📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 ভূমিকা

📄 ভূমিকা


বাগদাদে আব্বাসি খিলাফতের ওপর তুর্কি মামলুকদের একচ্ছত্র আধিপত্য একদিকে যেমন খলিফাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি হ্রাসকরণে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছিল, অপরদিকে আশেপাশের বিভিন্ন অঞ্চলের গভর্নরদেরকে নিজেদের অঞ্চলে স্বাধীন রাষ্ট্রগঠনের চিন্তা করার সুযোগ করে দিয়েছিল। কারণ, কোনো বিবেচনায়ই তারা তুর্কি মামলুকদের তুলনায় দুর্বল ছিল না। এ কারণেই হিজরি তৃতীয় শতাব্দীর প্রথম অর্ধেক অতিবাহিত না হতেই সুবিশাল আব্বাসি সাম্রাজ্যের পরিসর অতি সংকীর্ণ গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে এবং আব্বাসি রাষ্ট্রভূমি স্বাধীন বিভিন্ন রাষ্ট্র দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে পড়ে। এসব রাষ্ট্রের ওপর আব্বাসি খলিফার কোনো ধরনের কর্তৃত্ব ছিল না।
মৌলিকভাবে এসব রাষ্ট্রকে দু-ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। কিছু রাষ্ট্র স্বতন্ত্র পরিচয় বহন করলেও আব্বাসি সাম্রাজ্যের সঙ্গে মিত্রতাপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখত। তারা মিম্বরে আব্বাসি খলিফার জন্য দোয়া করত, নিজেদের মুদ্রায় খলিফার নাম উৎকীর্ণ করত এবং বাগদাদে খলিফার খেদমতে বিভিন্ন উপহারসামগ্রী প্রেরণ করত। বিপরীতে কিছু রাষ্ট্র ছিল সম্পূর্ণ স্বাধীন পরিচয়ধারী। তারা আব্বাসি সাম্রাজ্যের সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পর্ক তো রাখতই না; ক্ষেত্রবিশেষে আব্বাসি সাম্রাজ্যের ক্ষতিসাধনেও তৎপর হতো।
আব্বাসি খিলাফতের কর্ণধারগণ এই অরাজকতা দূরীকরণে উল্লেখযোগ্য কোনো ভূমিকা রাখতে পারেননি। কারণ, পূর্বেই ইতিহাসের ধারাবর্ণনায় আমরা লক্ষ করেছি, তখনকার খলিফাদের প্রকৃতপক্ষে নির্বাহী কোনো ক্ষমতাই ছিল না।
এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে লক্ষণীয় একটি বিষয় হলো, আব্বাসি খিলাফতের প্রথম স্তরে যেসব স্বাধীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটেছিল, সেগুলোর অবস্থান ছিল ইসলামি বিশ্বের পশ্চিম অংশে অর্থাৎ মাগরিব, আফ্রিকা ও আন্দালুস অঞ্চলে। আর এসব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বিভিন্ন আরব বা বার্বার গোত্রের চেষ্টায়।
কিন্তু পরবর্তী সময়ে যখন আব্বাসি খিলাফতব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন এর অনিবার্য প্রতিক্রিয়া হিসেবেই ইসলামি বিশ্বের মূল অংশে অর্থাৎ প্রাচ্যেও বিভিন্ন স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে। আর যেহেতু এ অঞ্চলের অধিকাংশ জনগণ ছিল পারসিক বা তুর্কি বংশোদ্ভূত, তাই স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্রগুলোর প্রতিষ্ঠার পেছনে পারসিক ও তুর্কিদের মূল ভূমিকা ছিল। একে কেন্দ্র করে পারসিক বা তুর্কিদের সাম্প্রদায়িকতার অপরাধে অভিযুক্ত করা মোটেও সমীচীন নয়। কারণ, যতদিন কেন্দ্রীয় খিলাফতব্যবস্থা শক্তিশালী ও ক্রিয়াশীল ছিল, ততদিন তারা এরূপ কিছু করার চিন্তাও করেনি। কিন্তু খিলাফতের মূলকেন্দ্র যখন দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন কুফরি শক্তির মোকাবিলা ও ইসলামি বিজয়াভিযানের ধারা অব্যাহত রাখার অনিবার্য দাবিতেই শক্তিশালী বিভিন্ন রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে। গজনবি, সেলজুক, জিনকি, আইয়ুবি, মামলুক ইত্যাদি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার পেছনে বিভক্তি-চিন্তা নয়; বরং এই কল্যাণচিন্তাই কার্যকর ছিল।
এই পরিচ্ছেদে আমরা এ জাতীয় স্বাধীন সবগুলো রাষ্ট্রের আলোচনা করব না। আমরা আমাদের আলোচনা এমন গোটা দশেক রাষ্ট্রের বিবরণীতে সীমাবদ্ধ রাখব, মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসে যাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ও অবদান রয়েছে। তবে যেসব রাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের পাশাপাশি কালিক ও স্থানিক বিবেচনায় দীর্ঘতা লাভ করেছিল এবং চলমান ইতিহাসের গতিধারায় অনন্যসাধারণ ভূমিকা রেখেছিল, তাদের আলোচনা এ পরিচ্ছেদে না করে সামনে আলাদা আলাদা পরিচ্ছেদে করা হবে।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 ঘুরি রাষ্ট্র

