📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 মুরাবিত সাম্রাজ্য পরিচিতি

📄 মুরাবিত সাম্রাজ্য পরিচিতি


হিময়ার গোত্রের প্রতি সম্বন্ধিত বিভিন্ন শাখাগোত্রের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছিল মুরাবিতি সাম্রাজ্য। শাখাগোত্রগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো লামতুনা, গুদালা, লামতা ইত্যাদি। মুরাবিতি শাসক আমিরুল মুসলিমিন ইউসুফ বিন তাশফিন ছিলেন লামতুনা শাখাগোত্রের সদস্য।
এ সকল গোত্রের সদস্যরা মুসা বিন নুসায়রের সঙ্গে মাগরিবে আগমন করেছিল। এরপর সেনাপতি তারিক বিন যিয়াদের সঙ্গে তারা তাঞ্জিয়ারে চলে যায়। কিন্তু পরে তারা সংঘবদ্ধ জীবনের পরিবর্তে বিচ্ছিন্ন জীবনধারাকে বেছে নেয় এবং উচ্চতর মাগরিবের অত্যধিক তাপমাত্রাবিশিষ্ট শুষ্ক ও অনুর্বর মরুভূমি অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে।
যেহেতু এসব গোত্র সাহারা মরুভূমির গভীরতম অঞ্চলে মাগরিবের একেবারে শেষ প্রান্তে বসবাস করত, তাই ‘ইসলাম’ নামক প্রদীপের সামান্য আলোকচ্ছটা তাদের জীবনে এলেও ইসলামের সুমহান শিক্ষা, সুসংহত আমল-পদ্ধতি ও আদর্শ জীবনাচার—কিছুই তারা লাভ করেনি; বরং তারা ডুবে ছিল নিজেদের সুপ্রাচীন অজ্ঞতা ও বেদুইন জীবনধারাতে।
৪৪০ হিজরি সনে গুদালা গোত্রের তৎকালীন সর্দার ইয়াহইয়া বিন ইবরাহিম আল-গুদালি হজের সফরে গমন করেন। হজ সমাপন করে মাগরিবে ফেরার পথে তিনি কায়রোয়ানে উপস্থিত হন এবং সেখানকার বিখ্যাত আলিম আবু ইমরান বিন মুসা বিন ঈসা আল-ফাসির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ফকিহ আবু ইমরানের সাক্ষাৎ লাভ ও তার দরসে বসার পর ইয়াহইয়ার চোখ খুলে যায়। তিনি উপলব্ধি করেন যে, তার জাতি নাম-পরিচয়ে মুসলমান হলেও প্রকৃতপক্ষে জাহিলিয়াত ও মূর্খতার ঘোর অমানিশায় নিমজ্জিত হয়ে আছে। তিনি ফকিহ আবু ইমরানকে অনুরোধ করেন যে, তিনি যেন তার কোনো শিষ্যকে মাগরিবে প্রেরণ করে সেখানকার জনসাধারণকে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা প্রদান করেন।
ফকিহ আবু ইমরান তার ছাত্রদের সামনে বিষয়টি তুলে ধরে মরুভূমির দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞ মানুষদের কাছে দ্বীন পৌঁছানোর জন্য সফরে উদ্বুদ্ধ করলে দূরত্বের কথা চিন্তা করে সকলে তাতে অসম্মতি জানায়। এরপর তিনি ইয়াহইয়াকে আরেক বিখ্যাত আলিম ওয়াজাজ বিন যিলু আল- লামতির কাছে পাঠান। ইয়াহইয়া তার কাছে উপস্থিত হয়ে সবকিছু খুলে বললে ফকিহ ওয়াজাজ ইয়াহইয়ার সঙ্গে পাঠানোর জন্য নির্বাচিত করেন তার বিশিষ্ট ছাত্র আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিনকে।
