয়; এমনকি ইয়াকুব বিন কিল্লিস নামক জনৈক ইহুদি মুইযের পুত্র আজিজের শাসনামলে প্রধান উজির পদে অধিষ্ঠিত হয়। উবায়দি সাম্রাজ্যের নীতিমালা ও গঠনতন্ত্র প্রণয়নের কৃতিত্ব এই ইয়াকুব বিন কিল্লিসের।
• পঞ্চম উবায়দি শাসক আজিজ বিল্লাহ জনৈকা খ্রিষ্টান রমণীকে বিয়ে করেন। আজিজের ওপর তার এই খ্রিষ্টান স্ত্রীর যথেষ্ট কর্তৃত্ব ছিল। সে আজিজকে মিশরের খ্রিষ্টান নাগরিকদের প্রতি অনুগ্রহ-আচরণে উদ্বুদ্ধ করে। তার প্ররোচনাতেই আজিজ মিশরে খ্রিষ্টানদের বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব উদ্যাপন শুরু করেন। উবায়দি সাম্রাজ্যের দপ্তরসমূহে প্রচুর খ্রিষ্টান সচিব নিয়োগ দেওয়া হয়। তারাও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে প্রভাব খাটাতে থাকে।
• আজিজ মানশা বিন ইবরাহিম কাযযারকে শামের প্রশাসক নিযুক্ত করেন।
কিন্তু ষষ্ঠ উবায়দি শাসক হাকিম বি আমরিল্লাহ ছিলেন পূর্ববর্তী শাসকদের তুলনায় ব্যতিক্রম। তিনি ৩৯৩ হিজরি সনে (১০০২ খ্রিষ্টাব্দে) সাম্রাজ্যের ইহুদি-খ্রিষ্টানদের স্বতন্ত্র পোশাক পরিধানের নির্দেশ দেন। এর তিন বছর পর তিনি কায়রোর কয়েকটি গির্জা ধ্বংসের নির্দেশ দেন। বিস্ময়কর তথ্য হলো—একইসময় তিনি মানসুর বিন আবদুন নামক জনৈক খ্রিষ্টানকে তার উজির পদে নিয়োগদান করেন। উজির মানসুরের পরামর্শেই হাকিম বি আমরিল্লাহ খ্রিষ্টানদের অন্যতম পবিত্র তীর্থস্থান আল-কুদসে অবস্থিত ‘আল-কিয়ামা’ গির্জা (The Church of the Holy Sepulchre) ধ্বংস করার নির্দেশ জারি করেন। আল-কিয়ামা গির্জা ধ্বংসের ঘটনা খ্রিষ্টসমাজকে বাইতুল মুকাদ্দাস পুনরুদ্ধারের জন্য ক্রুসেডীয় চেতনায় উদ্দীপ্ত করতে বিরাট ভূমিকা রেখেছিল।
হাকিম বি আমরিল্লাহর শাসনামলে খ্রিষ্টানদের ওপর অব্যাহত নিপীড়ন চলায় খ্রিষ্টান সচিবদের অনেকে বাধ্য হয়ে ইসলামধর্ম গ্রহণ করে; অনেকে দেশত্যাগ করে চলে যায় বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যে, হাবশায় কিংবা নুবিয়ায়।
টিকাঃ
৫৭. তারুজা: আধুনিক মিশরের বুহায়রা প্রদেশের অন্তর্গত আবুল মাতামির প্রশাসনিক অঞ্চলের একটি জনপদ।
৫৮. কায়রোর আরবি নাম আল-কাহিরা (القاهرة)। শব্দটির অর্থ—পরাভূতকারী।
📄 দরজিয়া (The Druze) সম্প্রদায়ের আত্মপ্রকাশ
৪১১ হিজরি সনে (১০২০ খ্রিষ্টাব্দে) হাকিম বি আমরিল্লাহ খ্রিষ্টানদের ওপর কঠোরতা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেন।
হাকিমের পর মিশরের ক্ষমতা লাভ করেন তার পুত্র যাহির। তিনি ইহুদি-খ্রিষ্টানদের সঙ্গে কোমল ও উদার আচরণ করেন।
অষ্টম উবায়দি শাসক মুসতানসির বিল্লাহর শাসনামলের শুরুর দিকে আবু সাদ ইবরাহিম বিন সাহল তুসতারি নামক জনৈক ইহুদি উবায়দি সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিতে পরিণত হয়। খলিফা মুসতানসিরের মা ইতিপূর্বে এই আবু সাদের বাড়ির দাসী ছিল। তার পুত্র মুসতানসির খলিফা পদে অধিষ্ঠিত হলে সে তার প্রাক্তন মালিক আবু সাদ তুসতারিকে সচিব পদে নিয়োগদান করে। তুসতারির বদান্যতায় ইহুদিরা উবায়দি সাম্রাজ্যে মর্যাদাকর অবস্থান তৈরিতে সক্ষম হয়; ইহুদিসমাজের অনেকেই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদ লাভ করে। ৪৩৯ হিজরি সনে (১০৪৭ খ্রিষ্টাব্দে) আবু সাদ তুসতারি নিহত হয়।
দরজিয়া (The Druze) সম্প্রদায়ের আত্মপ্রকাশ
