📄 গ্রানাডায় বনু আহমার (বনু নাসর)-এর শাসনকাল
ইকাব যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে আন্দালুসের অধিকাংশ বড় বড় নগরী খ্রিষ্টানদের দখলে চলে যায়। একমাত্র গ্রানাডা থেকে যায় মুসলমানদের হাতে। ৬৩৬ হিজরি থেকে ৬৬৮ হিজরি সন (১২৩৮-১২৬৯ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ক্যাস্টোলার শাসক তৃতীয় ফার্ডিনান্ড ও অ্যারাগোনের শাসক প্রথম জেইম ভ্যালেন্সিয়া, কর্ডোভা, মুরসিয়া, সেভিল প্রভৃতি নগরী জয় করে নেন। আরবদের শাসকক্ষমতা শুধু গ্রানাডাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। দুর্ভেদ্য-দুর্গম গ্রানাডা অঞ্চল এরপর প্রায় আড়াই শতাব্দী কাল খ্রিষ্টান স্পেনের মোকাবিলা করে টিকে থাকে。
গ্রানাডায় বনু আহমার সাম্রাজ্যের স্থপতি ছিলেন বনু নাসরুদ্দিন বংশের আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ বিন ইউসুফ নামক জনৈক আরব নেতা। দাবি করা হয় যে, বনু নাসর মদিনার খাযরাজ গোত্রের প্রতি সম্বন্ধিত। মুহাম্মাদ বিন ইউসুফ ইবনুল আহমার(৪৯) ছিলেন সমুন্নত মনোবল, সচ্চরিত্র ও দুর্লভ যোগ্যতাসম্পন্ন একজন নেতা। এ জন্যই বনু নাসর গোত্রে তার নেতৃত্বের স্বীকৃতি দিয়ে তাকে 'শায়খ' উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
তৎকালীন আন্দালুসের মুসলিম সমাজ যে দুর্যোগময় পরিস্থিতি মোকাবিলা করছিল, তার প্রতি লক্ষ করে বনু আহমার গ্রানাডার বাইরে অন্য কোনো নগরীতে নিজেদের সাম্রাজ্য বিস্তৃতির চিন্তা করেনি।
বিস্ময়ের বিষয় হচ্ছে-উপর্যুপরি ক্রুসেড আগ্রাসন, সার্বক্ষণিক শঙ্কা, শত্রুবেষ্টন ও শত্রুর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেও নিঃসঙ্গ ইসলামি ভূখণ্ড গ্রানাডা দৃঢ়তার সঙ্গে টিকে থাকে এবং জ্ঞানবিজ্ঞানের বিভিন্ন অঙ্গনে সমুন্নত অবস্থানে উন্নীত হতে সক্ষম হয়।
এর কারণ হিসেবে বলা যায়-আন্দালুসের বিভিন্ন ভূখণ্ড খ্রিষ্টানদের দখলে চলে যাওয়ার পর সেখানকার অধিকাংশ মুসলিম নাগরিক গণহত্যা ও বিতাড়নের হাত থেকে নিষ্কৃতি পেতে গ্রানাডায় পাড়ি জমায়। কৃষি, বাণিজ্য, হস্তশিল্পসহ বিভিন্ন পেশায় দক্ষ এসব মানুষের আগমনে গ্রানাডার প্রতিটি অঙ্গন ব্যাপকভাবে মুখরিত হয়ে ওঠে। গ্রানাডা-ভূমির এক ইঞ্চি জমিও এমন ছিল না, যা কোনো উপযোগী কাজে ব্যবহৃত হয়নি।
গ্রানাডা-নৃপতি ইবনুল আহমার একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক ছিলেন। তিনি জনগণের সঙ্গে সদাচরণ করতেন। বিভিন্ন ইসলামি নগরী থেকে গ্রানাডায় আগত আলিমসমাজ ও জ্ঞানীদের সহায়তা নিয়ে তিনি রাষ্ট্রের বুদ্ধিবৃত্তিক, অর্থনৈতিক ও নাগরিক সভ্যতার অঙ্গনে ব্যাপক উন্নতি সাধন করেন। তিনি বিভিন্ন খনিজ সম্পদের খনি আবিষ্কার করে সম্পদ আহরণের ব্যবস্থা করেন এবং প্রচুর হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি তৎকালীন বিশ্বের সৌন্দর্যের প্রতীক ও স্থাপত্য শিল্পের অপার বিস্ময় আল- হামরা প্রাসাদ নির্মাণ করেন। সুউচ্চ ও দুর্গম বিভিন্ন পর্বতচূড়া চারদিক থেকে ঘিরে রেখে আল-হামরাকে করে তুলেছিল দুর্ভেদ্য ও সুরক্ষিত। আল-হামরার উত্তর পাশ দিয়ে কলকল রবে বয়ে যেত দোরু নদীর প্রবাহধারা। প্রাসাদের নিরাপত্তা আরও সুরক্ষিত করতে নির্মাণ করা হয়েছিল মর্মর পাথরের সুদীর্ঘ প্রাচীর। নির্ধারিত দূরত্ব পরপর নিরাপত্তা প্রাচীরের ওপর পর্যবেক্ষণ টাওয়ারও স্থাপন করা হয়েছিল।
দ্বিতীয় যে বিষয়টি শত্রুদের আগ্রাসনের সম্মুখে গ্রানাডাকে টিকে থাকতে সাহায্য করেছিল তা হচ্ছে মাগরিবের বনু মারিন সাম্রাজ্যের(৫০) সঙ্গে গ্রানাডার শাসকপরিবারের বন্ধুত্ব। যখনই গ্রানাডার ওপর কোনো আক্রমণ হতো, বনু মারিন গ্রানাডার নিরাপত্তায় সামরিক সাহায্য প্রেরণ করত। বরং বনু মারিনের প্রেরিত একটি বাহিনী গ্রানাডাতেই ঘাঁটি স্থাপন করেছিল। তারা গ্রানাডা-নৃপতির অধীনে থেকে খ্রিষ্টান ক্রুসেডারদের আক্রমণ প্রতিরোধ করত।
৭৬৩ হিজরি সনে (১৩৬২ খ্রিষ্টাব্দে) বনু আহমারের শাসক পঞ্চম মুহাম্মদের শাসনামলে গ্রানাডার বুদ্ধিবৃত্তিক সভ্যতা উন্নতির সর্বোচ্চ চূড়ায় আসীন হয়।
পঞ্চম মুহাম্মাদের মৃত্যুর পর একে একে বেশ কয়েকজন শাসক গ্রানাডা শাসন করেন। কিন্তু তারা তাদের পূর্বসূরিদের ন্যায় শক্তি, প্রস্তুতি ও সতর্কতার অধিকারী ছিলেন না। বরং তারা ভোগবিলাসের জীবনে অভ্যস্ত ছিলেন।
গ্রানাডায় যখন শাসকবৃন্দের বিলাসী জীবন ও মাগরিবের মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের কারণে দুর্বলতা ধেয়ে আসছিল, খ্রিষ্টান স্পেন তখন নবোদ্যমে জেগে উঠে ঐক্যের শক্তি অর্জনে সচেষ্ট ছিল। অ্যারাগোনের শাসক ফার্ডিনান্ড এ সময় ক্যাস্টোলার রানি ইসাবেলাকে বিয়ে করেন এবং গ্রানাডার বিরুদ্ধে উভয় খ্রিষ্টান রাষ্ট্র ঐক্যবদ্ধ শক্তিতে পরিণত হয়।
এ সময় গ্রানাডার শাসক ছিলেন আবুল হাসান আলি ইবনুল আহমার। আবুল হাসান একজন সাহসী বীর যোদ্ধা ছিলেন; তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে দূরদর্শী ছিলেন না। ঐক্যবদ্ধ খ্রিষ্টানশক্তির মোকাবিলায় তিনি প্রতিপক্ষ অগ্রসর হওয়ার পূর্বেই তাদেরকে আক্রমণ করে পরাভূত করার নীতি অবলম্বন করেন। ইতিপূর্বে প্রতি বছর গ্রানাডা খ্রিষ্টান শাসকদের যে জিজিয়া কর প্রদান করত, তিনি তা প্রদানে অস্বীকৃতি জানিয়ে ফার্ডিনান্ডের প্রতিনিধিকে বলে দেন— 'যাও; তোমার প্রভুকে গিয়ে বলো, গ্রানাডার যে-সকল শাসক কর প্রদান করতেন, তারা মৃত্যুবরণ করেছেন। গ্রানাডার টাকশালে এখন তরবারি ছাড়া অন্য কিছু উৎপাদিত হয় না।'
আবুল হাসানের হুমকির পর উভয় পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ে এবং বেশ কয়েকটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এক যুদ্ধে আবুল হাসানের পুত্র আবু আবদুল্লাহ খ্রিষ্টানদের হাতে বন্দি হন। আবু আবদুল্লাহর বন্দিত্ব ছিল গ্রানাডার মুসলিম শাসনের জন্য এক বিরাট আঘাত। ব্যক্তি আবু আবদুল্লাহর বন্দিত্ব গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় ছিল না; গুরুত্বের বিষয় ছিল—দুই খ্রিষ্টান নৃপতি ফার্ডিনান্ড ও ইসাবেলা