📄 মাগরিব অঞ্চলে অব্যাহত গোলযোগ ও বিদ্রোহ মোকাবিলা
যেহেতু মাগরিবে উবায়দি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠায় সর্বাধিক ভূমিকা ছিল আবু আবদুল্লাহ শিয়ির, তাই বিশেষ করে কুতামা গোত্রসহ(৫৫) এ অঞ্চলের সাধারণ জনগণের মাঝে আবু আবদুল্লাহর যথেষ্ট জনপ্রিয়তা ছিল। আবু আবদুল্লাহর ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তায় উবায়দি শাসক উবায়দুল্লাহ তার প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েন এবং নিজের কর্তৃত্ব ও প্রভাব দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা করেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ২৯৮ হিজরি সনের জুমাদাল উখরা মাসে (৯১১ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে) আবু আবদুল্লাহ ও তার ভাই আব্বাসকে হত্যা করার নির্দেশ দেন। ফলে কুতামা গোত্রসহ মাগরিবের অন্যান্য অধিবাসীরা তার প্রতি বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। অবশ্য উবায়দুল্লাহ শেষ পর্যন্ত বিক্ষুব্ধ জনসাধারণকে শান্ত করতে সক্ষম হন।
আগলাবিয়া রাষ্ট্রের ওপর প্রতিষ্ঠিত উবায়দি সাম্রাজ্যের প্রাথমিক পরিধি নিয়ে উবায়দুল্লাহ মোটেও তুষ্ট ছিলেন না। তিনি এবার পুরো মাগরিব অঞ্চলকে উবায়দি সাম্রাজ্যের অধীনে নিয়ে আসার মনস্থ করেন। ৩১২ হিজরি সনে (৯২৪ খ্রিষ্টাব্দে) তিনি মুসা বিন আবুল আফিয়ার মাধ্যমে ইদরিসিয়া রাষ্ট্রের বিরাট অংশের পতন ঘটাতে সক্ষম হন। কিন্তু মুসা বিজিত অঞ্চলে নিজের কর্তৃত্ব ও প্রভাব বৃদ্ধি করার পর উবায়দিদের আনুগত্য প্রত্যাহার করে আন্দালুসের উমাইয়া খলিফা আবদুর রহমান আন-নাসিরের আনুগত্য স্বীকার করেন। উবায়দুল্লাহ তার পুত্র ও ঘোষিত যুবরাজ (ওলিয়ে আহদ) আবুল কাসিম আল-কায়িমকে ৩১৫ হিজরি সনে (৯২৭ খ্রিষ্টাব্দে) মুসার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য প্রেরণ করেন। আবুল কাসিম মুসাকে পরাজিত করে সেখানে উবায়দিদের কর্তৃত্ব পুনরুদ্ধার করেন।
পরবর্তী সময়ে উবায়দুল্লাহ মাহদিয়া নগরী প্রতিষ্ঠা করে উবায়দি সাম্রাজ্যের রাজধানী রাক্কাদা হতে মাহদিয়ায় স্থানান্তর করেন। মাহদিয়া নগরী তিনদিক থেকে সমুদ্রবেষ্টিত ছিল। তিনি মাহদিয়ায় সুবিখ্যাত ‘দারুস সিনাআ’ (জাহাজ নির্মাণ কারখানা) প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে একসঙ্গে দুইশ জাহাজের স্থান সংকুলান হতো। এরপর উবায়দুল্লাহ মাহদিয়া নগরীর সন্নিকটেই যাবিলা (Zawila) নগরী প্রতিষ্ঠা করেন।
৩১৬ হিজরি সনে (৯২৮ খ্রিষ্টাব্দে) আবু ইয়াযিদ মুখাল্লাদ বিন কিদাদ নামক জনৈক ব্যক্তি উবায়দুল্লাহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। উবায়দুল্লাহর মৃত্যুর পর তার পুত্র আবুল কাসিম আল-কায়িমের শাসনামলেও এ বিদ্রোহ চলমান ছিল। আবু ইয়াযিদ তুযিয়ার (Tozeur) নগরীতে বেড়ে উঠেছিল এবং সেখানেই কুরআনের শিক্ষা গ্রহণ করেছিল।