পারস্য হতে মিশরে আগমনকারী কিছু লোক হাকিম বি আমরিল্লাহর শাসনামলের শেষদিকে ইসমাইলিয়া মতাদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে নিজেদের ধর্মমত পরিবর্তন করে এবং ইসমাইলিয়া শিয়া মতাদর্শ গ্রহণ করে। পরবর্তী সময়ে তারা খলিফা হাকিমের মাঝে স্রষ্টা অধিষ্ঠিত হওয়ার দাবি তুলে তা প্রচার করতে থাকে। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর অনুসারীগণ তাদের এই গর্হিত আকিদার প্রচারে বিক্ষুব্ধ হয়ে তাদেরকে বিতাড়িত করেন। ধর্মত্যাগী এই দলটির অন্যতম প্রসিদ্ধ ব্যক্তি ও খলিফা হাকিমের অত্যন্ত আস্থাভাজন ব্যক্তি ছিল মুহাম্মাদ বিন ইসমাইল দরজি। সে পালিয়ে (দামেশকের পশ্চিমের এক ক্ষুদ্র জনপদ) ইনয়াসের এক গ্রামে চলে যায় এবং সেখানে হাকিমের স্রষ্টা হওয়ার আকিদা প্রচার করতে থাকে। ধীরে ধীরে সে অনেককে তার এই নতুন মতাদর্শের প্রতি আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়। এই নতুন দলটিই দরজিয়া সম্প্রদায় নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। (৫৯)
যেহেতু এই মতাদর্শ ছিল খলিফা হাকিম বি আমরিল্লাহকে পবিত্রতা ও শ্রেষ্ঠত্বের এক ধর্মীয় আলোকবলয়ে আবৃত করার প্রয়াস, তাই খলিফা হাকিম এর পৃষ্ঠপোষকতা করেন এবং এর মাধ্যমে জনগণকে নিজের ইচ্ছার অনুগত করার প্রয়াস চালান।
হাকিমের মৃত্যুর তিন বছর পর তার পুত্র যাহির তার পিতার প্রতি সম্বন্ধিত এই গর্হিত মতবাদ হতে নিজেকে দায়মুক্ত ঘোষণা করেন।
অষ্টম খলিফা মুসতানসির বিল্লাহর শাসনামলে (৪২৭-৪৮৭ হিজরি/১০৩৫-১০৯৪ খ্রিষ্টাব্দ) উবায়দি সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে একাধিক বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে।
সুদানি সৈন্যরা ওয়াজহে কাবলি(৬০) অঞ্চলে বিদ্রোহ ঘোষণা করে।
লাওয়াতাহ গোত্র ও বেদুইনদের সমন্বয়ে গঠিত প্রায় চল্লিশ হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী উবায়দি সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণাকারী সাবেক উবায়দি গভর্নর নাসিরুদ্দৌলা হাসান বিন হুসাইন বিন হামদান তাগলিবির নেতৃত্বে ওয়াজহে বাহরি(৬১) অঞ্চলে হামলা চালায় এবং ব্যাপক লুটতরাজ চালানোর পাশাপাশি বিভিন্ন পুল-সেতু ও শাখা-নদীপথ ধ্বংস করে দেয়। এর ফলে কায়রো ও ফুসতাত থেকে এ অঞ্চলে সাহায্য সরবরাহের পথ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
৪৬২ হিজরি সনে নাসিরুদ্দৌলা মিশরে আব্বাসি খিলাফতের প্রচারণা চালানোর লক্ষ্যে ইরাকের সেলজুক সুলতান আলপ আরসালানের কাছে দূত প্রেরণ করে সামরিক সহায়তা প্রেরণের অনুরোধ করেন। তিনি দাবি জানান যে, মিশরে আব্বাসি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হলে তাকে মিশরের গভর্নরের দায়িত্ব দিতে হবে। আরসালান তার প্রস্তাবকে স্বাগত জানান। তবে তখন তিনি রোমানদের সঙ্গে যুদ্ধে ব্যস্ত থাকায় মিশরের প্রতি মনোযোগী হতে পারেননি।
৪৬৪ হিজরি সনে নাসিরুদ্দৌলা ওয়াজহে বাহরি অঞ্চলে খুতবা থেকে মুসতানসিরের নাম বাদ দেন এবং বাগদাদের তৎকালীন আব্বাসি খলিফা কায়িম বি আমরিল্লাহর কাছে খেলাত (সম্মানসূচক পোশাক) প্রার্থনা করেন।
