📄 আবদুর রহমান আন-নাসির লি দ্বীনিল্লাহ বিন মুহাম্মাদ বিন আবদুল্লাহ
আবদুর রহমান আন-নাসিরের জন্ম ২৭৭ হিজরি সনে (৮৯১ খ্রিষ্টাব্দে)। তিনি তেইশ বছর বয়সে পিতামহ আবদুল্লাহর স্থলাভিষিক্ত হন। আবদুর রহমানের পিতা (২য়) মুহাম্মাদ আবদুর রহমানের জন্মের বিশ দিন পরই ভাই মুতাররিফের হাতে নিহত হন।
আমির আবদুল্লাহ বিন (১ম) মুহাম্মাদের মৃত্যুর পর সকলে কোনো ধরনের মতানৈক্য ছাড়াই আবদুর রহমানের হাতে বায়আত গ্রহণ করে। অথচ তখন তার কয়েকজন চাচা জীবিত ছিলেন এবং জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে তারা আবদুর রহমানের তুলনায় দায়িত্বলাভের অধিক দাবিদার ছিলেন। তাই তাদের পক্ষ থেকে বিদ্রোহ প্রচেষ্টা বা কমপক্ষে অসন্তোষ প্রকাশ পাওয়া অনুমেয়ই ছিল। কিন্তু তৎকালীন আন্দালুসের দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে সকলে উমাইয়া সাম্রাজ্যের পতনের অপেক্ষা করছিল এবং দায়িত্বের প্রতি নিরাসক্ত হয়ে পড়েছিল। এর ফলে আবদুর রহমান রাষ্ট্রের ভীত মজবুত করার অনুকূল পরিবেশ পেয়ে যান।
বিভক্তি ও পারস্পরিক হানাহানির কারণে আন্দালুসের ব্যবসাবাণিজ্য ও পণ্য পরিবহনব্যবস্থা স্থবির হয়ে পড়েছিল, জনজীবন ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ধ্বংসের উপক্রম হয়েছিল। ঘোরতর সংকটে নিমজ্জিত আন্দালুসবাসী আন্দালুস-ইতিহাসের এই যুগসন্ধিক্ষণে দয়াময় আল্লাহর কুদরতি করুণার প্রত্যাশায় প্রহর গুনছিল। তারা প্রতীক্ষায় ছিল উমাইয়া রাজদিগন্তে এমন কারও উদয় হবে, যিনি আন্দালুসকে এই দুর্যোগ থেকে উদ্ধার করবেন। আর তাই আবদুর রহমান আন-নাসির দায়িত্ব গ্রহণের পর যখন বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে ব্রতী হন, সাধারণ জনগণ তখন তার প্রতিটি সংস্কারমূলক প্রচেষ্টায় একতাবদ্ধ হয়ে তাকে সমর্থন জোগায়।
অভ্যন্তরীণ সমস্যা দূরীকরণে আবদুর রহমানের গৃহীত নীতি ও পদক্ষেপ
আবদুর রহমান ছিলেন কোমলতা ও কঠোরতার সম্মিলনে একজন আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক। দৃঢ়তার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়ার উপযুক্ত সময়ে দৃঢ় ও কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সামর্থ্যের সময় উদারতা ও কোমলতা প্রদর্শন-এই ছিল আবদুর রহমান আন-নাসিরের কর্মপদ্ধতি। দায়িত্ব গ্রহণ করেই তিনি আন্দালুসের অভ্যন্তরে গজিয়ে ওঠা প্রতিটি রাষ্ট্রের শাসক ও প্রশাসকদের কাছে একটি করে বার্তা প্রেরণ করেন। বার্তায় প্রতিশ্রুতি যেমন ছিল, হুমকিও ছিল; আশাবাদ যেমন ছিল, সতর্কবাণীও ছিল। তিনি বার্তায় স্পষ্ট করে দেন যে, আঞ্চলিক শাসকদের যে-ই আন্দালুসের বৈধ শাসকের প্রতি মিত্রতার হাত বাড়িয়ে দেবে, সে-ই আবদুর রহমানের আস্থা ও নৈকট্য লাভ করবে এবং কেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থার অধীনে সর্বোচ্চ সম্পদ ও ক্ষমতা লাভ করবে। অপরদিকে যে বা যারা মিত্রতার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করবে, তার বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সরকার এক বিধ্বংসী লড়াই চালিয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে কাউকে সামান্য ছাড় দেওয়া হবে না এবং কোনোকিছু অক্ষত রাখা হবে না।
