📄 সেলজুক পরিবার ও সুলতানদের বংশলতিকা
সেলজুক
মুসা মিকাইল আরসালান
দাউদ চাঘরি বেগ রুকনুদ্দিন তুগরুল বেগ মুহাম্মাদ (৪৪৯-৪৫৫ হি.)
কুতুলমিশ ইমাদুদ্দিন কারুত(২) সুলায়মান(১)
আযদুদ্দৌলা আবু শুজা আলপ আরসালান (৪৫৫-৪৬৫ হি.)
তুতুশ(৩) জালালুদ্দৌলা আবুল ফাতাহ মালিক শাহ (৪৬৫-৪৮৫ হি.) তিকিশ (তাখারিস্তানের অধিপতি)
সানজার মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দিন মাহমুদ বারকিয়ারুক (৪৯৮-৫১১ হি.) (৪৮৫-৪৮৭ হি.) (৪৮৭-৪৯৮ হি.)
রুকনুদ্দৌলা ২য় মালিক শাহ(৪) (৪৯৮ হি.)
২য় তুগরুল বেগ (৫২৬-৫২৭ হি.) সুলায়মান শাহ (৫৫৪-৫৫৬ হি.) গিয়াসুদ্দিন মাসউদ মুগিছুদ্দিন মাহমুদ (৫২৭-৫৪৭ হি.) (৫১১-৫২৫ হি.)
সেলজুক শাহ দাউদ ২য় মুহাম্মাদ (৫৪৮-৫৫৪ হি.) মুঈনুদ্দিন ৩য় মালিক শাহ (৫৪৭-৫৪৮ হি.)
আরসালান শাহ (৫৫৬-৫৭৩ হি.) ৩য় তুগরুল বেগ(৫) (৫৭৩-৫৯০ হি.)
১. তার মাধ্যমে রোমান সেলজুক রাষ্ট্রের সূচনা হয়। এ রাষ্ট্রের বিস্তৃতি ছিল ৪৭০ হি. হতে ৭০৮ হি. সন পর্যন্ত। তুর্কি উসমানি পরিবার ও মঙ্গোলদের হাতে রোমান সেলজুকদের পতন ঘটে।
২. তার মাধ্যমে কিরমানি সেলজুক রাষ্ট্রের সূচনা হয়। এর ব্যাপ্তি ছিল ৪৩২ হি. হতে ৫৮৩ হি. সন পর্যন্ত। গজনবি রাজপরিবারের হাতে এ রাষ্ট্রের পতন ঘটে।
৩. তার মাধ্যমে শামীয় সেলজুক রাষ্ট্রের সূচনা হয়। এর ব্যাপ্তি ছিল ৪৮৭-৫১১ হি. পর্যন্ত। শাম ও জাহিরার আতাবিক পদবীধারীদের হাতে এ রাষ্ট্রের পতন ঘটে।
৪. তার সময় সেলজুক রাষ্ট্র ইরাক ও কুর্দিস্তানে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। খোরাসান ও মাওয়ারাউন নাহার চলে যায় খোয়ারিজ- মর শাসকদের হাতে।
৫. তিনি খোয়ারিজমের শাহ সুলতান আলাউদ্দিন তিকিশের হাতে নিহত হলে বাগদাদে সেলজুক রাষ্ট্রের পতন ঘটে।
📄 শিয়া-সুন্নি সংঘাত
খলিফা কায়িম বি আমরিল্লাহর আমলেই ৪৪৩ হিজরি সনের সফর মাসে বাগদাদে শিয়া-সুন্নি দাঙ্গা সংঘটিত হয় এবং উভয় পক্ষের প্রচুর মানুষ নিহত হয়। ঐতিহাসিকগণ এর প্রেক্ষাপট বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন, শিয়ারা এ সময় কয়েকটি বুরুজ (টাওয়ার) তৈরি করে তাতে স্বর্ণ দ্বারা নিম্নোক্ত বাক্যগুলো উৎকীর্ণ করেছিল-
মুহাম্মাদ ও আলি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম মানুষ। যারা তা মানল, তারা শোকর করল; আর যারা অস্বীকার করল, তারা কুফরি করল।
নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে আলি রাযি.-কে সমান্তরালে রাখার এই গর্হিত শিয়া-কাণ্ডে বাগদাদের সুন্নি মুসলমানগণ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। একে কেন্দ্র করে উভয় পক্ষের মধ্যে মারামারি শুরু হয় এবং রবিউল আউয়াল মাস পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে। এ সময় বনু বুওয়াইহ-এর নেতৃবৃন্দের সমাধি পোড়ানো হয়, পোড়ানো হয় খলিফা মনসুর, খলিফা আমিন, তার মা জুবায়দাসহ অনেকের সমাধি। ফিতনা দিনে দিনে বিস্তৃত হয়ে সীমা ছাড়িয়ে যায়। শিয়া রাফিজিরাও বিভিন্ন রকম ফাসাদ সৃষ্টি করে। তারা বিভিন্ন প্রাচীন কবর খুড়ে কবরস্থ বুজুর্গদের লাশ জ্বালিয়ে দেয়। এমনকি তারা ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহ.