📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 উমাইয়া খিলাফতের অনুগত শাসনব্যবস্থার কাল

📄 উমাইয়া খিলাফতের অনুগত শাসনব্যবস্থার কাল


পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, এ স্তরের ব্যাপ্তি ৯২ হিজরি সনে মুসলমানদের আন্দালুস উপদ্বীপ বিজয়ের সময়কাল হতে ১৩৮ হিজরি সনে স্বতন্ত্র উমাইয়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকাল পর্যন্ত। এই ছেচল্লিশ বছর আন্দালুস তৎকালীন কেন্দ্রীয় উমাইয়া খিলাফতের অনুগত ও অধীনস্থ প্রাদেশিক অঞ্চল ছিল।
এই সংক্ষিপ্ত সময়কালে আন্দালুসে মোট তেইশজন গভর্নর দায়িত্ব পালন করেন। বরং বলা ভালো, একুশজন গভর্নর দায়িত্ব পালন করেন, যাদের মধ্যে দুজন দুই মেয়াদে কাজ করেন। অর্থাৎ গড়ে একেকজন গভর্নরের শাসনকাল ছিল মাত্র দু-বছর। এ তথ্য দ্বারাই অনুমান করা যায় যে, এই স্তরটি ছিল যথেষ্ট অস্থিরতাপূর্ণ এবং আন্দালুস এ সময় একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছিল। গভর্নরদের কেউ কেউ আল্লাহর দ্বীনের প্রচার-প্রসার করতে গিয়ে দ্বীনের তরে জীবনদান করেছেন, আবার কেউ কেউ বিভিন্ন ধরনের চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র, বিদ্রোহ-অভ্যুত্থান ইত্যাদির শিকার হয়ে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন বা নিহত হয়েছেন। নিম্নে এ সময়কালের গভর্নরদের নাম ও শাসনকাল উল্লেখ করা হলো-
০১ তারিক বিন যিয়াদ : ৯২-৯৩ হি. (৭১১-৭১২ খ্রি.)
০২ মুসা বিন নুসায়র(১৫) : ৯৩-৯৫ হি. (৭১২-৭১৪ খ্রি.)
০৩ আবদুল আজিজ বিন মুসা বিন নুসায়র (নিহত) : ৯৫-৯৭ হি. (৭১৪-৭১৬ খ্রি.)
০৪ আইয়ুব বিন হাবিব লাখমি : ৯৭-৯৭ হি. (৭১৬-৭১৬ খ্রি.)
০৫ হুর বিন আবদুর রহমান সাকাফি : ৯৭-১০০ হি. (৭১৬-৭১৯ খ্রি.)
০৬ সামাহ বিন মালিক খাওলানি (১৬) : ১০০-১০২ হি. (৭১৯-৭২১ খ্রি.)
০৭। আবদুর রহমান বিন (ক) আবদুল্লাহ আল-গাফিকি : ১০২-১০৩ হি. (৭২১-৭২১ খ্রি.)
০৮ আমবাসা বিন সুহাইম কালবি : ১০৩-১০৭ হি. (৭২১-৭২৫ খ্রি.)
০৯ উযরা বিন আবদুল্লাহ ফিহরি : ১০৭-১০৭ হি. (৭২৫-৭২৬ খ্রি.)
১০ ইয়াহইয়া বিন সালামা কালবি : ১০৭-১১০ হি. (৭২৬-৭২৮ খ্রি.)
১১ হুযায়ফা ইবনুল আহওয়াস কিসি : ১১০-১১০ হি. (৭২৮-৭২৮ খ্রি.)
১২ উসমান বিন আবি নাসআ হায়সামি : ১১০-১১১ হি. (৭২৮-৭২৯ খ্রি.)
১৩ হায়সাম বিন উবায়দ কিলাবি : ১১১-১১২ হি. (৭২৯-৭৩০ খ্রি.)
১৪ মুহাম্মাদ বিন আবদুল্লাহ আশজায়ি : ১১২-১১২ হি. (৭৩০-৭৩০ খ্রি.)
০৭ আবদুর রহমান বিন (খ) আবদুল্লাহ আল-গাফিকি(১৭) : ১১২-১১৪ হি. (৭৩০-৭৩২ খ্রি.)