আবদুর রহমান বুঝে-শুনেই এই বার্তা প্রেরণ করেছিলেন। তিনি জানতেন-যারা বিভিন্ন অঞ্চলে কর্তৃত্ব বিস্তার করে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্র গড়ে তুলেছে, তাদের অধিকাংশই প্রতাপ-প্রতিপত্তি হারিয়ে ফেলা বিভিন্ন প্রাচীন বংশ ও শাখাগোত্রের অবশিষ্ট অংশ।
আবদুর রহমান আন-নাসির তার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি অভিনব নীতি অবলম্বন করেন। তিনি একসঙ্গে সবগুলো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার পরিবর্তে তার বাহিনী নিয়ে একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র অবরোধ করতেন এবং বিভিন্নভাবে তাদের ওপর চাপ বৃদ্ধি করতেন। এরপর তিনি তাদেরকে নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানাতেন। শাসকপরিবার আত্মসমর্পণ করলে তিনি তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতেন এবং পরাভূত শাসককে তার পরিবার-পরিজন ও অনুচরবৃন্দসহ সসম্মানে কর্ডোভায় নিয়ে আসতেন। এরপর তিনি তাদের যথেষ্ট সমাদর করতেন এবং উমাইয়া রাজপরিবারের নৈকট্য দান করতেন। আবদুর রহমানের এই অভিনব নীতির ফলে দীর্ঘদিন যাবৎ উমাইয়া রাজপরিবারকে যুদ্ধ ও হুমকির মাধ্যমে সন্ত্রস্ত করে রাখা নেতৃবৃন্দ একে একে সকলেই আত্মসমর্পণ করতে থাকে।
তবে একজন বিদ্রোহী নেতাকে দমন করতে গিয়ে আবদুর রহমানকে বেশ বেগ পোহাতে হয়। আর সে হচ্ছে ইবনে হাফছুন। অবশ্য পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইসলাম ত্যাগ করার পর ইবনে হাফছুনের শক্তি ক্রমান্বয়ে দুর্বল হয়ে পড়েছিল এবং তার ক্ষমতা ও প্রভাব কার্যত নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। ৩০৬ হিজরি সনে (৯১৮ খ্রিষ্টাব্দে) ইবনে হাফছুনের মৃত্যু হয়। তার পরে তার সন্তানরা আবদুর রহমানের মোকাবিলায় দৃঢ়ভাবে অগ্রসর হতে পারেনি। ফলে তাদের সুরক্ষিত দুর্গ বাবিস্টারেরও পতন ঘটে।
৩১৩ হিজরি সন শুরু হওয়ার পূর্বেই আবদুর রহমান আন-নাসির একক আন্দালুস রাষ্ট্রের রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হন।
দ্রষ্টব্য-৫২
ইবনে হাফছুনকে নিয়ে ইউরোপীয় ঐতিহাসিকদের মিথ্যাচার
উমর ইবনে হাফছুন মূলত আন্দালুসের সাবেক শাসক পরিবার গোথ (Visigoths) বংশোদ্ভূত ছিল। ইউরোপীয় বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্র তার পরিচয় ও কর্মনীতির বর্ণনা দিতে গিয়ে মাত্রাতিরিক্ত অতিরঞ্জন করেছে। তাদের বিবরণ অনুযায়ী ইবনে হাফছুন ছিল একজন জাতীয় বীর, যে মাতৃভূমির স্বাধীনতা কামনা করত। অথচ প্রকৃত বাস্তবতা হলো ইবনে হাফছুন একজন বর্বর ও হিংস্র ডাকাতের চেয়ে বেশি কিছু ছিল না। এর অন্যতম প্রমাণ হচ্ছে যখন সে ধর্মত্যাগের ঘোষণা করে, তখন নিজের আশেপাশে কাউকেই পায়নি। এমনকি খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী মুসতারিবিনরাও তার পক্ষাবলম্বন করেনি।
