📄 মুকতাদি বি আমরিল্লাহ আবুল কাসিম আবদুল্লাহ
দ্বাদশ আব্বাসি খলিফা মুসতাইন, ষোড়শ আব্বাসি খলিফা মুতাযিদ ও ২৫ নং আব্বাসি খলিফা কাদির বিল্লাহর ন্যায় ২৭ নং আব্বাসি খলিফা মুকতাদি বি আমরিল্লাহর পিতাও খলিফা ছিলেন না। তার পিতা আমির যাখিরুদ্দিন আবুল কাসিম মুহাম্মাদ নিজ পিতা খলিফা কায়িম বি আমরিল্লাহর জীবদ্দশায় ইন্তেকাল করেন। মুকতাদি বি আমরিল্লাহ ৪৪৮ হিজরি সনে জন্মগ্রহণ করেন এবং ৪৬৭ হিজরি সনে উনিশ বছর বয়সে খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
মুকতাদি জন্মের পূর্ব থেকেই এতিম ছিলেন। তিনি তার পিতামহ আল- কায়িম বি আমরিল্লাহর যথার্থ তত্ত্বাবধানে তাঁরই গৃহে প্রতিপালিত হন। তিনি বীর-সাহসী ছিলেন। তাঁর শাসনকাল ছিল অত্যন্ত বরকতময়। সম্পদের প্রাচুর্য ছিল। খিলাফত ও খলিফা সকলের কাছে সম্মানের পাত্র ছিল। বিভিন্ন অঞ্চলের সুলতান ও শাসকগণ খলিফাকে শ্রদ্ধা করত এবং তাঁর সম্মুখে বিনীত আচরণ করত। মক্কা-মদিনা, বাইতুল মুকাদ্দাস ও পুরো শাম অঞ্চলে খলিফার নামে খুতবা পাঠ করা হতো। তাঁর আমলে মুসলিম অভিযাত্রীগণ শত্রুর হাত থেকে এডেসা ও এন্টিয়ক অঞ্চল পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়। বাগদাদ ও অন্যান্য নগরী পুনঃআবাদ হয়।
খলিফা মুকতাদিরের আমলে উজির ও কাজিগণ ছিলেন তৎকালীন সমাজের শ্রেষ্ঠতম মানুষ। তিনি তাঁর খিলাফতকালের শুরুর দিকেই দুশ্চরিত্রা নারীদেরকে বাগদাদ থেকে বের করে দেন। খলিফা বাগদাদ থেকে পানশালা, পতিতালয় ও গান-বাদ্যের আসর উচ্ছেদ করেন।
তৎকালীন সেলজুক সুলতান মালিক শাহও ছিলেন ন্যায়পরায়ণ ও নির্ভীক সুলতান। তিনি যে অঞ্চল অভিমুখে অভিযান পরিচালনা করতেন, তা-ই জয় করতেন। প্রাচ্য-প্রতীচ্যের শাসকগণ তার বশীভূত হয়। মালিক শাহর আমলে সেলজুক রাষ্ট্র পূর্বে চীন হতে পশ্চিমে শামের শেষ প্রান্তে মর্মর সাগর পর্যন্ত এবং উত্তরে ইসলামি ভূখণ্ডের শেষ সীমা হতে দক্ষিণে ইয়ামেনের শেষ সীমা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। এই সুবিশাল ইসলামি ভূখণ্ডের সর্বত্র জুমার খুতবায় তার নাম উচ্চারিত হতো। বাইজান্টাইন সম্রাট তার কাছে নিয়মিত জিজিয়া প্রেরণ করতেন। মালিক শাহর এই সাম্রাজ্যই ইতিহাসে ‘বৃহত্তর সেলজুক সাম্রাজ্য' নামে খ্যাত।
এ সময় বাগদাদের উজির ছিলেন নিজামুল মুলক কিওয়ামুদ্দিন আবু আলি হাসান বিন আলি বিন ইসহাক রাযিউ আমিরিল মুমিনিন। তিনি সমকালের শ্রেষ্ঠতম আলিমগণের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন এবং বিদ্যানুরাগী ছিলেন। তার মজলিস সর্বদা কারি, ফকিহ, শাস্ত্রজ্ঞ ও বুজুর্গদের পদচারণায় মুখরিত থাকত। নিজামুল মুলক মুসলিম উম্মাহর কল্যাণে এক অসাধারণ খেদমতের আঞ্জাম দেন। তিনি বাগদাদ, বলখ, নিশাপুর, হেরাত, ইস্পাহান, বসরা, মার্ভ, আমিল ও মসুলসহ সেলজুক সাম্রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় অনেকগুলো মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। তার প্রতি সম্বন্ধিত হয়ে মাদরাসাগুলো ‘নিজামিয়া মাদরাসা' নামে খ্যাতি লাভ করে। জাতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অংশ হিসেবে প্রতিটি মাদরাসায় শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা ও আবাসনের সুলভ ব্যবস্থা ছিল। প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে মাসিক ভাতাও প্রদান