📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 মুসতাসিম বিল্লাহ আবু আহমাদ আবদুল্লাহ

📄 মুসতাসিম বিল্লাহ আবু আহমাদ আবদুল্লাহ


মুসতাসিম বিল্লাহ ৬০৯ হিজরি সনে জন্মগ্রহণ করেন। ৬৪০ হিজরি সনে তার পিতা খলিফা মুসতানসিরের ইন্তেকাল হলে একত্রিশ বছর বয়সে তিনি বাগদাদে আব্বাসি খিলাফতের হাল ধরেন।
খলিফা মুসতাসিম বিল্লাহর বংশপরম্পরা হলো— মুসতাসিম বিন মুসতানসির বিন যাহির বিন নাসির বিন মুসতাযি বিন মুসতানজিদ বিন মুকতাফি বিন মুসতাযহির বিন মুকতাদি বিন যাখিরুদ্দিন বিন কায়িম বিন কাদির বিন ইসহাক বিন মুকতাদির বিন মুতাযিদ বিন তালহা (মুওয়াফফাক বিল্লাহ) বিন মুতাওয়াক্কিল বিন মুতাসিম বিন হারুনুর রাশিদ বিন মাহদি বিন মানসুর।
অর্থাৎ তার সরাসরি ঊর্ধ্বতন বিশজন পূর্বপুরুষের মধ্যে যাখিরুদ্দিন, ইসহাক ও তালহা বাদে বাকি সতেরোজনই খলিফা ছিলেন। কিন্তু এই সুউচ্চ বংশমর্যাদা ও পিতৃপরিচয় আল্লাহর দরবারে তার কোনো কাজে আসেনি।
তাতার শাসক হালাকু খানের (১৩৯) সামনে তাকে হত্যা করা হয় আর এর মাধ্যমে বাগদাদে আব্বাসি খিলাফতের ইতি ঘটে।
খলিফা মুসতাসিম ধার্মিক, সংযমী ও সচ্চরিত্র ছিলেন। তিনি মুখস্থ ও বিশুদ্ধ তেলাওয়াতের অধিকারী ছিলেন। বিশিষ্ট মুহাদ্দিস শারফুদ্দিন দিময়াতি রহ. তার সনদে ৪০টি হাদিস বর্ণনা করেছেন। তার হাদিস বর্ণনার ইজাজত (শাস্ত্রীয় অনুমতি) ছিল। তার থেকে অনেকেই হাদিস বর্ণনার ইজাজত লাভ করেছেন। তবে তার দূরদর্শিতা ও সাহসের অভাব ছিল।
খলিফা মুসতাসিমের উজির ছিল মুআইয়াদুদ্দিন মুহাম্মাদ বিন আলকামি। সে ছিল কট্টরপন্থি শিয়া মতান্তরে ইহুদি বংশোদ্ভূত। স্বাভাবিকভাবেই তার অন্তরে আব্বাসি খিলাফতের প্রতি বিদ্বেষ লুকিয়ে ছিল এবং সে যেকোনো মূল্যে আব্বাসি খিলাফত ধ্বংস করে প্রতিশোধ নিতে উদ্‌গ্রীব ছিল। উজির আলকামিই তাতারদের কাছে মুসলিম সাম্রাজ্যের যাবতীয় গোপন তথ্য সরবরাহ করত এবং তাতারদের কর্মতৎপরতার সংবাদ খলিফার কাছে পৌঁছতে বাধা দিত।
প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনে কাছির রহ.-এর বর্ণনার মাধ্যমেই আমরা বাগদাদকেন্দ্রিক আব্বাসি খিলাফতের আলোচনার ইতি টানতে চাই। তিনি বাগদাদে তাতারদের প্রবেশের বিবরণ উল্লেখ করতে গিয়ে লিখেছেন-
এরপর এলো ৬৫৬ হিজরি। এ বছরই তাতাররা বাগদাদ দখল করে এবং বাগদাদের অধিকাংশ নাগরিককে হত্যা করে। তারা খলিফাকেও হত্যা করে। আর এর মাধ্যমেই বাগদাদে বনু আব্বাসের সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত পতন ঘটে।