বহিস্থ খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের মোকাবিলায় আবদুর রহমান আন-নাসির
তারিক বিন যিয়াদ ও মুসা বিন নুসায়রের নেতৃত্বে আন্দালুস বিজয়াভিযানের সময় আন্দালুসের উত্তর-পশ্চিম অংশে গ্যালিসিয়া অঞ্চলের সাখরাতুল বিলাইয়া বা কোভাডঙ্গা (Covadonga) নামক একটি জনপদ অবিজিত থেকে গিয়েছিল। দুর্গমতা ও প্রচণ্ড শীতলতার কারণে মুসলিম অভিযাত্রীদল এলাকাটি জয় করার জন্য বিশেষ চেষ্টাও করেনি। পরবর্তী সময়ে পরাজিত গোথ বাহিনীর অবশিষ্ট সেনাপতি, সৈন্য ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ সেখানে আশ্রয় গ্রহণ করে। তারা নিজেদের আবাসভূমির বিস্তৃতির জন্য উপযুক্ত সুযোগের প্রতীক্ষায় ছিল। আন্দালুসে যখন গোলযোগ ও বিভেদ-বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে, তখন এই খ্রিষ্টানরা সুযোগের সদ্ব্যবহার করে এবং নিজেদের রাষ্ট্রের পরিধি দোরু (The Douro) নদী পর্যন্ত বিস্তৃত করতে সক্ষম হয়। খ্রিষ্টানরা এ সময় লিওন (Leon) নগরী দখল করে নেয় এবং লিওনকেই নিজেদের রাজধানী নির্বাচন করে। ইতিপূর্বে আবদুল মালিক বিন কাতান ফিহরির শাসনামলে আরবদের কাছে পরাজিত হয়ে বার্বাররা যেসব অঞ্চল ছেড়ে চলে গিয়েছিল, খ্রিষ্টানরা ধীরে ধীরে সেসব অঞ্চলও দখল করে নিজেদের রাষ্ট্রসীমা বিস্তৃত করতে থাকে। দ্য গ্রেট উপাধিধারী ৩য় আলফোন্সো (৩২) (Alfonso III) যখন লিওন রাষ্ট্রের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন খ্রিষ্টানরা সামুরা (Zamora) নগরীও দখল করে নেয় এবং নগরীটিকে সুরক্ষিত দুর্গে পরিণত করে। তখন থেকে পরবর্তী সময়ে মুসলমানদের খ্রিষ্টান ভূমিতে অভিযানের সময় সামুরা নগরী লিওন সাম্রাজ্যের দুর্গ ও প্রতিরোধকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো। মুসলমানরা অনেকবার এ নগরীটিতে অভিযান পরিচালনা করে এবং একাধিকবার নগরীটি ধ্বংস করে দেয়। খ্রিষ্টানরাও বারবার সংস্কার করে সামুরা নগরীকে নিজেদের নিরাপত্তায় ব্যবহার করতে থাকে। এ কারণেই মুসলমানদের কাছে সামুরা নগরীর নাম ছিল 'বিধ্বস্ত সামুরা'।
সারকথা—৩য় আলফোনসোর শাসনামলের শেষদিকে খ্রিষ্টান লিওন রাষ্ট্রের সীমানা দোরু নদী পর্যন্ত পৌঁছে যায়; বরং দোরু নদীর দক্ষিণে অবস্থিত পশ্চিমে প্রলম্বিত অঞ্চল পর্যন্ত লিওন রাষ্ট্র বিস্তৃত হয়।
অপরদিকে আন্দালুসের (উচ্চ সীমান্ত নামে পরিচিত) উত্তর-পূর্ব সীমান্তে বিখ্যাত এভ্রো (The Ebro) নদী ও তার শাখানদীসমূহ এবং পিরেনিজ পর্বতমালার মধ্যবর্তী অঞ্চলে যেসব খ্রিষ্টান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেগুলো মূলত দক্ষিণ দিক (জারাগোজা) থেকে ইসলামি অভিযানের শিকার হওয়ার ভয়ে পাহাড়ি অঞ্চলে গড়ে উঠেছিল। এসব রাষ্ট্রের উত্তর সীমান্ত সংলগ্ন অঞ্চল ছিল খ্রিষ্টান ইউরোপের অংশ। তাই এই রাষ্ট্রগুলো পোপ ও ক্যাথলিক বিশ্বের সঙ্গে সার্বক্ষণিক সম্পর্ক বজায় রাখত। এসব খ্রিষ্টান রাষ্ট্রের রাষ্ট্রবিস্তৃতির কোনো আগ্রহ ছিল না, রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষও ছিল না।