খারিজি মতাদর্শের শাখা সাফারিয়া মতাদর্শ গ্রহণকারী আবু ইয়াযিদ শিয়াদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ডাক দিলে খারিজি মতাদর্শীরা তার পক্ষে সমবেত হয়। কিছু বার্বার সম্প্রদায়ও তার দলে যোগ দেয় এবং ৩৩১ হিজরি সনে (৯৪২ খ্রিষ্টাব্দে) সকলে আবু ইয়াদিদের হাতে উবায়দিদের বিরুদ্ধে লড়াই করার বায়আত গ্রহণ করে। বার্বাররা মনে করত যে, তারাই আন্দালুস বিজয় করেছে এবং পরবর্তী সময়ে মাগরিবে উবায়দিদের খিলাফত প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে; অথচ বিনিময়ে তারা বারবার বঞ্চিত হয়েছে। তাই তারা নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় উবায়দি সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। আবু ইয়াযিদ তাদেরকে তাদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের নেতৃত্ব গ্রহণ করে।
দ্বিতীয় উবায়দি খলিফা আবুল কাসিম আল-কায়িম তার পিতা উবায়দুল্লাহর চেয়েও নিকৃষ্ট ছিল। সে ছিল অভিশপ্ত ধর্মদ্রোহী। সে প্রকাশ্যে নবীদের নিন্দা ও গালিগালাজ করত। তার পক্ষ থেকে ঘোষক জনসমক্ষে ঘোষণা করত— 'তোমরা গুহা ও তার প্রতিবেশীকে(৫৬) অভিসম্পাত করো।' আবুল কাসিম অনেক আলিমকে হত্যা করেছিল। ৩৩৪ হিজরি সনে (৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে) তার মৃত্যু হয়।
আবু ইয়াযিদের বিদ্রোহ উবায়দি সরকারকে যথেষ্ট ভোগান্তিতে ফেলে দিয়েছিল। অবশেষে ৩৩৬ হিজরি সনে (৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে) তারা এ বিদ্রোহ দমন করতে সক্ষম হয়। তবে এর পেছনে প্রচুর শক্তি ব্যয়ের ফলে মাগরিবে উবায়দিদের কর্তৃত্ব দুর্বল হয়ে যায় এবং একের পর এক বিদ্রোহে উত্তর আফ্রিকার পরিস্থিতি শোচনীয় হয়ে পড়ে।
আবুল কাসিম আল-কায়িমের মৃত্যুর পর ৩৩৪ হিজরি সনে তার পুত্র ইসমাইল আবু তাহির 'আল-মানসুর' উপাধি ধারণ করে উবায়দি সাম্রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করেন। ৩৩৭ হিজরিতে (৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে) তিনি মানসুরিয়া নগরী প্রতিষ্ঠা করেন এবং মানসুরিয়াকে সাম্রাজ্যের রাজধানী নির্বাচিত করেন। নিরাপত্তাপ্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত মানসুরিয়া নগরীর পাঁচটি প্রবেশদ্বার ছিল— সম্মুখদ্বার, পূর্ব দ্বার, যাবিলামুখী দ্বার, কুতামা দ্বার ও আল-ফুতুহ দ্বার। উবায়দি সেনাবাহিনী আল-ফুতুহ দ্বার দিয়ে অভিযানে বের হতো। আল-মানসুরের শাসনামলে মানসুরিয়া নগরী বাণিজ্য ক্ষেত্রে ব্যাপক সমৃদ্ধি অর্জন করে।
আল-মানসুরের পর তার পুত্র মাআদ 'মুইয লি দ্বীনিল্লাহ' উপাধি ধারণ করে উবায়দি সাম্রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করেন। তিনি মাগরিবে উবায়দি সরকারের কর্তৃত্ব ও প্রভাব দৃঢ়করণে প্রচুর কাজ করেন। মুইয তার সেনাপতি জাওহার সিকিল্লিকে সাম্রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের বিদ্রোহীদের দমনের দায়িত্ব দেন এবং সিউটা ও তাঞ্জিয়ার বাদে পুরো মাগরিবের মিম্বরসমূহে উবায়দি মতাদর্শের প্রচারণা চালু করতে সক্ষম হন।
তবে প্রকৃত বাস্তবতা হচ্ছে— উবায়দি শাসকগণ মাগরিব অঞ্চলে নিজেদের পূর্ণ কর্তৃত্ব ও স্থায়ী অবস্থান গড়ে তুলতে যথেষ্ট প্রচেষ্টা চালালেও তা সফল হয়নি। বরং প্রচুর সামরিক শক্তি ব্যয় করে একটি বিদ্রোহ দমন করলেই নতুন আরেকটি বিদ্রোহ শুরু হয়ে যেত এবং উবায়দি শাসকপরিবারকে নির্ঘুম রজনী উপহার দিত!