-এর সমাধিতেও আগুন লাগানোর চেষ্টা করে। রাফিজিদের নেতৃত্বে ছিল কুতাইয়ি নামক জনৈক বদমাশ। সে তাদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের অনুসরণ করে প্রকাশ্যে বা গোপনে হত্যা করত। তার কারণে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। প্রচণ্ড দুঃসাহসী, শক্তিশালী ও চতুর হওয়ায় কেউ তাকে বশে আনতে পারছিল না।
৪৪৮ হিজরি সন পর্যন্ত পরিস্থিতি এমনই ছিল। আর ৪৪৮ হিজরি সনেই শুরু হয় সেলজুক পরিবারের সালতানাত।
ঐতিহাসিক ইবনে কাছির রহ. বলেন—
এ বছরই রাফিজিদের নির্দেশ প্রদান করা হয় যে, তারা যে আজানে অতিরিক্ত 'হাইয়া আলা খাইরিল আমল' উচ্চারণ করত, তা বাদ দিতে হবে। তাদের মুয়াজ্জিনদের ফজরের আজানে 'হাইয়া আলাল ফালাহ'-এর পর দু-বার 'আসসালাতু খাইরুম মিনান নাওম' বলার নির্দেশ দেওয়া হয়। রাফিজিদের বিভিন্ন মসজিদের দ্বারে উৎকীর্ণ 'মুহাম্মাদ ও আলি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম মানুষ' বাণী মুছে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়। কবিতাপাঠকগণ বসরা প্রবেশদ্বার দিয়ে রাফিজিদের কেন্দ্র কারখের প্রবেশদ্বারে প্রবেশ করে সাহাবায়ে কেরামের শানে রচিত বিভিন্ন কবিতা আবৃত্তি করতে থাকে। ইতিপূর্বে বনু বুওয়াইহির শাসনামলে তারা এরূপ করতে পারত না। কারণ, বুওয়াইহি শাসকপরিবার শিয়াদেরকে সহায়তা করত এবং শক্তি জোগাত। ইতিমধ্যে বুওয়াইহি পরিবারের শাসনব্যবস্থা বিলুপ্ত হয়েছে এবং তাদের স্থলে সেলজুক তুর্কিদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেলজুকরা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআকে ভালোবাসত, তাদের প্রতি হৃদ্যতা পোষণ করত এবং তাদের মর্যাদা সমুন্নত করত। কালের দীর্ঘ পরিক্রমায় সদা সর্বদা আল্লাহই প্রশংসিত। (১২০)
টিকাঃ
১২০. ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১২/৬৬।
📄 ৪৯০ হিজরি সনে সংঘটিত ভয়াবহ এক ফিতনা
এ সময় উবায়দিরা আরসালান আবুল হারিস বাসাসিরি তুর্কি-এর সহায়তায় বাগদাদ দখল করার এবং আব্বাসি খলিফাকে নির্বাসিত করার চেষ্টা চালায়।
বাসাসিরি ছিল বুওয়াইহি সুলতান বাহাউদ্দৌলার ক্রীতদাস। পূর্বে সে বাসা নগরীর জনৈক ব্যক্তির দাস ছিল বিধায় তাকে বাসাসিরি বলা হতো। বাসাসিরি 'আল-মালিকুল মুযাফফার' উপাধি গ্রহণ করে এবং আপন চাতুর্যগুণে খলিফা কায়িম বি আমরিল্লাহর একান্ত আস্থাভাজন ব্যক্তিতে পরিণত হয়। খলিফা তার পরামর্শ ব্যতীত কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন না। পুরো ইরাকের মিম্বরে মিম্বরে তার নামে খুতবা পাঠ করা হতো। কিন্তু কিছুদিন পরই বাসাসিরির আসল রূপ প্রকাশ পেয়ে যায়। সে খলিফা ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। এ সময় সেলজুক সুলতান তুগরুল বেগ ও তার ভাই ইবরাহিমের মধ্যে সংঘাত চলছিল। বাসাসিরি তখন আরব আমির কুরাইশ বিন বাদরানকে সঙ্গে নিয়ে মসুল অভিমুখে রওনা হয় এবং মসুলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। সংবাদ পেয়ে তুগরুল বেগ দ্রুত মসুলে গমন করে নগরীটি পুনরুদ্ধার করেন। বাসাসিরি ও কুরাইশ পালিয়ে গেলে তুগরুল বেগ নুসায়বিন পর্যন্ত তাদের পশ্চাদ্ধাবন করেন। এদিকে তুগরুল বেগের ভাই ইবরাহিম পালিয়ে হামাদানে চলে যায় এবং বিদ্রোহ ঘোষণা করে। তুগরুল বেগ এবার ভাই ইবরাহিমের পিছু নেন। এ সময় অল্পকিছু সৈন্য তার অনুসরণ করলেও বাকিরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে।
বাগদাদ তখন বলতে গেলে সৈন্যশূন্য। বাসাসিরি একে সুবর্ণ সুযোগ মনে করে বাগদাদ অভিমুখে রওনা হয়। বাসাসিরির আগমনসংবাদ শুনে বাগদাদে আতঙ্কের স্রোত বয়ে যায়। পুরো বাগদাদে তখন একটাই আওয়াজ—'যারা বাগদাদ ছাড়তে চায়, তারা যেন অতি শীঘ্র বাগদাদ ছাড়ে!' জনগণ ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। নারী-পুরুষ ও শিশুদের মধ্যে কান্নার রোল পড়ে যায়। প্রতিপক্ষকে প্রতিরোধ করার মতো সৈন্য বাগদাদে না থাকায় অনেকে খলিফাকেও বাগদাদ ত্যাগের পরামর্শ দিলে স্বয়ং খলিফা কায়িম বি আমরিল্লাহও বাগদাদ ত্যাগের মনস্থ করেন। অবশ্য পরে তিনি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে রাজপ্রাসাদে অবস্থান করাকেই প্রাধান্য দেন।
৪৫০ হিজরি সনের ৮ জিলকদ (১০৫৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৭ ডিসেম্বর) বাসাসিরি উবায়দিদের সাদা ঝান্ডা হাতে বাগদাদে প্রবেশ করে। মূল পতাকায় উবায়দি খলিফার নাম খচিত ছিল। কারখের অধিবাসী শিয়ারা বাসাসিরিকে স্বাগত জানায়। বাসাসিরি সন্ত্রাসী শ্রেণির লোকদের সমবেত করে এবং তাদেরকে খলিফার প্রাসাদ লুণ্ঠনের অনুমতি প্রদান করে। শিয়ারা সুন্নিদের ঘরবাড়ি লুটপাট করতে থাকে। বাগদাদে পুনরায় শিয়া রুসম-রেওয়াজ ও বিদআতের প্রচলন শুরু হয়।
খলিফা কায়িম বি আমরিল্লাহ এ সময় আব্বাসি রাজপরিবারের সীমিত সংখ্যক সদস্যসহ প্রাসাদে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। খলিফা আরব আমির কুরাইশ বিন বাদরানের কাছে নিরাপত্তা প্রার্থনা করলে সে খলিফাকে নিরাপত্তা প্রদান করে। খলিফাকে নিরাপত্তা দেওয়ায় বাসাসিরি কুরাইশের প্রতি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়। অবশ্য পরে উভয়ে একমত হয় যে, তারা খলিফাকে বাগদাদ থেকে বের করে আনা (১২১) অঞ্চলের আমির মুহারিশ বিন মুজালির কাছে পাঠিয়ে দেবে। মুহারিশ ছিলেন কুরাইশ বিন বাদরানের পিতৃবংশীয় ভাই। খলিফা বারবার কুরাইশের কাছে অনুরোধ করেন যে, তাকে যেন বাগদাদ থেকে নির্বাসিত না করা হয়। কিন্তু সব চেষ্টাই নিষ্ফল প্রমাণিত হয়। খলিফাকে হাওদায় বসিয়ে আনা অঞ্চলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরবর্তী পূর্ণ এক বছর খলিফা মুহারিশের কাছেই ছিলেন। তার সঙ্গে তার পরিবারের কেউ ছিল না। এটি ৪৫০ হিজরি সনের জিলকদ (১০৫৯ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি) মাসের ঘটনা।
বাসাসিরি বাগদাদে জুমার খুতবায় উবায়দি খলিফার নাম পাঠের নির্দেশ জারি করে। বাগদাদের রাফিজিরা এ সময় অত্যন্ত আনন্দিত ছিল। বাসাসিরি বাগদাদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের ওপর কঠিন নির্যাতন চালায়।