বছরের শুরুতেই তাতার শাসক হালাকু খানের বাহিনীর অগ্রবর্তী অংশ দুজন সেনাপতির নেতৃত্বে বাগদাদে অবতরণ করে। মসুলের শাসক তাদেরকে বাগদাদবাসীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য হাদিয়া-তোহফা দিয়ে সহায়তা করেছিল। (১৪০) এর মাধ্যমে সে তাতারি আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে এবং তাদের মনস্তুষ্টি অর্জন করতে চেয়েছিল। আল্লাহ তাদেরকে লাঞ্ছিত করুন। (তাতার বাহিনীর আগমনের সংবাদ পেয়ে) পুরো বাগদাদকে নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেওয়া হয়, মিনজানিক ও অন্যান্য প্রতিরোধক অস্ত্র স্থাপন করা হয়। কিন্তু এসব অস্ত্রের কি ক্ষমতা আছে আল্লাহ-নির্ধারিত তাকদিরের প্রতিরোধ করার?! যেমন এক বর্ণনায় আছে—
«لَنْ يُغْنِيَ حَذَرُ عَنْ قَدَرٍ»
তাকদিরের সামনে কোনো ধরনের তাদবির ও সতর্কতা কাজে আসে না।
আল্লাহ তাআলা যেমন পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন—
إِنَّ أَجَلَ اللَّهِ إِذَا جَاءَ لَا يُؤَخِّرُ
নিশ্চয়ই আল্লাহর নির্ধারিত কাল যখন এসে যায়, তখন আর তা বিলম্বিত হয় না। [সুরা নূহ: ০৪]
তাতাররা খলিফার বাসগৃহ অবরোধ করে চতুর্দিক থেকে তির নিক্ষেপ করতে শুরু করে। একটি তির খলিফার সামনে ক্রীড়ারত জনৈকা ক্রীতদাসীর শরীরে বিদ্ধ হয়। এই দাসীটি ছিল খলিফার অন্যতম মূল্যবান ও উৎকৃষ্ট দাসী। জানালা দিয়ে ভেতরে ঢুকে তিরটি তার গায়ে বিদ্ধ হতেই সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। সে তখন খলিফার সামনে নৃত্য করছিল এবং খলিফাকে আনন্দ দিচ্ছিল। খলিফা এতে প্রচন্ড ভয় পেয়ে যান। বিদ্ধ হওয়া তিরটি খলিফার সামনে উপস্থিত করা হয়। তাতে লেখা ছিল—
'আল্লাহ যখন নিজ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ইচ্ছা করেন, তখন বুদ্ধিমানদের বিবেকবুদ্ধি বিলোপ করে দেন।'
এরপর খলিফা প্রহরা ও সতর্কতা বৃদ্ধির নির্দেশ প্রদান করেন। পুরো প্রাসাদকে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাপর্দায় ঢেকে দেওয়া হয়।
এ বছরেরই ১২ মুহাররম হালাকু খান তার পুরো বাহিনী নিয়ে বাগদাদে উপস্থিত হয়। তার বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ছিল প্রায় দুই লক্ষ। হালাকু খান খলিফার প্রতি প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ ছিল। এর কারণ হলো, হালাকু খান যখন প্রথমবার হামাদান থেকে ইরাক অভিমুখে রওনা হয়েছিল, তখন উজির মুআইয়াদুদ্দিন বিন আলকামি খলিফাকে পরামর্শ দিয়েছিল যে, তিনি যেন হালাকু খানের কাছে অতি মূল্যবান কিছু উপঢৌকন প্রেরণ করেন এবং এর মাধ্যমে তোষামোদ করে হালাকু খানকে বাগদাদে আক্রমণ করা হতে নিবৃত্ত রাখেন। কিন্তু খলিফার নবীন দুআইদার (লিপিকার ও বার্তাপ্রেরক) আইবেকসহ অনেকে খলিফাকে এরূপ করতে নিষেধ করেন। তারা খলিফাকে বোঝান যে, উজির ইবনুল আলকামি মূলত এর মাধ্যমে তাতার সম্রাটের আস্থাভাজন হতে চাচ্ছে। তারা খলিফাকে সামান্যকিছু হাদিয়া পাঠানোর পরামর্শ দেন। খলিফা যৎসামান্য হাদিয়া পাঠালে হালাকু খান অপমানিত বোধ করেন এবং খলিফার কাছে বার্তা পাঠিয়ে আইবেক ও সুলায়মান শাহকে তার হাতে তুলে দিতে বলেন। কিন্তু খলিফা তাদেরকে পাঠাতে সম্মত হননি।
যাই হোক, হালাকু খান তার খোদাদ্রোহী-অত্যাচারী বিশাল বাহিনী নিয়ে বাগদাদে উপস্থিত হয়। তারা না আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখত, না পরকালের প্রতি। হালাকু বাহিনী পূর্ব-পশ্চিম উভয় দিক থেকে বাগদাদ ঘেরাও করে ফেলে। বাগদাদের সেনাবাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ছিল খুবই অল্প, একেবারেই নগণ্য। অশ্বারোহী সৈন্য দশ হাজারও ছিল না। তাদেরকে ও অন্যান্য সৈনিকদেরকে কিছুদিন পূর্বেই জায়গির হতে বঞ্চিত করা হয়েছিল। তাই তারা বাধ্য হয়ে বাজারঘাট ও বিভিন্ন মসজিদের দরজায় ভিড় করে ভিক্ষা করছিল। পেশাদার কবিরা তাদের মাঝে ঘুরে-ফিরে সান্ত্বনামূলক এবং ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য শোকপ্রকাশক বিভিন্ন কবিতা পাঠ করছিল। এ সবকিছু হচ্ছিল রাফিজি উজির ইবনুল আলকামির নির্দেশনায়।
পূর্ববর্তী বছর সুন্নি ও রাফিজিদের মধ্যে বিরাট সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল। তখন কারখসহ রাফিজিদের বিভিন্ন এলাকায় লুটপাট হয়, এমনকি উজির ইবনুল আলকামির নিকটজনদের অনেকের ঘরেও লুটপাট হয়। এতে তার ক্রোধ আরও বৃদ্ধি পায় এবং সে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে এমন ভয়ানক ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে থাকে, যার পরিণতি এত ভয়াবহ যে, বাগদাদ নগরীর পত্তনকাল হতে আজ পর্যন্ত এরূপ ভয়াবহ ঘটনা সংঘটিত হয়নি।
এ কারনেই তাতার বাহিনী বাগদাদ অবরোধ করার পর বাগদাদ হতে সবার আগে যে তাতারদের উদ্দেশে বের হয়ে আসে, সে হলো এই ইবনুল আলকামি।
ইবনুল আলকামি তার পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজন, সেবক ও অনুচরদের নিয়ে তাতার শিবিরে পৌঁছে যায় এবং সম্রাট হালাকু খানের সঙ্গে মিলিত হয়। আল্লাহ তার প্রতি অভিসম্পাত করুন। এরপর সে ফিরে আসে এবং খলিফাকে হালাকু খানের সামনে উপস্থিত হয়ে সন্ধি আলোচনায় প্রতিনিধিত্ব করার পরামর্শ দেয়।
