📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 উবায়দি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার ইতিহাস

📄 উবায়দি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার ইতিহাস


সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক কালে উবায়দিরা আব্বাসিদের নীতি অবলম্বন করেছিল। প্রথমে তারা মিশর, মাগরিব ও ইয়ামেনে নিজেদের মতাদর্শ প্রচার করে এ সকল অঞ্চলে প্রচুর সংখ্যক অনুসারী ও সহযোগী তৈরি করতে সক্ষম হয়। এমনকি আগলাবিয়া রাষ্ট্রের শেষ যুগের উজিরগণও উবায়দি মতাদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হয়। উবায়দি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা-পূর্ববর্তী শেষ স্তরে আফ্রিকায় উবায়দি মতাদর্শের প্রধান প্রচারক ছিলেন আবু আবদুল্লাহ আলি বিন হাওশাব শিয়ি। তিনি ২৮০ হিজরি সন (৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দ) থেকে মাগরিবে এবং ২৮৯ হিজরি সন (৯০২ খ্রিষ্টাব্দ) থেকে উত্তর আফ্রিকায় উবায়দি মতাদর্শ প্রচারে ব্যাপক পরিসরে কাজ করেন।
আবু আবদুল্লাহ তার অনুসারীদের নিয়ে একটি শক্তিশালী বাহিনী গঠন করতে সক্ষম হন এবং তাদেরকে নিয়ে আগলাবিয়া রাষ্ট্রে উপর্যুপরি আক্রমণ করেন। ২৯৬ হিজরি সন (৯০৯ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত ব্যাপ্ত একটানা প্রায় পাঁচ বছরের লড়াইয়ের পর তিনি আগলাবিয়া সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত পতন ঘটান। এর ফলে মাগরিবের অধিকাংশ অঞ্চলে উবায়দিদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় এবং কায়রোয়ান নগরীর পশ্চিমে অবস্থিত সকল এলাকায় উবায়দিদের একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম হয়।
আগলাবিয়া সাম্রাজ্যে অভিযান চলাকালেই আবু আবদুল্লাহ শিয়ি উবায়দুল্লাহর(৫৩) কাছে বার্তা পাঠিয়ে তাকে মাগরিবে আগমন করতে বলেন। উবায়দুল্লাহ কালবিলম্ব না করে মাগরিব সফরের উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং যথেষ্ট সতর্কতা ও গোপনীয়তা অবলম্বন করেন। তিনি মিশর অতিক্রমের সময় সেখানকার প্রচারক ও অনুসারীরা তাকে স্বাগত জানায়। এরপর পথে বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাত ও কষ্টকর অভিজ্ঞতা পাড়ি দিয়ে অবশেষে তিনি উচ্চ মাগরিবের সিজিলমাসা অঞ্চলে পৌঁছান। উবায়দুল্লাহ সিজিলমাসার(৫৪) শাসক ইয়াসা বিন মিদরারকে উদার হস্তে অর্থসম্পদ প্রদান করে নিরাপদে সেখানে বসবাস করতে থাকেন। তবে ২৯৬ হিজরি সনে (৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে) আবু আবদুল্লাহ শিয়ি আগলাবিদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করলে ইয়াসার আচরণ পাল্টে যায়। ইয়াসা উবায়দুল্লাহকে তার পরিবার ও কিছু অনুসারীসহ বন্দি করেন। পরবর্তী সময়ে আবু আবদুল্লাহর ক্ষমতার পরিধি আরও বিস্তৃত হয় এবং সিজিলমাসাও তার কর্তৃত্বে চলে আসে। তখন সিজিলমসার শাসক ইয়াসা বিন মিদরার পালিয়ে যান। আবু আবদুল্লাহ সিজিলমাসায় পৌঁছে উবায়দুল্লাহকে কারামুক্ত করেন। এরপর উবায়দুল্লাহর হাতে খিলাফতের বায়আত গ্রহণ করা হয়। উবায়দুল্লাহ বিশাল এক বাহিনী নিয়ে (আগলাবিয়া রাষ্ট্রের রাজধানী) রাক্কাদায় পৌঁছান। রাক্কাদার অধিবাসীরা তাকে উষ্ণ অভিবাদন জানায়। তিনি রাক্কাদাকে তার নবগঠিত রাষ্ট্রের রাজধানী নির্বাচিত করেন, পুরো অঞ্চলের মিম্বরসমূহে খুতবায় তার নাম পাঠ করার নির্দেশ দেন এবং 'আমিরুল মুমিনিন আল-মাহদি' উপাধি ধারণ করেন। এভাবেই উত্তর আফ্রিকায় ফাতিমি নামধারী উবায়দি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

