📄 মুতি লিল্লাহ আবুল কাসিম ফজল
মুতি লিল্লাহর জন্ম ৩০১ হিজরি সনে বাগদাদে। খলিফা পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার সময় তার বয়স ছিল তেত্রিশ বছর। মুসতাকফিকে অপসারণের পর তার চাচাতো ভাই মুতি লিল্লাহকে খলিফা পদে বসানো হয়।
মুতি লিল্লাহ খলিফা হওয়ার পর সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে দাঙ্গা ও গোলযোগের শিকার হন। তাদেরকে শান্ত ও তুষ্ট করার জন্য নিরুপায় হয়ে তিনি তাদেরকে রাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকার জায়গির প্রদান করেন। ফলে সারাদেশে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পায়, লুটপাট বেড়ে যায়। এক বছর অতিবাহিত না হতেই রাজধানী বাগদাদেও এর প্রভাব পড়ে। দুর্মূল্য এক সময় দুর্ভিক্ষে রূপ নেয়। ক্ষুধার তাড়নায় মানুষ মৃত প্রাণী ও কুকুর খেতে বাধ্য হয়। খাবার হিসেবে মানুষ খেতে থাকে কাঁটাযুক্ত কারব (carob)। কারবের বিচি ঝলসে খাওয়ার কারণে বিভিন্ন রোগ-ব্যাধি এবং আঁতড়ি ও পেটে স্ফীতি (টিউমার) দেখা দেয়। বহু মানুষ ক্ষুধার তাড়নায় ও রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এত অধিক মানুষের দাফন-কাফনে অক্ষমতা দেখা দেওয়ায় কুকুর মানুষের লাশ ভক্ষণ করতে থাকে। অনেক মানুষ বাগদাদ ছেড়ে বসরার পথে রওনা হয়। তাদের অধিকাংশই পথিমধ্যে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। বাড়িঘর ও জমিজমা রুটির বিনিময়ে বিক্রি হতে থাকে।
প্রকৃতপক্ষে জায়গির পদ্ধতির সূচনা ছিল ইরাকের ধ্বংসের প্রথম ধাপ। এর ফলে যারা জমিচাষ ও ক্ষেতের পরিচর্যা করত, সেই কৃষকশ্রেণি কর্মস্পৃহা ও উদ্দীপনা হারিয়ে ফেলে।
একইসময় দায়লামি ও তুর্কি সৈন্যদের মধ্যে শুরু হয় সাম্প্রদায়িক সংঘাত। দায়লামিরা মুইযুদ্দৌলাকে অপসারণ করার চেষ্টা চালালে তুর্কিরা তার পক্ষ নিয়ে এই প্রচেষ্টা বানচাল করে দেয়। ফলে মুইযুদ্দৌলা এবার দায়লামিদের বাদ দিয়ে তুর্কিদের প্রতি প্রসন্ন হন। তিনি তুর্কিদেরকে অবাধ ক্ষমতা প্রদান করেন। ক্ষমতা পেয়ে তুর্কিরা দেশজুড়ে লুটপাট ও অরাজকতা সৃষ্টি করে।
📄 ইরাকে শিয়া কর্তৃত্ব বিস্তার : উবায়দিদের পথে বুওয়াইহি পরিবার
বুওয়াইহি পরিবারের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হওয়ার আগ পর্যন্ত বাগদাদবাসী আলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর মতাদর্শে জীবনযাপন করত। তারা সকল সাহাবিকে শ্রদ্ধা করত, শায়খায়ন (১১০) অন্যান্য সাহাবির তুলনায় শ্রেষ্ঠ মনে করত, সাহাবি মুয়াবিয়া রাযি. ও পূর্বসূরি বিদ্বগ্ধ মনীষীগণের সমালোচনা করার ন্যায় আত্মবিনাশী কাজ থেকে বিরত থাকত। কিন্তু বুওয়াইহি শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বাগদাদে শিয়া মতাদর্শ বিস্তার লাভ করতে থাকে। কারণ, বুওয়াইহি পরিবার ছিল শিয়া মতাদর্শে বিশ্বাসী। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় শিয়া মতবাদ ইরাকে সুদৃঢ় অবস্থান লাভ করতে সক্ষম হয়। ৩৫২ হিজরি সনে (৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে) মুইযুদ্দৌলা বাগদাদের মসজিদের সামনে নিম্নোক্ত বাক্যগুলো (নাউযুবিল্লাহ) উৎকীর্ণ করার নির্দেশ দেন—