শায়খ আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিন সুবিশাল মরু অঞ্চল পাড়ি দিয়ে বর্তমান মৌরিতানিয়ার দক্ষিণ অঞ্চলে অবস্থিত প্রচণ্ড উষ্ণ ও অনুর্বর গুদালা গোত্র অধ্যুষিত এলাকায় পৌঁছান। তিনি সেখানকার মুসলমানদের করুণ পরিস্থিতি স্বচক্ষে অবলোকন করে দরদ-ব্যথায় অস্থির হয়ে ওঠেন। ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে তিনি তাদের মাঝে দ্বীনি শিক্ষার প্রচার শুরু করেন। কিন্তু শুরুতেই তিনি গুদালা গোত্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে প্রচণ্ড বাধার সম্মুখীন হন। তারা তাকে বেদম প্রহার ও অপমান করে; এমনকি একপর্যায়ে বসতি থেকে তাড়িয়ে দেয়।
এরপর তিনি সেখান থেকে আরও গহিনে দক্ষিণ দিকে চলে যান এবং একটি দ্বীপে পৌঁছান। ঐতিহাসিকগণের প্রবল ধারণামতে জায়গাটি ছিল টিমবাক্কা (Timbukta) (৪৫) নগরীর কাছে নাইজার নদীর বাঁকে অবস্থিত কোনো এলাকা। আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিন সেখানে একটি সাদামাটা তাঁবু স্থাপন করেন। স্বাভাবিকভাবেই তার বিগত দিনের দাওয়াতি প্রচেষ্টার ফলে গুদালা গোত্রের কিছু ব্যক্তি বিশেষ করে কিছু তরুণের হৃদয় ও স্বভাব-প্রকৃতি দ্বীনের প্রতি স্পন্দিত হয়েছিল। তারা শায়খের এই দূরবর্তী অবস্থানস্থলের সংবাদ পেয়ে তার কাছে ভিড় জমাতে শুরু করে। প্রথমে তাদের সংখ্যা ছিল মাত্র সাতজন। হিজরতকারী দলটির নেতৃত্বে ছিলেন ইয়াহইয়া বিন ইবরাহিম আল-গুদালি; তিনি তার জাতি ও ক্ষমতা ছেড়ে শায়খের দরবারে উপস্থিত হয়েছিলেন।
নতুন এই প্রতিকূল পরিবেশেই শায়খ আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিন ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার সঙ্গে তাদেরকে দ্বীন শিক্ষা দিতে থাকেন। তার অব্যাহত প্রচেষ্টায় মাত্র চার বছরের মাথায় ৪৪০ হিজরি সনে (১০৪৮ খ্রিষ্টাব্দে) তার অনুসারীর সংখ্যা এক হাজারে পৌঁছায়। শায়খ আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিনের অনুসারীদেরকেই মুরাবিতিন বলা হতো।
এরপর ধীরে ধীরে মুরাবিতিদের সংখ্যা ও শক্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং অল্পসময়ের মধ্যেই তারা আধুনিক আলজেরিয়া থেকে সেনেগাল পর্যন্ত আফ্রিকা অঞ্চলের সুবিস্তৃত এলাকাজুড়ে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। মুরাবিতি সম্প্রদায়কে তুলনা করা যেতে পারে আন্দালুস বিজেতা তারিক বিন যিয়াদ ও তার সঙ্গী অভিযাত্রীদের সঙ্গে। তাদের মতোই মুরাবিতি সম্প্রদায় ছিল অনন্যসাধারণ বীরত্ব ও সুদৃঢ় মনোবলের অধিকারী; ভোগবিলাসের কোনো স্থান তাদের জীবনধারায় ছিল না। (৪৬)

টিকাঃ
৪৫. টিমবাক্টা: বর্তমানে আফ্রিকান রাষ্ট্র মালির একটি নগরী।
৪৬. মুরাবিতি সম্প্রদায় ও মুরাবিতি সাম্রাজ্য সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে অধ্যয়ন করুন মাকতাবাতুল হাসান থেকে প্রকাশিত ড. রাগিব সারজানির আন্দালুসের ইতিহাস।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 যাল্লাকার যুদ্ধ (Battle of Zallaqa)

📄 যাল্লাকার যুদ্ধ (Battle of Zallaqa)