টিকাঃ
৫৩. উবায়দুল্লাহ হচ্ছেন উবায়দি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। তার বংশপরিচয় নিয়ে ঐতিহাসিক ও কুলজিবিশারদগণের মাঝে মতানৈক্য রয়েছে। কতক ঐতিহাসিক তাকে হজরত আলি বিন আবু তালিব রাযি.-এর বংশোদ্ভূত উল্লেখ করলেও অধিকাংশের মত হলো, তিনি মূলত ইহুদি বংশোদ্ভূত। আবার কেউ কেউ তাকে কারামাতিয়াদের দিকেও সম্বন্ধিত করেছেন। যারা তাকে আলি রাযি.-এর প্রতি সম্বন্ধিত করেন, তাদের মতে তার বংশধারা এরূপ— উবায়দুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ বিন ইসমাইল বিন জাফর বিন আলি বিন হাসান বিন আলি বিন আবু তালিব। [মূল গ্রন্থের টীকা]
তার বংশপরিচয় সম্পর্কে সুনিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছা এ জন্যও কঠিন যে, উমাইয়া শাসনামলের শেষদিকে এবং আব্বাসি আমলে আলাবি নেতৃবৃন্দের কয়েক পুরুষ আত্মগোপন করে ছিলেন এবং সরকার ও বৃহত্তর জনসাধারণ হতে নিজেদের গোপন রেখে শিয়া মতবাদ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন চালিয়ে গিয়েছিলেন। এ কারণে তাদের প্রত্যেকের সন্তানসন্ততির পরিচয় ও সংখ্যাও জনসাধারণ জানতে পারত না। যেহেতু আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর দৃষ্টিতে হজরত ফাতিমা রাযি.-এর প্রতি তার বংশ-সম্বন্ধ সঠিক নয়, তাই তার প্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্যকে ফাতিমি সাম্রাজ্য না বলে উবায়দি সাম্রাজ্য অভিহিত করাই সমীচীন।
৫৪. সিলিজমাসায় তখন মিদরারিয়া রাষ্ট্র নামে একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত ছিল। মিদরারিয়া রাষ্ট্রের ব্যাপ্তি ছিল ১৪০ হিজরি হতে ৩৪৫ হিজরি সন (৭৫৭-৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত। অবশ্য ২৯৬ হিজরি সনের পর থেকে মিদরারিয়া রাষ্ট্র উবায়দি সাম্রাজ্যের করদরাজ্য ছিল। মিদরারিয়া রাষ্ট্রের শাসকপরিবার (বার্বার উপগোষ্ঠী) বনু মিদরার গোত্র ছিল খারিজি সাফারিয়া মতাদর্শের অনুসারী।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 দ্রষ্টব্য : একক খিলাফতব্যবস্থা মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের সেতুবন্ধন

📄 দ্রষ্টব্য : একক খিলাফতব্যবস্থা মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের সেতুবন্ধন