সে প্রস্তাব দেয়, খলিফা যেন ইরাকের বার্ষিক খারাজের অর্ধেক খলিফার থাকবে আর অর্ধেক তাতারদেরকে প্রদান করা হবে— এই শর্তে সন্ধি করেন। খলিফা মুসতাসিম কাজি, ফকিহ, সুফি এবং রাষ্ট্রের নেতৃস্থানীয় ও পদস্থ ব্যক্তিবর্গের সাতশ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে হালাকু খানের সঙ্গে সাক্ষাতের লক্ষ্যে বের হন। প্রতিনিধিদল হালাকু খানের তাঁবুর কাছে পৌঁছলে প্রহরীরা খলিফাকে বাধা প্রদান করে এবং মাত্র সতেরোজনকে সঙ্গে নিয়ে ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেয়। খলিফা সতেরোজনকে বাছাই করে তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেন। বাকিদেরকে বাহন থেকে নামিয়ে সঙ্গে থাকা আত্মরক্ষার সবকিছু কেড়ে নেওয়া হয় এবং একে একে সকলকে হত্যা করা হয়। এরপর খলিফাকে হালাকু খানের সামনে উপস্থিত করা হয়।
হালাকু খান তাকে বিভিন্ন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। কথিত আছে, হালাকু খানের প্রতাপের সামনে প্রচণ্ড ভীত খলিফার কথা বারবার জড়িয়ে আসছিল।
এরপর খলিফা খাজা নাসিরুদ্দিন তুসি ও উজির ইবনুল আলকামিসহ অন্যদের সঙ্গে বাগদাদে ফিরে আসেন। খলিফাকে প্রহরা দিয়ে নিয়ে আসা হয়। খলিফা রাজপ্রাসাদ হতে স্বর্ণ, অলংকার, দামি রত্ন ও অন্যান্য মূল্যবান সম্পদ উপস্থিত করেন।
উক্ত রাফিজি দল ও অন্যান্য মুনাফিকরা হালাকু খানকে খলিফার সঙ্গে সন্ধি না করার পরামর্শ দেয়। উজির ইবনুল আলকামি তাকে বলে, 'অর্ধেক খারাজ প্রদানের চুক্তি করা হলে তা সর্বোচ্চ এক-দুই বছর টিকবে। তারপর অবস্থা যেমন ছিল, তেমন হয়ে যাবে।' তারা হালাকু খানকে বোঝায় যে, সন্ধি করার পরিবর্তে খলিফাকে হত্যা করাই শ্রেয়তর হবে। খলিফা যাবতীয় মূল্যবান সম্পদ নিয়ে হালাকু খানের কাছে উপস্থিত হলে তিনি খলিফাকে হত্যা করার নির্দেশ দেন। কথিত আছে, খলিফাকে হত্যা করার পরামর্শ উজির ইবনুল আলকামি ও নাসিরুদ্দিন তুসিই দিয়েছিল।
হালাকু খান যখন আলমুত দুর্গ জয় করেন এবং ইসমাইলিদের হাত থেকে তা কেড়ে নেন, তখন থেকেই নাসিরুদ্দিন তুসি হালাকু খানের সঙ্গী হয়েছিল। হালাকু খান তাকে নিজের উপদেষ্টা-উজির মনোনীত করেন। হালাকু খান যখন খলিফাকে হত্যা করতে দ্বিধা ও ভয় করছিলেন, তখন নাসিরুদ্দিন তুসি হালাকু খানকে বারবার প্ররোচিত করে উৎসাহ জোগাতে থাকে। সে হালাকু খানকে বলে, 'খলিফাকে অস্ত্রাঘাতে হত্যা না করে বরং বস্তায় ভরে উপর্যুপরি পদাঘাতে হত্যা করা হোক। এর ফলে তার রক্ত মাটিতে পতিত হবে না এবং পরবর্তীকালে তার প্রতিশোধও নেওয়া হবে না!'
