📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 আবদুর রহমান আদ-দাখিল ও আন্দালুসে উমাইয়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা

📄 আবদুর রহমান আদ-দাখিল ও আন্দালুসে উমাইয়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা


আবদুর রহমান আদ-দাখিলের জন্ম ১১৩ হিজরি সনে (৭৩১ খ্রিষ্টাব্দে) তৎকালীন উমাইয়া খিলাফতের রাজধানী দামেশকে। পঁচিশ বছর বয়সে তিনি আন্দালুসের আমির ও প্রশাসক পদে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আব্বাসিদের পক্ষ থেকে বনু উমাইয়া প্রচণ্ড নিপীড়নের শিকার হলেও আবদুর রহমান আদ-দাখিল ইসলামি বিশ্বের একক খিলাফতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তাই আন্দালুসের দায়িত্ব গ্রহণ করার পর পরবর্তী কিছুদিন তিনি আব্বাসি খলিফার নামেই খুতবা পাঠ করতেন। কিন্তু পরে আব্বাসি খলিফার পক্ষ থেকে তাকে হত্যা করার প্রচেষ্টা চালানো হলে তিনি আব্বাসি খলিফার নামে খুতবাপাঠ বন্ধ করে দেন এবং আব্বাসি সাম্রাজ্য থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। তবে এরপরও তিনি নিজেকে খলিফা দাবি করার পরিবর্তে আমির (প্রশাসক) পরিচয় ধারণ করেই আন্দালুস শাসন করে যান।
অভ্যন্তরীণ সমস্যাসমূহের সমাধান
আন্দালুসে নবাগত আবদুর রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পরই আন্দালুসের ভেতরের-বাইরের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে মনোযোগী হন। যেহেতু আবদুর রহমানের সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ইয়ামেনি আরবদের উল্লেখযোগ্য সহায়তায়, তাই ইয়ামেনিরা মনে করত, আন্দালুস এখন তাদেরই! তারা জনগণের সঙ্গে যথেচ্ছ আচরণ করতে পারবে। ইয়ামেনিরা পূর্বের ন্যায় নিজেদের বিশৃঙ্খল নীতির ওপর চলতে থাকে, জনগণের জানমাল নিয়ে স্বেচ্ছাচারী আচরণ করতে থাকে এবং সাম্প্রদায়িক চেতনা উসকে দিতে থাকে। কিন্তু হঠাৎ করেই তারা উপলব্ধি করে যে, আবদুর রহমান এসব সাম্প্রদায়িক চেতনাকে স্বীকৃতি বা প্রশ্রয় দিচ্ছেন না। তিনি চাচ্ছেন আন্দালুস ভূমিতে দলমতবংশ নির্বিশেষে একটি ঐক্য ও সম্প্রীতিপূর্ণ ইসলামি সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে।
আবদুর রহমানের এই সাম্য নীতি ইয়ামেনিদের বিক্ষুব্ধ করে তোলে। তারা একে নিজেদের অধিকারহরণ বিবেচনা করে আবদুর রহমানের বিরুদ্ধে একের পর এক বিদ্রোহ করতে থাকে। আবদুর রহমান উমাইয়া মাওয়ালিদের সহায়তায় প্রতিটি বিদ্রোহের মোকাবিলা করেন এবং সফলভাবে দমন করেন। বিদ্রোহ দমনে আবদুর রহমানের নীতি ছিল বিদ্রোহীদের সংঘটিত হওয়ার সুযোগ না দিয়ে শুরুতেই তাদেরকে ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া। মূলত এটি ছিল তার পূর্বতন উমাইয়া খলিফাগণেরই গৃহীত নীতি। উমাইয়া খলিফাগণ তাদের প্রতিপক্ষকে হুমকি হয়ে দাঁড়ানোর পূর্বেই সমূলে উৎখাত করতেন।
উল্লেখ্য, শৈশব ও কৈশোরে আবদুর রহমান প্রতিপালিত হয়েছিলেন তার পিতামহ খলিফা হিশাম বিন আবদুল মালিকের রাজগৃহে। হিশামের শাসনামল ছিল উমাইয়া সাম্রাজ্যের সমৃদ্ধি ও উন্নতির যুগ। তার শাসনামলে রাজপ্রাসাদ ছিল সকল কৌশল ও শাস্ত্রের উন্নত শিক্ষাঙ্গন। এই সমৃদ্ধ শিক্ষাঙ্গনেই শিক্ষাগ্রহণ করেছেন আবদুর রহমান আদ-দাখিল।
আবদুর রহমানের বিরুদ্ধে পরিচালিত বিদ্রোহ প্রচেষ্টাসমূহের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল আব্বাসি খলিফা আবু জাফর আল-মানসুরের সমর্থনে পরিচালিত একটি বিদ্রোহ প্রচেষ্টা। ১৪৬ হিজরি সনে (৭৬৩ খ্রিষ্টাব্দে) সংঘটিত এ বিদ্রোহ আলা বিন মুগিস আল-হাযরামির নেতৃত্বে পরিচালিত হয়। এ সময় বিদ্রোহীরা আবদুর রহমানকে প্রায় দু-মাস কারামোনা নগরীতে অবরুদ্ধ করে রাখে। কিন্তু আবদুর রহমান এই বিদ্রোহও সফলতার সঙ্গে দমন করেন। অবরুদ্ধ অবস্থায় আবদুর রহমান ও তার বাহিনীর অবস্থা যখন সঙ্গিন হয়ে পড়েছিল, তখন তিনি তার সৈন্যদের বলেন, 'তোমরা সকলে আবারও ফিরে আসার আশা ছেড়ে দিয়ে আমার সঙ্গে বের হয়ে এসো।' আবদুর রহমানের নির্দেশে সকলে একযোগে বেরিয়ে এসে অবরোধকারীদের ওপর