আলোচ্য সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী খ্রিষ্টান রাষ্ট্র ছিল নাফার (Navarre) রাজ্য (৩৩)। নাফারের অধিপতি স্যাঞ্চো তার রাজত্বের সীমানা বৃদ্ধি করতে করতে মুসলমানদের সুরক্ষিত দুই দুর্গ লেইদা (Lleida) ও ওয়েস্কা (Huesca) নগরী পর্যন্ত বিস্তৃত করতে সক্ষম হন।
কাজেই একক আন্দালুস রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা প্রচেষ্টার পাশাপাশি সীমান্ত অঞ্চলের খ্রিষ্টান রাষ্ট্রগুলোর প্রতি দৃষ্টি রাখাও আবদুর রহমানের কর্তব্য ছিল। খ্রিষ্টান রাষ্ট্রগুলো যেন ইসলামি সাম্রাজ্যের জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে না পারে এবং ইসলামি ভূখণ্ডের প্রতি লোলুপ দৃষ্টিতে তাকাতে সাহস না পায় এ উদ্দেশ্যে ৩০৫ হিজরি সনে আবদুর রহমান খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে এক দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন। প্রায় চৌত্রিশ বছর পর ৩৩৯ হিজরি সনে তিনি পরিস্থিতি পুরোপুরি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে সক্ষম হন। কারও সঙ্গে সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে, আবার কারও ক্ষেত্রে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে তিনি তাদেরকে বশীভূত করেন। আর এ সবকিছু তিনি এমন বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে সম্পাদন করেন যে, খ্রিষ্টান শাসকগণ তাকে একজন শত্রু নয় বরং বন্ধুরূপে বিবেচনা করত। এমনকি নিজেদের পারস্পরিক বিরোধ-সংঘাতে তারা আবদুর রহমান আন-নাসিরকে বিচারক ও মীমাংসাকারী মানত। এ প্রসঙ্গে নিম্নোক্ত ঘটনাটি উল্লেখ করা যেতে পারে।
নাফারের শাসক স্যাঞ্চো (Sancho) এ সময় অতি স্থূলতার রোগে আক্রান্ত হন। তিনি তখন আবদুর রহমান আন-নাসিরকে তার চিকিৎসার জন্য কর্ডোভা থেকে একজন চিকিৎসক পাঠাতে অনুরোধ করেন। আবদুর রহমান তখন তার চিকিৎসার জন্য আন্দালুসের অভিজ্ঞ ইহুদি চিকিৎসক হাসদাই বিন শাবরুত (Hasdai ibn Shaprut)-কে নাফারে প্রেরণ করেন। কিছুদিন পর আবদুর রহমানকে কৃতজ্ঞতা জানাতে স্বয়ং স্যাঞ্চোর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল কর্ডোভায় আগমন করে। আবদুর রহমান প্রতিনিধিদলের যথেষ্ট সমাদর করেন এবং স্যাঞ্চোর চিকিৎসার জন্য সাম্রাজ্যের অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের একত্র করেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে উভয়ের মাঝে সন্ধিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং মুসলমানরা আন্দালুস-লিওন সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দুর্গের অধিকার লাভ করে।
অপর দুই খ্রিষ্টান রাষ্ট্র লিওন ও অ্যারাগোন (Aragon)-এর অধিপতিরাও ইসলামি আন্দালুস রাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করতে প্রতিনিধিদল প্রেরণ করে। এভাবে দীর্ঘ কয়েক বছরের ধারাবাহিক প্রচেষ্টা ও পরিশ্রমের পর আবদুর রহমান পুরো আন্দালুস উপদ্বীপে মুসলমানদের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন।
