📄 গোত্রভিত্তিক বিভক্ত রাষ্ট্রশাসকদের শাসনকাল
এ স্তরে আন্দালুস ভূমি অঞ্চলকেন্দ্রিক খণ্ড খণ্ড বিভক্ত রাষ্ট্রে পরিণত হয়। একে তাইফা (বিভক্ত) শাসকদের যুগ হিসেবে অভিহিত করা হয়।
উমাইয়া শাসনব্যবস্থার পতন ঘটতেই আন্দালুসের প্রতিটি নগরী ও অঞ্চলের গভর্নর ও প্রশাসকগণ নিজেদের অঞ্চলকে স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণা করে এবং নিজেদেরকে স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বাধীন শাসক দাবি করে। দক্ষিণাঞ্চল চলে যায় বার্বারদের দখলে আর পূর্বাঞ্চল চলে যায় সাকলাবিদের দখলে। অন্যান্য অঞ্চলও বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী পরিবার বা বিগত কয়েক বছর ধরে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনকারী নতুন কোনো পরিবারের কর্তৃত্বে চলে যায়। এ সময় প্রায় বিশটি পরিবার ইসলামি আন্দালুসের বিভিন্ন অঞ্চল শাসন করে। শক্তি ও ক্ষমতা এবং খ্যাতি ও প্রসিদ্ধির বিচারে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
• সেভিল অঞ্চল শাসনকারী বনু আব্বাদ পরিবার। বনু আব্বাদ ছিল আন্দালুসে বসতি স্থাপনকারী লাখমি আরবদের বংশোদ্ভূত।
• গ্রানাডা অঞ্চলে বার্বার বনু যিরি পরিবার। সেভিল ও গ্রানাডা অঞ্চল আন্দালুসের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত।
• টলেডোতে আরেক বার্বার গোত্র বনু যিননুন। টলেডো আন্দালুসের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত। বিভক্ত শাসকপরিবারগুলোর মধ্যে বনু যিননুন অন্যদের চেয়ে শক্তিশালী ছিল।
• মালাগা এবং জাযিরাতুল খাযরা অঞ্চলে ইদরিসিয়া বনু হাম্মদ পরিবার।
• জারাগোজায় বনু হুদ পরিবার। জারাগোজা উত্তর-পূর্ব আন্দালুসে অবস্থিত।
অধিকাংশ শাসকপরিবারই ছিল স্বেচ্ছাচারী ও অত্যাচারী। অবশ্য ব্যতিক্রমী দু-একজন রাষ্ট্রশাসনে সদাচরণও উপহার দিয়েছেন। তবে প্রায় সব শাসকই ছিলেন সংস্কৃতিমনা, জ্ঞান ও সাহিত্যচর্চার প্রতি অনুরাগী। তাদের প্রাসাদগুলো ছিল কবি-সাহিত্যিক ও জ্ঞানী-গুণীদের সমাবেশস্থল। তাইফা শাসকবৃন্দের পৃষ্ঠপোষকতায় এমন অনেক সুবিখ্যাত কবি-সাহিত্যিক ও আলিম-উলামা অতিবাহিত হয়েছেন, আন্দালুস ইতিহাস যাদের নিয়ে গৌরব করে থাকে। শাসকদের মধ্যেও অনেকে আলিম, কবি ও সাহিত্যিক ছিলেন।
তাইফা যুগের শাসকবৃন্দ আপন আপন রাজপ্রাসাদে কবি-সাহিত্যিক ও জ্ঞানীজনদের সমবেত করতে রীতিমত প্রতিযোগিতা করতেন এবং তাদেরকে প্রচুর হাদিয়া প্রদান করতেন। এর ফলে সে যুগে আন্দালুসের বিভিন্ন বিভক্ত রাষ্ট্রের রাজধানীগুলো জ্ঞানবিজ্ঞান ও সাহিত্যের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়। বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে শাসকবৃন্দের তত্ত্বাবধান ও পৃষ্ঠপোষকতায় আন্দালুসের পরিবেশ সাহিত্য ও কাব্যের পরিবেশে পরিণত হয়।
'মুজামুল বুলদান' গ্রন্থকার ইয়াকুত আল-হামাবি (মৃত্যু: ৬২৬ হিজরি) তৎকালীন আন্দালুসের একটি নগরী সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন—
আমি অসংখ্য ব্যক্তিকে বলতে শুনেছি যে, এই নগরীতে তুমি এমন মানুষ কমই পাবে, যে কবিতা বলতে পারে না বা সাহিত্য সম্পর্কে ধারণা রাখে না। এমনকি তুমি যদি কৃষিভূমিতে কাজ করা কোনো কৃষকের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাকে কোনো কবিতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো, সে-ও তোমার চাহিদামতো বিষয়ে তৎক্ষণাৎ কিছু কবিতা শুনিয়ে দেবে। (৪৩)
টিকাঃ
৪৩. আলোচ্য মন্তব্যটি তিনি করেছিলেন তৎকালীন আন্দালুসের পশ্চিমাঞ্চলীয় নগরী শালব সম্পর্কে। বর্তমানে নগরীটি পর্তুগালের অন্তর্ভুক্ত এবং Silves নামে পরিচিত। দেখুন: ইয়াকুত আল-হামাবি, মুজামুল বুলদান, ৩/৩৫৭।