আক্রমণ চালায় এবং তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত করে। আবদুর রহমান আলা বিন মুগিস আল-হাযরামির কর্তিত মস্তক ও আলার নিহত সঙ্গীদের কর্তিত কান খলিফা আল-মানসুরের কাছে পাঠিয়ে দেন। প্রতিটি কানের সঙ্গে যুক্ত কাগজে নিহত ব্যক্তির নাম লেখা ছিল। খলিফা আল-মানসুর তখন হজের সফরে ছিলেন। তার সামনে এগুলো উপস্থিত করা হলে তিনি ক্রোধে অধীর হয়ে যান। পরক্ষণেই তিনি স্বগতোক্তি করেন, 'সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার, যিনি আমাদের ও এই শয়তানের মাঝে সমুদ্রকে অন্তরায় রেখেছেন।' তিনি আবদুর রহমান আদ-দাখিলকে 'কুরাইশি ইগল' নামে অভিহিত করেন এবং পরবর্তী সময়ে আবদুর রহমান এ নামেই প্রসিদ্ধি লাভ করেন। এরপর আব্বাসিরা আর কখনো আন্দালুসের উমাইয়া সাম্রাজ্যে হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করেনি।
বহিস্থ সমস্যাসমূহের সমাধান
রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সংঘটিত বিদ্রোহ প্রচেষ্টাসমূহ দমনের পাশাপাশি আবদুর রহমানকে বাইরের বিভিন্ন সমস্যারও মোকাবিলা করতে হয়। এসব সমস্যার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল খ্রিষ্টান ক্রুসেডারদের আগ্রাসন প্রচেষ্টা।
বার্সেলোনার প্রশাসক সুলায়মান বিন ইয়াক্যান কালবির নেতৃত্বে আবদুর রহমানের প্রতি বিক্ষুব্ধ একদল আরব আবদুর রহমানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এবং ইউরোপিয়ান ক্রুসেড সেনাপতি ফরাসি সম্রাট শার্লেমাইনের (Charlemagne) কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করে। তারা শার্লেমাইনকে বোঝাতে সক্ষম হয় যে, এখন আন্দালুসে অভিযান পরিচালনা করা সহজ হবে এবং আমরা আপনাকে জারাগোজা নগরী দখলে সহায়তা করব। এভাবে তারা নিজেদের প্রতিশোধস্পৃহা চরিতার্থ করার লক্ষ্যে মুসলিম আন্দালুসের ভাগ্যে এক বিরাট দুর্যোগ টেনে আনে।
১৬১ হিজরি সনে (৭৭৮ খ্রিষ্টাব্দে) শার্লেমাইন এক বিশাল বাহিনী নিয়ে আন্দালুস অভিমুখে রওনা হন। তিনি পিরেনিজ পর্বতমালা (Pyrenees Mountains) পাড়ি দিয়ে জারাগোজার দক্ষিণ সীমান্তে আক্রমণ করেন। জারাগোজাবাসী প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুললে শার্লেমাইন জারাগোজা অবরোধ করেন। সংবাদ পাওয়ামাত্র আবদুর রহমান জারাগোজার প্রতিরক্ষায় এগিয়ে আসেন। পরিস্থিতিও তাকে সহায়তা করে। শার্লেমাইনের কাছে নিজ সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির সংবাদ এসে পৌঁছলে তিনি অবরোধ প্রত্যাহার করে বিফল মনোরথে ব্যর্থতার গ্লানি সঙ্গে করে ফ্রান্সে প্রত্যাবর্তনের পথ ধরেন। মহাপ্রজ্ঞাময় আল্লাহ তাআলার কী কৌশল ও মহিমা! শার্লেমাইনের বাহিনী যখন পিরেনিজ পর্বতমালার সংকীর্ণ গিরিপথ অতিক্রম করছিল, তখন পর্বতমালার পাদদেশের বাস্ক অঞ্চলের অধিবাসীরা তাদের পথরোধ করে। কথিত আছে, আবদুর রহমানই তাদেরকে অস্ত্রশস্ত্র ও জনবল দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। বাস্কের অধিবাসীরা শার্লেমাইনের বাহিনীর পশ্চাদ্বর্তী অংশের ওপর কঠিন আক্রমণ করে তাদেরকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। পিরেনিজ উপত্যকায় ফরাসি সেনাবাহিনীর শৌর্য ও গৌরব ধুলোয় মিশে যায়। ফরাসি বাহিনীর এই অংশটির নেতৃত্বে ছিল শার্লেমাইনের অত্যন্ত আস্থাভাজন রোল্যান্ড নামক জনৈক সেনাপতি। আক্রমণে অন্যান্য সৈন্যদের সঙ্গে সেও নিহত হয়েছিল। শার্লেমাইন তার বিয়োগ বেদনায় অত্যন্ত ব্যথিত হন। জনৈক ফরাসি কবি নিহত রোল্যান্ডকে উৎসর্গ করে La Chanson de Roland নামে একটি শোককাব্য রচনা করেন। এ শোককাব্যটিকে ফরাসি সাহিত্যের প্রথম উৎসাহব্যঞ্জক সঙ্গীত হিসেবে গণ্য করা হয় এবং ফরাসি ভাষার গঠন ও বিকাশের ক্ষেত্রে একে একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অবশ্য কাব্যটিতে যথেষ্ট পরিমাণে ইতিহাস বিকৃত করা হয়েছে। এতে বর্ণিত অধিকাংশ ঘটনার সঙ্গেই বাস্তব ইতিহাসের কোনো মিল নেই।