৪৬২ হিজরি সনে (১০৬৯ খ্রিষ্টাব্দে) ইউসুফ বিন তাশফিনের হাতে মুরাবিতি সাম্রাজ্যের শাসনক্ষমতা অর্পিত হয়। ইউসুফ বিন তাশফিন ছিলেন ধার্মিক ও খোদাভীরু, প্রত্যয়ী ও প্রভাবশালী এবং অভিজ্ঞ একজন শাসক। তিনি মাগরিব অঞ্চলে তার সাম্রাজ্য বিস্তৃত করেন। অ্যাটলাস পবর্তমালা সংলগ্ন অঞ্চলে তিনি মাররাকিশ (Marrakesh) নগরী প্রতিষ্ঠা করেন। এ অঞ্চলে মাগরিবের সবচেয়ে শক্তিশালী ও অপ্রতিরোধ্য সম্প্রদায় মাছমুদা গোত্র বসবাস করত। মাররাকিশ ছিল মুরাবিতি সাম্রাজ্যের রাজধানী। পরে তিনি সিউটা ও তাঞ্জিয়ার অঞ্চলও অধিকার করেন এবং এর মাধ্যমে মুরাবিতি সাম্রাজ্য আন্দালুসের দক্ষিণ অঞ্চলে নজরদারি করার সক্ষমতা অর্জন করে।
ইউসুফ বিন তাশফিনের নেতৃত্বাধীন মুরাবিতি সাম্রাজ্য ছিল তৎকালীন মাগরিব অঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র। আর তাই আন্দালুসবাসী তার কাছেই সাহায্যপ্রার্থনা করেছিল। ইসলামি ভ্রাতৃত্ববোধ ও জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহর প্রতি সহজাত আকর্ষণের দাবিতে ইউসুফ বিন তাশফিন তাদের ডাকে সাড়া দেন। তিনি আন্দালুসের খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য বাহিনী প্রস্তুত করার পর জাবালে তারিক প্রণালি পাড়ি দিয়ে আন্দালুস উপকূলের জাযিরাতুল খাযরায় অবতরণ করেন এবং জাযিরাতুল খাযরাকেই তার বাহিনীর ঘাঁটি নির্ধারণ করেন।
মুরাবিতি বাহিনীর নৌযানগুলো যখন প্রণালি পাড়ি দিচ্ছিল, তখন পাহাড়ের চূড়ার ন্যায় বিশালাকার ঢেউ নৌযানগুলোর গায়ে আছড়ে পড়ছিল। এ সময় মহান সেনাপতি ইউসুফ বিন তাশফিন তার জাহাজের সম্মুখভাগে এসে সিজদায় লুটিয়ে পড়েন এবং আত্মবিনয়ী হয়ে আল্লাহর দরবারে দোয়া করেন—
হে আল্লাহ, আমার এই সমুদ্র পাড়ি দেওয়াতে যদি আপনি মুসলমানদের কল্যাণ ও উপকার রেখে থাকেন, তাহলে এই সমুদ্র-সফর আমাদের জন্য সহজ করে দিন। আর যদি এতে কল্যাণ না থাকে, তাহলে এ সফর কঠিন করে তুলুন, যেন আমরা সমুদ্র পাড়ি দিতে না পারি।
ইউসুফ বিন তাশফিনের দোয়া শেষ হতেই বিক্ষুব্ধ সমুদ্র শান্ত হয়ে যায় এবং নৌযানগুলো দ্রুতগতিতে চলতে থাকে। আন্দালুসে অবতরণ করার পর তিনি কৃতজ্ঞচিত্তে মহান আল্লাহর দরবারে সিজদা আদায় করেন।
ইউসুফ বিন তাশফিন আন্দালুসে অবতরণ করার পর বিভক্ত রাষ্ট্রসমূহের শাসকবৃন্দ তার সঙ্গে মিলিত হয়। সবাই যে প্রশান্ত মনে তার সঙ্গে যোগ দিয়েছিল, তা কিন্তু নয়। এরপর ইউসুফ বিন তাশফিন তার বাহিনী নিয়ে বিভিন্ন অঞ্চল অতিক্রম করে উত্তরাঞ্চলের বাতালইয়ুস (Badajoz) অঞ্চলের নিকটবর্তী জাল্লাকা নামক এলাকায় পৌঁছেন।
জাল্লাকা প্রান্তরে সংঘটিত যুদ্ধে সেনাপতি ইউসুফ বিন তাশফিনের এমন কিছু বৈশিষ্ট্য ও আচরণ প্রকাশ পেয়েছিল, যা ইসলামের প্রথম যুগের মহান বিজেতা কাফেলার স্মৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করে তোলে।