হুমকি ও প্রতিশ্রুতি এবং ঘুষ ও ঘুষির অস্ত্র প্রয়োগ করে আবু আবদুল্লাহকে বশীভূত করতে এবং তাকে তার পিতা আবুল হাসান ও তার শাসনব্যবস্থার প্রতি বিক্ষুব্ধ করে তুলতে সক্ষম হয়। আবু আবদুল্লাহ যখন ফার্ডিনান্ড ও ইসাবেলার হাতের পুতুলে পরিণত হন, তখন তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। মুক্ত আবদুল্লাহ গ্রানাডায় ফিরেই তার পিতার বিরুদ্ধে তুমুল যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। এর কিছুদিন পরই ভগ্নহৃদয় আবুল হাসান মৃত্যুবরণ করেন।
আবুল হাসানের মৃত্যুর পর গ্রানাডার শাসনভার গ্রহণ করেন তার ভাই আবদুল্লাহ যাগ্ল। তিনি ছিলেন আন্দালুসের ইসলামি সাম্রাজ্যের শেষ মহান শাসক। আবদুল্লাহ যাগ্ল ছিলেন দৃঢ়চেতা এবং খ্রিষ্টান ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে লড়াকু যোদ্ধা। ভ্রাতুষ্পুত্র আবু আবদুল্লাহ যদি ক্ষমতা নিয়ে তার সঙ্গে দ্বন্দ্বে না জড়াতেন এবং তার কর্মপ্রচেষ্টায় বাধা সৃষ্টি না করতেন, তাহলে হয়তো জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি গ্রানাডার শাসনব্যবস্থা ধরে রাখতে পারতেন। প্রকৃত বাস্তবতা হলো, শাসকশ্রেণির পারস্পরিক সংঘাতই গ্রানাডার পতন ত্বরান্বিত করেছিল।
ফার্ডিনান্ড ও ইসাবেলার নেতৃত্বে খ্রিষ্টান যোদ্ধারা একের পর এক এলাকা জয় করে গ্রানাডাকে সংকীর্ণ করে ফেলে। একের পর এক পতন হতে থাকে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন নগরী ও নিরাপত্তা-দুর্গ। ততদিনে বারুদ আবিষ্কৃত হয়েছিল এবং খ্রিষ্টান যোদ্ধারা তা সংগ্রহও করেছিল। সদ্য আবিষ্কৃত কামানের মাধ্যমে গোলা ছুড়ে খ্রিষ্টান যোদ্ধারা বিভিন্ন দুর্গের প্রাচীর ধসিয়ে দিচ্ছিল। ফলে পরিস্থিতি আরও গুরুতর আকার ধারণ করে। তা সত্ত্বেও এ সকল দুর্গের মুসলমানগণ প্রাণপণ লড়াই করে প্রবল প্রতিরোধের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল।
আবদুল্লাহ যাগল ছিলেন দৃঢ়চেতা ও শক্তিশালী একজন শাসক। কিন্তু ভ্রাতুষ্পুত্র আবু আবদুল্লাহ তার বাহিনীকে বলে রেখেছিলেন—তারা যেন তার চাচার বাহিনীকে দুর্গ রক্ষায় সাহায্য করার পরিবর্তে বাধা প্রদান করে। অহংবোধ, ক্ষমতার লিপ্সা, বিদ্বেষ ও অশুভ চিন্তাই আবু আবদুল্লাহকে অন্ধ করে ফেলেছিল।
এভাবে গ্রানাডা রাষ্ট্রের পশ্চিম অংশ খ্রিষ্টানদের দখলে চলে যায়। খ্রিষ্টান বাহিনী অনিন্দ্যসুন্দর বন্দর নগরী মালাগা ও সুরক্ষিত দুর্গ রুনদা দখল করে নেয়। বিস্ময় ও পরিতাপের বিষয় হচ্ছে—খ্রিষ্টান বাহিনী মালাগা বিজয়ের পর আবু আবদুল্লাহ ফার্ডিনান্ড ও ইসাবেলার কাছে অভিনন্দনবার্তা প্রেরণ করেন।
এরপর ক্রুসেডাররা পূর্বদিকে অগ্রসর হয়। আবদুল্লাহ যাগল সর্বোচ্চ চেষ্টা করে তাদেরকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাকদির তখন আন্দালুসে মুসলিম শাসনের চূড়ান্ত পতন ঘোষণা করছিল।
অসহায় আবদুল্লাহ যাগল সাগর পাড়ি দিয়ে আফ্রিকা অঞ্চলে চলে যান। সেখানে ফেজের শাসক তাকে বন্দি করে তার সম্পদ জব্দ করে এবং তার ওপর নির্মম নির্যাতন চালায়। তার দু-চোখ উপড়ে ফেলা হয়। বাকি জীবন তিনি অত্যন্ত দুঃখজনক অবস্থায় দিনাতিপাত করেন।