৪৫১ হিজরি সনের শুরুতেও পরিস্থিতি এমনই ছিল। তবে সুলতান তুগরুল বেগ এরমধ্যে তার ভাই ইবরাহিমকে পরাভূত ও হত্যা করতে সক্ষম হন। এবার তিনি বাসাসিরির দফারফা করতে পূর্ণ প্রস্তুত। তিনি আরব আমির কুরাইশকে বার্তা পাঠিয়ে সতর্ক করেন এবং হুমকি প্রদান করেন। এরপর কুরাইশ ও তুগরুল বেগ বাসাসিরির বিরুদ্ধে একজোট হন। সুলতান তুগরুল বেগ এরপর বাগদাদ অভিমুখে রওনা হন। তুগরুল বেগের আগমন সংবাদ পেয়ে বাসাসিরি পালিয়ে যায়। তুগরুল বেগের বাগদাদে প্রবেশের দিনটি ছিল অত্যন্ত স্মরণীয় একটি দিন। তুগরুল বেগ খলিফাকে বাগদাদে নিয়ে আসার জন্য কয়েকটি রাজকীয় বাহন প্রেরণ করেন। খলিফা ফেরার পথে নাহরাওয়ানে পৌঁছলে সুলতান তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য বাগদাদ থেকে বের হয়ে আসেন এবং খলিফার তাঁবুতে প্রবেশ করে খলিফার সম্মুখভূমিতে সাতবার চুম্বন করেন।
এরপর সুলতান তুগরুল বেগ ওয়াসিতে পলায়নকারী বাসাসিরির পশ্চাদ্ধাবন করেন। সেখানে প্রচণ্ড যুদ্ধের পর বাসাসিরির অনুসারীরা পরাজিত হয়। কিছু সৈনিক বাসাসিরির পশ্চাদ্ধাবন করে তাকে হত্যা করে। এরপর তার কর্তিত মস্তক বাগদাদে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এভাবে এই বিরাট ফিতনার সমাপ্তি ঘটে।
টিকাঃ
১২১. আনা: জাযিরা অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত রাক্কা ও হিতের মধ্যবর্তী প্রসিদ্ধ একটি নগরী। নগরীটির অবস্থান ফুরাত নদীর তীরঘেঁষে হাদিসাতুল ফুরাত এলাকার নিকটে। দেখুন: ইয়াকুত আল-হামাবি, মুজামুল বুলদান, ৪/৭২।
📄 মানজিকার্টের যুদ্ধ
কায়িম বি আমরিল্লাহর খিলাফত আমলেই ৪৫৫ হিজরি সনে তুগরুল বেগ ইন্তেকাল করেন। তার স্থলাভিষিক্ত হন সুলতান আযদুদ্দৌলা আবু শুজা আলপ আরসালান মুহাম্মাদ বিন দাউদ বিন মিকাইল বিন সেলজুক।
৪৬৩ হিজরি সনে (১০৭১ খ্রিষ্টাব্দে) বাইজান্টাইন সম্রাট চতুর্থ রোমানোস (Romanos IV Diogenes) ফরাসি, নরম্যান, জর্জিয়ান, আর্মেনীয়, বুলগেরিয়ান, তুর্কি পেচেগ ও ভাড়াটে কুমান সৈন্যদের সমন্বয়ে গঠিত বিশাল এক বাহিনী নিয়ে ইসলাম ও মুসলমানদের চূড়ান্ত বিনাশের লক্ষ্যে রওনা হন। বাইজান্টাইন বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ছিল দুই লক্ষের মতো। সম্রাট রোমানোস তার বাহিনীর বিজয়ের বিষয়ে এতটা সুনিশ্চিত ছিলেন যে, তিনি বিজয়ের পূর্বেই ইসলামি ভূখণ্ডের বিভিন্ন অঞ্চল তার সেনাপতিদের জায়গির হিসেবে বণ্টন করে দেন এবং বাগদাদ যার ভাগে পড়েছে, সেই সেনাপতিকে বাগদাদে প্রবেশের পর আব্বাসি খলিফার সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দেন! কিন্তু তাকদিরের হিসাব ছিল ভিন্ন। পবিত্র কুরআনের ভাষায়—
(لَعَمْرُكَ إِنَّهُمْ لَفِي سَكْرَتِهِمْ يَعْمَهُونَ )
আপনার জীবনের শপথ! প্রকৃতপক্ষে ওইসব লোক নিজেদের উন্মাদনায় বুঁদ হয়ে গিয়েছিল। [সুরা হিজর : ৭২]