আল্লাহ তাআলা মুয়াবিয়া বিন আবু সুফিয়ানকে অভিসম্পাত করুন। যারা ফাতিমা রাযি.-কে ফাদাক হতে বঞ্চিত করেছে (১১৪), তাদেরকেও অভিসম্পাত করুন। যারা হুসাইনকে তার নানার পাশে সমাহিত হতে বাধা প্রদান করেছে, আল্লাহ তাদেরকে অভিসম্পাত করুন।
ফলকটি স্থাপন করার পর রাতের বেলা অজ্ঞাত কেউ তা তুলে ফেলে। কিন্তু মুইযুদ্দৌলা পরে একই লেখা পুনঃস্থাপন করেন।
৩৫২ হিজরি সনের ১০ মুহাররম (৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দের ৮ ফেব্রুয়ারি) মুইযযুদ্দৌলা ফরমান জারি করেন যে, এখন থেকে ১০ মুহাররম সবধরনের কাজকর্ম বন্ধ রেখে সবাইকে বিলাপ করতে হবে, কৃত্রিম গম্বুজ তৈরি করতে হবে, নারীদের মুখে কালি মেখে পরিধেয় বস্ত্র বিদীর্ণ করে 'হায় হুসাইন! হায় হুসাইন!' মাতম করে সড়ক প্রদক্ষিণ করতে হবে। মুইযযুদ্দৌলার নির্দেশনা মোতাবেক শিয়া মতাদর্শীরা মহা সমারোহে এসব নির্দেশনা পালন করা শুরু করে। বাগদাদের সুন্নি জনগণ যদিও এসব অন্যায় কর্মকাণ্ড প্রত্যক্ষ করছিল; কিন্তু একদিকে শিয়াদের জয়জয়কার, অপরদিকে প্রশাসনের সরাসরি সমর্থন শিয়াদের পক্ষে থাকায় তাদের বাধা প্রদানের কোনো শক্তি ছিল না।
একই বছরের ১৮ জিলহজ (১১৫) (৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দের ৭ জানুয়ারি) মুইযযুদ্দৌলা সবাইকে আগুন প্রজ্বলিত করে এবং ঘরবাড়ি সুসজ্জিত করে উৎসব করার নির্দেশ দেন এবং ১৮ জিলহজকে 'ঈদুল গাদির' নামকরণ করেন। এরপর থেকে শিয়া সম্প্রদায়ের লোকেরা ১৮ জিলহজ ঈদ পালন করে থাকে। তারা এর স্বপক্ষে নিম্নোক্ত হাদিস দলিল হিসেবে পেশ করে এবং দাবি করে যে, এর মাধ্যমে নবীজির ইন্তেকালের পর হজরত আলি রাযি.-এর প্রথম খলিফা হওয়ার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।
مَنْ كُنْتُ مَوْلَاهُ فَعَلَيَّ مَوْلَاهُ، اللَّهُمَّ وَالِ مَنْ وَالَاهُ وَعَادِ مَنْ عَادَاهُ
আমি যার বন্ধু হব, আলিও তার বন্ধু। হে আল্লাহ, যারা আলির প্রতি হৃদ্যতা পোষণ করে, আপনি তাদের প্রতি হৃদ্যতা পোষণ করুন আর যারা তার প্রতি শত্রুতা পোষণ করে, আপনিও তাদের প্রতি শত্রুতা পোষণ করুন। (১১৬)
জাযিরার আরব শাসক নাসিরুদ্দৌলার সঙ্গে বুওয়াইহি সুলতান মুইযযুদ্দৌলার বেশ কয়েকবার যুদ্ধ সংঘটিত হয়। দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী এ যুদ্ধের কারণে উভয় পক্ষই অন্য সবকিছু বাদ দিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় ব্যস্ত ছিল। পারস্পরিক এই সংঘাতের ফলে স্বাভাবিকভাবেই মুসলমানদের সামরিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সমকালীন বাইজান্টাইন শক্তি ইসলামি ভূখণ্ডে আক্রমণ করার দুঃসাহস দেখায়। যথাস্থানে এর বিস্তারিত বিবরণ আসবে।