📄 ঘুরি রাষ্ট্র


তাজিক বংশোদ্ভূত একটি পরিবারের নাম শানিসবানি। শানিসবানি পরিবার (বর্তমান আফগানিস্তানের অন্তর্গত) গজনি ও হেরাতের মধ্যবর্তী ঘুর নামক এলাকায় বসবাস করত বলে তাদের প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র 'ঘুরি রাষ্ট্র' নামে পরিচিত হয়। পাহাড়ি উপত্যকাবেষ্টিত ঘুর অত্যন্ত শীতল ও নির্জন একটি অঞ্চল।
ঘুরি (শানিসবানি) পরিবার ছিল গজনবি রাজপরিবারের অনুগত ও আস্থাভাজন একটি পরিবার। এরই প্রেক্ষিতে গজনবি রাজপরিবার ঘুরি পরিবারকে বিভিন্ন অঞ্চলের প্রশাসনিক দায়িত্ব প্রদান করে। পরবর্তী সময়ে ঘুরি প্রশাসকগণ নিজেদের জন্য স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেন। ততদিনে গজনবি রাষ্ট্রের শাসনব্যস্থা দুর্বল হয়ে পড়ায় তৎকালীন ঘুরি প্রশাসক মুহাম্মাদ ঘুরি গজনবি রাষ্ট্রে হামলা চালিয়ে গজনি নগরী দখল করে নেন। এরপর থেকে গজনবি-ঘুরি সংঘাত চলতে থাকে এবং ৫৮২ হিজরি সনের (১১৮৬ খ্রিষ্টাব্দের) মধ্যে ঘুরি পরিবার পুরো গজনবি রাষ্ট্র নিজেদের কর্তৃত্বে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়।
ভারতবর্ষে জিহাদ পরিচালনা ও ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে ঘুরি রাজপরিবার ছিল গজনবি রাজপরিবারের স্বার্থক উত্তরসূরি। গজনবি পরিবারের পর ঘুরি পরিবার ভারতবর্ষের শাসনভার গ্রহণ করলে ভারতবর্ষের প্রশাসকগণ মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার চেষ্টা চালায়। একে কেন্দ্র করে ঘুরি বাহিনীর সঙ্গে ভারতবর্ষের হিন্দুদের বেশ কয়েকবার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ৫৯৬ হিজরি সনে (১২০০ খ্রিষ্টাব্দে) হিন্দুরা মুসলমানদের পরাজিত করতে সক্ষম হয় এবং মুসলিম বাহিনীকে প্রায় চল্লিশ মাইল দূর পর্যন্ত তাড়া করে।
পরের বছরই সুলতান মুহাম্মাদ ঘুরি ভারতবর্ষে চলমান বিদ্রোহের চূড়ান্ত দমনের মনস্থ করে এক লক্ষ বিশ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে হিন্দুদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য রওনা হন। ঘুরি বাহিনীর মোকাবিলায় ভারতবর্ষের হিন্দু রাজাগণ তিন লক্ষ সৈন্যের এক বিরাট বাহিনী সমবেত করে। যুদ্ধের দামামা বেজে উঠতেই মুসলিম বাহিনী প্রবল বিক্রমে প্রতিপক্ষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং হাজার হাজার হিন্দু সৈন্যকে হত্যা করে। যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে।