১৫ আবদুল মালিক বিন কাতান (ক) ফিহরি : ১১৪-১১৬ হি. (৭৩২-৭৩৪ খ্রি.)
১৬ উকবা ইবনুল হাজ্জাজ সালুলি : ১১৬-১২৩ হি. (৭৩৪-৭৪১ খ্রি.)
১৭ আবদুল মালিক বিন কাতান (খ) ফিহরি (নিহত) : ১২৩-১২৩ হি. (৭৪১-৭৪১ খ্রি.)
১৮ বালজ বিন বিশর কুশায়রি : ১২৩-১২৪ হি. (৭৪১-৭৪২ খ্রি.)
১৯ ছালাবা বিন সালামা আমিলি : ১২৪-১২৫ হি. (৭৪২-৭৪৩ খ্রি.)
২০ আবুল খাত্তার হুসাম বিন যারার কালবি : ১২৫-১২৭ হি. (৭৪৩-৭৪৫ খ্রি.)
২১ ছাওয়াবা বিন সালামা জুযামি: ১২৭-১২৯ হি. (৭৪৫-৭৪৬ খ্রি.)
২২ ইউসুফ বিন আবদুর রহমান ফিহরি (১৮) : ১২৯-১৩৮ হি. (৭৪৬-৭৫৬ খ্রি.)
এই আমলেই বিভিন্ন কারণে প্রথমে আন্দালুস বিজেতা আরব অভিযাত্রী ও মাগরিবি বার্বার (আমাজিঘ) যোদ্ধাদের মাঝে বিরোধ ও বিভেদের প্রাথমিক লক্ষণসমূহ প্রকাশ পেতে থাকে এবং পরবর্তী সময়ে তা আন্দালুসের জনগণের মাঝেও সংক্রমিত হতে থাকে। উল্লেখযোগ্য দুটি কার্যকারণ হলো—
• নেতৃত্ব ও দায়িত্ব প্রদানে আরবদেরকে প্রাধান্যদান।
• বার্বার জনগোষ্ঠীর মাঝে খারিজি মতাদর্শের বিস্তার।
খারিজিরা খিলাফতের প্রাণকেন্দ্র দামেশক ও ইসলামি প্রাচ্য অঞ্চলে তাদের মতাদর্শ প্রচার করতে গিয়ে উমাইয়া খিলাফতের প্রচণ্ড বাধার সম্মুখীন হওয়ায় পালিয়ে মাগরিবে আস্তানা গেড়েছিল এবং বার্বার গোত্রসমূহের মাঝে নিজেদের মতাদর্শ প্রচার করছিল। তারা বার্বারদেরকে আরবদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে সাম্প্রদায়িক চেতনা জাগিয়ে তুলতে সক্ষম হয়। খারিজি মতাদর্শ গ্রহণকারী মায়সারা নামক জনৈক বার্বার সর্দার আরবদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ডাক দেয় এবং একে কেন্দ্র করে ১২২ হিজরি (৭৪০ খ্রিষ্টাব্দে) তাঞ্জিয়ারে আরব ও বার্বার জনগোষ্ঠীর মাঝে তুমুল লড়াই সংঘটিত হয়। এ যুদ্ধে বহু আরব বীর যোদ্ধা ও অভিজাত ব্যক্তি নিহত হয়েছিল বলে ইতিহাসে তা 'সম্ভ্রান্তদের (পতন) ট্রাজেডি' নামে পরিচিতি লাভ করে।
দামেশকে খলিফা হিশাম বিন আবদুল মালিকের কাছে এ সংবাদ পৌঁছলে তিনি বার্বারদের বিদ্রোহ দমন করার জন্য কুলসুম বিন ইয়ায কুশায়রির নেতৃত্বে ত্রিশ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী মাগরিবে প্রেরণ করেন। বাহিনীর অধিকাংশ সৈন্য ছিল শাম অঞ্চলের (কায়স গোত্রীয়) আরব। মিশরের কিছু সৈন্যও বাহিনীতে যোগ দিয়েছিল।
স্বাভাবিকভাবেই ধারণা করা হয়েছিল যে, এই বিশাল বাহিনীর সহায়তায় মাগরিবের পরাজিত আরবরা এবার অবধারিতভাবেই বার্বারদের পরাজিত করবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটে সম্পূর্ণ বিপরীত। এর কারণ ছিল, উত্তর আফ্রিকায় পূর্ব থেকেই অবস্থানকারী আরবগণ ছিল হিজাযের অধিবাসী; আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে মদিনার অধিবাসী। অপরদিকে প্রতিশোধ অভিযানে আগত অধিকাংশ আরব সৈন্য ছিল শাম অঞ্চলের অধিবাসী। আর ৬৩ হিজরি সনে (৬৮৩ খ্রিষ্টাব্দে) ইয়াযিদ ইবনে মুয়াবিয়ার আমলে সংঘটিত হাররার যুদ্ধ ও মদিনায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই হিজায ও শামের আরবদের মাঝে প্রচণ্ড বিরোধ ও শত্রুতা চলে আসছিল।