ফরাসি বাহিনী চলে যাওয়ার পর আন্দালুসে স্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি হয়। পুরো রাষ্ট্রে আবদুর রহমান আদ-দাখিলের কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা দৃঢ় ভিত্তি লাভ করে। ১৬৪ হিজরি সনে (৭৮১ খ্রিষ্টাব্দে) তিনি জারাগোজায় গমন করেন এবং শার্লেমাইনকে শান্তিচুক্তির আহ্বান জানান। শার্লেমাইন আহ্বানে সাড়া দিলে উভয়ের মধ্যে শান্তিচুক্তি সম্পন্ন হয়। আবদুর রহমান আদ-দাখিল মাত্র বিশ বছর বয়সে ১৩৮ হিজরি সনে আন্দালুস সাম্রাজ্যের হাল ধরেছিলেন। এরপর দীর্ঘ পঁচিশ বছর তিনি পরম ধৈর্য ও অবিচলতা, উচ্চাভিলাষ ও দৃঢ় সংকল্পের সঙ্গে পরিস্থিতির উন্নয়নে কাজ করে গেছেন। আন্দালুসের দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বে যেমন তিনি বিপৎসংকুল এক জীবন অতিক্রম করেছেন, দায়িত্বগ্রহণের পরও একটানা পঁচিশটি বছর তিনি নানা সমস্যার মোকাবিলা করে গেছেন। অবশেষে ১৬৪ হিজরি সনে এসে পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে তিনি তার ধৈর্য, উচ্চাভিলাষ ও সংকল্পের সুফল ভোগ করতে শুরু করেন।
স্থিতিশীল অধ্যায়ের সূচনা
আবদুর রহমান আদ-দাখিল ১৭০ হিজরি সনে কর্ডোভা মসজিদের নির্মাণ শুরু করেন। সাত বছর পর্যন্ত এর নির্মাণকাজ অব্যাহত থাকে। প্রশাসনিক বিষয়ে তিনি তার পূর্বপুরুষদের নীতি অনুসরণ করেন। তিনি আন্দালুসের নগরীগুলোকে নতুন করে বিন্যস্ত করেন এবং সেনাবাহিনীকে সুবিন্যস্ত করেন। উমাইয়া মাওয়ালিদের নিয়মিত বাহিনী ও পূর্বে বর্ণিত অঞ্চলকেন্দ্রিক সহায়ক বাহিনীর পাশাপাশি তার শাসনামলে সাকলাবিদের(২২) সমন্বয়ে নতুন একটি সামরিক বাহিনী গঠিত হয়।
আবদুর রহমান আদ-দাখিল যদিও একাকী আন্দালুসে পা রেখেছিলেন; কিন্তু সুদক্ষ পরিকল্পনা ও নেতৃত্বগুণের কারণে তার শাসনামলে আন্দালুসে ইসলামি সেনাবাহিনীর সদস্যসংখ্যা এক লক্ষে পৌঁছায়। এই সংখ্যা কেবল অশ্বারোহী সৈনিকদের; পদাতিক সৈন্যদের সংখ্যা এ হিসাবের বাইরে। পরবর্তী সময়ে আন্দালুসে যেসব উমাইয়া প্রশাসক ও খলিফা শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন, তাদের সামরিক শক্তির মূল ভিত্তি ছিল আবদুর রহমান আদ-দাখিলের এই সেনাবাহিনী।
তিনি তরবারি ও মিনজানিকসহ বিভিন্ন অস্ত্র তৈরি করার জন্য বেশ কয়েকটি কারখানা গড়ে তোলেন। টলেডো ও বারডিলের(২৩) সমরাস্ত্র-কারখানাগুলো এ ক্ষেত্রে বিশেষ সুখ্যাতি অর্জন করে।
আবদুর রহমান আদ-দাখিল দেশের বার্ষিক বাজেটের ক্ষেত্রে ত্রিবণ্টন নীতি গ্রহণ করেন। বাজেটের পূর্ণ এক-তৃতীয়াংশ বরাদ্দ থাকত সেনাবাহিনীর জন্য; এক-তৃতীয়াংশ দেশের জনসেবামূলক বিভিন্ন কাজ যেমন রসদসামগ্রী, নির্মাণ, বেতন-ভাতা, সেবামূলক প্রকল্প ইত্যাদির পেছনে ব্যয় করার জন্য; আর বাকি এক-তৃতীয়াংশ অনাকাঙ্ক্ষিত আপৎকালীন পরিস্থিতির জন্য রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা থাকত।
আবদুর রহমান আদ-দাখিল নাগরিক জীবনধারার উন্নয়নেও কাজ করেন। তিনি রাষ্ট্রের বসতিপূর্ণ নগরীগুলোর সৌন্দর্যবর্ধন করেন এবং কর্ডোভার সম্মুখভাগে রুসাফা নামে একটি অভিজাত নগরী প্রতিষ্ঠা করেন। রুসাফা ছিল উদ্ভিদ-উদ্যানবিশিষ্ট মনোরম একটি নগরী। রুসাফার উদ্যানগুলোতে পানি সরবরাহের সুলভ ব্যবস্থা ছিল। উদ্যানটিতে তিনি অন্যান্য গাছের পাশাপাশি শাম থেকে আনা একটি খেজুরচারাও রোপণ করেন। রুসাফায় এই একটিমাত্র খেজুর গাছের উপস্থিতি ও আন্দালুসে খেজুর গাছের বিরলতা আবদুর রহমানের হৃদয়ে বিষণ্ণতা জাগিয়ে তুলত। গাছটির মাঝে তিনি নিজের জীবনকেই খুঁজে পেতেন। তিনি একজন কবিও ছিলেন। এ খেজুরগাছটিকে সম্বোধন করেই তিনি স্বরচিত এই কবিতাটি আবৃত্তি করেন—
تَبَدَّتْ لَنَا وَسْطَ الرُّصَافَةِ نَخْلَهُ * تَنَاءَتْ بِأَرْضِ الْغَرْبِ عَنْ بَلَدِ النَّخْلِ
فَقُلْتُ: شَبِيْهِيْ فِي التَّغَرُّبِ وَالنَّوَى * وَطُولِ التَّنَائِي عَنْ بَنِيَّ وَعَنْ أَهْلِي
نَشَأْتِ بِأَرْضِ أَنْتِ فِيْهَا غَرِيْبَةُ * فَمِثْلُكِ فِي الْإِقْصَاءِ وَالْمُنْتَأَى مِثْلِي
سَقَتْكِ غَوَادِي الْمُزْنِ مِنْ صَوْبِهَا الَّذِي * يَسِحُ وَيَسْتَمْرِي السَّمَاكَيْنِ بِالْوَبْلِ
খেজুর-ভূমি থেকে বহু দূর প্রতীচ্যে রুসাফার ভূমিতে উদ্ভাসিত এক খেজুর-বৃক্ষ,
