📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 মানজিকার্টের যুদ্ধ

📄 মানজিকার্টের যুদ্ধ


কায়িম বি আমরিল্লাহর খিলাফত আমলেই ৪৫৫ হিজরি সনে তুগরুল বেগ ইন্তেকাল করেন। তার স্থলাভিষিক্ত হন সুলতান আযদুদ্দৌলা আবু শুজা আলপ আরসালান মুহাম্মাদ বিন দাউদ বিন মিকাইল বিন সেলজুক।
৪৬৩ হিজরি সনে (১০৭১ খ্রিষ্টাব্দে) বাইজান্টাইন সম্রাট চতুর্থ রোমানোস (Romanos IV Diogenes) ফরাসি, নরম্যান, জর্জিয়ান, আর্মেনীয়, বুলগেরিয়ান, তুর্কি পেচেগ ও ভাড়াটে কুমান সৈন্যদের সমন্বয়ে গঠিত বিশাল এক বাহিনী নিয়ে ইসলাম ও মুসলমানদের চূড়ান্ত বিনাশের লক্ষ্যে রওনা হন। বাইজান্টাইন বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ছিল দুই লক্ষের মতো। সম্রাট রোমানোস তার বাহিনীর বিজয়ের বিষয়ে এতটা সুনিশ্চিত ছিলেন যে, তিনি বিজয়ের পূর্বেই ইসলামি ভূখণ্ডের বিভিন্ন অঞ্চল তার সেনাপতিদের জায়গির হিসেবে বণ্টন করে দেন এবং বাগদাদ যার ভাগে পড়েছে, সেই সেনাপতিকে বাগদাদে প্রবেশের পর আব্বাসি খলিফার সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দেন! কিন্তু তাকদিরের হিসাব ছিল ভিন্ন। পবিত্র কুরআনের ভাষায়—
(لَعَمْرُكَ إِنَّهُمْ لَفِي سَكْرَتِهِمْ يَعْمَهُونَ )
আপনার জীবনের শপথ! প্রকৃতপক্ষে ওইসব লোক নিজেদের উন্মাদনায় বুঁদ হয়ে গিয়েছিল। [সুরা হিজর : ৭২]
সুলতান আলপ আরসালান মাত্র বিশ হাজার সৈন্যের এক বাহিনী নিয়ে ৪৬৩ হিজরি সনের ২৬ জিলকদ (১০৭১ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ আগস্ট) বুধবার (বর্তমান তুরস্কের অন্তর্গত) মানজিকার্টের নিকটবর্তী যাহওয়া নামক স্থানে তাদের মুখোমুখি হন। সুলতান বাইজান্টাইন বাহিনীর বিশালতা দেখে চিন্তিত হয়ে পড়েন। তখন মুসলিম বাহিনীর সদস্য ও বিশিষ্ট ফকিহ আবু নাসির মুহাম্মাদ বিন আবদুল মালিক বুখারি তাকে পরামর্শ দেন যে, শুক্রবার দিন দ্বিপ্রহরের পর যুদ্ধ শুরু করা হোক। কারণ, তখন ইসলামি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মসজিদগুলোতে খতিবগণ মুজাহিদ বাহিনীর জন্য দোয়া করতে থাকবে।
পরবর্তী শুক্রবার ২৮ জিলকদ (২৬ আগস্ট) জুমার নামাজ আদায় করার পর উভয় বাহিনী যুদ্ধ শুরু করে। প্রতিপক্ষের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় সুলতান আলপ আরসালান ঘোড়া হতে নেমে সিজদায় পড়ে যান এবং আপন মুখমণ্ডল মাটিতে ঘর্ষণ করে আল্লাহর দরবারে সাহায্য কামনা করে দোয়া করতে থাকেন।
আল্লাহ তাআলা মুসলিম বাহিনীকে সাহায্য করেন। মুসলিম সৈন্যদের নিষ্ঠাপূর্ণ প্রচেষ্টায় বাইজান্টাইন বাহিনী শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। তাদের অসংখ্য সৈন্য নিহত হয়, বন্দিও হয় অনেকে। সম্রাট রোমানোস নিজেও বন্দি হন। জনৈক রোমান ক্রীতদাস তাকে বন্দি করে। পরে অবশ্য বিশাল অঙ্কের মুক্তিপণ প্রদান এবং বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যে বন্দি সকল মুসলমানকে মুক্তিদানের বিনিময়ে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। (১২২)
মানজিকার্টের যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে এশিয়া মাইনর অঞ্চলে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের কর্তৃত্ব ভেঙে পড়ে, সেলজুকদের সামনে অঞ্চলটি উন্মুক্ত হয়ে পড়ে এবং মুসলমানরা প্রথমবারের মতো এ অঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। উভয় পক্ষের জনবল ও অস্ত্রবলের অসম ব্যবধান, মুসলমানদের নিরঙ্কুশ বিজয় এবং বিজয়ের প্রভাব-ফলাফলের বিবেচনায় মানজিকার্টের যুদ্ধ ইতিহাসে 'দ্বিতীয় ইয়ারমুকের যুদ্ধ' নামে খ্যাত।
৪৬৩ হিজরি সনেই সেলজুকরা শিয়া উবায়দি সাম্রাজ্যের কাছ থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস ও রামলা নগরী পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়। পূর্বেও উল্লেখ করা হয়েছে, উবায়দিরা ৩৫৮ হিজরি সনে (৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে) বাইতুল মুকাদ্দাস দখল করে নিয়েছিল। (১২৩)