বার্বারদের বিদ্রোহ মোকাবিলায় যদিও উভয় শ্রেণির আরবগণ বাহ্যিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল; কিন্তু অন্তর্জগতে বিরোধ বিদ্যমান থাকলে বাহ্যিক ঐক্যে কী আসে যায়! আর তাই সেবু (Sebou) উপত্যকায় সংঘটিত যুদ্ধে আরব বাহিনী বার্বারদের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। আরব সেনাপতি কুলসুম বিন ইয়ায যুদ্ধক্ষেত্রেই নিহত হন। কুলসুমের চাচাতো ভাই বালজ বিন বিশর জীবিত সাত হাজার সৈন্যকে সঙ্গে নিয়ে কোনোমতে আত্মরক্ষা করে সিউটায় আশ্রয় নিলে বার্বাররা তাদেরকে অবরোধ করে রাখে।
দীর্ঘ দিন অবরুদ্ধ থাকার পর পরিস্থিতি কঠিন হয়ে দাঁড়ালে সেনাপতি বালজ বিন বিশর আন্দালুসের মুসলিম প্রশাসনের কাছে সাহায্যবার্তা প্রেরণ করেন এবং প্রণালি পাড়ি দিয়ে আন্দালুসে আশ্রয় নেওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করেন। কিন্তু আন্দালুসের হিজাযি প্রশাসন শামের আরবদের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে।
কিছুদিন না যেতেই আন্দালুসেও পট পরিবর্তন ঘটে। আন্দালুসে বসবাসকারী বার্বাররা যখন মাগরিবে স্বজাতির বিজয় সম্পর্কে অবগত হয়, তখন তারা আন্দালুসে আরব নেতৃত্বের পতন ঘটাতে প্রচণ্ড বিদ্রোহ শুরু করে। বিদ্রোহ দমনে ব্যর্থ হয়ে আন্দালুসের প্রশাসক আবদুল মালিক বিন কাতান ফিহরি অনুভব করেন যে, এই কঠিন পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার পেতে হলে মাগরিবে অবরুদ্ধ শামের বাহিনীর শরণাপন্ন হওয়া ব্যতীত কোনো উপায় নেই। আবদুল মালিক বালজ বিন বিশরের কাছে বার্তা পাঠিয়ে তার বাহিনীকে এই শর্তে আন্দালুসে আগমনের অনুমতি প্রদান করেন যে, তারা আন্দালুসে পৌঁছে বিদ্রোহী বার্বারদের বিরুদ্ধে লড়াই করবে এবং বিজয় সুনিশ্চিত হয়ে গেলে আন্দালুস ত্যাগ করতে বাধ্য থাকবে। বালজ বিন বিশর এ শর্তেই আন্দালুসে প্রবেশ করতে সম্মত হন। আবদুল মালিক শামের বাহিনীর শর্তপূরণের নিশ্চয়তাস্বরূপ তাদের কয়েকজন লোককে জামিন হিসেবে আটকে রাখেন।
উভয় পক্ষ মিলে সম্মিলিত অভিযান পরিচালনা করে আন্দালুসের বার্বারদের বিদ্রোহ দমন করতে সক্ষম হয়। পরাজিত বার্বার মুসলমানরা আন্দালুস ভূমি ত্যাগ করে আফ্রিকায় ফিরে যেতে শুরু করে। এভাবে পারস্পরিক বিভেদ-বিচ্ছিন্নতার কারণে মুসলমানরা হারায় আন্দালুস ভূমির বড় একটি অংশ। শত্রুর আগ্রাসন নয়; পারস্পরিক বিভেদই ছিল এর জন্য দায়ী। (১৯)