যেন আমারই প্রতিচ্ছবি, আমার মতোই পরিবারহারা, নিঃসঙ্গ ও শেকড়চ্যুত।
আমার মতোই বহিরাগত তুমি, জন্মভূমি হতে দূরত্ব ও নিঃসঙ্গতার শোকে অচেতন,
যদিও তুমি সিঞ্চিত উষ্ণ প্রস্রবণে, মৎসকুল যেখানে করে সন্তরণ।
আবদুর রহমান আদ-দাখিল ১৭২ হিজরি সনের জুমাদাল উলা মাসে (৭৮৮ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে) উনষাট বছর বয়সে কর্ডোভায় ইন্তেকাল করেন এবং কর্ডোভাতেই সমাহিত হন।
ঐতিহাসিক ইবনে হাইয়ান আন্দালুসি আবদুর রহমান আদ-দাখিলের গুণ-বৈশিষ্ট্য পর্যালোচনা করতে গিয়ে বলেছেন— আবদুর রহমান ছিলেন পরমতসহিষ্ণু, সুপণ্ডিত, প্রদীপ্ত চিন্তাশক্তির অধিকারী, স্থির সংকল্পবিশিষ্ট, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ, ত্বরিত উদ্যোগী ও অবিরাম কর্মতৎপরতার অধিকারী। তিনি আরাম-আয়েশ বা ভোগবিলাসে মত্ত হতেন না, বিলাসিতায় প্রশান্তি খুঁজে পেতেন না এবং দায়দায়িত্ব অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতেন না। তিনি কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিজ মতের ওপর নির্ভর করতেন না। তিনি ছিলেন একাধারে রণাঙ্গনের দুঃসাহসী রণসেনানী, তেজোদীপ্ত, সদা চিন্তানিমগ্ন; বাগ্মী, কবি, উদার-মহানুভব, সুভাষী ও সাবলীল বক্তা। তিনি শুভ্র পোশাক পরিধান করতেন, মাথায় সাদা পাগড়ি বাঁধতেন এবং সাদা পরিচ্ছদ পছন্দ করতেন। বন্ধু-শত্রু নির্বিশেষে সবার অন্তরে তার প্রতি শ্রদ্ধামিশ্রিত প্রভাব-ভীতি বিরাজমান ছিল। প্রজাদের কারও অসুস্থতার সংবাদ পেলে তিনি তাকে দেখতে যেতেন, কেউ ইন্তেকাল করলে তার জানাজায় শরিক হতেন; রাজধানীতে উপস্থিত থাকলে নিজে জুমা ও ঈদের নামাজ পড়াতেন এবং খুতবা দিতেন। (২৪)
ঐতিহাসিকগণ আবদুর রহমান আদ-দাখিল সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন— আবদুর রহমান আদ-দাখিলের আবির্ভাব না হলে আন্দালুস থেকে ইসলামের নামনিশানাই মুছে যেত।

টিকাঃ
২২. সাকলাবি সেসব সৈনিককে বলা হতো, যাদেরকে ইউরোপের বিভিন্ন ক্রীতদাস-বাজার থেকে সংগ্রহ করে আনা হতো এবং সুদক্ষ প্রশিক্ষণ ও সুনিবিড় তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে বিশুদ্ধ ইসলামি সামরিক চিন্তাধারায় গড়ে তোলা হতো। তারা সাম্রাজ্য এবং শাসকদের অনুগত ও একনিষ্ঠ সেবকে পরিণত হতো।
২৩. বর্তমান ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে Garonne নদীর তীরে অবস্থিত একটি নগরী; যার ইংরেজি নাম Bordeaux।
২৪. মাক্কারি, নাফহুত তীব, ৩/৩৭।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 হিশাম বিন আবদুর রহমান

📄 হিশাম বিন আবদুর রহমান


হিশাম বিন আবদুর রহমানের জন্ম ১৩৯ হিজরি সনে (৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে) কর্ডোভায়। তেত্রিশ বছর বয়সে তিনি তার পিতার স্থলাভিষিক্ত হন। আবদুর রহমান তার পুত্রদের মধ্য হতে হিশামকেই তার স্থলাভিষিক্ত নির্বাচিত করেন। পিতার মৃত্যুর সময় তিনি আন্দালুসের উত্তর সীমান্তে মেরিডায় প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করছিলেন। আবদুর রহমান তাকে রাজধানী হতে বহু দূরে বিপজ্জনক সীমান্ত অঞ্চলে পাঠিয়ে জিহাদের ময়দানে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জন এবং সর্বাবস্থায় বিপদ মোকাবিলা করার উপযুক্ত করে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।
হিশাম বিন আবদুর রহমান ধর্মপরায়ণ ও খোদাভীরু ছিলেন। জনগণ তার শাসনে সন্তুষ্ট ছিল এবং শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ জীবনযাপনের নিশ্চয়তা লাভ করেছিল। তিনি বিভিন্ন অঞ্চলে নিযুক্ত প্রশাসকদের প্রতি সার্বক্ষণিক নজর রাখতেন, জবাবদিহি করতেন এবং প্রয়োজনে বরখাস্ত করতেন। তার ভাই সুলায়মান তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল; কিন্তু হিশাম তা সফলভাবে দমন করে আপন ক্ষমতা সুসংহত করেন।