খলিফাকে কীভাবে হত্যা করা হয়েছিল, তা নিয়ে অবশ্য বিভিন্ন মতামত পাওয়া যায়। অনেকেই বস্তায় ভরে পদাঘাতের কথা বললেও কেউ কেউ শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করার কথাও বলেছেন। আবার অনেকের ধারণা, খলিফাকে পানিতে ডুবিয়ে হত্যা করা হয়। সঠিক তথ্য সম্পর্কে একমাত্র আল্লাহ তাআলা অবগত।
নিঃসন্দেহে খলিফাসহ যাদেরকে হত্যা করা হয়েছে, অর্থাৎ নেতৃস্থানীয় উলামায়ে কেরাম, বিচারক, রাজপরিবারের সদস্য, রাষ্ট্রের নেতৃস্থানীয় নেতৃবৃন্দ—তাদের সকলের গোনাহর বোঝা হত্যাকারীরা বহন করবে। এরপর হালাকু বাহিনী পুরো বাগদাদে ছড়িয়ে পড়ে এবং নারী-পুরুষ, শিশু-তরুণ-বৃদ্ধ-বয়োবৃদ্ধ- নির্বিচারে সকলকে হত্যা করে। আত্মরক্ষার জন্য অনেকে কূপ, ঝোপঝাড় ও ময়লার স্তুপের মধ্যে দিনের পর দিন লুকিয়ে ছিল। অনেকে দরজা বন্ধ করে গৃহাভ্যন্তরেই অবস্থান করছিল। তাতাররা দরজা ভেঙে বা দরজায় আগুন লাগিয়ে সেসব ঘরে প্রবেশ করে। অনেকে পালিয়ে বিভিন্ন উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছিল। হালাকু বাহিনী ছাদ ভেঙে ফেলে তাদেরকেও হত্যা করে। নিহত মানুষের রক্তে অলিগলির নালাগুলোতে রক্তের ধারা প্রবাহিত হচ্ছিল। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
যারা মহল্লার মসজিদ, জামে মসজিদ বা খানকায় আশ্রয় নিয়েছিল, তারাও নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়। হত্যাযজ্ঞ থেকে রেহাই পেয়েছিল কেবল ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা; তাদের কাছে আশ্রয় গ্রহণকারীরা, উজির ইবনুল আলকামির গৃহে আশ্রয়গ্রহণকারীরা এবং অল্প কয়েকজন ব্যবসায়ী, যারা প্রচুর পরিমাণ সম্পদ প্রদান করে নিজেদের জানমালের নিরাপত্তা লাভ করেছিল। যে সুবিশাল নগরী ছিল লক্ষ মানুষের কলতানে মুখরিত অনিন্দ্য ও মনোরম এক নগরী, সেই বাগদাদ এমন ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয় যে, মনে হচ্ছিল—এখানে হাতেগোনা গুটিকয়েক মানুষই বসবাস করে!
যারা বেঁচে ছিল, তারাও ছিল ভয় ও ক্ষুধা, লাঞ্ছনা ও বিচ্ছিন্নতায় আক্রান্ত। এ ঘটনার অনেক আগ থেকেই উজির ইবনুল আলকামি সৈন্যসংখ্যা হ্রাস করার এবং সরকারি তালিকা থেকে তাদের নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। খলিফা মুসতানসিরের আমলের শেষদিকেও সৈন্যসংখ্যা ছিল প্রায় এক লক্ষের মতো। তাদের মধ্যে অনেকেই ছিল আমির পদমর্যাদার অধিকারী, যারা গভর্নরদের ন্যায় মর্যাদা লাভ করত। ইবনুল আলকামি তার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখে এই সুবিশাল সেনাবাহিনীর সৈন্যসংখ্যা কমিয়ে দশ হাজারে নিয়ে আসে। (১৪১)
