📄 হাকাম আল-মুসতানসির বিল্লাহ বিন আবদুর রহমান আন-নাসির
হাকাম বিন আবদুর রহমানের জন্ম ৩০২ হিজরি সনে (৯১৫ খ্রিষ্টাব্দে) কর্ডোভায়। সাতচল্লিশ বছর বয়সে তিনি তার পিতার স্থলাভিষিক্ত হন। হাকাম নিজে আলিম ও জ্ঞানপিপাসু ছিলেন এবং জ্ঞানী-গুণী ও আলিমসমাজের প্রতি অনুরাগী ছিলেন। জনৈক ঐতিহাসিক তার সম্পর্কে বলেন, 'হাকাম ছিলেন 'বইপোকা'। (৩৬) পার্শ্ববর্তী খ্রিষ্টান রাষ্ট্রগুলোর শাসকশ্রেণি হাকামকে কোমল ও নমনীয় মনে করেছিল। তাই তারা সন্ধিচুক্তিতে উল্লেখিত সীমান্তবর্তী বিভিন্ন দুর্গ সমর্পণে অস্বীকৃতি জানায়। কিন্তু হাকাম তাদেরকে সামান্য সুযোগ না দিয়ে সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন এবং এমন সমুচিত শিক্ষা প্রদান করেন যে, তারা চুক্তি বাস্তবায়নে বাধ্য হয়।
হাকামের শাসনামলে আন্দালুসের বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনের পরিস্থিতি
হাকাম দুর্লভ বিভিন্ন গ্রন্থের হস্তলিখিত মূল কপি সংগ্রহ করার জন্য কয়েকজন কর্মকর্তা নিযুক্ত করেছিলেন। কর্মকর্তাগণ ইসলামি প্রাচ্যের বিভিন্ন ভূখণ্ডে সফর করে বিভিন্ন শাস্ত্র ও সাহিত্যের দুর্লভ রচনাবলি ক্রয় করে নিয়ে আসত। কর্মকর্তাদের প্রতি নির্দেশ ছিল—কোনো গ্রন্থের মূল্য যত অধিকই হোক না কেন, তা সংগ্রহ করতেই হবে। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন ও মাক্কারির হিসাবমতে কর্ডোভায় হাকামের নির্মিত গ্রন্থাগারে প্রায় চার লক্ষ গ্রন্থ ছিল। হাকাম তার সংগ্রহশালার সব গ্রন্থ অধ্যয়ন করতেন এবং তাতে বিভিন্ন টীকা-টিপ্পনী যুক্ত করতেন। তার টীকা ও সংযুক্তিগুলো বোদ্ধামহলের দৃষ্টিতে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও জ্ঞানগর্ভ বিবেচিত ছিল।
গ্রন্থ সংগ্রহের পাশাপাশি হাকাম ইসলামি বিশ্ব থেকে প্রথিতযশা আলিমদেরকেও কর্ডোভায় সমবেত করেন। তার শাসনামলেই কর্ডোভা মসজিদ বিশ্ববিদ্যালয় মানের শিক্ষাঙ্গনে রূপান্তরিত হয়। সেখানে বিভিন্ন শাস্ত্রের বিশেষজ্ঞ আলিমগণ নানা বিষয়ে পাঠদান করতেন।
হাকাম কর্ডোভা ও অন্যান্য নগরীতে প্রচুর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। দরিদ্র শিক্ষার্থীগণ এসব প্রতিষ্ঠানে বিনা খরচে পড়াশোনা করত। এ ছাড়াও অধ্যয়ন ও জ্ঞানার্জন ব্যাপক ও সহজতর করার লক্ষ্যে তিনি আল-হাকাম গ্রন্থাগারের পাশাপাশি কর্ডোভা ও অন্যান্য নগরীতে অনেকগুলো গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করেন।
বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনের প্রতি এই মনোনিবেশের কারণে খলিফা হাকাম আল-মুসতানসির রাষ্ট্রের প্রশাসনিক বিষয়াদির তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব উজির ও সেনাপতিদের হাতে ছেড়ে দিয়েছিলেন। সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিষয়াদি তার হাজিব ও রাজপ্রহরী জাফর মিসহাফি দেখাশোনা করতেন এবং যাবতীয় সমস্যার সমাধান করতেন। একান্ত প্রয়োজন ব্যতীত তিনি খলিফার দ্বারস্থ হতেন না।
একই কারণে হাকাম তার পুত্র হিশামকে খিলাফতের দায়িত্ব পালনের জন্য উপযুক্ত করে গড়ে তোলারও সুযোগ পাননি। অন্তিম শয্যায় তিনি এ বিষয়ে চিন্তিত হন এবং পুত্রের পরিণতি নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। তখন তিনি সাম্রাজ্যের হাজিব, উজির, পদস্থ কর্মকর্তা ও সেনাপতিদের সমবেত করেন এবং সকলের কাছ থেকে তার অবর্তমানে হিশামকে খলিফা পদে অধিষ্ঠিত করা ও নিষ্ঠার সঙ্গে তাকে সহায়তা করার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেন।
তার মৃত্যুর পর হিশাম খলিফা পদে অধিষ্ঠিত হন। কিন্তু ক্ষমতা কার্যত চলে যায় উমাইয়া রাজপরিবারের বাইরে মুহাম্মাদ বিন আবু আমির নামক জনৈক উচ্চাভিলাষী ব্যক্তির হাতে। বলা যায়, হাকামের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে কার্যত আন্দালুসে উমাইয়া শাসনের সমাপ্তি ঘটে। হাকামের পর যারা খলিফা হয়েছিলেন, তারা ছিলেন কর্তৃত্ব ও ক্ষমতাহীন ছায়াশাসক। অবশেষে ৪২২ হিজরি সনে (১০৩১ খ্রিষ্টাব্দে) কাগজে-কলমেও আন্দালুসে উমাইয়া শাসনের পতন ঘটে।
খলিফা হাকাম আল-মুসতানসির চুয়াত্তর বছর বয়সে ৩৬৬ হিজরি সনে (৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে) ইন্তেকাল করেন।
টিকাঃ
৩৬. ইবনুল খতিব রহ. তার সম্পর্কে বলেছেন—তিনি ছিলেন আলিম, ফকিহ, মাজহাবসমূহ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞানী, কুলজিশাস্ত্রের ইমাম, ইতিহাসের হাফেজ, গ্রন্থপ্রেমী ও প্রচুর গ্রন্থ সংগ্রহকারী, যুগ ও প্রজন্ম এবং দেশ ও সময়কালের বিবেচনায় মনীষীদের পার্থক্য নিরূপণশাস্ত্রে সুদক্ষ। এ শাস্ত্রে দক্ষতা অর্জনের জন্য তিনি যথেষ্ট একাগ্রতার সঙ্গে অধ্যয়ন করতেন এবং অনুসন্ধিৎসু থাকতেন। আর তাই এ বিষয়ে তিনি আদর্শ বলে বিবেচিত হতেন এবং এ বিষয়ে তার মন্তব্যকে হুজ্জত ও দলিল বিবেচনা করা হতো। দেখুন: ইবনুল খতিব, আ'মালুল আ'লাম, পৃষ্ঠা: ৪১।