টিকাঃ
৫৫. কুতামা একটি বার্বার গোত্র। উবায়দুল্লাহর স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় কুতামা গোত্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
৫৬. নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরতের সফরে হজরত আবু বকর রাযি.-কে সঙ্গে নিয়ে সাওর গুহায় আত্মগোপন করেছিলেন। শিয়ারা এই অভিশপ্ত বাক্যের মাধ্যমে সেদিকেই ইঙ্গিত করত।
📄 উবায়দি শাসকদের মিশর জয়ের প্রচেষ্টা
মাগরিব অঞ্চলে অব্যাহত বিদ্রোহ প্রচেষ্টার কারণেই উবায়দিরা মিশরের প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। প্রথম উবায়দি শাসক উবায়দুল্লাহ আল-মাহদি বেশ কয়েকবার মিশর জয়ের প্রচেষ্টা চালান। ৩০১ হিজরি সনে (৯১৩ খ্রিষ্টাব্দে) তিনি নিজে মিশরের উদ্দেশে অভিযান পরিচালনা করেন। কিন্তু মিশরের প্রাণকেন্দ্র ফুসতাত নগরী পর্যন্ত পৌঁছার পথে তার বাহিনীর সামনে নীলনদ প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। বাধ্য হয়ে তিনি আলেকজান্দ্রিয়ায় ফিরে আসেন। সেখান থেকে প্রত্যাবর্তনের পথে বারকা (Cyrenaica) অঞ্চলে তার বাহিনী আব্বাসি খলিফা মুকতাদির বিল্লাহর প্রেরিত বাহিনীর মুখোমুখি হয় এবং তুমুল লড়াইয়ের পর পরাজিত হয়ে মাগরিবে ফিরে আসে।
৩০৬ হিজরি সনে (৯১৮ খ্রিষ্টাব্দে) উবায়দুল্লাহ তার পুত্র আবুল কাসিম আল-কায়িমের নেতৃত্বে আরেকটি বাহিনী মিশর অভিমুখে প্রেরণ করেন। আবুল কাসিম আলেকজান্দ্রিয়া জয় করে জিযা (Giza) অভিমুখে রওনা হন। কিন্তু আব্বাসি খলিফার তুর্কি সেনাপতি মুনিস আল-খাদিম উবায়দি বাহিনীকে পরাভূত করেন এবং উবায়দিদের যুদ্ধজাহাজগুলো জ্বালিয়ে দেন।
উবায়দুল্লাহ ৩২১ হিজরি সনে (৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দে) হাবশ বিন আহমাদ মাগরিবির নেতৃত্বে মিশরের উদ্দেশে আরেকটি বাহিনী প্রেরণ করেন। কিন্তু এবারের প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হয় এবং উক্ত বাহিনী ৩২২ হিজরি সনে ইখশিদি শাসক মুহাম্মাদ বিন তুগজ ইখশিদির কাছে পরাজিত হয়। শেষোক্ত দুটি অভিযানে উবায়দি বাহিনী বাহরাইনের কারামাতি শাসক ইবনে তাহির জান্নাবির সঙ্গে যোগাযোগ রেখে অগ্রসর হয়েছিল।
৩২৩ হিজরি সনে (৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দে) দ্বিতীয় উবায়দি শাসক আবুল কাসিম মিশরের উদ্দেশে আরেকটি বাহিনী প্রেরণ করেন। তারা খুব সহজেই আলেকজান্দ্রিয়ায় প্রবেশ করে এবং মিশরের বিভিন্ন নেতার সহায়তা লাভ করে। এর ফলে অনুমিত হচ্ছিল যে, মিশরে ইতিমধ্যে উবায়দি মতাদর্শ বিস্তৃতি লাভ করেছে। কিন্তু এবারও উবায়দিদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয় এবং উবায়দি বাহিনী ইখশিদি বাহিনীর হাতে পরাজিত হয়। এরপর থেকে উবায়দিরা বিভিন্ন কৌশলে মিশরের শাসকদের পরাভূত করার প্রচেষ্টা চালাতে থাকে।
৩৩৪ হিজরি সনে (৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে) তৎকালীন মিশর-প্রশাসক (আবুল কাসিম আনুজুরের পক্ষে দায়িত্ব পালনকারী) কাফুর একইসঙ্গে আব্বাসি খলিফা ও উবায়দি খলিফার সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপনে ব্রতী হন। তিনি মাগরিবের অধিপতি উবায়দি সরকারের কাছে বিভিন্ন উপহারসামগ্রী প্রেরণ করতেন এবং তাদের প্রতি নিজের আনুগত্য-ভাব প্রকাশ করতেন। পাশাপাশি তিনি আব্বাসিদের প্রতিও আনুগত্যের ভান করতেন। এই পরিস্থিতির মধ্যেই চতুর্থ উবায়দি খলিফা মুইয মিশরে উবায়দি মতাদর্শের পরিধি বিস্তৃতির লক্ষ্যে কাজ করতে থাকেন এবং দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর কাফুরের অধীনস্থ বড় বড় কর্মকতা ও সেনাপতিদের তার আনুগত্যের বায়আত গ্রহণ করাতে সক্ষম হন। পাশাপাশি তিনি মাগরিব থেকে মিশর পর্যন্ত পথ নির্মাণ ও পথের ধারে কূপ খননের কাজও করেন। ৩৫৬ হিজরি সন পর্যন্ত এভাবেই চলতে থাকে।