মুসলিম উম্মাহর অবিচ্ছিন্নতা ও কাফিরশক্তির মোকাবিলায় দৃঢ়তার ক্ষেত্রে একক খিলাফতব্যবস্থার গুরুত্ব অপরিসীম। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পর থেকে পৃথিবীর সকল ভূখণ্ডের মুসলমান এক ও অভিন্ন জাতি হিসেবে এক খলিফার অধীনে বসবাস করত। স্থান-বর্ণ ও জাতি-পরিচয়ের ভিন্নতা সত্ত্বেও কখনোই মুসলিমবিশ্বে একাধিক খলিফার প্রশ্ন উত্থাপিত হয়নি। বনু উমাইয়ার শাসনামলে যদিও সীমিত কিছু সময় দুই খলিফার অস্তিত্ব ছিল; কিন্তু আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর মতাদর্শ অনুসারে তখন আব্দুল্লাহ বিন যুবায়র রাযি. ছিলেন একমাত্র বৈধ খলিফা। উমাইয়া শাসনব্যবস্থার পতন ও আব্বাসি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠার পর ইসলামি বিশ্বের নানা অংশে বিভিন্ন স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলেও আব্বাসি খলিফা ব্যতীত অন্য কেউ নিজেকে খলিফা বলে দাবি করেনি। ২৯৭ হিজরি সনে যখন উবায়দি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা উবায়দুল্লাহ আল-মাহদি নিজেকে খলিফা ও আমিরুল মুমিনিন দাবি করেন, মূলত তখনই মুসলিমবিশ্ব প্রথমবারের মতো খিলাফত প্রশ্নে বিভক্তির শিকার হয়। উনিশ বছর পর ৩১৬ হিজরি সনে যখন আন্দালুসে আবদুর রহমান আন-নাসিরও নিজেকে খলিফা ঘোষণা করেন, তখন মুসলিমবিশ্ব খিলাফতের ক্ষেত্রে তিনভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। সাতাশি বছর পর ৪০৩ হিজরি সনে কর্ডোভাকেন্দ্রিক খিলাফতব্যবস্থার পতন ঘটলে মুসলিমবিশ্ব আবারও দুই খলিফার যুগে প্রবেশ করে। এরও একশ চৌষট্টি বছর পর ৫৬৭ হিজরি সনে উবায়দি সাম্রাজ্যের পতন ঘটলে আবারও মুসলিমবিশ্ব এক-অভিন্ন খিলাফতব্যবস্থায় ফিরে আসে। যদিও এ সময় আব্বাসি খিলাফতের ভঙ্গুর অবস্থার কারণে বিভিন্ন রাষ্ট্র আব্বাসি খলিফার কর্তৃত্ব শিকার করত না; কিন্তু তারা আব্বাসি খলিফার মোকাবিলায় ভিন্ন খলিফা দাঁড় করানোর চিন্তাও করেনি। ৬৫৬ হিজরি সনে তাতার আগ্রাসন-পরবর্তী সময়ে অল্প কিছুদিন মুসলিমবিশ্ব খিলাফতশূন্য থাকলেও ৬৫৯ হিজরি সনে মিশরে আবারও আব্বাসি খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 উবায়দি (ফাতিমি) সাম্রাজ্যের খলিফাগণের তালিকা

📄 উবায়দি (ফাতিমি) সাম্রাজ্যের খলিফাগণের তালিকা


১. আল-মাহদি উবায়দুল্লাহ : ২৯৭-৩২২ হি. (৯০৯-৯৩৪ খ্রি.)
২. আল-কায়িম মুহাম্মাদ আবুল কাসিম : ৩২২-৩৩৪ হি. (৯৩৪-৯৪৫ খ্রি.)
৩. আল-মানসুর ইসমাইল আবু তাহির : ৩৩৪-৩৪১ হি. (৯৪৫-৯৫২ খ্রি.)
৪. আল-মুইয লি দ্বীনিল্লাহ মাআদ(৬৪) : ৩৪১-৩৬৫ হি. (৯৫২-৯৭৫ খ্রি.)
৫. আল-আজিজ বিল্লাহ নিযার আবু মানসুর : ৩৬৫-৩৮৬ হি. (৯৭৫-৯৯৬ খ্রি.)
৬. আল-হাকিম বি আমরিল্লাহ আবু আলি মানসুর : ৩৮৬-৪১১ হি. (৯৯৬-১০২০ খ্রি.)
৭. আয-যাহির আলি আবুল হাসান : ৪১১-৪২৭ হি. (১০২০-১০৩৫ খ্রি.)
৮. আল-মুসতানসির বিল্লাহ আবু তামিম : ৪২৭-৪৮৭ হি. (১০৩৫-১০৯৪ খ্রি.)
৯. আল-মুসতালি আহমাদ আবুল কাসিম : ৪৮৭-৪৯৫ হি. (১০৯৪-১১০১ খ্রি.)
১০. আল-আমির মানসুর আবু আলি : ৪৯৫-৫২৪ হি. (১১০১-১১৩০ খ্রি.)
১১. আল-হাফিজ আবদুল মজিদ আবুল মায়মুন : ৫২৪-৫৪৪ হি. (১১৩০-১১৪৯ খ্রি.)
১২. আয-যাফির ইসমাইল আবুল মানসুর : ৫৪৪-৫৪৯ হি. (১১৪৯-১১৫৪ খ্রি.)
১৩. আল-ফায়িয ঈসা আবুল কাসিম : ৫৪৯-৫৫৫ হি. (১১৫৪-১১৬০ খ্রি.)
১৪. আল-আযিদ আবদুল্লাহ আবু মুহাম্মাদ : ৫৫৫-৫৬৭ হি. (১১৬০-১১৭১ খ্রি.)