করা হতো। উজির নিজামুল মুলক মাদরাসাগুলোতে অধ্যাপনার জন্য ইসলামি বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে যুগশ্রেষ্ঠ আলিম ও বিদ্বানদের খুঁজে নিয়ে আসতেন। হাদিস, ফিকহসহ বিভিন্ন শাস্ত্রের খ্যাতনামা আলিমগণ নিজামিয়া মাদরাসাসমূহে পাঠদান করতেন। (১২৬) তৎকালে ইসলামি ভূখণ্ডের বিভিন্ন অঞ্চলে ফিতনারূপে ছড়িয়ে পড়া শিয়া মতাদর্শ ও বাতিনি চিন্তাধারার বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধে এসব প্রতিষ্ঠানের অনস্বীকার্য ভূমিকা ছিল। (১২৭)
মহান খলিফা, ন্যায়পরায়ণ সুলতান ও বিদ্যানুরাগী উজিরের এই হৃদ্যতাপূর্ণ সহাবস্থান স্বাভাবিকভাবেই স্বার্থান্বেষী ও কুচক্রী মহলের পছন্দ হওয়ার কথা নয়। তাই তারা সুলতান ও উজিরের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টিতে তৎপর হয়। তাদের প্ররোচনায় সুলতান মালিক শাহ উজির কিওয়ামুদ্দিনের প্রতি রুষ্ট হন।
উনত্রিশ বছর উজিরের দায়িত্ব পালন করার পর কিওয়ামুদ্দিন ৪৮৫ হিজরি সনের ১০ রমজান (১০৯২ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ অক্টোবর) ইসমাইলি ফিরকার হাশাশিন বাহিনীর জনৈক আততায়ীর হাতে নিহত হন। কুদরতের কী বিস্ময়কর আচরণ! এর মাসখানেক পর ১৫ শাওয়াল (১৮ নভেম্বর) সুলতান মালিক শাহও ইন্তেকাল করেন। তাদের দুজনের মৃত্যুতে সেলজুক পরিবারের সৌভাগ্য-ধারারও যেন সমাপ্তি ঘটে। সেলজুক পরিবারে শুরু হয় দ্বন্দ্ব, অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং তির-তরবারির অবাধ ব্যবহার। (১২৮)
সুলতান মালিক শাহর চার পুত্র ছিল। তাদের নাম যথাক্রমে বারকিয়ারুক, মুহাম্মাদ, সানজার ও মাহমুদ। মালিক শাহর মৃত্যুর পর যদিও জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে বারকিয়ারুক সালতানাতের দাবিদার ছিলেন; কিন্তু কনিষ্ঠ পুত্র মাহমুদ তার মা তুরকান খাতুন ও উজির তাজুল মুলক সিরাজির সহায়তায় সুলতান পদে অধিষ্ঠিত হন। তখন মাহমুদের বয়স ছিল মাত্র চার বছর! বারকিয়ারুক অবশ্য উপর্যুপরি চেষ্টা চালিয়ে কিছুদিনের মধ্যেই নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। ৪৮৭ হিজরি সনের ১৪ মুহাররম (১০৯৪ খ্রিষ্টাব্দের ৩ ফেব্রুয়ারি) খলিফা মুকতাদি বি আমরিল্লাহ বারকিয়ারুককে সেলজুক সুলতান হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেন। এর পরদিন ১৫ মুহাররম (৪ ফেব্রুয়ারি) খলিফা মুকতাদি বি আমরিল্লাহ উনচল্লিশ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।
টিকাঃ
১২৬. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৮/৪৮০-৪৮১।
১২৭. নিজামিয়া মাদরাসা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে দেখুন : আলি সাল্লাবি, দাওলাতুস সালাজিকা, পৃষ্ঠা : ২৭৮-৩২৫।
১২৮. পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, সেলজুক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রাথমিককালেই সেলজুক পরিবারের তৎকালীন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে নিজেদের অধিকৃত সুবিস্তৃত রাষ্ট্রকে কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করে পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের মাঝে নেতৃত্ব বণ্টন করে দেয় এবং তুগরুল বেগকে সকলের প্রধান নির্বাচিত করে। তখন থেকে বিভিন্ন অঞ্চলের শাসনকর্তাগণ ইরাকে