৩৫৭ হিজরি সনে (৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে) কাফুর মৃত্যুবরণ করলে মিশরের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। জাতীয় অর্থনীতি দুর্যোগের সম্মুখীন হয়; নীলনদের প্রবাহ হ্রাস পাওয়ায় দুর্ভিক্ষ ও মহামারি ছড়িয়ে পড়ে। ইখশিদি সরকার সৈনিকদের বেতন-ভাতা প্রদানেও অক্ষম হয়ে পড়ে। তখন মিশরের নেতৃবৃন্দের অনেকে উবায়দি খলিফা মুইয লি দ্বীনিল্লাহর কাছে বার্তা পাঠিয়ে তাকে মিশরে আগমনের অনুরোধ জানায়।
৩৫৮ হিজরি সনের ১৪ রবিউস সানি (৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ৭ মার্চ) জাওহার সিকিল্লির নেতৃত্বে এক লক্ষ উবায়দি সৈন্যের একটি বাহিনী মিশর অভিমুখে রওনা হয়। পথে কোনো ধরনের প্রতিরোধের সম্মুখীন হওয়া ছাড়াই তারা আলেকজান্দ্রিয়ায় প্রবেশ করে। উবায়দি বাহিনীর আলেকজান্দ্রিয়ায় পৌঁছার সংবাদ ফুসতাতে পৌঁছলে সেখানকার উজির জাফর ইবনুল ফুরাত ও তার সঙ্গীরা জাওহারের সঙ্গে মিশরবাসীর নিরাপত্তাদানের শর্তে সন্ধিচুক্তি করা সমীচীন মনে করে। ৩৫৮ হিজরি সনের ১৮ রজব (৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ৭ জুন) তারা তারুজায় (৫৭) জাওহারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। জাওহার তাদের জানমালের নিরাপত্তা প্রদান করেন এবং নিরাপত্তা-চুক্তিতে সুস্পষ্ট উল্লেখ করেন যে, তিনি মিশরে কেবল জনকল্যাণের লক্ষ্যেই আগমন করেছেন। মিশরের জনগণ তাদের সুন্নি ধর্মমতের ওপর বহাল থাকতে পারবে; তাদেরকে শিয়া মতবাদ গ্রহণে বাধ্য করা হবে না।
তবে মিশরীয় সৈন্যদের বড় একটি অংশ সন্ধিচুক্তি প্রত্যাখ্যান করে জাওহার সিকিল্লির বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়ায়। অবশ্য শেষপর্যন্ত তারাও আত্মসমর্পণ করে এবং পুনরায় নিরাপত্তা প্রার্থনা করে।
📄 কায়রো নগরীর পত্তন এবং জামে আযহার প্রতিষ্ঠা
উবায়দি সাম্রাজ্যের অধীনে মিশরে এক নতুন যুগের সূচনা হয়। ৩৫৮ হিজরি সনের ১৭ শাবান (৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ৬ জুলাই) ফুসতাতের উত্তরে মানসুরিয়া (কায়রো) নগরীর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। পাশাপাশি উবায়দি খলিফা মুইযের বসবাসের জন্য একটি রাজপ্রাসাদের ভিত্তিও স্থাপিত হয়। পরে প্রাসাদটি 'প্রাচ্য প্রাসাদ' ও 'মহান প্রাসাদ' নামে পরিচিতি লাভ করে।
পত্তনের পর প্রথম চার বছর কায়রো নগরী মানসুরিয়া নামে পরিচিত ছিল। এরপর মুইয শুভলক্ষণ হিসেবে নগরীটির 'কায়রো'(৫৮) নামকরণ করেন এবং আশা প্রকাশ করেন যে, শীঘ্রই তিনি এই নগরীর নামের বরকতে আব্বাসিদের পরাভূত করবেন। জাওহার কায়রোর নগরপ্রাচীরে চারটি দ্বার নির্মাণ করেন—আন-নাসর দ্বার, আল-ফুতুহ দ্বার, যুবাইলা দ্বার (Bab Zuweila) ও আল-কাওস দ্বার।
