📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 ক্ষয় ও বিভক্তির কাল বা প্রথম বিভক্তির কাল

📄 ক্ষয় ও বিভক্তির কাল বা প্রথম বিভক্তির কাল


এ আমলেই ইসলামি আন্দালুস ভূখণ্ডের বিরাট অংশ মুসলমানদের হাতছাড়া হয়ে যায় এবং আন্দালুসের ইসলামি রাষ্ট্র প্রথমবারের মতো বিভক্তির শিকার হয়। এ আমলের ব্যাপ্তি আবদুর রহমান আন-নাসিরের দায়িত্ব গ্রহণের আগ পর্যন্ত।
এ আমলে যারা আন্দালুসের শাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, তারা হলেন-
• মুহাম্মাদ বিন আবদুর রহমান আল-আওসাত। জন্ম ২০৭ হিজরি সনে (৮২৩ খ্রিষ্টাব্দে) কর্ডোভায়, মৃত্যু ২৭৩ হিজরি সনে (৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দে) কর্ডোভায়। শাসনকাল ২৩৮ থেকে ২৭৩ হিজরি (৮৫২-৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দ)।
• মুনযির বিন মুহাম্মাদ বিন আবদুর রহমান। জন্ম ২২৯ হিজরি সনে (৮৪৪ খ্রিষ্টাব্দে) কর্ডোভায়, মৃত্যু ২৭৫ হিজরি সনে (৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দে) বাবিস্টারে। শাসনকাল ২৭৩ থেকে ২৭৫ হিজরি (৮৮৬-৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দ)।
• আবদুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ বিন আবদুর রহমান। জন্ম ২২৯ হিজরি সনে (৮৪৪ খ্রিষ্টাব্দে) কর্ডোভায়, মৃত্যু ৩০০ হিজরি সনে (৯১৩ খ্রিষ্টাব্দে) কর্ডোভায়। শাসনকাল ২৭৫ থেকে ৩০০ হিজরি (৮৮৯-৯১৩ খ্রিষ্টাব্দ)।
আন্দালুস ইতিহাসের এই স্তরে প্রচুর বিদ্রোহ সংঘটিত হয় এবং আন্দালুসের আরব জনগোষ্ঠী কয়েকটি বিচ্ছিন্ন স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সেভিল অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত বনু হাজ্জাজ রাষ্ট্র। বনু হাজ্জাজ ছিল ইয়ামেনি লাখমি বংশের শাখা। বনু হাজ্জাজের সর্দার ইবরাহিম বিন হাজ্জাজ আন্দালুসের উমাইয়া শাসকদের ন্যায় প্রভাব-প্রতিপত্তি লাভের আশায় উমাইয়া সাম্রাজ্যের আদলে তার রাষ্ট্র গড়ে তোলেন। উমাইয়া শাসকদের ন্যায় ইবরাহিম বিন হাজ্জাজেরও রাজপ্রাসাদ, রাজপ্রহরী, নিজস্ব বাহিনী ও ভৃত্য-অনুচর ছিল। তিনি নিজ দরবারে জ্ঞানী-গুণী, কবি-সাহিত্যিক ও শাস্ত্রজ্ঞদের দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকতেন। বিশিষ্ট কবি ও ঐতিহাসিক, বিখ্যাত সাহিত্যগ্রন্থ 'আল-ইকদুল ফারিদ'-এর গ্রন্থকার ইবনু আবদি রাব্বিহি তার আমলেই সাহিত্যজগতে আত্মপ্রকাশ করেন।
এ আমলে বার্বাররাও উমাইয়া শাসকের আনুগত্য অস্বীকার করে নিজেদের গোত্রকেন্দ্রিক জীবনধারায় ফিরে যায় এবং আন্দালুসের পশ্চিমাঞ্চল ও পর্তুগালের দক্ষিণাঞ্চল নিয়ে আলাদা রাষ্ট্র গঠন করে। বার্বাররা জাইয়ান নগরীর ন্যায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও কেন্দ্রীয় এলাকাতেও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। বাবার শাসকদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিল যিননুন পরিবার। তাদের নেতৃত্বে ছিল মুসা নামক জনৈক ধূর্ত ও দুষ্ট ব্যক্তি। তার তিন পুত্রও ছিল পিতার সার্থক উত্তরসূরি! যুননুন পরিবার আন্দালুসের প্রতিটি প্রান্তে অগ্নিসংযোগ, লুণ্ঠন ও হত্যাযজ্ঞের মাধ্যমে ব্যাপক ত্রাস সৃষ্টি করেছিল।