এরপর সে উপর্যুপরি পত্রপ্রেরণের মাধ্যমে তাতারদেরকে বাগদাদ দখল করতে প্ররোচিত করতে থাকে। সে তাদেরকে বোঝায় যে, এখন বাগদাদ দখল করা একেবারেই সহজ, বাগদাদের প্রকৃত নিরাপত্তাব্যবস্থা, সেনাবাহিনী ও সেনাপতিদের অবস্থা বড় দুর্বল। তার উদ্দেশ্য ও চাওয়া ছিল বাগদাদের মাটিতে সুন্নাহকে সম্পূর্ণরূপে নিঃশেষ করে দেওয়া, রাফিজি বিদআত প্রতিষ্ঠা করা, উবায়দি কোনো ব্যক্তিকে খলিফা পদে অধিষ্ঠিত করা এবং আলিম-উলামা ও মুফতিদেরকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়া। কিন্তু মহান আল্লাহ তো আপন বিষয়ে পূর্ণ ক্ষমতাবান। তিনি ইবনুল আলকামির ষড়যন্ত্র তার বিরুদ্ধেই চাপিয়ে দেন, মর্যাদাপূর্ণ জীবনের পর লাঞ্ছনার জীবন দান করেন এবং তাকে খলিফার উজিরের পদ থেকে তাতারদের চাকর ও কুমন্ত্রণাদাতায় পরিণত করেন। বাগদাদে যত নারী-পুরুষ, আবালবৃদ্ধবনিতা নির্মম হত্যাযজ্ঞের শিকার হয়েছে, সকলের গুনাহর বোঝাও তার ঘাড়ে বর্তেছে। বিধান তো একমাত্র আল্লাহ তাআলার; যিনি সুমহান, যিনি আসমান-জমিনের প্রতিপালক।
এই মহাদুর্যোগে বাগদাদে কী পরিমাণ মুসলমান নিহত হয়েছিল, তা নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। আট লক্ষ, আঠারো লক্ষ, বিশ লক্ষ—এ রকম বিভিন্ন মতামত পাওয়া যায়। নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য আর আমরাও তার কাছেই ফিরে যাব।
তাতাররা বাগদাদে প্রবেশ করেছিল মুহাররম মাসে। এরপর একটানা চল্লিশ দিন চলে হত্যাযজ্ঞ। আমিরুল মুমিনিন মুসতাসিম বিল্লাহকে হত্যা করা হয় সফর মাসের চৌদ্দ তারিখ বুধবার। তার কবরের কোনো চিহ্ন রাখা হয়নি। এ সময় তার বয়স ছিল ছেচল্লিশ বছর চার মাস। তার খিলাফতকালের পরিধি ছিল পনেরো বছর আট মাসের সামান্য বেশি। তার সঙ্গে তার বড় পুত্র আবুল আব্বাস আহমাদকে হত্যা করা হয়, যার বয়স ছিল পঁচিশ বছর। এরপর হত্যা করা হয় মেজো পুত্র আবুল ফজল আবদুর রহমানকে, যার বয়স ছিল তেইশ বছর। কনিষ্ঠ পুত্র মুবারক ও তিন কন্যা ফাতিমা, খাদিজা ও মরিয়মকে বন্দি করা হয়। কথিত আছে—রাজপ্রাসাদ থেকে আরও বন্দি করা হয় প্রায় এক হাজার ক্রীতদাসীকে। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
খলিফার বাসগৃহের শিক্ষক শায়খ মুহিউদ্দিন ইউসুফ বিন শায়খ আবুল ফরজ ইবনুল জাওযিকে হত্যা করা হয়। তিনি ইবনুল আলকামির ঘোর বিরোধী ছিলেন। তার তিন পুত্র আবদুল্লাহ, আবদুর রহমান ও আবদুল কারিমকেও হত্যা করা হয়। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদধারী ব্যক্তিদেরকেও একের পর এক হত্যা করা হয়। যেমন : দুআইদার আস-সাগির মুজাহিদুদ্দিন আইবেক, শিহাবুদ্দিন সুলায়মান শাহ, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর বিভিন্ন আমির এবং নগরীর বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। রাজপ্রাসাদ হতে রাজপরিবারের একজন একজন করে আহ্বান করা হতো। যাকে আহ্বান করা হতো, সে তার স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে বের হয়ে এলে তাকে খিলাল কবরস্তানে নিয়ে যাওয়া হতো এবং বকরির ন্যায় জবাই করা হতো। তার কন্যা ও দাসীদের মধ্য হতে তাতাররা যাদেরকে নির্বাচন করত, তাদেরকে বন্দি করা হতো।
