📄 পতন-পরবর্তী সময়ে আন্দালুস থেকে ইসলাম নিশ্চিহ্নকরণ
আবু আবদুল্লাহর অশ্রুই আন্দালুসে মুসলমানদের শেষ অশ্রু ছিল না। এরপর আন্দালুস ভূমিতে আরও অনেক মুসলমানের অশ্রু ঝরেছে এবং তাদের আর্তচিৎকারে আকাশ-বাতাস ভারী হয়েছে। চুক্তি সম্পাদনের কিছু দিন পরই খ্রিষ্টান শাসকগোষ্ঠী চুক্তি অস্বীকার করে এবং শর্তসমূহ লঙ্ঘন করতে শুরু করে। একপর্যায়ে তারা মুসলমানদের ওপর খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণের জন্য চাপ সৃষ্টি করতে থাকে। প্রথমদিকে কিছুদিন পরিস্থিতি শান্ত ছিল এবং স্বাধীনভাবে ধর্মপালনের সুযোগ ছিল। গ্রানাডার তৎকালীন বিশপ হারনান্দেজ তালাভেরা উদার প্রকৃতির লোক ছিলেন। কিন্তু বিশপের উদার নীতিতে কার্ডিনাল সিমেন্স চরম অসন্তুষ্ট হয় এবং রানি ইসাবেলাকে কুমন্ত্রণা দিতে থাকে যে, মুসলমানদের সঙ্গে চুক্তিরক্ষার মাধ্যমে ঈশ্বরের সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। সিমেন্সের কথায় প্রভাবিত হয়ে ইসাবেলা মুসলমানদের নির্যাতন করার নির্দেশ জারি করেন। মুসলমানরা এতে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। কিন্তু কার্ডিনাল সিমেন্স পরিস্থিতি আরও কঠিন করে তোলে এবং রানিকে প্ররোচিত করে নতুন আরেকটি ফরমান জারি করে। নতুন ফরমানে মুসলমানদেরকে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ বা দেশত্যাগ—দুটির একটি বেছে নেওয়ার অবকাশ দেওয়া হয়। ফরমানে উল্লেখ করা হয়—মুসলমানদের পূর্বপুরুষগণ সকলে খ্রিষ্টান ছিল। তাই গির্জা তাদেরকে জন্মসূত্রে খ্রিষ্টানই গণ্য করে আসছে। কিছুদিন পর মসজিদসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং মূল্যবান গ্রন্থ ও পাণ্ডুলিপিসমূহ জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। এর পাশাপাশি মুসলমানদের জীবনে নেমে আসে অবর্ণনীয় নির্যাতন।
নির্যাতিত মুসলমানদের অনেকে পালিয়ে মাররাকিশ, মিশর ও তুরস্কে চলে যায়। অনেকে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে এবং বাশারাত (Alpujarra) অঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় আশ্রয় গ্রহণ করে। এলাকাটি ছিল বিদ্রোহ পরিচালনার অত্যন্ত উপযোগী ক্ষেত্র। বিদ্রোহীদের দমন করার জন্য কয়েকটি অভিযান চালানো হয়; কিন্তু প্রতিটি অভিযান ব্যর্থ হয়।
যারা প্রচণ্ড নির্যাতনের মুখে বাহ্যিকভাবে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করতে বাধ্য হয়, তারা অতি সঙ্গোপনে ধর্মীয় বিধানাবলি পালনের চেষ্টা করত। যেসব জলদস্যু আন্দালুস উপকূলে অবতরণ করে খ্রিষ্টানদের সন্তান চুরি করে নিয়ে যেত, তারা তাদেরকে গোপনে সাহায্য করত।
📄 আন্দালুসের মরিস্কোদের জীবনে নেমে আসা দুর্যোগের কিছু খণ্ডচিত্র