এর কিছুদিন পর তিনি ফুসতাতে পৌঁছে রাজধানী কায়রোর ওপরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। খলিফা মুসতানসিরের পরিবর্তে নাসিরুদ্দৌলা হাসানই এবার উবায়দি সাম্রাজ্য পরিচালনা করতে থাকেন। তিনি খলিফা মুসতানসিরের জন্য মাসিক একশ দিনার ভাতা নির্ধারণ করে দেন। কায়রোতে নাসিরুদ্দৌলার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় উবায়দি সাম্রাজ্যের মূল সামরিক শক্তি তুর্কিরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। তারা এবার ষড়যন্ত্র করে নাসিরুদ্দৌলাকে হত্যা করে। এরপর মিশরে নাসিরুদ্দৌলার পরিবারের সবাইকে খুঁজে বের করে তাদেরকেও হত্যা করা হয়।
এরপর উবায়দি সাম্রাজ্যের লাগাম চলে যায় তুর্কিদের হাতে। অসহায় খলিফা মুসতানসির অবশেষে আক্কার (Acre) গভর্নর বদরুদ্দিন জামালির কাছে বার্তা পাঠিয়ে তাকে কায়রোয় এসে সাম্রাজ্যের দায়িত্ব গ্রহণের অনুরোধ জানান। বদরুদ্দিন শর্তারোপ করেন যে, তিনি কায়রোতে অবস্থানরত তুর্কি, মাগরিবি ও সুদানি সৈন্যদের দমন করার জন্য শামের (আর্মেনীয়) নির্বাচিত সৈন্যদের সঙ্গে নিয়ে আসবেন।
বদরুদ্দিন জামালি ছিলেন আমির জামালুদ্দৌলা বিন আম্মারের একজন আর্মেনীয় ক্রীতদাস। শামে সংঘটিত বিভিন্ন যুদ্ধে আপন সামরিক দক্ষতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে তিনি বিভিন্ন পদ লাভ করতে থাকেন। অবশেষে ৪৫৬ হিজরি সনে (১০৬৪ খ্রিষ্টাব্দে) তিনি মুসতানসির বিল্লাহর পক্ষ থেকে দামেশকের গভর্নর নিযুক্ত হন। দামেশকে তুর্কিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন লড়াইয়ে সাফল্য লাভের পর তিনি ৪৬০ হিজরি সনে (১০৬৮ খ্রিষ্টাব্দে) আক্কার গভর্নর পদ লাভ করেন।
মুসতানসির বিল্লাহর অনুরোধে বদরুদ্দিন কায়রোয় আগমন করেন এবং তুর্কি সেনাপতিদের হত্যা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন। তিনি ওয়াজহে কাবলি ও ওয়াজহে বাহরি অঞ্চলে খলিফা মুসতানসিরের কর্তৃত্ব ফিরিয়ে আনেন। এরপর তিনি আলেকজান্দ্রিয়ায় 'জামে আত্তারিন' নির্মাণ করেন। বদরুদ্দিন জামালির কঠোর নেতৃত্বে মিশরের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ফিরে আসে। ৪৫৭-৪৬৪ হিজরি সনে মিশরের বার্ষিক রাজস্বের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে বিশ লক্ষ দিনার থেকে একত্রিশ লক্ষ দিনারে উন্নীত হয়।
জামালি ৪৮৭ হিজরি সনে (১০৯৪ খ্রিষ্টাব্দে) মৃত্যুবরণ করেন এবং তার ছেলে আফজাল শাহানশাহকে পরবর্তী উজির নির্বাচিত করে যান।
উজিরদের অবাধ কর্তৃত্বের কারণে মুসতানসির বিল্লাহ তার শাসনামলের অধিকাংশ সময় অনেকটা হাত-পা-বাঁধা ব্যক্তির মতোই ছিলেন। ৪৮৭ হিজরি সনের ১৭ জিলহজ (১০৯৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ ডিসেম্বর) তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মুসতানসিরের মৃত্যুর মাধ্যমেই উবায়দি সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় যুগের সূচনা ঘটে, যাকে আমরা অভিহিত করতে পারি 'উজিরদের কর্তৃত্বের যুগ' নামে।
টিকাঃ
৫৯. বর্তমানে বিশ্বে দরজিয়া ধর্মাবলম্বী লোকের সংখ্যা দশ লক্ষের ঊর্ধ্বে। তাদের অধিকাংশ বাস করে সিরিয়া, লেবানন, ইসরাইল ও ভেনেজুয়েলায়।
৬০. ওয়াজহে কাবলি: মিশরের দক্ষিণ-পূর্ব অংশের একটি অঞ্চলের নাম ওয়াজহে কাবলি বা সাইদে মিশর, ইংরেজিতে Upper Egypt।
৬১. ওয়াজহে বাহরি: মিশরের উত্তরাঞ্চলে বদ্বীপ সদৃশ একটি অঞ্চলের নাম ওয়াজহে বাহরি বা দালতান নীল; ইংরেজিতে The Nile Delta।