যুদ্ধ শেষে আন্দালুসের প্রশাসক আবদুল মালিক বালজ বিন বিশরকে পূর্বের শর্তের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আন্দালুস ছেড়ে মাগরিবে চলে যেতে বলেন। কিন্তু বালজের নেতৃত্বাধীন শামের বাহিনী আন্দালুস ত্যাগে অস্বীকৃতি জানায়। যেহেতু তাদের শক্তির পাল্লা ভারী ছিল, তাই তারা গভর্নর আবদুল মালিককে অপসারণ করে এবং নিজেদের নেতা বালজ বিন বিশরকে গভর্নর পদে বসায়। এরপর শামের সৈন্যরা আবদুল মালিক বিন কাতানের প্রতি অভিযোগ তোলে যে, তিনি তার কাছে জামিনে থাকা জনৈক ব্যক্তিকে হত্যা করেছেন। শামের সৈন্যরা প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য আবদুল মালিককে তাদের হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানায়। বালজ বিন বিশর তাদেরকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করলে তারা তাকে হুমকি প্রদান করে এবং বলে যে, আপনি নিজে মুযার বংশীয় হওয়ায় আরেক মুযার বংশীয় আবদুল মালিকের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করছেন। নিরুপায় হয়ে বালজ আবদুল মালিককে তাদের হাতে তুলে দেন। এরপর শামের সৈন্যরা বয়োবৃদ্ধ আবদুল মালিক বিন কাতানকে হত্যা করে। নিজেদের প্রশাসক নিহত হওয়ায় এবার বালাদি(২০) আরবরা বিদ্রোহ শুরু করে। ফলে আন্দালুস ভূমিতে শুরু হয় ইয়ামেনিদের সঙ্গে শামের আরবদের সংঘাত।
আন্দালুসের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে খিলাফতের রাজধানী দামেশক হতে ১২৫ হিজরি সনে (৭৪৩ খ্রিষ্টাব্দে) আবুল খাত্তার হুসাম বিন যারার কালবিকে নতুন প্রশাসক হিসেবে আন্দালুসে প্রেরণ করা হয়।
আবুল খাত্তার আন্দালুসে পৌঁছেই পরিস্থিতি শান্তকরণে কাজ শুরু করেন। তিনি প্রথমে শামের আরবদের সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ গ্রহণ করেন এবং তাদেরকে বিভিন্ন অংশে বিভক্ত করে আন্দালুসের বিভিন্ন এলাকায় বসতি স্থাপনের নির্দেশ দেন। শামের যেসব সৈন্য ছিল দামেশকের অধিবাসী, তাদেরকে এলভিরা (Elvira) অঞ্চলে প্রেরণ করা হয় এবং এলভিরা অঞ্চলের নামকরণ করা হয় দামেশক। যেসব সৈন্য ছিল হিমসের অধিবাসী, তাদেরকে সেভিল (Seville) অঞ্চলে প্রেরণ করা হয় এবং সেভিলের নামকরণ করা হয় হিমস। কিননাসরিনের (Qinnasrin) অধিবাসী সৈন্যদেরকে জাইয়ান (Jaén) অঞ্চলে পাঠানো হয় এবং জাইয়ান অঞ্চলের নামকরণ করা হয় কিননাসরিন। জর্ডানের অধিবাসী সৈন্যদেরকে রাইয়া (Rayya) অঞ্চলে বসতি স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয় এবং রাইয়া অঞ্চলের নামকরণ করা হয় জর্ডান। ফিলিস্তিনের অধিবাসী সৈন্যদেরকে সিডোনিয়া (Sidonia) অঞ্চলে বসতি স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয় এবং সিডোনিয়ার নামকরণ করা হয় ফিলিস্তিন। আর মিশরের অধিবাসী সৈন্যদেরকে আন্দালুসের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে টাডমির (Tudmir) অঞ্চলে বসতি স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয় এবং টাডমির অঞ্চলের নামকরণ করা হয় মিশর।