খ্রিষ্টান অধিপতি ৬ষ্ঠ আলফোন্সো এক বিশাল বাহিনী(৪৭) গঠন করেছিলেন। বাহিনীর বিশালতা ও যুদ্ধসরঞ্জামের প্রাচুর্যে মোহাচ্ছন্ন হয়ে আলফোন্সো চিৎকার করে বলে ওঠেন-'এই সুবিশাল বাহিনী নিয়ে আমি জিন-মানুষ এমনকি আসমানের ফিরেশতাদের বিরুদ্ধেও লড়াই করতে পারব।' কিন্তু মুতামিদ ইবনে আব্বাদের দৃঢ়তা ও অবিচলতা, ইউসুফ বিন তাশফিনের কৌশল ও নিপুণতা এবং মুরাবিতি সৈন্যদের ঈমানি শক্তি ও চেতনার সামনে আলফোন্সোর এই আধিক্যের দাম্ভিকতা কোনো কাজে আসেনি।
বাতালইয়ুসের নিকটবর্তী জাল্লাকা প্রান্তরে উভয় বাহিনী মুখোমুখি হয়। মুতামিদ বিন আব্বাদের নেতৃত্বাধীন অংশ ছিল মুসলিম বাহিনীর সম্মুখ অংশে। ইউসুফ বিন তাশফিন তার বাহিনী নিয়ে কিছুটা দূরে একটি উঁচু পাহাড়ের পাদদেশে লুকিয়ে ছিলেন। যখন উভয়পক্ষের মধ্যে যুদ্ধের দিন নির্দিষ্ট করার জন্য পত্রবিনিময় হয়, তখন আলফোন্সো প্রতারণার আশ্রয় নেন এবং বলেন যে, 'আগামীকাল শুক্রবার আর শুক্রবার মুসলমানদের সাপ্তাহিক আনন্দের দিন। তাই সেদিন আমরা আপনাদের বিরুদ্ধে লড়তে চাই না। তার পরের দিন শনিবার, ইহুদিদের আনন্দের দিন। যেহেতু আমাদের এ অঞ্চলে প্রচুর ইহুদি আছে, তাই আমাদের কর্তব্য তাদের দিকটিও খেয়াল রাখা। আর এর পরদিন হলো রোববার, আমাদের আনন্দের দিন। সুতরাং আসুন, আমরা এসব আনন্দের দিনগুলোর সম্মান বজায় রাখি। সোমবারেই পরস্পরের সাক্ষাৎ হবে।'
৪৭৯ হিজরি সনের ১২ রজব (১০৮৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ অক্টোবর) শুক্রবার ইউসুফ বিন তাশফিন যখন ফজরের উদ্দেশ্যে বের হন, তখনই খ্রিষ্টান বাহিনী প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে মুসলিম বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। অবশ্য আন্দালুসের খ্রিষ্টানদের স্বভাব সম্পর্কে পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকায় মুতামিদ বিন আব্বাদ পূর্বেই এমন কিছু ঘটার আশঙ্কা করেছিলেন। তাই তিনি তখন যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েই ছিলেন। মুতামিদের বাহিনী খ্রিষ্টান বাহিনীর অগ্রবর্তী আক্রমণ প্রতিরোধ করে। এরপর মুরাবিতি সৈন্যগণ নামাজ শেষ করেই খ্রিষ্টানদের ওপর আক্রমণ শুরু করে। উভয় পক্ষের মধ্যে শুরু হয় প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী লড়াই। মুসলিম বাহিনী প্রবল বিক্রমে খ্রিষ্টান সৈন্যদের পরাভূত করতে থাকে। অল্পসময়ের মধ্যে সুবিশাল খ্রিষ্টান বাহিনীর পতন ঘটে। সুবিশাল বাহিনী নিয়ে যুদ্ধ করতে আসা আলফোন্সো মাত্র পাঁচশ সৈন্য নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালাতে সক্ষম হন।
মুসলিম বাহিনী খ্রিষ্টান বাহিনীর প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র ও অন্যান্য সম্পদ লাভ করে। কিন্তু ইউসুফ বিন তাশফিন নির্মোহতা ও আত্মনিবেদনের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে সমস্ত যুদ্ধলব্ধ সম্পদ আন্দালুসবাসীকে প্রদান করেন। ইউসুফ বিন তাশফিনের এই উদার আচরণে আন্দালুসের শাসক-জনগণ নির্বিশেষে সকলের হৃদয়ে তার প্রতি ভক্তি, প্রীতি ও শ্রদ্ধার আসন তৈরি হয়।
