📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 আন্দালুসে মুসলিম জাতি

📄 আন্দালুসে মুসলিম জাতি


নিঃসন্দেহে আন্দালুস ভূখণ্ডে মুসলমানদের ইতিহাস স্বতন্ত্র পরিচ্ছেদে আলোচনার দাবি রাখে। কারণ, আন্দালুসে ইসলামি শাসনব্যবস্থা স্থায়ী হয়েছিল ৯২ হিজরি থেকে ৮৯৭ হিজরি সন পর্যন্ত আট শতাব্দী কাল। আর তাই সন্দেহাতীতভাবেই এটি ইসলামি ইতিহাসের অতি গুরুত্বপূর্ণ ও সুদীর্ঘ একটি অধ্যায়। এ অঞ্চলে মুসলমানদের অবস্থান ও কর্ম-অবদান ইতিহাসের এক মহাকাব্যিক অধ্যায়, যার সমাপ্তি ঘটে প্রথমত মুসলমানদের হাতে, তাদেরই উদাসীনতায়; তারপর ইসলামের শত্রুদের সুদীর্ঘ প্রস্তুতি, অব্যাহত চক্রান্ত ও অধীর ধৈর্য প্রচেষ্টায়। আন্দালুসে মুসলিম জাতি খ্যাতি ও মর্যাদার সর্বোচ্চ শিখরে এবং সভ্যতা ও সংস্কৃতির অত্যুচ্চ স্তরে উন্নীত হয়েছিল। কিন্তু সুন্নাতুল্লাহ ও আল্লাহ তাআলার শাশ্বত নীতি তো কারও প্রতি পক্ষপাতিত্ব করে না এবং কাল ও স্থানের ভিন্নতায় পরিবর্তিত হয় না।
ইতিপূর্বে আমরা উমাইয়া শাসনামলে পরিচালিত বিজয়াভিযানের আলোচনায় মুসলমানদের আন্দালুস বিজয়ের সময় হতে ১১৪ হিজরি সনে সংঘটিত বালাতুশ শুহাদা যুদ্ধ পর্যন্ত সময়ের ইতিহাস আলোচনা করেছি। কাজেই আমাদের সামনের আলোচনা এর পরবর্তী সময়কালের বিবরণের মাধ্যমে শুরু হবে।
আন্দালুসের ইসলামি ইতিহাসকে দশটি স্তরে বিভক্ত করা যায়।
• প্রথম স্তর: ৯২-১৩৮ হিজরি (৭১১-৭৫৫ খ্রিষ্টাব্দ)।
এ স্তরের সূচনা হয় ৯২ হিজরি সনে মুসলমানদের আন্দালুস বিজয়ের মাধ্যমে আর শেষ হয় উমাইয়া খিলাফতের পতন এবং ১৩৮ হিজরি সনে উমাইয়া যুবরাজ আবদুর রহমান আদ-দাখিলের আন্দালুসে প্রবেশের মাধ্যমে। এ সময়ে আন্দালুস উমাইয়া খিলাফতের অনুগত ও অধীনস্থ প্রাদেশিক অঞ্চল ছিল। খিলাফতের নিযুক্ত গভর্নর ও প্রশাসকগণ আন্দালুসে অবস্থান করে কেন্দ্রীয় খিলাফতের নির্দেশনা মোতাবেক রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন।
• দ্বিতীয় স্তর : ১৩৮-২৩৮ হিজরি (৭৫৫-৮৫২ খ্রিষ্টাব্দ)। এ স্তরে আন্দালুস তৎকালীন আব্বাসি খিলাফতের কর্তৃত্বমুক্ত স্বতন্ত্র সাম্রাজ্যে পরিণত হয় এবং উন্নতি ও সমৃদ্ধির প্রথম স্তর অতিক্রম করে। এ সময়কালকে প্রতাপ, গৌরব ও সভ্যতা বিনির্মাণের যুগ হিসেবে গণ্য করা হয়। এ সময় আশেপাশের অঞ্চলের ওপর ইসলামি রাষ্ট্র আন্দালুসের যথেষ্ট প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল।