এই অভিনব নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে নতুন প্রশাসক আবুল খাত্তার আন্দালুসে বসবাসরত আরব, বার্বার জনগোষ্ঠী ও স্থানীয় অধিবাসীদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ানো শামের সৈন্যদেরকে সুবিন্যস্ত পদ্ধতিতে বিভক্ত করে ফেলতে সক্ষম হন। এসব সৈন্যরাই পরবর্তী সময়ে আন্দালুসের সামরিক ব্যবস্থাপনার মূল উপাদানে পরিণত হয়। জিম্মি ও কৃষকদের কাছ থেকে প্রাপ্ত রাজস্বের এক-তৃতীয়াংশ তাদের জন্য বরাদ্দ করা হয় এবং শর্তারোপ করা হয় যে, প্রশাসন যখন তলব করবে, তখন তারা প্রশাসনকে চাহিদা মোতাবেক সৈন্য সরবরাহ করবে।
কিন্তু এই প্রজ্ঞাপূর্ণ নীতি খুব বেশি দিন কার্যকর থাকেনি। কিছুদিন না যেতেই মুযারি ও ইয়ামেনি আরবদের মাঝে জাহিলি সাম্প্রদায়িক চেতনা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। শামের আরবদের মাঝে সামিল বিন হাতিম নামক চরম সাম্প্রদায়িক এক মুযারি নেতা আত্মপ্রকাশ করে এবং তাদের নেতা বনে যায়। বিপরীতে আন্দালুসের প্রশাসক আবুল খাত্তার ছিলেন চরম সংকীর্ণমনা ইয়ামেনি।
এরইমাঝে তুচ্ছ একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি হয়। মুযার গোত্রীয় জনৈক ব্যক্তির সঙ্গে এক ইয়ামেনির বিবাদ সৃষ্টি হলে উভয়ে প্রশাসক আবুল খাত্তারের দ্বারস্থ হয়। আবুল খাত্তার ইয়ামেনির পক্ষে ফয়সালা করলে মুযারিরা একে অবিচার দাবি করে সামিলের কাছে অভিযোগ করে। সামিল এ বিষয়ে প্রতিকারের উদ্দেশ্যে আবুল খাত্তারের কাছে গেলে আবুল খাত্তার তাকে অপমান তো করেনই; মাথায় আঘাত করে তার পাগড়ি স্থানচ্যুত করে ফেলেন। অপমানিত সামিল ফিরে আসার সময় জনৈক দ্বাররক্ষী তাকে বলে, 'আবুল জাওশান, আপনার পাগড়ি ঠিক করে নিন।' উত্তরে তিনি বলেন, 'আমার পক্ষে যদি আমার কওম থাকে, তবে তারাই আমার পাগড়ি ঠিক করে দেবে।' সামিলের এ উক্তি ছিল পুনরায় সাম্প্রদায়িক সংঘাত শুরু হওয়ার প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত।
১৩০ হিজরিতে (৭৪৭ খ্রিষ্টাব্দে) কর্ডোভা (গোয়াডেল কুইভার) নদীর তীরে শাকুন্দা এলাকায় সামিলের নেতৃত্বাধীন মুযার গোত্র এবং আবুল খাত্তারের নেতৃত্বাধীন ইয়ামেনিদের মাঝে একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধের প্রথমদিকে মুযারিদের পাল্লা ভারী থাকলেও পরে ইয়ামেনিরা প্রবল বেগে হামলা চালিয়ে বিজয় অর্জনে সক্ষম হয়। পরাজিত সামিল তার আবাসস্থল জারাগোজায় আশ্রয় নেন। জারাগোজা ছিল প্রাচীরবেষ্টিত সুরক্ষিত এক নগরী। বিজয়ী আবুল খাত্তার তার বাহিনী নিয়ে জারাগোজা পৌঁছে নগরী অবরোধ করেন।