আলপ আরসালানের পুরো শাসনামল ছিল সেলজুক সাম্রাজ্যের উন্নতি ও সমৃদ্ধির কাল। কেবল যুদ্ধক্ষেত্রেই নয়, বরং বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনেও যথেষ্ট উন্নতি সাধিত হয়েছিল। সুলতান আলপ আরসালানই প্রথম বাগদাদে নিজামিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। ৪৫৮ হিজরি সনে (১০৬৬ খ্রিষ্টাব্দে) এর প্রতিষ্ঠা সমাপ্ত হয়। নিজামিয়া মাদরাসায় সমকালীন ইরাকের বরং সমগ্র মুসলিম বিশ্বের শাফেয়ি শায়খ আবু ইসহাক সিরাজি পাঠদান করতেন।
৪৬৫ হিজরি সনে (১০৭২ খ্রিষ্টাব্দে) আলপ আরসালান প্রায় দুই লক্ষ সৈন্য নিয়ে তুর্কিস্তান অভিমুখে রওনা হন এবং আমু দরিয়া পাড়ি দেন। কিন্তু এরইমধ্যে তার পরপারের ডাক এসে যায়। বর্ণিত আছে, মৃত্যুর পূর্বে তিনি বলেছিলেন—
আমি যখনই কোনো শত্রুর উদ্দেশে কোনো যুদ্ধক্ষেত্রে রওনা হয়েছি, কেবল আল্লাহর ওপর ভরসা করেছি এবং তার কাছেই সাহায্যপ্রার্থনা করেছি। এবারের অভিযানে আমি একটি উঁচু টিলায় দাঁড়িয়ে আমার সৈন্যবাহিনীর দিকে তাকিয়ে বলেছিলাম, 'কে আছে আমার মোকাবিলা করার, আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার?! আমি তো আমার এই বাহিনী নিয়ে চীনের সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছতে পারব।' এখন আল্লাহ যা চেয়েছেন, তাই হতে যাচ্ছে।
বিশিষ্ট ঐতিহাসিক ইবনুল আছির আলপ আরসালান সম্পর্কে লিখেছেন— তিনি ছিলেন গুণী ও উদার, জ্ঞানী ও ন্যায়পরায়ণ। পরনিন্দা-কানকথা মোটেও শুনতে পারতেন না। তার শাসনামলে সেলজুক সাম্রাজ্যের পরিধি অনেক বৃদ্ধি পায় এবং দিগন্ত বিস্তৃত অঞ্চল তার বশীভূত হয়। তাকে প্রদত্ত 'সুলতানুল আলম' বা জগতের সুলতান অভিধা ছিল সত্যই তার শানে যথোপযুক্ত। মহৎ হৃদয় এই সুলতান দরিদ্রদের প্রতি অনুগ্রহপূর্ণ আচরণ করতেন, আল্লাহর দরবারে প্রচুর দোয়া করতেন। সৈন্যরা যেন জনসাধারণের সম্পদে অন্যায় হস্তক্ষেপ করতে না পারে, এ বিষয়ে তিনি কঠোর নজরদারি করতেন। (১২৪)
আলপ আরসালানের মৃত্যুর পর সেলজুক সালতানাতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তার পুত্র জালালুদ্দৌলা আবুল ফাতাহ মালিক শাহ। তার আমলেই ৪৬৭ হিজরি সনের ১৩ শাবান (১০৭৫ খ্রিষ্টাব্দের ৩ এপ্রিল) মৃত্যুবরণ করেন খলিফা কায়িম বি আমরিল্লাহ। এ সময় খলিফার বয়স ছিল ছিয়াত্তর বছর। তিনি দীর্ঘ পঁয়তাল্লিশ বছর খলিফা পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
ঐতিহাসিক ইবনে কাছির রহ. খলিফা কায়িম বি আমরিল্লাহর আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন—
“তার পূর্বে অন্য কোনো খলিফা এত দীর্ঘ সময় খিলাফতের দায়িত্ব পালন করেননি। তিনি সুভাষী, খোদাভীরু ও দুনিয়াবিরাগী ছিলেন। জনগণের প্রতি উদার ও বদান্য আচরণ করতেন। দ্বীন ও ধার্মিকতা, আকিদা ও ধর্মবিশ্বাস এবং রাষ্ট্রব্যবস্থাপনা—সর্ববিবেচনায় তিনি বনু আব্বাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ খলিফা ছিলেন। তিনি বাসাসিরির ফিতনার সম্মুখীন হন এবং এ কারণে তাকে রাজপ্রাসাদ, পরিবার-পরিজন ও মাতৃভূমি ছেড়ে নির্বাসিত হতে হয়। দীর্ঘ এক বছর তিনি হাদিসা আনা অঞ্চলে নির্বাসিত অবস্থায় জীবনযাপন করেন। এরপর আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহে পুনরায় তিনি খলিফা পদে অধিষ্ঠিত হন।” (১২৫)

টিকাঃ
১২২. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৮/৩৮৮-৩৮৯।
১২৩. প্রাগুক্ত, ৭/৩০৯ ও ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১১/২৬৬-২৬৭।
১২৪. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৮/৩৯৪।
১২৫. ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১২/১০৫।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00