অপরদিকে মুওয়াল্লাদিন সম্প্রদায় আন্দালুসের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তে জারফ অঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। তারা আন্দালুসের বেশ কয়েকটি নগরীতে অধিকার প্রতিষ্ঠা করে আলাদা রাষ্ট্র গঠন করে। ইবনে হাফছুন নামক জনৈক মুওয়াল্লাদিন নেতা এ সময় শক্তিশালী বিদ্রোহীরূপে আবির্ভূত হয়। সে রাইয়া অঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে এবং বাবিস্টার পর্বতের এক সুরক্ষিত দুর্গে ঘাঁটি স্থাপন করে। ইবনে হাফছুন গ্রানাডার পাহাড়ি লোকজনকে প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে উদ্বুদ্ধ করে। দিনে দিনে তার প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং সে গ্রানাডার আশেপাশের বিভিন্ন অঞ্চলে তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। ইবনে হাফছুন তার দলবল নিয়ে মানুষের মাঝে লুটতরাজ চালাত এবং ত্রাস ও আতঙ্ক সৃষ্টি করত। একপর্যায়ে পুরো দক্ষিণ আন্দালুসে তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। কোনো প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই সে কর্ডোভার একেবারে কাছাকাছি চলে যায়।
উমাইয়া শাসক আবদুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ বেশ কয়েকবার ইবনে হাফছুনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে বাধা প্রদানের চেষ্টা করলেও তার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
একপর্যায়ে ইবনে হাফছুন নিজের শক্তি বৃদ্ধি করতে মুসতারিবিন সম্প্রদায়কে নিজ দলে টানার সিদ্ধান্ত নেয় এবং তাদেরকে প্রলুব্ধ করতে ইসলাম ত্যাগ করে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করে। কিন্তু এর ফল হয় সম্পূর্ণ বিপরীত। তার সঙ্গে থাকা মুসলমানরা তাকে ত্যাগ করে আর খ্রিষ্টান মুসতারিবিন নাগরিকরাও তার দলে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে ইবনে হাফছুনের ক্ষমতা ও প্রভাব দুর্বল হয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে আবদুর রহমান আন-নাসিরের হাতে তার রাজ্যের পতন ঘটে।
আন্দালুসে বনু উমাইয়ার স্বাধীন শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মাত্র একশ বছর পর ২৩৮ হিজরি থেকে ৩০০ হিজরি পর্যন্ত সময়ে এই ছিল আন্দালুসের হালচিত্র। ইসলামি আন্দালুস খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত হয়ে পড়ে। কয়েকটি এলাকা নিয়েই একেকটি রাষ্ট্র গঠিত হতে থাকে এবং সেই ক্ষুদ্র ও বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্রগুলো নিজেদেরকে সাম্রাজ্য দাবি করতে থাকে। অপরদিকে বনু উমাইয়ার শাসন ও কর্তৃত্ব রাজধানী কর্ডোভা ও তার পার্শ্ববর্তী কিছু এলাকায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।
অবশ্য এই রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিভক্তি সত্ত্বেও সমকালীন আন্দালুসের নাগরিক সভ্যতা তখন উন্নতি ও অগ্রগতির পথে অগ্রসর ছিল।
উমাইয়া শাসক আবদুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ তার ওলিয়ে আহদ ও পরবর্তী শাসক হিসেবে পৌত্র আবদুর রহমানকে মনোনীত করেন। আবদুর রহমান তখন জীবনের তেইশতম বসন্তে পদার্পণকারী টগবগে এক যুবক।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00