সুলতান আলপ আরসালান মাত্র বিশ হাজার সৈন্যের এক বাহিনী নিয়ে ৪৬৩ হিজরি সনের ২৬ জিলকদ (১০৭১ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ আগস্ট) বুধবার (বর্তমান তুরস্কের অন্তর্গত) মানজিকার্টের নিকটবর্তী যাহওয়া নামক স্থানে তাদের মুখোমুখি হন। সুলতান বাইজান্টাইন বাহিনীর বিশালতা দেখে চিন্তিত হয়ে পড়েন। তখন মুসলিম বাহিনীর সদস্য ও বিশিষ্ট ফকিহ আবু নাসির মুহাম্মাদ বিন আবদুল মালিক বুখারি তাকে পরামর্শ দেন যে, শুক্রবার দিন দ্বিপ্রহরের পর যুদ্ধ শুরু করা হোক। কারণ, তখন ইসলামি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মসজিদগুলোতে খতিবগণ মুজাহিদ বাহিনীর জন্য দোয়া করতে থাকবে।
পরবর্তী শুক্রবার ২৮ জিলকদ (২৬ আগস্ট) জুমার নামাজ আদায় করার পর উভয় বাহিনী যুদ্ধ শুরু করে। প্রতিপক্ষের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় সুলতান আলপ আরসালান ঘোড়া হতে নেমে সিজদায় পড়ে যান এবং আপন মুখমণ্ডল মাটিতে ঘর্ষণ করে আল্লাহর দরবারে সাহায্য কামনা করে দোয়া করতে থাকেন।
আল্লাহ তাআলা মুসলিম বাহিনীকে সাহায্য করেন। মুসলিম সৈন্যদের নিষ্ঠাপূর্ণ প্রচেষ্টায় বাইজান্টাইন বাহিনী শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। তাদের অসংখ্য সৈন্য নিহত হয়, বন্দিও হয় অনেকে। সম্রাট রোমানোস নিজেও বন্দি হন। জনৈক রোমান ক্রীতদাস তাকে বন্দি করে। পরে অবশ্য বিশাল অঙ্কের মুক্তিপণ প্রদান এবং বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যে বন্দি সকল মুসলমানকে মুক্তিদানের বিনিময়ে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। (১২২)
মানজিকার্টের যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে এশিয়া মাইনর অঞ্চলে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের কর্তৃত্ব ভেঙে পড়ে, সেলজুকদের সামনে অঞ্চলটি উন্মুক্ত হয়ে পড়ে এবং মুসলমানরা প্রথমবারের মতো এ অঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। উভয় পক্ষের জনবল ও অস্ত্রবলের অসম ব্যবধান, মুসলমানদের নিরঙ্কুশ বিজয় এবং বিজয়ের প্রভাব-ফলাফলের বিবেচনায় মানজিকার্টের যুদ্ধ ইতিহাসে 'দ্বিতীয় ইয়ারমুকের যুদ্ধ' নামে খ্যাত।
৪৬৩ হিজরি সনেই সেলজুকরা শিয়া উবায়দি সাম্রাজ্যের কাছ থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস ও রামলা নগরী পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়। পূর্বেও উল্লেখ করা হয়েছে, উবায়দিরা ৩৫৮ হিজরি সনে (৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে) বাইতুল মুকাদ্দাস দখল করে নিয়েছিল। (১২৩)
আলপ আরসালানের পুরো শাসনামল ছিল সেলজুক সাম্রাজ্যের উন্নতি ও সমৃদ্ধির কাল। কেবল যুদ্ধক্ষেত্রেই নয়, বরং বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনেও যথেষ্ট উন্নতি সাধিত হয়েছিল। সুলতান আলপ আরসালানই প্রথম বাগদাদে নিজামিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। ৪৫৮ হিজরি সনে (১০৬৬ খ্রিষ্টাব্দে) এর প্রতিষ্ঠা সমাপ্ত হয়। নিজামিয়া মাদরাসায় সমকালীন ইরাকের বরং সমগ্র মুসলিম বিশ্বের শাফেয়ি শায়খ আবু ইসহাক সিরাজি পাঠদান করতেন।