মুইযযুদ্দৌলা ৩৫৬ হিজরি সনের ১৩ রবিউল আউয়াল (৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ ফেব্রুয়ারি) ইন্তেকাল করেন। তার স্থলাভিষিক্ত হন তার পুত্র ইযযুদ্দৌলা বখতিয়ার বিন আহমাদ বিন বুওয়াইহি। ৩৬৭ হিজরি সনে আপন চাচাতো ভাই আযদুদ্দৌলা কর্তৃক অপসারিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি আমিরুল উমারার দায়িত্ব পালন করেন। ইযযুদ্দৌলা তার পুরো শাসনামল অনর্থক কর্মকাণ্ড, খেল-তামাশা ও নারীসম্ভোগে নষ্ট করেন। অনুচর ও সহকারীদের সঙ্গে তিনি ভালো ব্যবহার করতেন না। তাই তারা তাকে ভয় করত এবং তাকে এড়িয়ে চলত। এ সময় রোমানরা মুসলমানদের পারস্পরিক হানাহানির সুযোগ নিয়ে ইসলামি রাষ্ট্রের সবগুলো প্রধান সীমান্ত নগরী পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়। রোমানদের উপর্যুপরি আগ্রাসনে জাযিরা ও শামের মুসলিম অধিবাসীদের অন্তরে রোমানভীতি ছড়িয়ে পড়ে। দুই শাসক গোষ্ঠী বুওয়াইহি ও হামদান রাজপরিবার তখন নিজেদের প্রকৃত শত্রুর কথা ভুলে গিয়ে পারস্পরিক হানাহানিতে ব্যস্ত ছিল।
ইরাককেন্দ্রিক আব্বাসি সাম্রাজ্যের তৎকালীন পরিস্থিতি অনুধাবন করতে নিম্নোক্ত ঘটনাটি সহায়ক হতে পারে।
৩৬১ হিজরি সনে রোমান সম্রাট ১ম জন (John I Tzimiskes) এডেসা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে হামলা চালান এবং সামনে অগ্রসর হয়ে জাযিরার নুসায়েবিন পর্যন্ত পৌঁছে যান। রোমান বাহিনী এ সময় বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়, মুসলমানদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়। তখন নুসায়েবিনের একটি প্রতিনিধিদল সাহায্যপ্রাপ্তির আশায় বাগদাদে উপস্থিত হয়। তারা বাগদাদের জনসমাগমপূর্ণ বিভিন্ন স্থানে গিয়ে নিজেদের দুরবস্থা ও রোমানদের নির্যাতন-লুণ্ঠনের কথা তুলে ধরে সাহায্যপ্রার্থনা করে এবং দলমত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সাধারণ জনগণ ও সেনাবাহিনীসহ সকল বাগদাদবাসীকে রোমানদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানায়।
নুসায়েবিনবাসীর দুর্দশার কথা শুনে বাগদাদবাসী অস্থির ও উত্তেজিত হয়ে পড়ে। উত্তেজিত জনতা খলিফার বাসগৃহ ঘেরাও করে হামলা চালাতে উদ্যত হলে নুসায়বিনের প্রতিনিধিদল তাদেরকে নিবৃত্ত করে। বাগদাদের মূল অধিকর্তা আমিরুল উমারা ইযযুদ্দৌলা বখতিয়ার তখন কুফার উপকণ্ঠে সৌখিন শিকারে ব্যস্ত! তার কাছে সাহায্যপ্রার্থনার জন্য বাগদাদের সম্ভ্রান্ত ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের একটি প্রতিনিধিদল কুফার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। জাতীয় প্রয়োজন ভুলে সৌখিন শিকারে ব্যস্ত থাকা, ইসলামি ভূখণ্ডে রোমানদের আগ্রাসন প্রতিরোধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ না করা এবং বুতাইহা অঞ্চলের মুসলিম শাসক ইমরান বিন শাহিনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়ানো ইত্যাদি কারণে বাগদাদবাসী তখন বখতিয়ারের প্রতি প্রচণ্ড ক্রুদ্ধ ছিল।