নিজেকে খলিফাতুল মুসলিমিন ঘোষণা
আবদুর রহমানের শাসনামলেই মাগরিবে উবায়দি সাম্রাজ্যের উত্থান ঘটে। উবায়দি শাসকপরিবার নিজেদের রাষ্ট্রকে ইসলামি খিলাফত দাবি করত এবং সমগ্র ইসলামি বিশ্বকে নিজেদের বশীভূত করার স্বপ্ন লালন করত। তারা আন্দালুসের শাসক আবদুর রহমানকেও হুমকি প্রদান করত। যেহেতু মুসলমানদের অন্তরে খলিফা পদের স্বতন্ত্র ধর্মীয় প্রভাব-প্রতিপত্তি রয়েছে, তাই আবদুর রহমান ৩১৬ হিজরি সনের রমজান মাসে (৯২৮ খ্রিষ্টাব্দে) নিজেকে 'খলিফাতুল মুসলিমিন' ঘোষণা করেন। তার এ ঘোষণা ছিল উবায়দি শত্রুর বিরুদ্ধে তাদেরই অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ ঘোষণার নামান্তর।
আবদুর রহমান আন-নাসিরের শাসনামলেই ৩২৫ হিজরি সনে কর্ডোভা থেকে সাত কিলোমিটার দূরে গোয়াডেল কুইভার নদীর উত্তর তীরে আয-যাহরা নগরীর নির্মাণ শুরু হয়। দীর্ঘ চল্লিশ বছর পর আবদুর রহমানের পুত্র হাকামের শাসনামলে নগরীটির নির্মাণকাজ সমাপ্ত হয়। সমকালীন পর্যটক ঐতিহাসিকগণের সাক্ষ্য অনুযায়ী আয-যাহরা নগরী ছিল ভূপৃষ্ঠে মানুষের নির্মিত অন্যতম বিস্ময়কর নিদর্শন।
তার শাসনামলে কর্ডোভা নগরীর আয়তন ব্যাপক সম্প্রসারিত করা হয়। প্রায় পাঁচ লক্ষ নাগরিক অধ্যুষিত কর্ডোভা তখন জনসংখ্যার বিচারে বাগদাদের পর সমকালীন বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জনবহুল শহরে পরিণত হয়।
তার শাসনামলে কৃষিব্যবস্থাতেও যুগান্তকারী উন্নয়ন সাধিত হয়। আন্দালুসে এ সময় ধান, আখ, জলপাই, শণসহ বিভিন্ন প্রজাতির ফল ও ফসলের চাষ হতো। তিনি রেশম পোকার প্রজনন ও প্রতিপালনের জন্য বিশেষ কয়েকটি খামার প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ফসলের ক্ষেতে নিরবচ্ছিন্ন পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সুশৃঙ্খল সেচব্যবস্থা উদ্ভাবন করেন।
আবদুর রহমান আন-নাসির চাষাবাদের জন্য মৌসুমভিত্তিক ক্যালেন্ডারেরও প্রবর্তন করেছিলেন। তিনি বিভিন্ন খনিজ ধাতু যেমন স্বর্ণ, রুপা ও তামা ইত্যাদি আহরণের প্রতিও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। চামড়াজাত শিল্প, জাহাজনির্মাণ শিল্প, চাষাবাদের যন্ত্রপাতি প্রস্তুতকরণ ইত্যাদি ক্ষেত্রেও তিনি বেশ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তার শাসনামলে ওষুধশিল্পও বেশ উন্নতি সাধন করেছিল।
বাহাত্তর বছরের সংগ্রামী জীবন শেষে ৩৫০ হিজরির রমজান মাসে (৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে) আন্দালুস ইতিহাসের এই মহান শাসক ইন্তেকাল করেন।
আল্লামা যাহাবি রহ. তার সম্পর্কে বলেছেন—
তিনি ছিলেন সাহসী, বীর, বিচক্ষণ, উদারমনা ও সুমহান চরিত্রের অধিকারী। আন্দালুসে তার প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠিত হওয়া পর্যন্ত তিনি জবরদখলকারীদের মূলোৎপাটনে সচেষ্ট ছিলেন।
তার শাসনামলে আন্দালুসে যেভাবে আলিম-উলামা ও জ্ঞানী-গুণীদের সমাবেশ ঘটেছিল, তা অন্য কারও আমলে হয়নি। তিনি গুরুত্বপূর্ণ, বিশাল ও ঐতিহাসিক অনেক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। (৩৪)