তিনি ফ্রান্স ভূমিতে যুদ্ধাভিযান পরিচালনা করেন। আন্দালুসের মুসলিম জনগোষ্ঠী সোৎসাহে এ অভিযানে শরিক হয়। এক লক্ষ সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে হিশাম ১৭৭ হিজরি সনে (৭৯৩ খ্রিষ্টাব্দে) ফ্রান্সে প্রবেশ করেন এবং কারকাসোনা (Carcassonne) নগরীর দিকে অগ্রসর হন। ফ্রান্স অধিপতি শার্লেমাইন তখন দানিয়ুব নদীর তীরবর্তী অঞ্চলে ব্যস্ত ছিলেন। অবস্থা বেগতিক দেখে কাউন্ট অব টুলুজ (Toulouse) রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রশাসকদের দ্রুত সমবেত হতে আহ্বান করেন। তখন তারা চতুর্দিক থেকে আগমন করে এবং মুসলিম বাহিনীর মুখোমুখি হয়। তুমুল লড়াইয়ের পর মুসলিম বাহিনী বিজয় লাভ করে। ফরাসিরা প্রচুর জনবল ও অস্ত্রসম্পদ হারায়। মুসলিম বাহিনী তাদের পশ্চাদ্ধাবন না করে লব্ধ গনিমত নিয়েই প্রত্যাবর্তন করে।
হিশামের শাসনামলেই আন্দালুসে মালিকি মাজহাবের প্রসার ঘটে। (২৫) ইমাম মালিক রহ.-এর শাগরিদ ইয়াহইয়া বিন ইয়াহইয়া লাইছি আন্দালুসে মালিকি মাজহাবের প্রসারে বড় ভূমিকা রাখেন। হিশামের আমলে আন্দালুসে আলিম ও ফকিহগণের অত্যুচ্চ মর্যাদা ছিল।
হিশাম বিন আবদুর রহমান সাত বছর নয় মাস ব্যাপ্ত শাসনামল শেষে ১৮০ হিজরি সনের সফর মাসে (৭৯৬ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে) চল্লিশ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।

টিকাঃ
২৫. এর পূর্বে আন্দালুসে ইমাম আওযায়ি রহ.-এর মাজহাবের প্রচলন ছিল।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 হাকাম বিন হিশাম বিন আবদুর রহমান আদ-দাখিল

📄 হাকাম বিন হিশাম বিন আবদুর রহমান আদ-দাখিল


হাকাম বিন হিশামের জন্ম ১৫৪ হিজরি সনে (৭৭১ খ্রিষ্টাব্দে) কর্ডোভায়। ছাব্বিশ বছর বয়সে তিনি তার পিতা হিশামের স্থলাভিষিক্ত হন।
তার উপাধি ছিল রাবাযি। রাজধানী কর্ডোভার পার্শ্ববর্তী রাবায নামক একটি শহরতলির অধিবাসীদের প্রতি অমানবিক আচরণ করায় তাকে এ উপাধি দেওয়া হয়।
হাকাম বিলাসী জীবনযাপন করতেন এবং খেল-তামাশা ও শিকারের নেশায় ডুবে থাকতেন। তিনি অহংকারী ও দুষ্ট প্রকৃতির কিছু অনুচর দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিলেন। এ ছাড়াও তার ছিল প্রজাদের প্রতি কঠোর এবং বর্বর আচরণকারী বিশেষ একটি বাহিনী, যার অধিকাংশই ছিল সাকলাবি শ্রেণির। হাকাম ক্ষমতা গ্রহণের কয়েক মাস পরই রাজপরিবারের লোকজন এবং রাষ্ট্রের প্রবীণ ব্যক্তিবর্গ অপরিণত এবং অপরিপক্ব হাকামের বিরুদ্ধাচরণ শুরু করে। কয়েকজন ফকিহ-আলিমও তাদেরকে সমর্থন করেন। ফলে জনগণও তার বিরুদ্ধে চলে যায়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে হাকামের কঠোর আচরণ
তার শাসনামলের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ও প্রসিদ্ধ ঘটনা হচ্ছে রাবায- ট্রাজেডি। ২০২ হিজরি সনের ১৩ রমজান (৮১৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৫ মার্চ) কর্ডোভার দক্ষিণ শহরতলি শাকুন্দা হতে সাধারণ জনগোষ্ঠী ও আলিমদের সমন্বয়ে একটি দল রাজধানীর উদ্দেশে রওনা হয়। তাদের সঙ্গে আন্দালুসের বিখ্যাত ফকিহ ইয়াহইয়া বিন ইয়াহইয়া লাইছিও ছিলেন। আন্দোলনকারীরা রাষ্ট্রে ন্যায়প্রতিষ্ঠার দাবিতে সমবেত হয়েছিল; ক্ষমতার প্রতি তাদের কোনো দৃষ্টি ছিল না।
কিন্তু হাকাম তাদের সঙ্গে অত্যন্ত কঠোর ও নিকৃষ্ট আচরণ করেন। হাকামের নির্দেশে তার বাহিনীর সৈন্যরা আন্দোলনকারীদের বাড়িঘরে আগুন লাগিয়ে দেয় এবং তাদের স্ত্রী-সন্তানদের নির্বিচারে হত্যা করতে থাকে। আন্দোলনকারীরা তাদের পরিবারকে রক্ষা করার জন্য ফিরে এলে সৈন্যরা তাদেরকেও হত্যা করে। এভাবে কঠোর ও নৃশংস নীতি প্রয়োগের মাধ্যমে হাকাম আন্দোলনকারীদের দমন করেন।