প্রতিনিধিদল সাক্ষাৎ করার পর ইযযুদ্দৌলা তাদেরকে শীঘ্রই রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধপ্রস্তুতি গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি তার সচিব সুবুক্তগিনকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার এবং জনসাধারণকে যুদ্ধাভিযানে অংশগ্রহণে উদ্বুদ্ধ করার নির্দেশ দেন। সুবুক্তগিনের আহ্বানে অসংখ্য মানুষ অভিযানে যোগ দিতে প্রস্তুত হয়ে যায়।
ইযযুদ্দৌলা মসুলের অধিপতি আবু তাগলিব বিন হামদানের কাছে বার্তা পাঠিয়ে জানান যে, তিনি রোমানদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করতে যাচ্ছেন। কাজেই মসুল-অধিপতি যেন মুসলিম বাহিনীর যুদ্ধপ্রস্তুতিতে সহায়তা করেন এবং প্রয়োজনীয় রসদপত্র ও খাবারদাবার সরবরাহ করেন। আবু তাগলিব সানন্দে সহায়তা করতে রাজি হন। এরপর ইযযুদ্দৌলা খলিফা মুতি লিল্লাহর কাছে বার্তা পাঠিয়ে তাকে যুদ্ধাভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সরবরাহের নির্দেশ দেন। উত্তরে খলিফা বলেন, 'আমি যদি প্রচুর সম্পদের মালিক হতাম বা রাষ্ট্রীয় সম্পদ আমার নিয়ন্ত্রণে থাকত, তাহলে যুদ্ধে অংশগ্রহণ ও যুদ্ধব্যয়ে শরিক হওয়ার মতো জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে সহায়তা করা আমার ওপর অপরিহার্য হতো। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমার ওপর এ ধরনের কোনো দায়িত্ব বর্তায় না। এ দায়িত্ব তো তার ওপরই বর্তাবে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও সম্পদ যার হাতে আছে। আমার ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি তো খুতবায় নাম উচ্চারণেই সীমাবদ্ধ। সুতরাং আমার পক্ষে কিছুই দেওয়া সম্ভব নয়। যদি আমাকে পদত্যাগে বাধ্য করো, আমি তাও করতে রাজি আছি।'
এরপর খলিফা ও সুলতানের মধ্যে একাধিকবার পত্রবিনিময় হয়। শেষ পর্যন্ত ইযযুদ্দিন বখতিয়ার হুমকির পথ অবলম্বন করলে খলিফা নিজের পোশাক-পরিচ্ছদ, রাজপ্রাসাদের ভগ্নাবশেষ ইত্যাদি বিক্রি করে চার লক্ষ দিরহাম সংগ্রহ করে বখতিয়ারকে প্রদান করেন। ইরাক, খোরাসানসহ অন্যান্য অঞ্চলের অধিবাসীদের মাঝে এ কথা ছড়িয়ে পড়ে যে, খলিফার যাবতীয় সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। খলিফাপ্রদত্ত অর্থ হাতে পাওয়ার পর বখতিয়ার যুদ্ধের কথা বেমালুম ভুলে যান এবং পুরো অর্থ নিজের স্বার্থে ব্যয় করেন!
খলিফা মুতি লিল্লাহর খিলাফতকালেই ৩৫৮ হিজরি সনে (৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে) সেনাপতি জাওহার সিকিল্লির নেতৃত্বে উবায়দিরা মিশর দখল করে নেয়। একই বছর তারা বাইতুল মুকাদ্দাস ও দামেশকসহ শামের বিরাট অংশও উবায়দি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হয়। জাওহার সিকিল্লি বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে মিশরে উবায়দিদের অনুকূল ক্ষেত্র প্রস্তুত করার পর ৩৬২ হিজরি সনে (৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে) উবায়দি খলিফা মুইয লি দ্বীনিল্লাহ মাগরিব থেকে মিশরে আগমন করেন এবং কায়রোকে উবায়দি সাম্রাজ্যের রাজধানী নির্বাচিত করেন। এ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা সামনে স্বতন্ত্র পরিচ্ছেদে করা হবে।