আবু আবদুল্লাহ তার চাচা আবদুল্লাহ যাগলের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ফার্ডিনান্ডকে প্ররোচিত করেছিলেন। তিনি ফার্ডিনান্ডকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, ফার্ডিনান্ড যখন যাগলকে পরাজিত করে তার নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলো দখল করে নেবেন, তখন আবু আবদুল্লাহ তার অধিকারে থাকা রাজপ্রাসাদ, আল-হামরা প্রশাসনিক অঞ্চলসহ গ্রানাডার বাকি অংশের কর্তৃত্ব ফার্ডিনান্ডের হাতে তুলে দেবেন। যাগলকে পরাজিত করার পর ফার্ডিনান্ড যখন আবু আবদুল্লাহকে তার প্রতিশ্রুতির কথা স্মরণ করিয়ে দেন, তখন আবু আবদুল্লাহ দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েন। তিনি এ সময় আরব বীর যোদ্ধা মুসা বিন আবুল গাসসানের নেতৃত্বে গ্রানাডার একটি প্রতিনিধিদলকে ফার্ডিনান্ডের কাছে এই বার্তাসহ প্রেরণ করেন যে, ফার্ডিনান্ডের যদি তাদের অস্ত্রশস্ত্র অর্জন করার আকাঙ্ক্ষাই থাকে, তাহলে যেন তিনি নিজেই তা নিতে আসেন।
তখন ফসল কাটার সময় ঘনিয়ে এসেছিল। ফার্ডিনান্ড এ সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে পঁচিশ হাজার সৈন্য নিয়ে গ্রানাডায় আক্রমণ করেন এবং আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ দখল করে নেন। এরপর তিনি এতটুকুতেই সন্তুষ্ট থেকে সে বছরের মতো নিজ রাষ্ট্রে ফিরে যান।
৮৯৫ হিজরি সনে ফার্ডিনান্ড আবারও গ্রানাডা আক্রমণ করেন। এতক্ষণে এসে অচেতন আবু আবদুল্লাহর চেতনা ফিরে আসে। কিন্তু ততক্ষণে যে বড় বিলম্ব হয়ে গেছে! আবু আবদুল্লাহ যুদ্ধের পোশাক পরিধান করে খ্রিস্টান বাহিনীর মোকাবিলায় বের হয়ে আসেন। তার সঙ্গে ছিলেন আন্দালুসের শেষ আরব বীর মুসা বিন আবু গাসসান। ততদিনে ফার্ডিনান্ডের সামনে মাথানতকারী গ্রানাডার আরবরা যখন উপলব্ধি করে যে, গ্রানাডার মুসলমানদের দিকে এক কঠিন দুর্যোগ ধেয়ে আসছে আর গ্রানাডার শাসক আবু আবদুল্লাহ তার বাহিনী নিয়ে সেই দুর্যোগের প্রতিরোধে বেরিয়ে পড়েছেন, তখন তারা নিজেদের কাঁধ থেকে ফার্ডিনান্ডের আনুগত্যের জোয়াল নামিয়ে ফেলে এবং মুসলমান ভাইদের সঙ্গে প্রতিরোধযুদ্ধে শরিক হয়। গ্রানাডার বাহিনী প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলে ফার্ডিনান্ডের বাহিনীকে হটিয়ে দিতে সক্ষম হয় এবং বেদখল হওয়া কয়েকটি দুর্গ পুনরুদ্ধার করে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই প্রতিরোধযুদ্ধ ছিল নিভে যাওয়ার পূর্বে প্রদীপের শেষবারের মতো জ্বলে ওঠার ন্যায়। প্রদীপের এই অন্তিম শিখা জ্বলে ওঠার পূর্বাভাস নয়; বরং প্রাণান্তকর চেষ্টায় অন্তিম অস্তিত্বের ঘোষণা।