এরপর হাকাম আন্দালুসের দক্ষিণাঞ্চলীয় গ্রামীণ জনপদগুলোর জনসাধারণকে আন্দালুস থেকে বিতাড়িত করার নির্দেশ দেন। এসব এলাকার অধিবাসীরা ছিল আন্দালুসের সম্ভ্রান্ত ও অভিজাত শ্রেণির জনগণ। বিতাড়িত জনগণের একটি অংশ আন্দালুস ছেড়ে মাগরিবের ফেজ নগরীতে আশ্রয় নেয়। মাগরিবে তখন প্রথম ইদরিস ইদরিসিয়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সূচনা স্তরে ছিলেন। তিনি তাদেরকে স্বাগত জানিয়ে ফেজের একটি এলাকা তাদের জন্য ছেড়ে দেন। বর্তমানেও এলাকাটি আন্দালুসিয়া নামে পরিচিত। নবগঠিত ইদরিসিয়া রাষ্ট্র এসব লোকের অভিজ্ঞতা ও কর্মদক্ষতা দ্বারা যথেষ্ট উপকৃত হয়। বিতাড়িত জনগণের আরেকটি অংশ পূর্ব দিকে চলে যায় এবং দীর্ঘ জলাভূমি ও স্থলভূমি পাড়ি দিয়ে আলেকজান্দ্রিয়ায় আবাস গ্রহণ করে। পরে তারা সেখান থেকেও বিতাড়িত হয়ে ক্রিট দ্বীপে (২৬) পৌঁছায়। দ্বীপটি তখন বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল। আন্দালুসের বিতাড়িত জনগোষ্ঠী সেখানে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে ২১২ হিজরি সনে (৭২৮ খ্রিষ্টাব্দে) 'কালবিয়া' নামক একটি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। শতাব্দীকাল পর বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য পুনরায় দ্বীপটি দখল করে নেয়।
শাসনামলের শুরুর দিকে হাকাম বিজয়াভিযানের তৎপরতা অব্যাহত রাখলেও পরে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে এসব গোলযোগ ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে স্বাভাবিকভাবেই আন্দালুসের প্রকৃত শত্রু ক্রুসেডার শার্লেমাইনের মোকাবিলার বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দিতে পারেননি। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে শার্লেমাইন ১৯০ হিজরি সনে বার্সেলোনা দখল করে নেন এবং সেখানে খ্রিষ্টান সীমান্ত নগরী প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে এই বার্সেলোনা অঞ্চল ইসলামি আন্দালুসের সীমান্তঘেঁষা এক শক্তিশালী খ্রিষ্টান রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
রাবায ট্রাজেডির পরই হাকাম বিন হিশাম অসুস্থ হয়ে পড়েন। দিনে দিনে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। এ সময় তিনি রাবাযবাসীর সঙ্গে কৃত গর্হিত আচরণের জন্য অনুতপ্ত হয়ে পড়েন। এর কিছুদিন পরই তিনি ইন্তেকাল করেন।
হাকাম বিন হিশাম ২০৬ হিজরি সনের জিলহজ মাসে (৮২২ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে) বায়ান্ন বছর বয়সে মারা যান।

টিকাঃ
২৬. ক্রিট: ক্রিট (Crete) গ্রিসের সর্ববৃহৎ দ্বীপ।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 আবদুর রহমান বিন হাকাম

📄 আবদুর রহমান বিন হাকাম


আবদুর রহমান বিন হাকামের জন্ম ১৭৬ হিজরি সনে (৭৯২ খ্রিষ্টাব্দে) টলেডোতে। ত্রিশ বছর বয়সে তিনি আন্দালুসের উমাইয়া সাম্রাজ্যের হাল ধরেন। তিনি 'আবদুর রহমান আল-আওসাত' নামে খ্যাত ছিলেন। (২৭) উত্তরাধিকার সূত্রে আবদুর রহমান একটি মজবুত ও শক্তিশালী সাম্রাজ্যের অধিকারী হন। তিনি ভারসাম্যপূর্ণ স্বভাবের অধিকারী ছিলেন। কঠোরতা ও কোমলতার মিশেলে গড়ে ওঠা আবদুর রহমান আল-আওসাত জানতেন—তরবারি চালনার স্থলে কীভাবে তরবারি চালাতে হয় এবং কোমলতার স্থলে কীভাবে কোমলতা প্রদর্শন করতে হয়।
তার শাসনামলেই আন্দালুসে নাগরিক সভ্যতা ও সমৃদ্ধ জীবনযাত্রার বহিঃপ্রকাশ ঘটতে শুরু করে। লোকজন বিলাসবহুল ও দৃষ্টিনন্দন প্রাসাদসম ঘরবাড়ি নির্মাণ করতে থাকে। কর্ডোভা সমগ্র ইউরোপের সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন নগরী হওয়ার দিকে যাত্রা শুরু করে। যদিও এ বিবরণ সমাজের একটি বিশেষ শ্রেণির ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য ছিল, তবে সাম্রাজ্যের অধিকাংশ লোকই এ সময় তুলনামূলক সমৃদ্ধ জীবনযাপন করত। কারণ, একদিকে রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের অর্থব্যবস্থা সমৃদ্ধ হচ্ছিল, অপরদিকে জনগণও ছিল কর্মোদ্যমী। সরকারি করের পরিমাণও ছিল অতি অল্প। প্রশাসনের লোকজনের আচার-আচরণ সম্পর্কে অভিযোগ প্রদানের জন্য ন্যায়প্রতিষ্ঠা বিভাগ নামে স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান ছিল। বিখ্যাত ফকিহ ইয়াহইয়া বিন ইয়াহইয়া আল-লাইছি বিচার-বিভাগের তত্ত্বাবধান করতেন। তার পদমর্যাদা ছিল অনেকটা বর্তমান সময়ের আইন ও বিচারমন্ত্রীর ন্যায়।
আবদুর রহমান আল-আওসাতই প্রথম কর্ডোভায় টাকশাল প্রতিষ্ঠা করেন এবং নিজ নামে মুদ্রা চালু করেন।
নরম্যান জলদস্যুদের হামলা [২৩০ হি.-৮৪৫ খ্রি.]