দীর্ঘ উনত্রিশ বছর দায়িত্ব পালন করার পর ৩৬৩ হিজরি সনের ১৫ জিলকদ (৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দের ৭ আগস্ট) খলিফা মুতি লিল্লাহ অসুস্থতাজনিত কারণে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি গ্রহণ করেন এবং তার পুত্র আবদুল কারিমকে খলিফা নির্বাচিত করেন। এর কিছুদিন পরই তিনি ইন্তেকাল করেন। মুতি লিল্লাহ তার খিলাফত আমলে উল্লেখযোগ্য কোনো কীর্তি-অবদান রেখে যেতে পারেননি।
টিকাঃ
১১০. ‘শায়খায়ন’ মানে প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর রাযি. ও দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর রাযি.।
১১৪. যায়বার ও ফাদাক-ভূমিতে হযরত ফাতিমা রাযি.-এর মিরাস দাবি-সংক্রান্ত আলোচনা প্রথম খলিফা আবু বকর সিদ্দীক রাযি.-এর খিলাফতকালের আলোচনায় গত হয়েছে।
১১৫. শিয়াদের আকিদা হলো-নবীজির মৃত্যুর পর হজরত আলি রাযি.-ই ছিলেন নবীজির খলিফা হওয়ার প্রকৃত হকদার এবং নবীজি আপন জীবদ্দশায় বিভিন্নভাবে এ বিষয়টি ঘোষণা করে গেছেন। তাদের ভাষ্যমতে সবশেষে দশম হিজরি সনের ১৮ জিলহজ নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজ থেকে প্রত্যাবর্তনের সময় মক্কা ও মদিনার মধ্যবর্তী 'গাদির খুম' নামক স্থানে এক ভাষণ প্রদান করেন এবং লক্ষ সাহাবির উপস্থিতিতে হজরত আলি রাযি.-এর খলিফা হওয়ার ঘোষণা প্রদান করেন। এ কারণে তারা ১৮ জিলহজ ঈদ উদ্যাপন করে এবং একে 'ঈদুল গাদির' বলে অভিহিত করে। এ তথ্যটিও এখানে প্রণিধানযোগ্য যে, তৃতীয় খলিফা হজরত উসমান রাযি.-এর শাহাদাতের তারিখও ১৮ জিলহজ।
১১৬. 'সুনানে তিরমিজি' ও 'সুনানে ইবনে মাজাহ'-সহ বিভিন্ন হাদিসগ্রন্থে উক্ত বর্ণনাটির প্রথম অংশ বিদ্যমান থাকলেও গবেষক মুহাদ্দিসগণ উক্ত বর্ণনাটিকে অগ্রহণযোগ্য আখ্যায়িত করেছেন। হাফেজ ইবনে হাজার মক্কি রহ. লিখেছেন, উক্ত হাদিসের শুদ্ধতার বিষয়ে এমন একদল হাদিস বিশারদ আপত্তি করেছেন, হাদিস শাস্ত্রে যাদেরকে 'সমাধানস্থল' বিবেচনা করে হয়। যেমন : ইমাম আবু দাউদ, আবু হাতিম রাযি প্রমুখ। [আস-সাওয়াইকুল মুহারাকাহ, ১/১০৭]। আল্লামা যায়লায়ি রহ. লিখেছেন, এমন অনেক হাদিস আছে, যা বর্ণনাকারী ও সনদের আধিক্য সত্ত্বেও মানের দিক থেকে যয়িফ। যেমন : مَنْ كُنْتُ مَوْلَاهُ فَعَلَى مَوْلَاهُ [তাখরিজুল হিদায়া, ১/১৮৯]। শায়খুল ইসলাম ইবনে তায়মিয়া রহ. লিখেছেন, উক্ত হাদিসটি 'সহিহ' শিরোনামের হাদিস গ্রন্থগুলোতে নেই। অবশ্য উলামায়ে কেরামের অনেকে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন। হাদিসটির বিশুদ্ধতা নিয়ে মতবিরোধ আছে। বুখারি, ইবরাহিম আল-হারবি-সহ একদল মুহাদ্দিস হাদিসটির বিষয়ে আপত্তি করেছেন। আর হাদিসটির শেষ অংশ অর্থাৎ اللَّهُمَّ وَالِ مَنْ وَالَاهُ وَعَادِ مَنْ عَادَاهُ তা সন্দেহাতীতভাবেই জাল ও বানোয়াট। [মিনহাজুস সুন্নাহ, ৭/৩১৯]। মোটকথা, এ জাতীয় সংশয়পূর্ণ রেওয়ায়েত যদিও বিভিন্ন হাদিস গ্রন্থের মানাকিব (ব্যক্তির গুণ ও বৈশিষ্ট্য) অধ্যায়ে পাওয়া যায়; কিন্তু তা দিয়ে কোনো মৌলিক আকিদাগত বিষয় কিছুতেই প্রমাণিত হয় না।