এরপর গ্রানাডায় বনু সিরাজ গোত্রের ফারজ ইবনুল ফারজের নেতৃত্বে নতুন এক বিদ্রোহের সূচনা হয়। ফারজ ইবনুল ফারজ নিপীড়িত মুসলমানদের সঙ্গে নিয়ে পাহাড়ি এলাকায় চলে যায়। এক সপ্তাহ না যেতেই বাশারাত অঞ্চলের সকলে অস্ত্র তুলে নেয় এবং খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে। উভয়পক্ষের মধ্যে কয়েকবার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। এটি ৯৭৬ হিজরি সনের (১৫৬৮ খ্রিষ্টাব্দের) ঘটনা। কিন্তু চলমান ঘটনাপ্রবাহ ধীরে ধীরে মুসলমানদের জন্য পরিস্থিতি প্রতিকূল করে তোলে।
শতাব্দীকাল পরেই ১০১৭ হিজরি সনের (১৬০৯ খ্রিষ্টাব্দের) মধ্যে পুরো স্পেন মুসলিমশূন্য হয়ে যায়। গ্রানাডার পতনের পর থেকে নিয়ে সপ্তদশ শতকের প্রথম দশক পর্যন্ত সময়ে স্পেন থেকে বিতাড়িত করা হয় প্রায় ত্রিশ লক্ষ মুসলমানকে। অপরদিকে যারা স্প্যানিশ খ্রিষ্টানদের নির্মম গণহত্যার শিকার হয়, তাদের সংখ্যাও এর কম নয়।
আন্দালুসের মরিস্কোদের(৫১) জীবনে নেমে আসা দুর্যোগের কিছু খণ্ডচিত্র
• ৯০৭ হিজরি সনের ৪ মুহাররম (১৫০১ খ্রিষ্টাব্দের ২০ জুলাই) রাজকীয় ফরমান জারি করা হয়—গ্রানাডায় কোনো মুসলমানের অস্তিত্ব থাকতে পারবে না। এখনো কোনো মুসলমান থেকে গেলে সে বাইরের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবে না। কেউ এ নির্দেশ অমান্য করলে তার শাস্তি হলো মৃত্যুদণ্ড ও সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণ।
• ৯০৮ হিজরি সনের ১৩ রমজান (১৫০৩ খ্রিষ্টাব্দের ১২ মার্চ) ফরমান জারি করা হয়—গ্রানাডায় এখনো (ক্রীতদাস বাদে) যেসব মুসলমান রয়ে গেছে, তাদের মধ্যে যাদের বয়স ইতিমধ্যে (পুরুষদের ক্ষেত্রে) ১৪ বছর ও (নারীদের ক্ষেত্রে) ১২ বছর হয়ে গেছে, তাদের চলতি বছরের মে মাস শুরু হওয়ার পূর্বে অবশ্যই গ্রানাডা ত্যাগ করতে হবে। তবে দেশত্যাগের সময় কোনো সম্পদ সঙ্গে নেওয়া যাবে না এবং দেশত্যাগ করে আফ্রিকার উত্তরাঞ্চলে যাওয়া যাবে না। কারণ, তা একটি ইসলামি রাষ্ট্র।
• ৯০৯ হিজরি সনের ১৯ রবিউল আউয়াল (১৫০৩ খ্রিষ্টাব্দের ১১ সেপ্টেম্বর) রাজকীয় প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়—মরিস্কোরা (নতুন খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণকারী) আগামী দু-বছর নিজেদের সম্পদে কোনোপ্রকার হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। এ সময় কেউ দেশত্যাগ করতে চাইলে কেবল অ্যারাগোন বা পর্তুগালে যেতে পারবে। কারণ, এ দুটি অমুসলিম রাষ্ট্র।