এ সময় অবরুদ্ধ সামিলকে রক্ষা করতে অন্যান্য এলাকায় বসবাসকারী মুযারিরা বেরিয়ে আসে। বিভিন্ন এলাকা থেকে অগ্রসর হওয়া মুযারিরা পথিমধ্যে পরস্পর মিলিত হতে থাকে এবং বিরাট সংখ্যায় পরিণত হয়। আন্দালুসে বসবাসরত বনু উমাইয়ার মাওয়ালিদের (উমাইয়া রাজপরিবার কর্তৃক মুক্ত ক্রীতদাসদের) প্রায় তিনশ সদস্যের একটি দল মুযারিদের সঙ্গে যোগ দেয়। অবশ্য তাদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিবদমান কোনো পক্ষের হয়ে যুদ্ধ করতে নয়; বরং তারা প্রেরিত হয়েছিল নিজেদের একটি লক্ষ্য বাস্তবায়নে উভয় পক্ষের সঙ্গে দর কষাকষির উদ্দেশ্যে। মাওয়ালিদের দলটি প্রথমে অবরুদ্ধ সামিলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তার সমর্থন লাভের চেষ্টা করার সিদ্ধান্ত নেয়। এদিকে ইয়ামেনিরা অবরুদ্ধ সামিলের সহায়তায় প্রচুর সংখ্যক মুযারিদের আগমনের সংবাদে ভীত হয়ে অবরোধ প্রত্যাহার করে কর্ডোভায় ফিরে যায়। মুক্ত সামিল বেরিয়ে এসে তাকে উদ্ধারে আগত মুযারিদের স্বাগত জানান এবং তাদেরকে বিভিন্ন উপঢৌকন প্রদান করেন। এরপর তিনি সকলকে সঙ্গে নিয়ে কর্ডোভা দখলের উদ্দেশ্যে রওনা হন। পথিমধ্যে মাওয়ালি প্রতিনিধিদল নিজেদের প্রস্তাব সামিলের কাছে পেশ করলে তিনি তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন। সামিলের কাছ থেকে নিরাশ হয়ে মাওয়ালিরা এবার ইয়ামেনিদের শরণাপন্ন হয় আর ইয়ামেনিরা সাদরে তাদের প্রস্তাব গ্রহণ করে নেয়।
উমাইয়া প্রতিনিধিদলের প্রস্তাবটি কী ছিল, তা ভালোভাবে বুঝতে হলে আমাদেরকে একটু পেছনে ফিরে যেতে হবে। বনু উমাইয়ার প্রায় শতাব্দীব্যাপী সাম্রাজ্যকে চূর্ণবিচূর্ণ করে যখন আব্বাসি খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন আব্বাসিরা নির্বিচারে উমাইয়া রাজপরিবারের সদস্যদের হত্যা করতে থাকে। এ সময় উমাইয়া রাজপরিবারের হাতেগোনা যে কজন সদস্য গণহত্যা থেকে আত্মরক্ষা করতে সক্ষম হয়েছিল, তাদের একজন হলেন 'আবদুর রহমান আদ-দাখিল(২১) নামে খ্যাত আবদুর রহমান বিন মুয়াবিয়া বিন হিশাম বিন আবদুল মালিক। আবদুর রহমান বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে সুদীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আব্বাসি ঘাতকদের এড়াতে সক্ষম হন। তিনি শাম, মিশর, লিবিয়া ও কায়রোয়ান পাড়ি দিয়ে মাগরিবে তার মাতুলকুলের কাছে আশ্রয় গ্রহণ করেন। তার মা ছিলেন বার্বার শাখাগোত্র নাফযাওয়া (Nefzaoua) বংশোদ্ভূত। এ সময় যুবরাজ আবদুর রহমানের বয়স ছিল বিশেরও কম।
মাগরিবে পৌঁছে আবদুর রহমান সেখানে বসবাসকারী উমাইয়া মাওয়ালিদের তাদের প্রতি বনু উমাইয়ার অনুগ্রহদানের কথা স্মরণ করিয়ে দেন এবং তাকে আন্দালুস প্রবেশে সহায়তা করতে আহ্বান জানান।
আবদুর রহমান তাদেরকে জানান যে, তিনি আন্দালুস ভূমিতে তার পিতৃপুরুষের গৌরব ও কৃতিত্বপূর্ণ ভূমিকা ফিরিয়ে আনতে চান। এসব মাওয়ালি একদিকে যেমন বনু উমাইয়ার প্রতি কৃতার্থ ছিল, অপরদিকে যথেষ্ট মেধা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞারও অধিকারী ছিল। তারা আন্দালুসে বিরাজমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেয় এবং বিবদমান দুই পক্ষের মধ্যে কোনো এক পক্ষের সমর্থন লাভের প্রত্যাশায় অগ্রসর হয়। বাস্তবেও ইয়ামেনিরা তাদের প্রস্তাব সাদরে গ্রহণ করে নেয়।