বাগদাদের মহান শায়খ ও খলিফার রাজশিক্ষক সদরুদ্দিন আলি ইবনুন নাইয়ারকেও হত্যা করা হয়। বেছে বেছে হত্যা করা হয় খতিব, ইমাম ও কুরআনের হাফিজদেরকে। দীর্ঘ কয়েক মাস বাগদাদের মসজিদগুলো বিরান পড়ে ছিল। নামাজের জামাত বা জুমা কিছুই আদায় করা হয়নি। উজির ইবনুল আলকামি (আল্লাহ তাআলা তার অনিষ্ট করুন, তাকে অভিশপ্ত করুন) চেয়েছিল, বাগদাদের মসজিদ, মাদরাসা ও খানকাগুলো যেন বিরান হয়ে যায় আর মাজার ও রাফিজি মহল্লাগুলো যেন আবাদ থাকে। সে রাফিজিদের জন্য একটি বিশাল ও শানদার মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল, যেখান থেকে রাফিজিরা তাদের নীতি ও আদর্শ প্রচার করবে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা তাকে সেই তাওফিক দান করেননি। বরং তার থেকে আপন নিয়ামত ছিনিয়ে নিয়েছেন এবং এই ঘটনার কয়েক মাসের মধ্যেই তাকে দুনিয়া থেকে তুলে নিয়েছেন। এর কিছুদিন পর তার পুত্রও পিতার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তর সম্পর্কে আল্লাহই সর্বজ্ঞ!
তাকদির-নির্ধারিত ধ্বংসযজ্ঞ যখন শেষ হয় এবং চল্লিশ দিন পূর্ণ হয়, বাগদাদ তখন বিরান। অতি অল্প সংখ্যক লোকই বেঁচে ছিল। পথেঘাটে টিলার ন্যায় লাশের স্তুপ পড়ে ছিল। এরপর বৃষ্টি হওয়ায় লাশগুলো বিকৃত হয়ে যায় এবং বাতাস লাশের দুর্গন্ধে ভারী হয়ে যায়। আবহাওয়া দূষিত হয়ে পড়ে এবং মহামারি ছড়িয়ে পড়ে। সুদূর শাম পর্যন্ত সকল এলাকার বাতাস দূষিত হয়ে পড়ে। আবহাওয়ার পরিবর্তন ও দূষিত বাতাসের কারণে বিভিন্ন অঞ্চলে অনেক মানুষ মারা যায়। অনেক স্থানে দুর্মূল্য, মহামারি ও প্লেগের কারণে গণমৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
এরপর যখন বাগদাদে নিরাপত্তার ঘোষণা প্রদান করা হয়, তখন বিভিন্ন গর্ত ও কবরস্তান থেকে লুকিয়ে থাকা মানুষেরা বের হয়ে আসে। তাদেরকে দেখে মনে হচ্ছিল, যেন মৃত মানুষ কবর থেকে বের হয়ে আসছে! একে অপরকে চিনতে পারছিল না। বাবা ছেলেকে, ভাই ভাইকে চিনছিল না। দূষিত আবহাওয়ার শিকার হয়ে তারাও মৃত্যুমুখে পতিত হয় এবং পূর্ববর্তীদের সঙ্গে মিলিত হয়। যারা এতদিন ভূপৃষ্ঠে একসঙ্গে জীবনযাপন করত; এবার তারা ভূগর্ভে মিলিত হয় সেই মহান সত্তার হুকুমে, যিনি গোপন ও অতি গোপন—সবকিছুই জানেন। আল্লাহ ব্যতীত আর কোনো উপাস্য নেই। তাঁর আছে সুন্দরতম নামসমূহ।