নরম্যান জলদস্যুরা (২৮) কালো পতাকাবিশিষ্ট তুলনামূলক ছোট নৌযানে চড়ে সাগরপথে বিভিন্ন ভূখণ্ডে যেত। তারা তীরে অবতরণ করে ছোট একটি শিবির স্থাপন করত; এরপর আশেপাশের এলাকায় দ্রুত হামলা চালিয়ে ধনসম্পদ লুণ্ঠন করে শিবিরে গচ্ছিত রাখত। পুরো জনপদে লুণ্ঠন শেষ হলে তারা লব্ধ সম্পদ শিবির থেকে নৌযানে নিয়ে যেত এবং দ্রুত স্থানত্যাগ করে অন্যত্র চলে যেত। নরম্যান জলদস্যুরা শত্রুপক্ষকে ভয় দেখানোর জন্য আগুন ব্যবহার করত। এ কারণে মুসলমানরা তাদেরকে অগ্নিপূজারি মনে করত। ঐতিহাসিক বিভিন্ন নথিপত্রে তাদেরকে অগ্নিপূজারি হিসেবেই উল্লেখ করা হয়েছে।
নরম্যান জলদস্যুরা আন্দালুস ভূমিতে রাহাজানি চালালে আবদুর রহমান আল-আওসাতের বাহিনী দীর্ঘ কয়েক মাস যুদ্ধ করার পর তাদেরকে দমন করতে সক্ষম হয়। এ ঘটনা আবদুর রহমানকে ভাবিয়ে তোলে এবং তিনি উপলব্ধি করেন যে, আন্দালুসের ইসলামি ভূখণ্ডের নিরাপত্তার জন্য একটি শক্তিশালী নৌবহর প্রতিষ্ঠা করা অতি জরুরি। ইতিপূর্বে অপ্রয়োজনীয় মনে করে আন্দালুসে নৌবহর প্রতিষ্ঠার চিন্তা করা হয়নি। আবদুর রহমানের তত্ত্বাবধানে আন্দালুসের প্রথম নৌবহর প্রতিষ্ঠিত হয়। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আন্দালুসের নৌবহর ভূমধ্যসাগরের ওয়েস্টার্ন বেসিনে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। মুসলিম নৌবহর আন্দালুসের পূর্ব উপকূলে অবস্থিত ব্যালেরিক দ্বীপপুঞ্জেও (২৯) পুনঃকর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। আবদুর রহমান আল-আওসাত দুটি নৌবহর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। একটি ভূমধ্যসাগরে টহল দিত, অপরটি আটলান্টিক মহাসাগরে।
আবদুর রহমান আল-আওসাতের শাসনামলে আন্দালুস রাষ্ট্রের প্রভাব-প্রতিপত্তি এমন উচ্চ স্তরে উন্নীত হয়েছিল যে, বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপল থেকেও তার দরবারে উপঢৌকন প্রেরণ করা হতো। (৩০)
তার শাসনামলেই আন্দালুসের পূর্বাঞ্চলে মুরসিয়া (Murcia) এলাকায় নতুন করে মুযারি-ইয়ামেনি সংঘর্ষ শুরু হয়। দীর্ঘ সাত বছর চেষ্টা করার পর আবদুর রহমান এই ফিতনা দমন করতে সক্ষম হন। অবশ্য কিছুদিন পরই আমির আবদুল্লাহর শাসনামলে এই ফিতনা আরও ভয়ংকর রূপ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে।
মুসতারিবিনদের বিদ্রোহ
আন্দালুসের যেসব খ্রিষ্টান নাগরিক মুসলমানদের হাতে আন্দালুস বিজিত হওয়ার পরও আপন ধর্মমতে অটল ছিল এবং জিজিয়া প্রদান করে আন্দালুসে বসবাস করছিল, তাদেরকে মুসতারিবিন বলা হতো। ভাষা, জ্ঞানচর্চা, সভ্যতা-সংস্কৃতি ও জীবনাচারের দিক থেকে তারা আরবদের মতোই ছিল। আন্দালুসে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসতারিবিন জনগোষ্ঠীর বসবাস ছিল। মুসলিম ও মুসতারিবিন জনগণের মাঝে সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত সুন্দর ও সম্প্রীতিপূর্ণ।
এই কারণেই তাদের বিদ্রোহপ্রচেষ্টা ছিল অত্যন্ত বিস্ময়কর ঘটনা। বিশেষ করে আবদুর রহমান আল-আওসাতের শাসনামল ছিল সচ্ছলতাপূর্ণ ও অস্থিরতামুক্ত। জনসাধারণের মাঝে কোনো ধরনের ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতাও ছিল না।
জনৈক কট্টরপন্থি খ্রিষ্টান পাদরি আন্দালুসের খ্রিষ্টানসমাজে আরব সভ্যতার প্রতি আকর্ষণ এবং খ্রিষ্টান-মুসলিম শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে অস্থির হয়ে উঠেছিল। সে খ্রিষ্টানসমাজে ধর্মীয় উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা করলে কিছু খ্রিষ্টান নাগরিক তার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বিদ্রোহ করে। আবদুর রহমান প্রজ্ঞার সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেন এবং একান্ত বাধ্য না হলে কঠোরতা অবলম্বন না করার নীতি অবলম্বন করেন। ফলে শান্তিপূর্ণ পন্থায় এই বিদ্রোহের সমাপ্তি ঘটে।