ইয়ামেনিদের সাড়া পেয়ে মাওয়ালিরা অত্যন্ত আনন্দিত হয় এবং দ্রুত মাগরিবে অবস্থানরত আবদুর রহমানের কাছে বার্তা পাঠিয়ে সুসংবাদ জানিয়ে দেয়। বিস্তারিত অবগত হওয়ার পর আবদুর রহমান জাবালে তারিক প্রণালি অতিক্রম করে আন্দালুসে উমাইয়া মাওয়ালিদের ঘাঁটি তুৰ্শে (Torrox) অবস্থান গ্রহণ করেন এবং সেখান থেকেই তার পরবর্তী কার্যক্রম শুরু করেন। আন্দালুসের তৎকালীন প্রশাসক ইউসুফ বিন আবদুর রহমান ফিহরি ও তার সহযোগী সামিল তখন আন্দালুসের উত্তরাঞ্চলে সৃষ্ট গোলযোগ দমনে ব্যস্ত ছিলেন। তাদের অনুপস্থিতির সুযোগ কাজে লাগিয়ে আবদুর রহমান তার পক্ষের লোকদের সমবেত করতে সক্ষম হন এবং তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে কর্ডোভা অভিমুখে রওনা হন। সংবাদ পেয়ে গভর্নর ইউসুফ ও সামিল দ্রুত কর্ডোভায় প্রত্যাবর্তন করেন। ১৩৮ হিজরির আরাফার দিন (৭৫৬ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে) গোয়াডেল কুইভার নদীর দুই তীরে মাসারা নামক এলাকায় দুই বাহিনী সমবেত হয়।
আবদুর রহমান অনর্থক রক্তপাত রোধে প্রথমে প্রতিপক্ষের কাছে শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রস্তাব পেশ করেন এবং সমঝোতা আলোচনায় বসার জন্য তাকে নদী পার হওয়ার অনুমতিদানের অনুরোধ জানান। প্রশাসক ইউসুফ আবদুর রহমানের কৌশল উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হন এবং তাকে নদী পার হওয়ার সুযোগ দেন। নদী পার হয়েই আবদুর রহমান স্বরূপে আত্মপ্রকাশ করেন এবং প্রতিপক্ষকে সুস্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে, আন্দালুস বিজেতা উমাইয়া খলিফা পরিবারের বংশধর হিসেবে তিনিই এ অঞ্চলের প্রশাসন দায়িত্ব লাভের বৈধ হকদার। সুতরাং তাকে আন্দালুসের প্রশাসক হিসেবে মেনে নেওয়া ব্যতিরেকে ভিন্ন কোনো দাবির ওপর কোনো সমঝোতা বা চুক্তি হবে না।
আবদুর রহমানের এ ঘোষণা নতুন যুদ্ধ শুরুর বার্তা ছিল। একে কেন্দ্র করেই মাসারা প্রান্তরে উভয় পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়।
মাসারা প্রান্তরের নিষ্পত্তিমূলক এ যুদ্ধে আবদুর রহমানের কুদরতপ্রদত্ত প্রতিভা ও দ্রুত চিন্তাগুণের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। আবদুর রহমান জানতে পারেন—তার পক্ষে যুদ্ধ করতে সমবেত হওয়া সৈন্যরা বলাবলি করছে যে, আবদুর রহমান একজন অল্পবয়স্ক যুবক। সে ইতিপূর্বে কোনো যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি। যুদ্ধ শুরু হলে সে ভীত হয়ে পড়বে এবং তার তাজাদম দ্রুতগামী ঘোড়ার সহায়তায় ঠিকই আত্মরক্ষা করতে সক্ষম হবে। আর আমরা ময়দানে থেকে ইউসুফের বাহিনীর নির্মমতার শিকার হব।