আন্দালুসে আগমনের পূর্বে ইউসুফ বিন তাশফিন বিভক্ত রাষ্ট্রসমূহের শাসকদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, তিনি আন্দালুসকে তার সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করবেন না। আর তাই জাল্লাকা প্রান্তরের ঐতিহাসিক যুদ্ধে জয়লাভ করার পর তিনি প্রতিশ্রুতি মোতাবেক আফ্রিকায় ফিরে যান। অবশ্য খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আন্দালুসবাসীকে সহায়তা করার জন্য তিনি তার বাহিনীর তিন হাজার সৈন্যের একটি অংশকে আন্দালুসে রেখে যান।
জাল্লাকার যুদ্ধের পর শত্রুরাষ্ট্রে ইউসুফ বিন তাশফিনের বীরত্বের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। ইউসুফ বিন তাশফিনকে আন্দালুসে আহ্বান করায় খ্রিষ্টানসমাজ মুতামিদ বিন আব্বাদের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ হয় এবং তার রাষ্ট্রে উপর্যুপরি হামলা চালাতে থাকে।
খ্রিষ্টান ক্রুসেডারদের অব্যাহত আক্রমণে কোণঠাসা হয়ে ৪৮১ হিজরি সনে (১০৮৮ খ্রিষ্টাব্দে) সেভিল শাসক মুতামিদ পুনরায় মুরাবিতি শাসক ইউসুফ বিন তাশফিনের কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করেন। ইউসুফ বিন তাশফিন আবারও তাদের আহ্বানে সাড়া দেন। কিন্তু এবার তিনি খ্রিষ্টানদের পাশাপাশি বিভক্ত রাষ্ট্রসমূহের শাসকবৃন্দকেও তার আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু বানান। কারণ, ইউসুফ বিন তাশফিন যখন টলেডোতে আলফোন্সোকে অবরোধ করেন, তখন তারা তাকে সাহায্য করার পরিবর্তে অবাধ্য আচরণ করে এবং গোপনে আলফোন্সোর সঙ্গে যোগাযোগ করে। বাধ্য হয়ে তিনি অবরোধ প্রত্যাহার করে নেন। শাসকবৃন্দের এই বিভক্তি, অবাধ্য আচরণ ও খ্রিষ্টানদের সঙ্গে সখ্য ইউসুফ বিন তাশফিনকে ব্যথিত ও মর্মাহত করে তোলে।
ইউসুফ বিন তাশফিন বিভক্ত রাষ্ট্র-শাসকদের বিলাসিতা, অপচয় ও প্রজাদের ওপর অন্যায় কর আরোপ সম্পর্কে অবগত হন। তিনি তাদেরকে জনসাধারণের ওপর আরোপিত অন্যায় কর প্রত্যাহার করে নিতে বলেন। কিন্তু ইবনে আব্বাদ ব্যতীত অন্যরা তার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে।
পাশাপাশি এসব শাসকবৃন্দ একে অপরের বিরুদ্ধে প্রতারণাসহ বিভিন্ন অভিযোগের কথা শুনিয়ে ইউসুফ বিন তাশফিনের কান ভারী করে তোলে। তার সামনে তাদের সকলের প্রকৃত পরিচয় উন্মোচিত হয়ে যায় এবং আস্থা ও বিশ্বাস নষ্ট হয়ে যায়।
যে ইবনে আব্বাদ ইতিপূর্বে খ্রিষ্টানদের মোকাবিলায় ইউসুফ বিন তাশফিনের কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করেছিলেন, তিনিও ইউসুফ বিন তাশফিনের নিযুক্ত সেনাপতি সায়র বিন আবু বকরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন এবং খ্রিষ্টান শাসক আলফোন্সোর সাহায্য গ্রহণ করেন।