বাগদাদে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাকারী তাতার সম্রাট হালাকু খান এ বছরের জুমাদাল উলা মাসে বাগদাদ ত্যাগ করে তার রাজধানীতে ফিরে যায়। আর উজির ইবনুল আলকামি; আল্লাহ তাআলা তাকে না ছাড় দিয়েছেন, না ছেড়ে দিয়েছেন। বরং মহা শক্তিমান আল্লাহ তাআলা জুমাদাল উখরার শুরুতেই তেষট্টি বছর বয়সী ইবনুল আলকামিকে পাকড়াও করেছেন। ইবনুল আলকামির রচনা ও সাহিত্যে ব্যুৎপত্তি ছিল। কিন্তু সে ছিল কট্টর শিয়া ও দুষ্ট রাফিজি। দুঃখ, পরিতাপ ও নিরাশাকে সঙ্গী করেই তার মৃত্যু হয় এবং দুর্যোগ তাকে যথাস্থানে পৌঁছিয়ে দেয়। তার মৃত্যুর পর তার পুত্র ইযযুদ্দিন ইবনুল ফজল মুহাম্মাদ উজিরের পদ গ্রহণ করে। কিন্তু একই বছর আল্লাহ তাআলা তাকেও তার পিতার সঙ্গে মিলিত করে দেন। যাবতীয় প্রশংসা ও দয়া আল্লাহরই।
আবু শামা, আমাদের শায়খ আবু আবদুল্লাহ যাহাবি ও কুতুবুদ্দিন ইউনিনি বর্ণনা করেন, এ বছরই (৬৫৬ হিজরি) শামের জনগণ কঠিন মহামারির শিকার হয়। তারা উল্লেখ করেন যে, ইরাকে প্রচুর মানুষ নিহত হওয়ার কারণে বাতাস ও আবহাওয়া দূষিত হয়ে পড়েছিল এবং দূষিত বাতাস শাম পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। আল্লাহই সর্বজ্ঞ। (১৪২)

টিকাঃ
১৩৯. হালাকু খান ছিলেন মোঙ্গল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা চেঙ্গিস খানের পৌত্র।
১৪০. মসুলের তৎকালীন শাসকের নাম ছিল বদরুদ্দিন লুলু। আর্মেনীয় দাস বদরুদ্দিনকে জনৈক দরজি ক্রয় করে মসুলে নিয়ে আসে এবং মসুলের শাসক নুরুদ্দিন আরসালান শাহ বিন ইযযুদ্দিন বিন মাসউদকে উপহার দেয়। সুদর্শন ও প্রখর মেধার অধিকারী বদরুদ্দিন অল্পদিনের মধ্যেই নুরুদ্দিনের আস্থাভাজন হয়ে যায় এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিতে পরিণত হয়। পরবর্তী সময়ে সে নুরুদ্দিনের সকল পুত্রকে হত্যা করে নিজেই মসুলের শাসক পদে অধিষ্ঠিত হয়। শিয়া মতাদর্শী বদরুদ্দিন একটানা প্রায় পঞ্চাশ বছর মসুল শাসন করে। সে প্রতিবছর আলি রাযি.-এর মাজারে এক হাজার দিনার ওজনের স্বর্ণ প্রেরণ করত। বাগদাদ ধ্বংসের পর হালাকু খান যখন বাগদাদ ত্যাগ করেন, তখন বদরুদ্দিন তার খেদমতে উপস্থিত হয়ে তার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে।
১৪১. উজির ইবনুল আলকামি যখন হালাকু খানকে বাগদাদ হামলায় প্ররোচিত করে পত্র পাঠান, তখন হালাকু খান প্রথমে রাজি হতে চাননি। পরে তিনি তার উজির নাসিরুদ্দিন তুসির অব্যাহত প্ররোচনায় রাজি হলেও শর্তারোপ করেন যে, ইবনুল আলকামিকে অবশ্যই যেকোনো মূল্যে বাগদাদের সেনাবাহিনী সংকুচিত করে ফেলতে হবে।
১৪২. ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১৩/১৭৯-১৮২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00