এরপর সেনাপতি জাওহার ৩৫৯ হিজরি সনে (৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে) জামে আযহার মসজিদের নির্মাণ শুরু করেন। দুই বছরের মধ্যে জামে আযহারের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। জামে আযহার নির্মাণ করা হয়েছিল মিশরে উবায়দি মতাদর্শের বিশেষ প্রতীক হিসেবে। উবায়দিরা আশঙ্কা করছিল যে, মিশরের অন্যান্য মসজিদে যদি উবায়দি মতাদর্শ প্রচার করা হয়, তাহলে মিশরবাসী বিদ্রোহ করতে পারে। ৩৬১ হিজরি সনের ৭ রমজান (৯৭২ খ্রিষ্টাব্দের ২২ জুন) জামে আযহারে নামাজ আদায় শুরু হয় এবং মিম্বরে উবায়দি খলিফা মুইযের নামে দোয়া করা হয়। এরপর মিশরে আব্বাসি খলিফার পরিবর্তে উবায়দি খলিফার নামে মুদ্রা প্রচলন করা হয়। জাওহার মিশরবাসীর জন্য (আব্বাসিদের প্রতীক) কৃষ্ণ পোশাক পরিধান নিষিদ্ধ করেন। তিনি শিয়াদের রীতি অনুযায়ী খুতবায় নিম্নোক্ত অংশটুকু বৃদ্ধি করার নির্দেশ দেন-
হে আল্লাহ, আপনি মুহাম্মাদ মুসতাফার ওপর শান্তি বর্ষণ করুন; শান্তি বর্ষণ করুন আলি মুরতাযা ও ফাতেমা বাতুলের ওপর। আরও শান্তি বর্ষণ করুন রাসুলের দুই দৌহিত্র হাসান-হুসাইনের ওপর, যাদেরকে আপনি পাপমুক্ত করেছেন এবং পূত-পবিত্র করেছেন। হে আল্লাহ, আপনি শান্তি বর্ষণ করুন আমিরুল মুমিনিনের পিতৃপুরুষগণের ওপর; যারা ছিলেন সুপথপ্রাপ্ত, পথপ্রদর্শক ও হিদায়াতের পথের ইমাম।
উবায়দিরা যদিও অঙ্গীকার করেছিল যে, তারা মিশরবাসীকে সুন্নি মতাদর্শ পরিবর্তন করে শিয়া মতবাদ গ্রহণে বাধ্য করবে না; কিন্তু তারা নিজেদের অঙ্গীকার রক্ষার পরিবর্তে নিম্নোক্ত পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করে।
• উবায়দিরা বিচারকসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে শিয়াদেরকে নিযুক্ত করে।
• তারা বড় বড় মসজিদগুলোকে শিয়া মতবাদ প্রচারের কেন্দ্রে পরিণত করে।
• শিয়া মতাদর্শের প্রচারের জন্য 'দাঈ আদ-দুআত' নামে একটি নতুন পদ তৈরি করা হয়। এ পদে শিয়া মতাদর্শধারী বড় কোনো আলিমকে নিযুক্ত করা হতো। দাঈ আদ-দুআত পদবিধারী ব্যক্তি প্রধান বিচারকের সমমর্যাদাসম্পন্ন বিবেচিত হতেন। তার অধীনে বারোজন প্রধান সহকারী ও সারাদেশে নিযুক্ত অসংখ্য প্রতিনিধি কাজ করত। অনেক সময় একই ব্যক্তি প্রধান বিচারপতি ও দাঈ আদ-দুআত পদে দায়িত্ব পালন করতেন।
• উবায়দি সরকার মিশরে বিভিন্ন শিয়া প্রথা ও রীতি চালু করে। মিশরে ঈদুল গাদির ও হুসাইন রাযি.-এর মৃত্যুদিবস উদ্যাপন শুরু হয় এবং একে কেন্দ্র করে মিশরবাসীর ওপর নানাভাবে নিপীড়ন চালানো হয়।
৩৯৫ হিজরি সনে (১০০৫ খ্রিষ্টাব্দে) ষষ্ঠ উবায়দি খলিফা হাকিম বি আমরিল্লাহ নগরীর দেয়ালে দেয়ালে এবং বাজারগুলোতে সাহাবায়ে কেরামের প্রতি নিন্দামূলক বাণী উৎকীর্ণ করার নির্দেশ জারি করেন। পরে ৩৯৮ হিজরি সনে (১০০৮ খ্রিষ্টাব্দে) উক্ত নির্দেশ প্রত্যাহার করা হয়।
মিশরে নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মিলাদ শরিফ (জন্ম উৎসব) এবং নবী-কন্যা ফাতিমা রাযি. ও নবী-জামাতা আলি রাযি.-এর জন্ম উৎসব পালনের রীতি চালু হয়।
শিয়া-রীতি অনুযায়ী সকল মসজিদে আজানে (حى على خير العمل) বলার নির্দেশ জারি করা হয়।
এ সকল পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে জাওহার মিশরে খলিফা মুইযের আগমনের পথ সুগম করেন। ৩৬২ হিজরি সনে (৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে) মুইয মিশরে আগমন করেন। তিনি তার জন্য নির্মিত প্রাসাদে প্রবেশ করে কৃতজ্ঞতায় সিজদাবনত হয়ে পড়েন। তার কাছে বিভিন্ন বহুমূল্য উপহারসামগ্রী পেশ করা হয়। এরপর তিনি কায়রোকে উবায়দি সাম্রাজ্যের রাজধানী নির্বাচিত করেন।
উবায়দি খলিফার মিশরে আগমন এবং কায়রোকে রাজধানী নির্বাচনের কারণে মাগরিবে উবায়দিদের প্রভাব-কর্তৃত্ব আরও নড়বড়ে হয়ে পড়ে এবং মাগরিবের অভ্যন্তরে উবায়দিদের প্রভাবমুক্ত বিভিন্ন স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে।
