📄 আবদুর রহমান বিন হাকাম
আবদুর রহমান বিন হাকামের জন্ম ১৭৬ হিজরি সনে (৭৯২ খ্রিষ্টাব্দে) টলেডোতে। ত্রিশ বছর বয়সে তিনি আন্দালুসের উমাইয়া সাম্রাজ্যের হাল ধরেন। তিনি 'আবদুর রহমান আল-আওসাত' নামে খ্যাত ছিলেন। (২৭) উত্তরাধিকার সূত্রে আবদুর রহমান একটি মজবুত ও শক্তিশালী সাম্রাজ্যের অধিকারী হন। তিনি ভারসাম্যপূর্ণ স্বভাবের অধিকারী ছিলেন। কঠোরতা ও কোমলতার মিশেলে গড়ে ওঠা আবদুর রহমান আল-আওসাত জানতেন—তরবারি চালনার স্থলে কীভাবে তরবারি চালাতে হয় এবং কোমলতার স্থলে কীভাবে কোমলতা প্রদর্শন করতে হয়।
তার শাসনামলেই আন্দালুসে নাগরিক সভ্যতা ও সমৃদ্ধ জীবনযাত্রার বহিঃপ্রকাশ ঘটতে শুরু করে। লোকজন বিলাসবহুল ও দৃষ্টিনন্দন প্রাসাদসম ঘরবাড়ি নির্মাণ করতে থাকে। কর্ডোভা সমগ্র ইউরোপের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন নগরী হওয়ার দিকে যাত্রা শুরু করে। যদিও এ বিবরণ সমাজের একটি বিশেষ শ্রেণির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য ছিল, তবে সাম্রাজ্যের অধিকাংশ লোকই এ সময় তুলনামূলক সমৃদ্ধ জীবনযাপন করত। কারণ, একদিকে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের অর্থব্যবস্থা সমৃদ্ধ হচ্ছিল, অপরদিকে জনগণও ছিল কর্মোদ্যমী। সরকারি করের পরিমাণও ছিল অতি অল্প। প্রশাসনের লোকজনের আচার-আচরণ সম্পর্কে অভিযোগ প্রদানের জন্য ন্যায়প্রতিষ্ঠা বিভাগ নামে স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান ছিল। বিখ্যাত ফকিহ ইয়াহইয়া বিন ইয়াহইয়া আল-লাইছি বিচার-বিভাগের তত্ত্বাবধান করতেন। তার পদমর্যাদা ছিল অনেকটা বর্তমান সময়ের আইন ও বিচারমন্ত্রীর ন্যায়।
আবদুর রহমান আল-আওসাতই প্রথম কর্ডোভায় টাকশাল প্রতিষ্ঠা করেন এবং নিজ নামে মুদ্রা চালু করেন।
নরম্যান জলদস্যুদের হামলা [২৩০ হি.-৮৪৫ খ্রি.]
নরম্যান জলদস্যুরা (২৮) কালো পতাকাবিশিষ্ট তুলনামূলক ছোট নৌযানে চড়ে সাগরপথে বিভিন্ন ভূখণ্ডে যেত। তারা তীরে অবতরণ করে ছোট একটি শিবির স্থাপন করত; এরপর আশেপাশের এলাকায় দ্রুত হামলা চালিয়ে ধনসম্পদ লুণ্ঠন করে শিবিরে গচ্ছিত রাখত। পুরো জনপদে লুণ্ঠন শেষ হলে তারা লব্ধ সম্পদ শিবির থেকে নৌযানে নিয়ে যেত এবং দ্রুত স্থানত্যাগ করে অন্যত্র চলে যেত। নরম্যান জলদস্যুরা শত্রুপক্ষকে ভয় দেখানোর জন্য আগুন ব্যবহার করত। এ কারণে মুসলমানরা তাদেরকে অগ্নিপূজারি মনে করত। ঐতিহাসিক বিভিন্ন নথিপত্রে তাদেরকে অগ্নিপূজারি হিসেবেই উল্লেখ করা হয়েছে।
নরম্যান জলদস্যুরা আন্দালুস ভূমিতে রাহাজানি চালালে আবদুর রহমান আল-আওসাতের বাহিনী দীর্ঘ কয়েক মাস যুদ্ধ করার পর তাদেরকে দমন করতে সক্ষম হয়। এ ঘটনা আবদুর রহমানকে ভাবিয়ে তোলে এবং তিনি উপলব্ধি করেন যে, আন্দালুসের ইসলামি ভূখণ্ডের নিরাপত্তার জন্য একটি শক্তিশালী নৌবহর প্রতিষ্ঠা করা অতি জরুরি। ইতিপূর্বে অপ্রয়োজনীয় মনে করে আন্দালুসে নৌবহর প্রতিষ্ঠার চিন্তা করা হয়নি। আবদুর রহমানের তত্ত্বাবধানে আন্দালুসের প্রথম নৌবহর প্রতিষ্ঠিত হয়। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আন্দালুসের নৌবহর ভূমধ্যসাগরের ওয়েস্টার্ন বেসিনে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। মুসলিম নৌবহর আন্দালুসের পূর্ব উপকূলে অবস্থিত ব্যালেরিক দ্বীপপুঞ্জেও (২৯) পুনঃকর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। আবদুর রহমান আল-আওসাত দুটি নৌবহর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। একটি ভূমধ্যসাগরে টহল দিত, অপরটি আটলান্টিক মহাসাগরে।
আবদুর রহমান আল-আওসাতের শাসনামলে আন্দালুস রাষ্ট্রের প্রভাব-প্রতিপত্তি এমন উচ্চ স্তরে উন্নীত হয়েছিল যে, বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপল থেকেও তার দরবারে উপঢৌকন প্রেরণ করা হতো। (৩০)
তার শাসনামলেই আন্দালুসের পূর্বাঞ্চলে মুরসিয়া (Murcia) এলাকায় নতুন করে মুযারি-ইয়ামেনি সংঘর্ষ শুরু হয়। দীর্ঘ সাত বছর চেষ্টা করার পর আবদুর রহমান এই ফিতনা দমন করতে সক্ষম হন। অবশ্য কিছুদিন পরই আমির আবদুল্লাহর শাসনামলে এই ফিতনা আরও ভয়ংকর রূপ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে।
মুসতারিবিনদের বিদ্রোহ
আন্দালুসের যেসব খ্রিষ্টান নাগরিক মুসলমানদের হাতে আন্দালুস বিজিত হওয়ার পরও আপন ধর্মমতে অটল ছিল এবং জিজিয়া প্রদান করে আন্দালুসে বসবাস করছিল, তাদেরকে মুসতারিবিন বলা হতো। ভাষা, জ্ঞানচর্চা, সভ্যতা-সংস্কৃতি ও জীবনাচারের দিক থেকে তারা আরবদের মতোই ছিল। আন্দালুসে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসতারিবিন জনগোষ্ঠীর বসবাস ছিল। মুসলিম ও মুসতারিবিন জনগণের মাঝে সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত সুন্দর ও সম্প্রীতিপূর্ণ।
এই কারণেই তাদের বিদ্রোহপ্রচেষ্টা ছিল অত্যন্ত বিস্ময়কর ঘটনা। বিশেষ করে আবদুর রহমান আল-আওসাতের শাসনামল ছিল সচ্ছলতাপূর্ণ ও অস্থিরতামুক্ত। জনসাধারণের মাঝে কোনো ধরনের ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাও ছিল না।
জনৈক কট্টরপন্থি খ্রিষ্টান পাদরি আন্দালুসের খ্রিষ্টানসমাজে আরব সভ্যতার প্রতি আকর্ষণ এবং খ্রিষ্টান-মুসলিম শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে অস্থির হয়ে উঠেছিল। সে খ্রিষ্টানসমাজে ধর্মীয় উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা করলে কিছু খ্রিষ্টান নাগরিক তার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বিদ্রোহ করে। আবদুর রহমান প্রজ্ঞার সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেন এবং একান্ত বাধ্য না হলে কঠোরতা অবলম্বন না করার নীতি অবলম্বন করেন। ফলে শান্তিপূর্ণ পন্থায় এই বিদ্রোহের সমাপ্তি ঘটে।
আবদুর রহমান আল-আওসাত ২৩৮ হিজরি সনের রবিউস সানি মাসে (৮৫২ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে) বাষট্টি বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।