সাফাদি রহ. তার সম্পর্কে লিখেছেন—
আবদুর রহমান আদ-দাখিলের পর সমরে নিপুণ, সিদ্ধান্তে নিখুঁত এবং বিপদ ও ভয়াবহ পরিস্থিতিতে সদা অগ্রসর তার মতো আর কেউ আসেনি। তিনি লক্ষ্য বাস্তবায়ন করে তবেই ক্ষান্ত হতেন। তিনি যেভাবে সৈন্যবাহিনীকে সুবিন্যস্ত করেছেন, ইতিপূর্বে কেউ তা করে দেখাতে পারেনি। তিনি জ্ঞানীদের সম্মান করতেন, কাজি ও বিচারক নির্বাচনে যথেষ্ট চিন্তাভাবনা করতেন। তিনি অত্যন্ত ব্যয়কুণ্ঠ ছিলেন; কেবল যথাযথ ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রীয় সম্পদ খরচ করতেন। (৩৫)
টিকাঃ
৩২. শাসনকাল ২৫২-২৯৭ হিজরি (৮৬৬-৯১০ খ্রিষ্টাব্দ)।
৩৩. নাফার: নাফার রাষ্ট্রের অবস্থান ছিল আধুনিক মানচিত্রের বাসকিউ অঞ্চলজুড়ে। প্রায় বিশ হাজার বর্গ কিলোমিটার আয়তনের বাসকিউ অঞ্চল (The Basque Country) স্পেন ও ফ্রান্সের সীমান্ত এলাকায় অবস্থিত। অঞ্চলটি দীর্ঘদিন যাবৎ স্পেন ও ফ্রান্স থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশের জন্য আন্দোলন করে আসছে।
৩৪. যাহাবি, তারীখুল ইসলাম, ২৫/২৩৭।
৩৫. সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল ওয়াফাইয়াত, ১৮/১৩৭।
📄 হাকাম আল-মুসতানসির বিল্লাহ বিন আবদুর রহমান আন-নাসির
হাকাম বিন আবদুর রহমানের জন্ম ৩০২ হিজরি সনে (৯১৫ খ্রিষ্টাব্দে) কর্ডোভায়। সাতচল্লিশ বছর বয়সে তিনি তার পিতার স্থলাভিষিক্ত হন। হাকাম নিজে আলিম ও জ্ঞানপিপাসু ছিলেন এবং জ্ঞানী-গুণী ও আলিমসমাজের প্রতি অনুরাগী ছিলেন। জনৈক ঐতিহাসিক তার সম্পর্কে বলেন, 'হাকাম ছিলেন 'বইপোকা'। (৩৬) পার্শ্ববর্তী খ্রিষ্টান রাষ্ট্রগুলোর শাসকশ্রেণি হাকামকে কোমল ও নমনীয় মনে করেছিল। তাই তারা সন্ধিচুক্তিতে উল্লেখিত সীমান্তবর্তী বিভিন্ন দুর্গ সমর্পণে অস্বীকৃতি জানায়। কিন্তু হাকাম তাদেরকে সামান্য সুযোগ না দিয়ে সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন এবং এমন সমুচিত শিক্ষা প্রদান করেন যে, তারা চুক্তি বাস্তবায়নে বাধ্য হয়।
হাকামের শাসনামলে আন্দালুসের বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনের পরিস্থিতি
হাকাম দুর্লভ বিভিন্ন গ্রন্থের হস্তলিখিত মূল কপি সংগ্রহ করার জন্য কয়েকজন কর্মকর্তা নিযুক্ত করেছিলেন। কর্মকর্তাগণ ইসলামি প্রাচ্যের বিভিন্ন ভূখণ্ডে সফর করে বিভিন্ন শাস্ত্র ও সাহিত্যের দুর্লভ রচনাবলি ক্রয় করে নিয়ে আসত। কর্মকর্তাদের প্রতি নির্দেশ ছিল—কোনো গ্রন্থের মূল্য যত অধিকই হোক না কেন, তা সংগ্রহ করতেই হবে। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন ও মাক্কারির হিসাবমতে কর্ডোভায় হাকামের নির্মিত গ্রন্থাগারে প্রায় চার লক্ষ গ্রন্থ ছিল। হাকাম তার সংগ্রহশালার সব গ্রন্থ অধ্যয়ন করতেন এবং তাতে বিভিন্ন টীকা-টিপ্পনী যুক্ত করতেন। তার টীকা ও সংযুক্তিগুলো বোদ্ধামহলের দৃষ্টিতে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও জ্ঞানগর্ভ বিবেচিত ছিল।