৮৯৭ হিজরি সনে (১৪৯১ খ্রিষ্টাব্দে) ফার্ডিনান্ড গ্রানাডায় চূড়ান্ত অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি এবার পঞ্চাশ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে গ্রানাডার কেন্দ্রস্থল অবরোধ করেন। এরপর তিনি মাত্র আশি দিনের মধ্যে নগরীর সম্মুখভাগে 'পবিত্র বিশ্বাস' নামে একটি নগরী প্রতিষ্ঠা করেন। দীর্ঘ অবরোধে একসময় গ্রানাডাবাসীর আহারসামগ্রী ফুরিয়ে যায়। সঙ্গিন পরিস্থিতিতে আবু আবদুল্লাহ উপলব্ধি করেন যে, ফার্ডিনান্ডের সঙ্গে সমঝোতা করা ব্যতীত তার সামনে অন্য কোনো পথ খোলা নেই। কিন্তু বীর সেনাপতি মুসা বিন আবু গাসসান শত্রুর কাছে আত্মসমর্পণে অস্বীকৃতি জানান। তিনি অস্ত্রধারণ করে অশ্বে আরোহণ করেন এবং একাই শত্রুবাহিনীর মধ্যে ঢুকে পড়ে তরবারি-বর্শা চালনা করতে থাকেন। মুসা বিন আবু গাসসান লাঞ্ছনার জীবনের পরিবর্তে গৌরবের মৃত্যুকে বেছে নেন এবং শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতে শহিদ হয়ে যান।
টিকাঃ
৪৯. তিনি ইবনুল আহমার নামে খ্যাতি লাভ করলেও প্রকৃতপক্ষে এটি তার নাম নয়; বরং তিনি ও তার পরবর্তী বংশধরগণের মধ্যে যারা গ্রানাডা শাসন করেছেন, তারা এই উপাধি ধারণ করেছিলেন।
৫০. মাগরিব অঞ্চলে মুওয়াহহিদি সাম্রাজ্যের পতনের পর গড়ে উঠেছিল বনু মারিন সাম্রাজ্য (The Marinid Sultanate)। বনু মারিন ছিল যিনানা নামক একটি আমাজিঘ গোত্রের শাখা। যাযাবর জীবনধারায় অভ্যস্ত বনু মারিন হিজরি সপ্তম শতকের শুরুতে মাগরিব ও সাহারা মরুভূমির মধ্যবর্তী দুর্গম মরু অঞ্চলে স্থায়ী আবাস স্থাপন করে। এর কিছুদিন পর তারা মুওয়াহহিদি সাম্রাজ্যের সামরিক দুর্বলতা ও প্রশাসনিক অস্থিরতাকে কাজে লাগিয়ে মাগরিবের বিভিন্ন নগরী ও জনপদে ছড়িয়ে পড়ে। বনু মারিনের ক্রমবর্ধমান শক্তিতে উদ্বিগ্ন হয়ে মুওয়াহহিদি শাসক ২য় ইউসুফ আল-মুসতানসির ৬১৩ হিজরি সনে একটি বাহিনী প্রেরণ করলে বাহিনীটি শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। এরপর থেকে ৬৪২ হিজরি সন পর্যন্ত একটানা কয়েক বছর বনু মারিন ও মুওয়াহহিদি সরকারের মধ্যে সংঘাত ও যুদ্ধ অব্যাহত থাকে। বনু মারিন ৬৪৩ হিজরি সনে মিকনাসা নগরী এবং ৬৪৮ হিজরি সনে ফেজ নগরী দখল করে নেয়। ৬৫৫ হিজরি সনে তারা জয় করে সিজিলমাসা (Sijilmasa) ও দারআ (Draa) নগরী। পরের বছর বনু মারিনের তৎকালীন নেতা আবু ইউসুফ ইয়াকুব বিন আবদুল হক আল-মারিনি 'আল-মানসুর বিল্লাহ' উপাধি ধারণ করে ফেজ নগরীকেন্দ্রিক বনু মারিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন।
৬৬৭ হিজরি সনের শেষদিকে সংঘটিত হয় বনু মারিন ও মুওয়াহহিদি বাহিনীর চূড়ান্ত যুদ্ধ। বনু মারিন রাষ্ট্রের রাজধানী ফেজ ও মুওয়াহহিদি সাম্রাজ্যের রাজধানী মাররাকিশের মধ্যবর্তী গাফু উপত্যকায় উভয় বাহিনী মুখোমুখি হয় এবং বনু মারিন নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে। যুদ্ধে মুওয়াহহিদি শাসক আবু দাবুস ওয়াসিক নিহত হন। ৬৬৮ হিজরি সনের ৯ মুহাররম আবু ইউসুফ ইয়াকুব আল-মানসুর তার বাহিনী নিয়ে মাররাকিশে প্রবেশ করলে মুওয়াহহিদি সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত পতন ঘটে; সূচিত হয় বনু মারিন সাম্রাজ্যের অধ্যায়।