খলিফা মুইযও মাগরিবের পরিবর্তে মিশরেই ক্ষমতা বিস্তৃতিতে মনোযোগ দেন। ভবিষ্যতে তার ক্ষমতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে এই আশঙ্কায় তিনি সেনাপতি জাওহারের কর্তৃত্ব হ্রাস করতে থাকেন। ফলে ধীরে ধীরে জাওহারও আপন প্রভাব-প্রতিপত্তি হারিয়ে ফেলেন।
উবায়দি সাম্রাজ্যের অন্যতম সুস্পষ্ট ও দৃশ্যমান বৈশিষ্ট্য হলো, উবায়দি শাসকগণ ইহুদি-খ্রিষ্টানদেরকে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন করতেন এবং আস্থাভাজন বিবেচনা করতেন। যেমন:
• চতুর্থ উবায়দি শাসক মুইয লি দ্বীনিল্লাহ বিভিন্ন ইহুদি চিকিৎসককে গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত করেন। তাদের কেউ কেউ রাষ্ট্রের উচ্চ পদেও আসীন হয়; এমনকি ইয়াকুব বিন কিল্লিস নামক জনৈক ইহুদি মুইযের পুত্র আজিজের শাসনামলে প্রধান উজির পদে অধিষ্ঠিত হয়। উবায়দি সাম্রাজ্যের নীতিমালা ও গঠনতন্ত্র প্রণয়নের কৃতিত্ব এই ইয়াকুব বিন কিল্লিসের।
• পঞ্চম উবায়দি শাসক আজিজ বিল্লাহ জনৈকা খ্রিষ্টান রমণীকে বিয়ে করেন। আজিজের ওপর তার এই খ্রিষ্টান স্ত্রীর যথেষ্ট কর্তৃত্ব ছিল। সে আজিজকে মিশরের খ্রিষ্টান নাগরিকদের প্রতি অনুগ্রহ-আচরণে উদ্বুদ্ধ করে। তার প্ররোচনাতেই আজিজ মিশরে খ্রিষ্টানদের বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব উদ্যাপন শুরু করেন। উবায়দি সাম্রাজ্যের দপ্তরসমূহে প্রচুর খ্রিষ্টান সচিব নিয়োগ দেওয়া হয়। তারাও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন বিষয়ে প্রভাব খাটাতে থাকে।
• আজিজ মানশা বিন ইবরাহিম কাযযারকে শামের প্রশাসক নিযুক্ত করেন।
কিন্তু ষষ্ঠ উবায়দি শাসক হাকিম বি আমরিল্লাহ ছিলেন পূর্ববর্তী শাসকদের তুলনায় ব্যতিক্রম। তিনি ৩৯৩ হিজরি সনে (১০০২ খ্রিষ্টাব্দে) সাম্রাজ্যের ইহুদি-খ্রিষ্টানদের স্বতন্ত্র পোশাক পরিধানের নির্দেশ দেন। এর তিন বছর পর তিনি কায়রোর কয়েকটি গির্জা ধ্বংসের নির্দেশ দেন। বিস্ময়কর তথ্য হলো—একইসময় তিনি মানসুর বিন আবদুন নামক জনৈক খ্রিষ্টানকে তার উজির পদে নিয়োগদান করেন। উজির মানসুরের পরামর্শেই হাকিম বি আমরিল্লাহ খ্রিষ্টানদের অন্যতম পবিত্র তীর্থস্থান আল-কুদসে অবস্থিত ‘আল-কিয়ামা’ গির্জা (The Church of the Holy Sepulchre) ধ্বংস করার নির্দেশ জারি করেন। আল-কিয়ামা গির্জা ধ্বংসের ঘটনা খ্রিষ্টসমাজকে বাইতুল মুকাদ্দাস পুনরুদ্ধারের জন্য ক্রুসেডীয় চেতনায় উদ্দীপ্ত করতে বিরাট ভূমিকা রেখেছিল।
হাকিম বি আমরিল্লাহর শাসনামলে খ্রিষ্টানদের ওপর অব্যাহত নিপীড়ন চলায় খ্রিষ্টান সচিবদের অনেকে বাধ্য হয়ে ইসলামধর্ম গ্রহণ করে; অনেকে দেশত্যাগ করে চলে যায় বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যে, হাবশায় কিংবা নুবিয়ায়।
টিকাঃ
৫৭. তারুজা: আধুনিক মিশরের বুহায়রা প্রদেশের অন্তর্গত আবুল মাতামির প্রশাসনিক অঞ্চলের একটি জনপদ।
৫৮. কায়রোর আরবি নাম আল-কাহিরা (القاهرة)। শব্দটির অর্থ—পরাভূতকারী।
📄 দরজিয়া (The Druze) সম্প্রদায়ের আত্মপ্রকাশ
৪১১ হিজরি সনে (১০২০ খ্রিষ্টাব্দে) হাকিম বি আমরিল্লাহ খ্রিষ্টানদের ওপর কঠোরতা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেন।
হাকিমের পর মিশরের ক্ষমতা লাভ করেন তার পুত্র যাহির। তিনি ইহুদি-খ্রিষ্টানদের সঙ্গে কোমল ও উদার আচরণ করেন।