আবদুর রহমান আল-আওসাত ২৩৮ হিজরি সনের রবিউস সানি মাসে (৮৫২ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে) বাষট্টি বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।
ঐতিহাসিক সাফাদি তার সম্পর্কে বলেছেন—
তিনি তার পিতার বিপরীতে জনগণের প্রতি ন্যায়পরায়ণ ছিলেন, ছিলেন উদার ও মহানুভব। যুক্তিবিদ্যাসংক্রান্ত শাস্ত্রসমূহের প্রতি তার বিশেষ অনুরাগ ছিল। আন্দালুসে তিনিই প্রথম তৈরি মুদ্রার প্রচলন করেন। তিনি সেভিলে নগরপ্রাচীর নির্মাণ করেন। তার তত্ত্বাবধানে কর্ডোভা মসজিদের সম্প্রসারণ করা হয়। তাকে খলিফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিকের সঙ্গে তুলনা করা হতো।
আবদুর রহমান আলিমদের ভালোবাসতেন এবং তাদেরকে কাছে রাখতেন। সাধারণত নিজেই নামাজে ইমামতি করতেন। প্রাচীন গ্রন্থাদি তিনিই প্রথম আন্দালুসে আনার ব্যবস্থা করেন এবং আন্দালুসের আলিমসমাজকে এসব গ্রন্থের সঙ্গে পরিচিত করেন। তিনি সুদর্শন ও প্রভাবসম্পন্ন ছিলেন। বেশি বেশি কুরআন তেলাওয়াত করতেন, হাদিস মুখস্থ করতেন। তার শাসনামলকে ‘বরের যুগ’ বলা হতো। তিনি ন্যায়ের বিকাশের মাধ্যমে দেশের মানুষের মন জয় করেছিলেন। জনগণ তার শাসনামল উপভোগ করত এবং তার দীর্ঘায়ু কামনা করত। তিনি ইনসাফের সঙ্গে রাজস্ব সংগ্রহ করতেন। রাষ্ট্রের বিনির্মানে তিনি সবিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। এমনকি তার শাসনামলে দেশের বার্ষিক রাজস্বের পরিমাণ দশ লক্ষ দিনারে পৌঁছেছিল। (৩১)

টিকাঃ
২৭. আন্দালুসের (স্বাধীন প্রশাসন) ইতিহাসে যে তিনজন প্রশাসক আবদুর রহমান নামে গত হয়েছেন, তিনি তাদের মাঝের জন। এ কারণেই তাকে 'আল-আওসাত' বা মধ্যমজন বলা হয়। প্রথমজন ছিলেন আবদুর রহমান আদ-দাখিল আর তৃতীয় জন আবদুর রহমান আন-নাসির, যার আলোচনা সামনে আসবে।
২৮. উত্তর ইউরোপের উপদ্বীপ স্ক্যান্ডিনেভিয়া (Scandinavia) অঞ্চলের অধিবাসীদের নরম্যান (The Normans) বলা হয়। ডেনমার্ক, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড ও সুইডেন মিলে স্ক্যান্ডিনেভিয়া অঞ্চল গঠিত। নরম্যান জাতিগোষ্ঠী অত্যন্ত বর্বর ও অসভ্য জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত ছিল। আশেপাশের অঞ্চলগুলোতে তারা দস্যুবৃত্তি চালাত। ইতিহাসে তারা ভাইকিং (Viking) জলদস্যু নামে পরিচিত। উল্লেখ্য, দস্যুবৃত্তির অর্থ হলো দেশজয় বা এ জাতীয় কোনো উদ্দেশ্য ছাড়া কেবল সম্পদ লুণ্ঠন ও জনপদ ধ্বংসের লক্ষ্যে বিভিন্ন অঞ্চলে হামলা চালানো।
২৯. ব্যালেরিক দ্বীপপুঞ্জ: আন্দালুসের পূর্ব উপকূলে ভূমধ্যসাগরের বুকে বেশ কয়েকটি দ্বীপ আছে, যেগুলোকে ব্যালেরিক দ্বীপপুঞ্জ (Balearic Islands) বলা হয়। এসব দ্বীপের মধ্যে সামরিক কৌশলগত দিক থেকে তিনটি দ্বীপের অবস্থান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; মায়োর্কা (Palma de Mallorca), ম্যানোর্কা (Menorca) ও ইবিজা (Ibiza) দ্বীপ। প্রাচীন আরবি উৎস-গ্রন্থসমূহে এসব দ্বীপকে 'প্রাচ্য দ্বীপপুঞ্জ' বলে অভিহিত করা হয়েছে।
৩০. মাক্কারি, নাফহুত তীব, ১/৩৪৬।
৩১. সাফাদি, আল-ওয়াফি বিল ওয়াফাইয়াত, ১৮/৮৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00