ইউসুফ বিন তাশফিন আন্দালুসকে আপন সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত না করার শপথ করেছিলেন। কিন্তু কিছুদিন পরই আন্দালুসের বিদগ্ধ উলামায়ে কেরাম তাকে উক্ত শপথ হতে মুক্ত ঘোষণা করেন। বরং তারা তাকে বলেন, আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য এসব দুরাচার শাসকদের অনিষ্ট থেকে মুসলমানদের রক্ষা করা আপনার অপরিহার্য কর্তব্য। সমকালীন ইসলামি প্রাচ্যের উলামায়ে কেরামের পক্ষ থেকেও উক্ত ফতোয়ার সমর্থনে ফতোয়া পাঠানো হয়।
ইউসুফ বিন তাশফিন ছিলেন একজন অনন্যসাধারণ নেতা। বেদুইন জীবনে অভ্যস্ত এই মহান নেতার জীবনে বিলাসিতা কখনোই জায়গা করে নিতে পারেনি। আন্দালুস ভূমি ও আন্দালুসের সম্পদের প্রতি তার হৃদয়ে সামান্য মোহও ছিল না। মুসলিম জনগণের প্রতি শাসকদের সীমাহীন নিপীড়ন এবং উলামায়ে কেরামের অব্যাহত ফতোয়ার দাবিতে অবশেষে তিনি একক আন্দালুস রাষ্ট্র গড়ার লক্ষ্যে ৪৮৩ হিজরি সনে (১০৯০ খ্রিষ্টাব্দে) তৃতীয়বারের মতো আন্দালুসে আগমন করেন। গ্রানাডা থেকে তিনি তার অভিযান শুরু করেন এবং ৪৯৫ হিজরি (১১০২ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত ব্যাপ্ত অভিযানের মাধ্যমে বিভক্ত রাষ্ট্রসমূহে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। এর ফলে ইবনে আব্বাদের রাষ্ট্রসহ পুরো আন্দালুস আফ্রিকার মুরাবিতি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়।
ইউসুফ বিন তাশফিন একশ বছর বয়সে ৫০০ হিজরি সনে (১১০৬ খ্রিষ্টাব্দে) মৃত্যুবরণ করেন। এরপর তার পুত্র আলি বিন ইউসুফ মুরাবিতি সাম্রাজ্যের হাল ধরেন এবং ৫৩৭ হিজরি সন (১১৪৩ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত সাম্রাজ্য শাসন করেন। তার মৃত্যুর পর ৫৩৯ হিজরি সন (১১৪৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত তাশফিন বিন আলি বিন ইউসুফ মুরাবিতি সাম্রাজ্যের শাসক ছিলেন।
মুরাবিতি শাসনের মাধ্যমে আন্দালুসে শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরে আসায় জনসাধারণ সীমাহীন আনন্দিত হয়। খ্রিষ্টান ক্রুসেডাররাও নিজেদেরকে গুটিয়ে নেয়। অবশ্য শাসক পর্যায়ের সীমিত কিছু ব্যক্তি নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মুরাবিতি শাসনে সন্তুষ্ট হতে পারেনি। এ ছাড়া সমকালীন আন্দালুসের সংস্কৃতিমনা নাগরিক শ্রেণিও মুরাবিতি শাসনে সন্তুষ্ট ছিল না। তাদের দৃষ্টিতে মুরাবিতিরা ছিল কাব্য ও সাহিত্যচর্চার রস ও সুধার গুরুত্ব অনুধাবনে অক্ষম পশ্চাৎপদ এক জাতি।
কিছুদিনের মধ্যেই মুরাবিতিদের সমূলে শেষ করার জন্য আফ্রিকা অঞ্চলে ধ্বংসাত্মক বিদ্রোহ শুরু হয়। বিদ্রোহের প্রভাবে আন্দালুস ভূমিও আক্রান্ত হয় এবং আন্দালুসে ফিরে আসে পূর্বের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি। আন্দালুস আবারও খণ্ড খণ্ড রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এবার বিভক্ত রাষ্ট্রের সংখ্যা পূর্বের চেয়েও বেশি। যতগুলো নগরী, ততগুলো রাষ্ট্র এবং ততজন রাষ্ট্রনায়ক!