গ্রন্থ সংগ্রহের পাশাপাশি হাকাম ইসলামি বিশ্ব থেকে প্রথিতযশা আলিমদেরকেও কর্ডোভায় সমবেত করেন। তার শাসনামলেই কর্ডোভা মসজিদ বিশ্ববিদ্যালয় মানের শিক্ষাঙ্গনে রূপান্তরিত হয়। সেখানে বিভিন্ন শাস্ত্রের বিশেষজ্ঞ আলিমগণ নানা বিষয়ে পাঠদান করতেন।
হাকাম কর্ডোভা ও অন্যান্য নগরীতে প্রচুর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন। দরিদ্র শিক্ষার্থীগণ এসব প্রতিষ্ঠানে বিনা খরচে পড়াশোনা করত। এ ছাড়াও অধ্যয়ন ও জ্ঞানার্জন ব্যাপক ও সহজতর করার লক্ষ্যে তিনি আল-হাকাম গ্রন্থাগারের পাশাপাশি কর্ডোভা ও অন্যান্য নগরীতে অনেকগুলো গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করেন।
বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনের প্রতি এই মনোনিবেশের কারণে খলিফা হাকাম আল-মুসতানসির রাষ্ট্রের প্রশাসনিক বিষয়াদির তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব উজির ও সেনাপতিদের হাতে ছেড়ে দিয়েছিলেন। সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিষয়াদি তার হাজিব ও রাজপ্রহরী জাফর মিসহাফি দেখাশোনা করতেন এবং যাবতীয় সমস্যার সমাধান করতেন। একান্ত প্রয়োজন ব্যতীত তিনি খলিফার দ্বারস্থ হতেন না।
একই কারণে হাকাম তার পুত্র হিশামকে খিলাফতের দায়িত্ব পালনের জন্য উপযুক্ত করে গড়ে তোলারও সুযোগ পাননি। অন্তিম শয্যায় তিনি এ বিষয়ে চিন্তিত হন এবং পুত্রের পরিণতি নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে যান। তখন তিনি সাম্রাজ্যের হাজিব, উজির, পদস্থ কর্মকর্তা ও সেনাপতিদের সমবেত করেন এবং সকলের কাছ থেকে তার অবর্তমানে হিশামকে খলিফা পদে অধিষ্ঠিত করা ও নিষ্ঠার সঙ্গে তাকে সহায়তা করার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেন।
তার মৃত্যুর পর হিশাম খলিফা পদে অধিষ্ঠিত হন। কিন্তু ক্ষমতা কার্যত চলে যায় উমাইয়া রাজপরিবারের বাইরে মুহাম্মাদ বিন আবু আমির নামক জনৈক উচ্চাভিলাষী ব্যক্তির হাতে। বলা যায়, হাকামের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে কার্যত আন্দালুসে উমাইয়া শাসনের সমাপ্তি ঘটে। হাকামের পর যারা খলিফা হয়েছিলেন, তারা ছিলেন কর্তৃত্ব ও ক্ষমতাহীন ছায়াশাসক। অবশেষে ৪২২ হিজরি সনে (১০৩১ খ্রিষ্টাব্দে) কাগজে-কলমেও আন্দালুসে উমাইয়া শাসনের পতন ঘটে।
খলিফা হাকাম আল-মুসতানসির চুয়াত্তর বছর বয়সে ৩৬৬ হিজরি সনে (৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে) ইন্তেকাল করেন।
টিকাঃ
৩৬. ইবনুল খতিব রহ. তার সম্পর্কে বলেছেন—তিনি ছিলেন আলিম, ফকিহ, মাজহাবসমূহ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞানী, কুলজিশাস্ত্রের ইমাম, ইতিহাসের হাফেজ, গ্রন্থপ্রেমী ও প্রচুর গ্রন্থ সংগ্রহকারী, যুগ ও প্রজন্ম এবং দেশ ও সময়কালের বিবেচনায় মনীষীদের পার্থক্য নিরূপণশাস্ত্রে সুদক্ষ। এ শাস্ত্রে দক্ষতা অর্জনের জন্য তিনি যথেষ্ট একাগ্রতার সঙ্গে অধ্যয়ন করতেন এবং অনুসন্ধিৎসু থাকতেন। আর তাই এ বিষয়ে তিনি আদর্শ বলে বিবেচিত হতেন এবং এ বিষয়ে তার মন্তব্যকে হুজ্জত ও দলিল বিবেচনা করা হতো। দেখুন: ইবনুল খতিব, আ'মালুল আ'লাম, পৃষ্ঠা: ৪১।