• ৯২০ হিজরি সনের ৬ জুমাদাল উলা (১৫১৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ জুন) পোপের পক্ষ থেকে মুসলমানদেরকে ক্যাথলিক ধর্মগ্রহণে বাধ্য করার নির্দেশ জারি করা হয়। নির্দেশে বলা হয়—যে ব্যক্তি ধর্ম পরিবর্তনে অস্বীকৃতি জানাবে, তাকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্পেন ত্যাগ করতে হবে কিংবা সে বাকি জীবন ক্রীতদাস হিসেবে কাটাবে। নির্দেশের শেষে সকল মসজিদকে গির্জায় রূপান্তরিত করার কথা বলা হয়। নির্দেশ মোতাবেক অনেকে ক্যাথলিক ধর্মমত গ্রহণ করলেও কেউই নির্যাতন ও বাস্তুচ্যুতকরণ থেকে রেহাই পায়নি।
• ১০০৭ হিজরি সনে (১৫৯৯ খ্রিষ্টাব্দে) রাজকীয় নির্দেশ জারি করা হয়—সকল মরিস্কো যুবক ও বৃদ্ধদের দাসে পরিণত করতে হবে। তাদের সম্পদ জব্দ করা হবে এবং তাদেরকে দেশের বাইরে নির্বাসিত করা হবে। আর শিশুদেরকে ধরে নিয়ে খ্রিষ্টধর্মের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠিয়ে দেওয়া হবে এবং তাদেরকে খ্রিষ্টধর্মের শিক্ষাদীক্ষায় গড়ে তোলা হবে।
• ১০১৮ হিজরি সনের ২২ জুমাদাল উখরা (১৬০৯ খ্রিষ্টাব্দের ২২ সেপ্টেম্বর) ফরমান জারি করা হয়—ফরমান ঘোষণা-পরবর্তী তিনদিনের মধ্যে সকল মরিস্কোকে বার্বারদের দেশে (মাগরিবে) নির্বাসিত করতে হবে। এই ফরমান জারি করার পর দশ লক্ষের অধিক মানুষকে নির্বাসিত করা হয়।
• অবশিষ্ট মরিস্কোদের ওপর স্প্যানিশ খ্রিষ্টান সরকার বিচিত্র ও অমানবিক নানারকম নির্যাতন চালায়। যেমন ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া, নির্বাসিত করা, সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা, মিথ্যা ও মনগড়া নানা অভিযোগ আরোপ করে বিচারের নামে গাধার পিঠে চড়িয়ে শহরের রাস্তাঘাটে ঘোরানো এবং গলায় কার্ড ঝুলিয়ে দিয়ে তাতে তার নাম ও অপরাধ লিখে দেওয়া ইত্যাদি। যেসব অপরাধে মরিস্কোদের অভিযুক্ত করা হতো, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো—নিয়মিত গোসল করা, মৃত ব্যক্তিকে নতুন কাফন পরানো, ইসলামের নবীর আলোচনা করা, কুরআন পাঠ করা, আরবি গ্রন্থ বা আরবি লেখা পৃষ্ঠা সংরক্ষণ করা, আরবি সংগীত গাওয়া, শূকরের গোশত আহার বা মদ্যপানে বিরত থাকা, অজু করা, নামাজ-রোজা করা ইত্যাদি!(৫২)
টিকাঃ
৫১. গ্রানাডায় মুসলমানদের পতনের পরও যে সমস্ত মুসলিম নাগরিক স্পেনেই বসবাস করে এবং পরে ‘দেশত্যাগ বা খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ’-নির্দেশের সম্মুখীন হয়, স্প্যানিশ খ্রিষ্টানরা তাদেরকে অবজ্ঞা প্রদর্শন ও মর্যাদাহানির জন্য ‘মরিস্কো’ বলে ডাকত।
৫২. রানি ইসাবেলা মরিস্কোদের নির্যাতন করার জন্য স্প্যানিশ তদন্ত কমিশন (The Tribunal of the Inquisition) নামে একটি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। সংস্থাটি খ্রিষ্টবাদ সংরক্ষণের নামে মরিস্কোদের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন চালাত। এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে দ্রষ্টব্য—মাকতাবাতুল হাসান থেকে প্রকাশিত ড. রাগিব সারজানির আন্দালুসের ইতিহাস।