পরবর্তী সময়ে সুলতান মুহাম্মাদ ঘুরি ভারতবর্ষের প্রশাসনদায়িত্ব তার ক্রীতদাস কুতুবুদ্দিন আইবেকের হাতে সোপর্দ করেন। দক্ষ ও প্রাজ্ঞ শাসক কুতুবুদ্দিন আইবেক ভারতবর্ষে ঘুরি রাষ্ট্রের ভীত দৃঢ়করণে কাজ করেন। তিনি দিল্লীকে ভারতবর্ষের রাজধানী নির্বাচিত করেন এবং সেখানে বিখ্যাত কুতুব মিনার মসজিদ নির্মাণ করেন। কুতুবুদ্দিন আইবেকের দক্ষ নেতৃত্বে ভারতবর্ষে ঘুরি পরিবারের বিজয়াভিযান অব্যাহত গতিতে এগিয়ে চলতে থাকে এবং একপর্যায়ে পুরো ভারতবর্ষ ঘুরি রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়।
যদিও ভারতবর্ষে হিন্দু রাজাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি চূর্ণীকরণ এবং অধিকাংশ অঞ্চল জয়ের কৃতিত্ব গজনবি রাজপরিবারের ছিল; কিন্তু গজনবি শাসকগণ এ অঞ্চলে অবস্থান করতেন না; বরং অভিযান শেষেই গজনিতে ফিরে যেতেন। বিপরীতে ভারতবর্ষে ইসলামি শাসন সুদৃঢ় ও স্থায়ীকরণের কৃতিত্ব ঘুরি পরিবারের প্রাপ্য। তারা দিল্লীকে রাজধানী নির্বাচন করে স্থায়ীভাবে ভারতবর্ষে অবস্থান করেন। এ কারণে ঘুরি রাষ্ট্রকেই ভারতবর্ষের প্রথম ইসলামি রাষ্ট্র গণ্য করা হয় এবং তাদের মাধ্যমেই ভারতবর্ষের ইসলামি ইতিহাসের সূচনা হয়।
৬০২ হিজরি সনে (১২০৬ খ্রিষ্টাব্দে) সুলতান মুহাম্মাদ ঘুরির মৃত্যুর পর তার ক্রীতদাস কুতুবুদ্দিন আইবেক নিজেকে হিন্দুস্তানের স্বাধীন সুলতান ঘোষণা করেন। এর মাধ্যমে ৬০২ হিজরি সন হতে ভারতবর্ষে মামলুক সাম্রাজ্যের সূচনা হয়। মামলুক সুলতানগণ রাজ্যবিস্তারের পরিবর্তে আপন কর্তৃত্বাধীন অঞ্চল নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতেন। ৬৮৬ হিজরি সনে (১২৮৭ খ্রিষ্টাব্দে) খিলজি পরিবারের হাতে ভারতবর্ষের মামলুক সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।
***
এ পর্যন্ত আব্বাসি খিলাফত আমলে প্রতিষ্ঠিত উল্লেখযোগ্য কিছু রাষ্ট্রের পরিচিতি সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো। সামনের পরিচ্ছেদগুলোতে একইসময়ে প্রতিষ্ঠিত আরও কয়েকটি রাষ্ট্র ও সাম্রাজ্যের ইতিহাস কিছুটা বিশদ আকারে ভিন্ন ভিন্ন পরিচ্ছেদে তুলে ধরা হবে। কারণ, স্থান ও কালের পরিধি বিবেচনায় এবং ইসলামি ইতিহাসের পট পরিবর্তনে এসব রাষ্ট্র ও সাম্রাজ্যের ভূমিকা ও অবদান স্বতন্ত্র আলোচনার দাবি রাখে।
***

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00