৪৬৫ হিজরি সনে (১০৭২ খ্রিষ্টাব্দে) আলপ আরসালান প্রায় দুই লক্ষ সৈন্য নিয়ে তুর্কিস্তান অভিমুখে রওনা হন এবং আমু দরিয়া পাড়ি দেন। কিন্তু এরইমধ্যে তার পরপারের ডাক এসে যায়। বর্ণিত আছে, মৃত্যুর পূর্বে তিনি বলেছিলেন—
আমি যখনই কোনো শত্রুর উদ্দেশে কোনো যুদ্ধক্ষেত্রে রওনা হয়েছি, কেবল আল্লাহর ওপর ভরসা করেছি এবং তার কাছেই সাহায্যপ্রার্থনা করেছি। এবারের অভিযানে আমি একটি উঁচু টিলায় দাঁড়িয়ে আমার সৈন্যবাহিনীর দিকে তাকিয়ে বলেছিলাম, 'কে আছে আমার মোকাবিলা করার, আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার?! আমি তো আমার এই বাহিনী নিয়ে চীনের সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছতে পারব।' এখন আল্লাহ যা চেয়েছেন, তাই হতে যাচ্ছে।
বিশিষ্ট ঐতিহাসিক ইবনুল আছির আলপ আরসালান সম্পর্কে লিখেছেন— তিনি ছিলেন গুণী ও উদার, জ্ঞানী ও ন্যায়পরায়ণ। পরনিন্দা-কানকথা মোটেও শুনতে পারতেন না। তার শাসনামলে সেলজুক সাম্রাজ্যের পরিধি অনেক বৃদ্ধি পায় এবং দিগন্ত বিস্তৃত অঞ্চল তার বশীভূত হয়। তাকে প্রদত্ত 'সুলতানুল আলম' বা জগতের সুলতান অভিধা ছিল সত্যই তার শানে যথোপযুক্ত। মহৎ হৃদয় এই সুলতান দরিদ্রদের প্রতি অনুগ্রহপূর্ণ আচরণ করতেন, আল্লাহর দরবারে প্রচুর দোয়া করতেন। সৈন্যরা যেন জনসাধারণের সম্পদে অন্যায় হস্তক্ষেপ করতে না পারে, এ বিষয়ে তিনি কঠোর নজরদারি করতেন। (১২৪)
আলপ আরসালানের মৃত্যুর পর সেলজুক সালতানাতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তার পুত্র জালালুদ্দৌলা আবুল ফাতাহ মালিক শাহ। তার আমলেই ৪৬৭ হিজরি সনের ১৩ শাবান (১০৭৫ খ্রিষ্টাব্দের ৩ এপ্রিল) মৃত্যুবরণ করেন খলিফা কায়িম বি আমরিল্লাহ। এ সময় খলিফার বয়স ছিল ছিয়াত্তর বছর। তিনি দীর্ঘ পঁয়তাল্লিশ বছর খলিফা পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
ঐতিহাসিক ইবনে কাছির রহ. খলিফা কায়িম বি আমরিল্লাহর আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন—
“তার পূর্বে অন্য কোনো খলিফা এত দীর্ঘ সময় খিলাফতের দায়িত্ব পালন করেননি। তিনি সুভাষী, খোদাভীরু ও দুনিয়াবিরাগী ছিলেন। জনগণের প্রতি উদার ও বদান্য আচরণ করতেন। দ্বীন ও ধার্মিকতা, আকিদা ও ধর্মবিশ্বাস এবং রাষ্ট্রব্যবস্থাপনা—সর্ববিবেচনায় তিনি বনু আব্বাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ খলিফা ছিলেন। তিনি বাসাসিরির ফিতনার সম্মুখীন হন এবং এ কারণে তাকে রাজপ্রাসাদ, পরিবার-পরিজন ও মাতৃভূমি ছেড়ে নির্বাসিত হতে হয়। দীর্ঘ এক বছর তিনি হাদিসা আনা অঞ্চলে নির্বাসিত অবস্থায় জীবনযাপন করেন। এরপর আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহে পুনরায় তিনি খলিফা পদে অধিষ্ঠিত হন।” (১২৫)
টিকাঃ
১২২. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৮/৩৮৮-৩৮৯।
১২৩. প্রাগুক্ত, ৭/৩০৯ ও ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১১/২৬৬-২৬৭।
১২৪. আবুল হাসান ইযযুদ্দিন ইবনুল আছির, আল-কামিল ফিত-তারীখ, ৮/৩৯৪।
১২৫. ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১২/১০৫।