• তৃতীয় স্তর : ২৩৮-৩০০ হিজরি (৮৫২-৯১৩ খ্রিষ্টাব্দ)। এ স্তরে আন্দালুসের ইসলামি রাষ্ট্র প্রথমবারের মতো ক্ষয় ও বিভক্তির শিকার হয়। এর ব্যাপ্তি আবদুর রহমান আন-নাসিরের শাসনামলের সূচনা পর্যন্ত। এ সময়কালকে দুর্বলতা ও অবসন্নতার যুগ হিসেবে গণ্য করা হয়।
• চতুর্থ স্তর : ৩০০-৩৬৮ হিজরি (৯১৩-৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দ)। এ স্তরে আন্দালুসের ইসলামি রাষ্ট্র পুনরায় সমৃদ্ধি ও প্রতিপত্তি অর্জন করে। এ আমলেই তৎকালীন আব্বাসি খিলাফতের দুর্বলতা ও ক্ষয়িষ্ণুতা বিবেচনা করে আন্দালুসে স্বতন্ত্র ইসলামি খিলাফত ঘোষণা করা হয় এবং আন্দালুসের শাসকগণ সুলতান বা গভর্নরের পরিবর্তে (উমাইয়া) খলিফা পরিচিতি ধারণ করেন।
• পঞ্চম স্তর : ৩৬৮-৩৯৯ হিজরি (৯৭৮-১০০৯ খ্রিষ্টাব্দ)। এ স্তরে আন্দালুসের উমাইয়া খিলাফত হাজিব বা রাজপ্রহরীর প্রভাব নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে। ‘খলিফা’ সম্মানসূচক পদবিতে পরিণত হয়, সাম্রাজ্যের কর্তৃত্ব চলে যায় হাজিব পদধারী আমিরিয়া পরিবারের হাতে। এ কারণে একে আমিরিয়া সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার স্তরও বলা হয়।
• ষষ্ঠ স্তর : ৩৯৯-৪২২ হিজরি (১০০৯-১০৩১ খ্রিষ্টাব্দ)। এ স্তরে দ্বিতীয়বারের মতো আন্দালুস সাম্রাজ্য ক্ষয় ও বিভক্তির শিকার হয়। এ স্তরেই আন্দালুসে উমাইয়া শাসনের চূড়ান্ত পতন ঘটে, সমাপ্তি ঘটে আন্দালুসকেন্দ্রিক খিলাফতব্যবস্থারও।
• সপ্তম স্তর: ৪২২-৪৮৪ হিজরি (১০৩১-১০৯১ খ্রিষ্টাব্দ)। এ স্তরে আন্দালুস ভূমি অঞ্চলকেন্দ্রিক খণ্ড খণ্ড বহু রাষ্ট্রে পরিণত হয়। একে তাইফা (বিভক্ত) শাসকদের যুগ হিসেবে অভিহিত করা হয়।
• অষ্টম স্তর: ৪৮৪-৫৪১ হিজরি (১০৯১-১১৪৭ খ্রিষ্টাব্দ)। এ স্তরে আন্দালুস সাগরের ওপারের মাগরিবকেন্দ্রিক মুরাবিতি সাম্রাজ্যের অধীনে পরিচালিত হয়।
• নবম স্তর: ৫৪১-৬২০ হিজরি (১১৪৭-১২২৪ খ্রিষ্টাব্দ)। এ স্তরে আন্দালুস মাগরিবকেন্দ্রিক মুওয়াহহিদি সাম্রাজ্যের অধীনে পরিচালিত হয়।
• দশম স্তর: ৬২০-৮৯৭ হিজরি (১২২৪-১৪৯২ খ্রিষ্টাব্দ)। বনু আহমার (বনু নাসর) পরিবারের শাসন স্তর। এ স্তরে আন্দালুসের ইসলামি ভূখণ্ড গ্রানাডা অঞ্চলে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। আর এ স্তরেই শুরু হয় আন্দালুসে ইসলামের চূড়ান্ত পতনের প্রথম ধাপ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00