অবস্থানকারী মূল সুলতানের প্রতি আনুগত্য বজায় রেখে আপন আপন অঞ্চল শাসন করত। কিন্তু তৃতীয় সেলজুক সুলতান মালিক শাহর মৃত্যুর পর সেলজুক রাজপরিবারের সদস্যদের মাঝে শুরু হয় ক্ষমতার অস্থির প্রতিযোগিতা। মূল সুলতান পদ নিয়ে যেমন মালিক শাহর পুত্রদের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি হয়, তেমনই বিভিন্ন অঞ্চলের শাসকবর্গও একে অপরের এলাকা দখল করার এক অনিঃশেষ প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে। সুবিশাল সেলজুক রাষ্ট্র বিভক্ত হয় পাঁচ ভাগে। বরং প্রতিটি অংশের মধ্যেও সৃষ্টি হয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আরও অনেক রাজ্য! ফলে কদিন পূর্বের অপ্রতিরোধ্য শক্তি সেলজুক সাম্রাজ্য হিজরি পঞ্চম শতাব্দী শেষ না হতেই পরিণত হয় বিভক্ত ও ছিন্নভিন্ন শক্তিতে। হিজরি পঞ্চম শতকের শেষদিকে (খ্রিষ্টীয় একাদশ শতকের শেষে) সেলজুক সাম্রাজ্য নিম্নে উল্লেখিত অবস্থায় বিভক্ত ছিল।
১. বৃহত্তর সেলজুক রাষ্ট্র (The Great Seljuq Empire)। আরবি ইরাকসহ সুবিস্তৃত অঞ্চল এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। আব্বাসি খিলাফতের ওপর এই সেলজুক রাষ্ট্রেরই প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ ছিল। বৃহত্তর সেলজুক রাষ্ট্রের রাজপরিবারে মোটামুটি পর্যায়ের ঐক্য বজায় থাকলেও গৃহসংঘাত থেকে পুরোপুরি মুক্ত ছিল না। প্রথম মালিক শাহর ইন্তেকালের পর বৃহত্তর সেলজুক রাষ্ট্রের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তার জ্যেষ্ঠ পুত্র বারকিয়ারুক।
২. কিরমানি সেলজুক রাষ্ট্র (Kermani Seljuqs)। এর অবস্থান ছিল দক্ষিণ পারস্য ও পাকিস্তান অঞ্চলে। কিরমানি সেলজুক রাষ্ট্রের ক্ষমতা ছিল কারুত বেগ বিন দাউদ বিন মিকাইল বিন সেলজুকের বংশধরদের হাতে। কারুত ছিলেন মহান সেনাপতি আলপ আরসালানের সহোদর।
৩. পারসিক সেলজুক রাষ্ট্র। উত্তর ইরাক তথা আজমি ইরাক, রায়, হামাদান ও কুর্দিস্তানজুড়ে ছিল এ রাষ্ট্রের বিস্তৃতি।
৪. শামীয় সেলজুক রাষ্ট্র। এটি দামেশকের সেলজুক রাষ্ট্র নামেও পরিচিত। আলপ আরসালানের পুত্র তুতুশের বংশধরগণ শামের সেলজুক রাষ্ট্রের হাল ধরেছিল। এখানেও রাজপরিবারের পারস্পরিক সংঘাত শামকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রে বিভক্ত করে রেখেছিল।
৫. রোমান সেলজুক রাষ্ট্র (Sultanate of Rum)। এর অবস্থান ছিল এশিয়া মাইনর (আনাতোলিয়া) অঞ্চলে। কুতুলমিশ বিন ইসরাইল বিন সেলজুকের বংশধরগণ রোমান সেলজুক রাষ্ট্র পরিচালনা করত।
উল্লেখ্য, ফুরাত ও দজলার নিম্নভূমিসহ ইরাকের সুবিস্তৃত সমতলভূমিকে ভৌগোলিকভাবে আরবি ইরাক (Arab Iraq) বলা হতো। আর এর পূর্বে অবস্থিত ইস্পাহান, রায়, কাজবিন, কির্মানশাহ-সহ বিস্তৃত পাহাড়িভূমিকে বলা হতো আজমি ইরাক (Persian Iraq)। জগ্রোস পর্বতমালাকে উভয় অঞ্চলের বিভক্তি রেখা বিবেচনা করা যায়। আরবি ইরাকের সিংহভাগ বর্তমানে আধুনিক ইরাক রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত আর আজমি ইরাক বর্তমান ইরান রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত।
যেহেতু বক্ষ্যমাণ অধ্যায়ে আব্বাসি খিলাফতের আলোচনা করা হচ্ছে, তাই সামনে আব্বাসি খিলাফতের ওপর প্রত্যক্ষ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাকারী বৃহত্তর সেলজুক রাষ্ট্রের আলোচনাই কেবল আসবে।