📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 তৎকালীন ইসলামি বিশ্বের পরিস্থিতি

📄 তৎকালীন ইসলামি বিশ্বের পরিস্থিতি


ইতিহাসের এই স্তরে হিজরি চতুর্থ শতাব্দীর মধ্যভাগে এসে আমরা যদি ইসলামি বিশ্বের দিকে দৃষ্টিপাত করি, তাহলে দেখতে পাব—
• আন্দালুসে আমিরুল মুমিনিন আবদুর রহমান আন-নাসির শাসন করছিলেন।
• আফ্রিকায় ছিল উবায়দিদের শাসন।
• মরক্কোয় ছিল ইদরিসি শাসন। দ্বিতীয় ইদরিসি শাসক ইসমাইল আল-মানসুর তখন সেখানকার শাসনকর্তা ছিলেন এবং তিনিও ‘আমিরুল মুমিনিন’ উপাধি ধারণ করেছিলেন।
• মিশর ও শামে ছিল ইখশিদিদের শাসন। অবশ্য তারা জুমার খুতবায় খলিফা হিসেবে আব্বাসি খলিফার নামই পাঠ করত।
• আলেপ্পো (১১১) ও সীমান্ত অঞ্চলগুলোতে ছিল সাইফুদ্দৌলা আলি বিন আবদুল্লাহ বিন হামদান শায়বানির শাসন। এ অঞ্চলেও মুসলিম সাম্রাজ্যের খলিফা হিসেবে আব্বাসি খলিফার নামই জুমার খুতবায় উচ্চারিত হতো।
• ফুরাত অববাহিকার জাযিরা অঞ্চল বা মেসোপটেমিয়া উচ্চভূমিতে (Upper Mesopotamia) ছিল নাসিরুদ্দৌলা হাসান বিন আলি বিন আবদুল্লাহ বিন হামদানের কর্তৃত্ব। তিনিও খুতবায় আব্বাসি খলিফার নাম পাঠ করতেন।
• ইরাকে ছিল দায়লামিদের ক্ষমতা। মুইযযুদ্দৌলা আহমাদ বিন বুওয়াইহি ছিলেন তৎকালীন ইরাকের সুলতান। বাগদাদের মিম্বরসমূহে এ সময় আব্বাসি খলিফার নাম নেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে বুওয়াইহি সুলতান মুইযযুদ্দৌলার নাম নেওয়া হতে থাকে।
• আম্মান, ইয়ামেন, বাহরাইন ও বসরার বাদিয়া অঞ্চলে ছিল কারামাতিয়াদের শাসন। এসব এলাকায় উবায়দি শাসক মাহদির নামে খুতবা পাঠ করা হতো।
• পারস্য ও আহওয়াজে ছিল ইমাদুদ্দৌলা উপাধিধারী আলি বিন বুওয়াইহির শাসন। তিনি আব্বাসি খলিফার নামেই খুতবা পাঠ করতেন। তাকে আমিরুল উমারা উপাধিও প্রদান করা হয়েছিল। কারণ, তিনিই ছিলেন বুওয়াইহি পরিবারের জ্যেষ্ঠতম সদস্য।
• জাবাল ও রায় অঞ্চলে ছিল রুকনুদ্দৌলা উপাধিধারী হাসান বিন বুওয়াইহির কর্তৃত্ব। তিনিও আব্বাসি খলিফার নামে খুতবা পাঠ করতেন। জুরজান ও তিবরিস্তানের কর্তৃত্ব নিয়ে এ সময় রুকনুদ্দৌলার সঙ্গে সামানি পরিবারের সংঘাত চলছিল।
• খোরাসান ও মাওয়ারাউন নাহারে ছিল সামানি পরিবারের ক্ষমতা। সামানি শাসকের রাজধানী ছিল বুখারা নগরী। সামানিরাও আব্বাসি খলিফার নামে খুতবা পাঠ করত।
একসময় এই সবগুলো বৃহৎ নগরী ও অঞ্চল ছিল এক খিলাফতের অধীনস্থ এবং সুবিশাল ইসলামি খিলাফতের অঙ্গ। কালের পরিক্রমায় ইতিহাসের এই পর্যায়ে এসে আজ সেই সুবিশাল ইসলামি সাম্রাজ্য বিস্ময়করভাবে বহুধা বিভক্ত এবং বিভিন্ন রাজপরিবারের করতলগত!
এ বিষয়টিও লক্ষণীয় যে, এ সময় নির্ভেজাল আরব বংশীয়দের হাতে কোনো এলাকার শাসনক্ষমতা ছিল না। এ ক্ষেত্রে একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল বনু হামদানের নাসিরুদ্দৌলা ও তার ভাই সাইফুদ্দৌলা। তৎকালীন শাসকদের মধ্যে কেবল এ দুজনই ছিলেন আরবি রক্তের ধারক। তবে এ কথাও মনে রাখতে হবে যে, তারা যে অঞ্চলের শাসক ছিলেন, সেসব এলাকায় প্রকৃত ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি ছিল তুর্কি সেনাপতিদের হাতে। তাদের দুজনের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ছিল না। বরং তারা বুওয়াইহি পরিবারের নির্দেশনা মেনে চলতেন এবং খুতবায় আব্বাসি খলিফার নামের পর মুইযযুদ্দৌলার নামও পাঠ করতেন।
আবারও ইতিহাসের ধারাবর্ণনায় ফিরে আসি। মুইযযুদ্দৌলাকে সর্বময় ক্ষমতা প্রদান করার পর মুসতাকফি বিল্লাহ অল্প কদিনই খলিফা পদে থাকতে পেরেছিলেন। চল্লিশ দিন না যেতেই মুইযযুদ্দৌলা তাকে অনধিকার চর্চার অভিযোগে অভিযুক্ত করে খলিফা পদ হতে অপসারণ করেন। এটি ৩৩৪ হিজরি সনের জুমাদাল উখরা মাসের ঘটনা। অর্থাৎ তার খিলাফতকাল মাত্র এক বছর চার মাস স্থায়ী হয়েছিল। অপসারণের পর তার চোখ উপড়ে ফেলা হয় (১১২) এবং তাকে গৃহবন্দি করা হয়। এর চার বছর পর ৩৩৮ হিজরি সনে ছেচল্লিশ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন।

টিকাঃ
১১১. আলেপ্পো: অতি প্রাচীন একটি নগরী। নগরীটির আরবি নাম حلب (হালাব), ইংরেজি নাম Aleppo (আলেপ্পো)। আধুনিক সিরিয়ার অন্তর্গত আলেপ্পো নগরী দেশটির রাজধানী দামেশক হতে প্রায় ৩১০ কিলোমিটার দূরে দেশের উত্তর-পশ্চিম অংশে অবস্থিত।
১১২. মুসতাকফি হলেন তৃতীয় আব্বাসি খলিফা, যার চোখ উপড়ে ফেলা হয়। তার পূর্বে কাহির বিল্লাহ ও মুত্তাকি লিল্লাহর চোখও উপড়ে ফেলা হয়েছিল।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00