আবদুর রহমান কথার পরিবর্তে কাজের মাধ্যমে উত্তরদানের মনস্থ করেন। তিনি তার দ্রুতগামী মূল্যবান ঘোড়াটিকে রেখে জনৈক সৈন্যের অতি দুর্বল একটি ঘোড়া বেছে নেন এবং তাতে আরোহণ করে যুদ্ধক্ষেত্রে রওনা হন। তিনি যেন নীরবে সবাইকে জানিয়ে দেন যে, তিনিই উৎকৃষ্ট ঘোড়ার লাগামধারী প্রথম ব্যক্তি নন। আবদুর রহমানের উপস্থিত সিদ্ধান্ত সকলকে প্রভাবিত করে এবং সকলে অটল-অবিচল থেকে যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই করতে থাকে। শেষ পর্যন্ত আবদুর রহমানের বাহিনীই জয়লাভ করে। বিজয়ী আবদুর রহমান আন্দালুসের রাজধানী কর্ডোভায় প্রবেশ করেন আর আন্দালুসে সূচিত হয় মুসলমানদের এক নতুন অধ্যায়—উমাইয়া রাষ্ট্রের অধ্যায়।

টিকাঃ
১৫. খলিফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিকের নির্দেশে তিনি তারিক বিন যিয়াদকে সঙ্গে নিয়ে তৎকালীন উমাইয়া খিলাফতের রাজধানী দামেশকে ফিরে যান।
১৬. তুলুজ (Toulouse)-এর যুদ্ধক্ষেত্রে শাহাদাত বরণ করেন。
১৭. পয়টিয়ার্স (Poitiers)-এ বালাতুশ শুহাদার যুদ্ধে শহিদ হন।
১৮. তার প্রশাসন আমল ছিল গোলযোগ ও অস্থিরতায় পূর্ণ।
১৯. পারস্পরিক বিদ্বেষ ও অপরিণামদর্শিতাই ছিল এর প্রধান কারণ। যদি এই অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা না ঘটত এবং হাজার হাজার বার্বার মুসলমান আন্দালুস ভূখণ্ড ত্যাগ না করত, তাহলে তাদের মাধ্যমে আন্দালুসের প্রতিটি প্রান্তে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হতো। বার্বাররা আন্দালুস ত্যাগ করায় ট্যাজু নদীর উত্তরের সকল অঞ্চল বলতে গেলে পুরোপুরি মুসলিমশূন্য হয়ে যায়। ফলে খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই এ সকল অঞ্চল পুরোপুরি অরক্ষিত হয়ে পড়ে এবং উত্তরের খ্রিষ্টানরা নিজেদের ইচ্ছেমতো এ অঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে থাকে। খ্রিষ্টীয় নবম শতাব্দীর মধ্যেই খ্রিষ্টানরা উত্তর আন্দালুসের বিরাট অংশ অধিকার করে নেয়। [মূল গ্রন্থের টীকা]
২০. পূর্বেও উল্লেখ করা হয়েছে-যেসব আরব আন্দালুসের প্রথম বিজয়াভিযানে অংশগ্রহণ করেছিল এবং দক্ষিণ আন্দালুসে আবাস স্থাপন করেছিল, পরবর্তীকালে আন্দালুসে হিজরতকারী অন্যান্য আরব থেকে পার্থক্যকরণের জন্য তাদেরকে বালাদি (স্থানীয়) বলা হতো। বালাদি আরবদের অধিকাংশই ছিল ইয়ামানের।
২১.'আদ-দাখিল' শব্দের অর্থ 'প্রবেশকারী'। যেহেতু আবদুর রহমান আদ-দাখিলই ছিলেন বনু উমাইয়ার প্রথম ব্যক্তি, যিনি প্রশাসক হিসেবে কর্ডোভায় প্রবেশ করেছেন, তাই তার উপাধি হয় 'আদ-দাখিল'। দেখুন— ইবনে খালদুন, তারীখে ইবনে খালদুন, ৪/১২২ ও মাক্কারি, নাফহুত তীব, ১/৩২৯।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00