অষ্টম উবায়দি শাসক মুসতানসির বিল্লাহর শাসনামলের শুরুর দিকে আবু সাদ ইবরাহিম বিন সাহল তুসতারি নামক জনৈক ইহুদি উবায়দি সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিতে পরিণত হয়। খলিফা মুসতানসিরের মা ইতিপূর্বে এই আবু সাদের বাড়ির দাসী ছিল। তার পুত্র মুসতানসির খলিফা পদে অধিষ্ঠিত হলে সে তার প্রাক্তন মালিক আবু সাদ তুসতারিকে সচিব পদে নিয়োগদান করে। তুসতারির বদান্যতায় ইহুদিরা উবায়দি সাম্রাজ্যে মর্যাদাকর অবস্থান তৈরিতে সক্ষম হয়; ইহুদিসমাজের অনেকেই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদ লাভ করে। ৪৩৯ হিজরি সনে (১০৪৭ খ্রিষ্টাব্দে) আবু সাদ তুসতারি নিহত হয়।
দরজিয়া (The Druze) সম্প্রদায়ের আত্মপ্রকাশ
পারস্য হতে মিশরে আগমনকারী কিছু লোক হাকিম বি আমরিল্লাহর শাসনামলের শেষদিকে ইসমাইলিয়া মতাদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে নিজেদের ধর্মমত পরিবর্তন করে এবং ইসমাইলিয়া শিয়া মতাদর্শ গ্রহণ করে। পরবর্তী সময়ে তারা খলিফা হাকিমের মাঝে স্রষ্টা অধিষ্ঠিত হওয়ার দাবি তুলে তা প্রচার করতে থাকে। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর অনুসারীগণ তাদের এই গর্হিত আকিদার প্রচারে বিক্ষুব্ধ হয়ে তাদেরকে বিতাড়িত করেন। ধর্মত্যাগী এই দলটির অন্যতম প্রসিদ্ধ ব্যক্তি ও খলিফা হাকিমের অত্যন্ত আস্থাভাজন ব্যক্তি ছিল মুহাম্মাদ বিন ইসমাইল দরজি। সে পালিয়ে (দামেশকের পশ্চিমের এক ক্ষুদ্র জনপদ) ইনয়াসের এক গ্রামে চলে যায় এবং সেখানে হাকিমের স্রষ্টা হওয়ার আকিদা প্রচার করতে থাকে। ধীরে ধীরে সে অনেককে তার এই নতুন মতাদর্শের প্রতি আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়। এই নতুন দলটিই দরজিয়া সম্প্রদায় নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। (৫৯)
যেহেতু এই মতাদর্শ ছিল খলিফা হাকিম বি আমরিল্লাহকে পবিত্রতা ও শ্রেষ্ঠত্বের এক ধর্মীয় আলোকবলয়ে আবৃত করার প্রয়াস, তাই খলিফা হাকিম এর পৃষ্ঠপোষকতা করেন এবং এর মাধ্যমে জনগণকে নিজের ইচ্ছার অনুগত করার প্রয়াস চালান।
হাকিমের মৃত্যুর তিন বছর পর তার পুত্র যাহির তার পিতার প্রতি সম্বন্ধিত এই গর্হিত মতবাদ হতে নিজেকে দায়মুক্ত ঘোষণা করেন।
অষ্টম খলিফা মুসতানসির বিল্লাহর শাসনামলে (৪২৭-৪৮৭ হিজরি/১০৩৫-১০৯৪ খ্রিষ্টাব্দ) উবায়দি সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে একাধিক বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে।
সুদানি সৈন্যরা ওয়াজহে কাবলি(৬০) অঞ্চলে বিদ্রোহ ঘোষণা করে।
লাওয়াতাহ গোত্র ও বেদুইনদের সমন্বয়ে গঠিত প্রায় চল্লিশ হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী উবায়দি সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণাকারী সাবেক উবায়দি গভর্নর নাসিরুদ্দৌলা হাসান বিন হুসাইন বিন হামদান তাগলিবির নেতৃত্বে ওয়াজহে বাহরি(৬১) অঞ্চলে হামলা চালায় এবং ব্যাপক লুটতরাজ চালানোর পাশাপাশি বিভিন্ন পুল-সেতু ও শাখা-নদীপথ ধ্বংস করে দেয়। এর ফলে কায়রো ও ফুসতাত থেকে এ অঞ্চলে সাহায্য সরবরাহের পথ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
৪৬২ হিজরি সনে নাসিরুদ্দৌলা মিশরে আব্বাসি খিলাফতের প্রচারণা চালানোর লক্ষ্যে ইরাকের সেলজুক সুলতান আলপ আরসালানের কাছে দূত প্রেরণ করে সামরিক সহায়তা প্রেরণের অনুরোধ করেন। তিনি দাবি জানান যে, মিশরে আব্বাসি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হলে তাকে মিশরের গভর্নরের দায়িত্ব দিতে হবে। আরসালান তার প্রস্তাবকে স্বাগত জানান। তবে তখন তিনি রোমানদের সঙ্গে যুদ্ধে ব্যস্ত থাকায় মিশরের প্রতি মনোযোগী হতে পারেননি।
৪৬৪ হিজরি সনে নাসিরুদ্দৌলা ওয়াজহে বাহরি অঞ্চলে খুতবা থেকে মুসতানসিরের নাম বাদ দেন এবং বাগদাদের তৎকালীন আব্বাসি খলিফা কায়িম বি আমরিল্লাহর কাছে খেলাত (সম্মানসূচক পোশাক) প্রার্থনা করেন।