ঐতিহাসিক সাফাদি তার সম্পর্কে বলেছেন—
তিনি তার পিতার বিপরীতে জনগণের প্রতি ন্যায়পরায়ণ ছিলেন, ছিলেন উদার ও মহানুভব। যুক্তিবিদ্যাসংক্রান্ত শাস্ত্রসমূহের প্রতি তার বিশেষ অনুরাগ ছিল। আন্দালুসে তিনিই প্রথম তৈরি মুদ্রার প্রচলন করেন। তিনি সেভিলে নগরপ্রাচীর নির্মাণ করেন। তার তত্ত্বাবধানে কর্ডোভা মসজিদের সম্প্রসারণ করা হয়। তাকে খলিফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিকের সঙ্গে তুলনা করা হতো।
আবদুর রহমান আলিমদের ভালোবাসতেন এবং তাদেরকে কাছে রাখতেন। সাধারণত নিজেই নামাজে ইমামতি করতেন। প্রাচীন গ্রন্থাদি তিনিই প্রথম আন্দালুসে আনার ব্যবস্থা করেন এবং আন্দালুসের আলিমসমাজকে এসব গ্রন্থের সঙ্গে পরিচিত করেন। তিনি সুদর্শন ও প্রভাবসম্পন্ন ছিলেন। বেশি বেশি কুরআন তেলাওয়াত করতেন, হাদিস মুখস্থ করতেন। তার শাসনামলকে ‘বরের যুগ’ বলা হতো। তিনি ন্যায়ের বিকাশের মাধ্যমে দেশের মানুষের মন জয় করেছিলেন। জনগণ তার শাসনামল উপভোগ করত এবং তার দীর্ঘায়ু কামনা করত। তিনি ইনসাফের সঙ্গে রাজস্ব সংগ্রহ করতেন। রাষ্ট্রের বিনির্মানে তিনি সবিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। এমনকি তার শাসনামলে দেশের বার্ষিক রাজস্বের পরিমাণ দশ লক্ষ দিনারে পৌঁছেছিল। (৩১)
টিকাঃ
২৭. আন্দালুসের (স্বাধীন প্রশাসন) ইতিহাসে যে তিনজন প্রশাসক আবদুর রহমান নামে গত হয়েছেন, তিনি তাদের মাঝের জন। এ কারণেই তাকে 'আল-আওসাত' বা মধ্যমজন বলা হয়। প্রথমজন ছিলেন আবদুর রহমান আদ-দাখিল আর তৃতীয় জন আবদুর রহমান আন-নাসির, যার আলোচনা সামনে আসবে।
২৮. উত্তর ইউরোপের উপদ্বীপ স্ক্যান্ডিনেভিয়া (Scandinavia) অঞ্চলের অধিবাসীদের নরম্যান (The Normans) বলা হয়। ডেনমার্ক, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড ও সুইডেন মিলে স্ক্যান্ডিনেভিয়া অঞ্চল গঠিত। নরম্যান জাতিগোষ্ঠী অত্যন্ত বর্বর ও অসভ্য জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত ছিল। আশেপাশের অঞ্চলগুলোতে তারা দস্যুবৃত্তি চালাত। ইতিহাসে তারা ভাইকিং (Viking) জলদস্যু নামে পরিচিত। উল্লেখ্য, দস্যুবৃত্তির অর্থ হলো দেশজয় বা এ জাতীয় কোনো উদ্দেশ্য ছাড়া কেবল সম্পদ লুণ্ঠন ও জনপদ ধ্বংসের লক্ষ্যে বিভিন্ন অঞ্চলে হামলা চালানো।
২৯. ব্যালেরিক দ্বীপপুঞ্জ: আন্দালুসের পূর্ব উপকূলে ভূমধ্যসাগরের বুকে বেশ কয়েকটি দ্বীপ আছে, যেগুলোকে ব্যালেরিক দ্বীপপুঞ্জ (Balearic Islands) বলা হয়। এসব দ্বীপের মধ্যে সামরিক কৌশলগত দিক থেকে তিনটি দ্বীপের অবস্থান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; মায়োর্কা (Palma de Mallorca), ম্যানোর্কা (Menorca) ও ইবিজা (Ibiza) দ্বীপ। প্রাচীন আরবি উৎস-গ্রন্থসমূহে এসব দ্বীপকে 'প্রাচ্য দ্বীপপুঞ্জ' বলে অভিহিত করা হয়েছে।
৩০. মাক্কারি, নাফহুত তীব, ১/৩৪৬।
৩১. সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল ওয়াফাইয়াত, ১৮/৮৪।