টিকাঃ
৬৪. ৩৫৮ হিজরি সনে (৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে) আল-মুইয লি দ্বীনিল্লাহর শাসনামলে মিশর বিজিত হয় এবং ৩৬২ হিজরি সনে (৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে) উবায়দি সাম্রাজ্যের রাজধানী মাগরিবের মানসুরিয়া থেকে মিশরের কায়রোতে স্থানান্তরিত হয়।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 উবায়দি (ফাতিমি) সাম্রাজ্যের খলিফাগণের বংশলতিকা

📄 উবায়দি (ফাতিমি) সাম্রাজ্যের খলিফাগণের বংশলতিকা


[নামের পাশে বন্ধনীতে খলিফাদের ক্রমধারা উল্লেখ করা হয়েছে]
আল-মাহদি উবায়দুল্লাহ (১) (২৯৭-৩২২ হি./৯০৯-৯৩৪ খ্রি.)
আল-কায়িম মুহাম্মাদ আবুল কাসিম (২) (৩২২-৩৩৪ হি./৯৩৪-৯৪৫ খ্রি.)
আল-মানসুর ইসমাইল আবু তাহির (৩) (৩৩৪-৩৪১ হি./৯৪৫-৯৫২ খ্রি.)
আল-মুইয লি দ্বীনিল্লাহ মাআদ (৪) (৩৪১-৩৬৫ হি./৯৫২-৯৭৫ খ্রি.)
আল-আজিজ বিল্লাহ নিযার আবু মানসুর (৫) (৩৬৫-৩৮৬ হি./৯৭৫-৯৯৬ খ্রি.)
আল-হাকিম বি আমরিল্লাহ আবু আলি মানসুর (৬) (৩৮৬-৪১১ হি./৯৯৬-১০২০ খ্রি.)
আয-যাহির আলি আবুল হাসান (৭) (৪১১-৪২৭ হি./১০২০-১০৩৫ খ্রি.)
আল-মুসতানসির বিল্লাহ আবু তামিম (৮) (৪২৭-৪৮৭ হি./১০৩৫-১০৯৪ খ্রি.)
শাখা-১:
আল-মুসতালি আহমাদ আবুল কাসিম (৯) (৪৮৭-৪৯৫ হি./১০৯৪-১১০১ খ্রি.)
আল-আমির মানসুর আবু আলি (১০) (৪৯৫-৫২৪ হি./১১০১-১১৩০ খ্রি.)
আবুল কাসিম তায়্যিব
শাখা-২:
মুহাম্মাদ
আল-হাফিজ আবদুল মাজিদ আবুল মায়মুন (১১) (৫২৪-৫৪৪ হি./১১৩০-১১৪৯ খ্রি.)
ইউসুফ
আয-যাফির ইসমাইল আবুল মানসুর (১২) (৫৪৪-৫৪৯ হি./১১৪৯-১১৫৪ খ্রি.)
আল-ফায়িয ঈসা আবুল কাসিম (১৩) (৫৪৯-৫৫৫ হি./১১৫৪-১১৬০ খ্রি.)
আল-আযিদ আবদুল্লাহ আবু মুহাম্মাদ (১৪) (৫৫৫-৫৬৭ হি./১১৬০-১১৭১ খ্রি.)
(সালাহুদ্দিন আইয়ুবির হাতে পতন ঘটে।)
শাখা-৩:
আবদুল্লাহ নিযার
শাখা-৪:
ইসমাইল

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00