এর কিছুদিন পর তিনি ফুসতাতে পৌঁছে রাজধানী কায়রোর ওপরও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। খলিফা মুসতানসিরের পরিবর্তে নাসিরুদ্দৌলা হাসানই এবার উবায়দি সাম্রাজ্য পরিচালনা করতে থাকেন। তিনি খলিফা মুসতানসিরের জন্য মাসিক একশ দিনার ভাতা নির্ধারণ করে দেন। কায়রোতে নাসিরুদ্দৌলার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় উবায়দি সাম্রাজ্যের মূল সামরিক শক্তি তুর্কিরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। তারা এবার ষড়যন্ত্র করে নাসিরুদ্দৌলাকে হত্যা করে। এরপর মিশরে নাসিরুদ্দৌলার পরিবারের সবাইকে খুঁজে বের করে তাদেরকেও হত্যা করা হয়।
এরপর উবায়দি সাম্রাজ্যের লাগাম চলে যায় তুর্কিদের হাতে। অসহায় খলিফা মুসতানসির অবশেষে আক্কার (Acre) গভর্নর বদরুদ্দিন জামালির কাছে বার্তা পাঠিয়ে তাকে কায়রোয় এসে সাম্রাজ্যের দায়িত্ব গ্রহণের অনুরোধ জানান। বদরুদ্দিন শর্তারোপ করেন যে, তিনি কায়রোতে অবস্থানরত তুর্কি, মাগরিবি ও সুদানি সৈন্যদের দমন করার জন্য শামের (আর্মেনীয়) নির্বাচিত সৈন্যদের সঙ্গে নিয়ে আসবেন।
বদরুদ্দিন জামালি ছিলেন আমির জামালুদ্দৌলা বিন আম্মারের একজন আর্মেনীয় ক্রীতদাস। শামে সংঘটিত বিভিন্ন যুদ্ধে আপন সামরিক দক্ষতার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে তিনি বিভিন্ন পদ লাভ করতে থাকেন। অবশেষে ৪৫৬ হিজরি সনে (১০৬৪ খ্রিষ্টাব্দে) তিনি মুসতানসির বিল্লাহর পক্ষ থেকে দামেশকের গভর্নর নিযুক্ত হন। দামেশকে তুর্কিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন লড়াইয়ে সাফল্য লাভের পর তিনি ৪৬০ হিজরি সনে (১০৬৮ খ্রিষ্টাব্দে) আক্কার গভর্নর পদ লাভ করেন।
মুসতানসির বিল্লাহর অনুরোধে বদরুদ্দিন কায়রোয় আগমন করেন এবং তুর্কি সেনাপতিদের হত্যা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন। তিনি ওয়াজহে কাবলি ও ওয়াজহে বাহরি অঞ্চলে খলিফা মুসতানসিরের কর্তৃত্ব ফিরিয়ে আনেন। এরপর তিনি আলেকজান্দ্রিয়ায় 'জামে আত্তারিন' নির্মাণ করেন। বদরুদ্দিন জামালির কঠোর নেতৃত্বে মিশরের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ফিরে আসে। ৪৫৭-৪৬৪ হিজরি সনে মিশরের বার্ষিক রাজস্বের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে বিশ লক্ষ দিনার থেকে একত্রিশ লক্ষ দিনারে উন্নীত হয়।
জামালি ৪৮৭ হিজরি সনে (১০৯৪ খ্রিষ্টাব্দে) মৃত্যুবরণ করেন এবং তার ছেলে আফজাল শাহানশাহকে পরবর্তী উজির নির্বাচিত করে যান।
উজিরদের অবাধ কর্তৃত্বের কারণে মুসতানসির বিল্লাহ তার শাসনামলের অধিকাংশ সময় অনেকটা হাত-পা-বাঁধা ব্যক্তির মতোই ছিলেন। ৪৮৭ হিজরি সনের ১৭ জিলহজ (১০৯৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ ডিসেম্বর) তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মুসতানসিরের মৃত্যুর মাধ্যমেই উবায়দি সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় যুগের সূচনা ঘটে, যাকে আমরা অভিহিত করতে পারি 'উজিরদের কর্তৃত্বের যুগ' নামে।
টিকাঃ
৫৯. বর্তমানে বিশ্বে দরজিয়া ধর্মাবলম্বী লোকের সংখ্যা দশ লক্ষের ঊর্ধ্বে। তাদের অধিকাংশ বাস করে সিরিয়া, লেবানন, ইসরাইল ও ভেনেজুয়েলায়।
৬০. ওয়াজহে কাবলি: মিশরের দক্ষিণ-পূর্ব অংশের একটি অঞ্চলের নাম ওয়াজহে কাবলি বা সাইদে মিশর, ইংরেজিতে Upper Egypt।
৬১. ওয়াজহে বাহরি: মিশরের উত্তরাঞ্চলে বদ্বীপ সদৃশ একটি অঞ্চলের নাম ওয়াজহে বাহরি বা দালতান নীল; ইংরেজিতে The Nile Delta।