টিকাঃ
৪৭. অধিকাংশ ঐতিহাসিক উৎসগ্রন্থে যদিও খ্রিষ্টান বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি; কিন্তু তাদের সংখ্যা যে বিশাল ছিল, বর্ণনাভঙ্গিতে তা স্পষ্ট করা হয়েছে। অপরদিকে যাদের বর্ণনায় খ্রিষ্টান বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা উল্লেখ আছে, তাদের কারও মতে খ্রিষ্টান বাহিনীর অশ্বারোহী সৈন্য ছিল আশি হাজার এবং পদাতিক সৈন্য ছিল দু-লক্ষ। আবার কারও মতে, খ্রিষ্টান বাহিনীতে বর্ম পরিহিত অশ্বারোহী সৈন্যের সংখ্যাই ছিল আশি হাজার। 'আল-হুলালুল মুওয়াশিয়া' গ্রন্থের লেখক এ বর্ণনা উদ্ধৃত করার পর লিখেছেন, যুদ্ধে খ্রিষ্টান বাহিনীর তিন লক্ষ সৈন্য নিহত হয়েছিল। আবার কারও কারও মতে খ্রিষ্টান বাহিনীর অশ্বারোহী ও বর্মধারী সৈন্যসংখ্যা ছিল পঞ্চাশ হাজার। মতান্তরে অশ্বারোহী ও বর্মধারী সৈন্যসংখ্যা ছিল কমপক্ষে চল্লিশ হাজার এবং তাদের প্রত্যেকের অধীনে প্রচুর সৈন্য ছিল।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 দ্রষ্টব্য : ইউসুফ বিন তাশফিন ইতিহাসের এক অবমূল্যায়িত বীর যোদ্ধা !

📄 দ্রষ্টব্য : ইউসুফ বিন তাশফিন ইতিহাসের এক অবমূল্যায়িত বীর যোদ্ধা !


৫৮৩ হিজরি সনে (১১৮৭ খ্রিষ্টাব্দে) ইসলামি প্রাচ্যে ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে যিনি অমর বিজয়গাথা রচনা করেছিলেন, তিনি হলেন সালাহুদ্দিন আইয়ুবি। অপরদিকে ৪৭৯ হিজরি সনে (১০৮৬ খ্রিষ্টাব্দে) প্রতীচ্যে যিনি ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে গড়ে তুলেছিলেন প্রতিরোধের অনন্য উপাখ্যান, তিনি হলেন ইউসুফ বিন তাশফিন।
কিন্তু ইতিহাস গ্রন্থগুলোতে অধিক চর্চিত হওয়ায় সালাহুদ্দিন আইয়ুবিই অধিক খ্যাতি ও সুখ্যাতি লাভ করেন। বিপরীতে ধ্বংসপ্রায় আন্দালুসকে খ্রিষ্টান আগ্রাসন থেকে রক্ষা করেও ইতিহাস ও ঐতিহাসিকদের কাছে ইউসুফ বিন তাশফিন ততটা সমাদৃত হননি। নিঃসন্দেহে এটি ইতিহাসের এক বিস্ময়কর আচরণ!

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 মুরাবিত শাসকগণের তালিকা

📄 মুরাবিত শাসকগণের তালিকা


০১ ইয়াহইয়া বিন ইবরাহিম : ...-৪৪৫ হি. (... -১০৫৩ খ্রি.) আল-গুদালি
০২ ইয়াহইয়া বিন উমর : ৪৪৫-৪৪৭ হি. (১০৫৩-১০৫৫ খ্রি.) লামতুনি
০৩ আবু বকর বিন উমর : ৪৪৭-৪৬২ হি. (১০৫৫-১০৬৯ খ্রি.) লামতুনি
০৪ ইউসুফ বিন তাশফিন : ৪৬২-৫০০ হি. (১০৬৯-১১০৬ খ্রি.)
০৫ আলি বিন ইউসুফ : ৫০০-৫৩৭ হি. (১১০৬-১১৪৩ খ্রি.)
০৬ ২য় তাশফিন বিন আলি : ৫৩৭-৫৩৯ হি. (১১৪৩-১১৪৫ খ্রি.) বিন ইউসুফ
০৭ ইবরাহিম বিন ২য় তাশফিন : ৫৩৯-৫৩৯ হি. (১১৪৫-১১৪৫ খ্রি.)
০৮ ইসহাক বিন আলি বিন : ৫৩৯-৫৪১ হি. (১১৪৫-১১৪৭ খ্রি.) ইউসুফ

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00