📄 আল-মুকতাদির বিল্লাহ আবুল ফজল জাফর
খলিফা মুকতাদিরের জন্ম ২৮২ হিজরি সনে। বড় ভাই মুকতাফি বিল্লাহর ঘোষণা অনুসারে ভাইয়ের মৃত্যুর পর মাত্র তেরো বছর বয়সে তিনি খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বয়সের অপরিপক্বতার কারণে তার শাসনামল জনগণের জন্য কল্যাণকর বিবেচিত হয়নি। প্রবীণ সেনাপতিদের পক্ষ থেকে তাকে অপসারণ করে আবদুল্লাহ বিন মুতাযকে ক্ষমতায় বসানোর প্রচেষ্টা চালানো হয়; কিন্তু তাদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়।
📄 নারী-শাসন
প্রকৃত কথা হলো, মুকতাদিরের শাসনামলে খিলাফতের প্রভাব-প্রতিপত্তি পুরোপুরিই শেষ হয়ে গিয়েছিল। বয়সে অপরিপক্ব খলিফার রাজনীতি ও যুদ্ধনীতি সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না। খলিফার মা ও জনৈকা গৃহ- পরিচারিকাই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করত। কেউ উজির পদ বা অন্য কোনো দায়িত্ব পেতে চাইলে তাদের দুজনকে ঘুষ দিয়েই তা বাগিয়ে নিতে পারত। মুকতাদির নিজে ব্যস্ত থাকতেন খেল-তামাশা, অর্থহীন বিনোদন ও অপব্যয়ে। রাষ্ট্রীয় বিষয়ে তার কোনো নিয়ন্ত্রণই ছিল না। মুকতাদিরের আমলে একে একে বারোবার উজির পদে পরিবর্তন হয়। কেউ কেউ বিভিন্ন মেয়াদে দু-তিনবারও দায়িত্ব পালন করে। উজির-পদ প্রাপ্তির একমাত্র যোগ্যতা ছিল চাহিদামতো ঘুষ প্রদান। খলিফার নারী আত্মীয়, সেবক ও ভৃত্যরা উজির নির্ধারণের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করত। কোনো যোগ্য ও সৎ ব্যক্তি উজির নির্বাচিত হলেও বেশিদিন দায়িত্বে থাকতে পারত না। কারণ, দায়িত্বের স্থায়িত্ব নির্ভর করত খলিফার মা, পরিচারিকা ও গৃহসেবকদের সন্তুষ্টির ওপর। আর তাদের সন্তুষ্টি অর্জনের পথ ছিল একটাই—চাহিদামতো নিয়মিত প্রচুর অর্থ প্রদান। যখনই অর্থপ্রদানে গড়িমসি করা হতো, তখনই উজিরকে বরখাস্ত করে ঘুষপ্রদানে সক্ষম অন্য কাউকে দায়িত্ব প্রদান করা হতো। এরপর কালবিলম্ব না করে অপসারিত উজিরকে বন্দি করা হতো এবং তার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হতো।
৩০১ হিজরি সনে (৯১৩ খ্রিষ্টাব্দে) কারামাতিয়া নেতা আবু সাইদ জান্নাবি নিহত হয় এবং তার পুত্র সাইদ তার স্থলাভিষিক্ত হয়। কিন্তু পরে সাইদের ভাই আবু তাহির সুলায়মান জান্নাবি তাকে পরাভূত করে কারামাতিয়া সম্প্রদায়ের নেতৃত্ব গ্রহণ করে। আবু তাহিরের আমলে কারামাতিয়াদের অনাচার বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। তারা বিভিন্ন অঞ্চল অধিকার করে খিলাফতের রাজধানী বাগদাদের দিকে অগ্রসর হতে থাকে এবং কুফায় পৌঁছে যায়। পথে তারা খলিফা কর্তৃক প্রেরিত বিভিন্ন বাহিনীকে একের পর এক পরাজিত করতে থাকে।
কারামাতিয়া বাহিনীর বাগদাদপানে আগমনের সংবাদ পেয়ে পুরো বাগদাদজুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। সাধারণ জনগণ ও বিশিষ্টজন সকলে কারামাতিয়াদের ভয়ে বাগদাদ ছেড়ে হুলওয়ান ও হামাদানে পালিয়ে যাওয়ার মনস্থ করে। অথচ কারামাতিয়া বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ছিল বড়জোড় দু-হাজার সাতশ এর কাছাকাছি। খলিফা মুকতাদির তাদের সৈন্যসংখ্যার কথা শুনে মন্তব্য করেন, 'আল্লাহ অভিশপ্ত করুন আশি হাজারের অধিক মানুষকে, যারা মাত্র দু-হাজার সাতশ সৈন্যের ভয়ে অক্ষমতা স্বীকার করে নিয়েছে।'
৩১২ হিজরি সনে (৯২৪ খ্রিষ্টাব্দে) কারামাতিয়া নেতা আবু তাহির তার সঙ্গীদের নিয়ে বাইতুল্লাহ হতে প্রত্যাবর্তনরত হাজিদের কাফেলার ওপর হামলা চালায়। হাজিগণ নিজেদের জানমালের নিরাপত্তা রক্ষার্থে তাদেরকে বাধা দিলে কারামাতিয়া বাহিনী প্রচুর সংখ্যক হাজিকে হত্যা করে এবং নারী ও শিশুদের বন্দি করে। সংবাদ পেয়ে খলিফা কারামাতিয়াদের দমন করার জন্য মুনিস আল-খাদিমের নেতৃত্বে একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। খলিফা এই বাহিনীর জন্য এক লক্ষ দিনার ব্যয় করেন। খলিফার বাহিনী প্রেরণের সংবাদ পেয়ে আবু তাহির ভীত হয়ে পড়ে এবং বন্দি হাজিদের ছেড়ে দেয়। ফলে পরিস্থিতি আপাতত শান্ত হয়।
মুকতাদিরের আমলেই আন্দালুসের প্রশাসক আবদুর রহমান আন-নাসির নিজেকে ‘আমিরুল মুমিনিন’ ও ইসলামি বিশ্বের খলিফা ঘোষণা করেন।
২৯৭ হিজরি সনে আফ্রিকায় উবায়দি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। উবায়দি রাষ্ট্র কিছুদিনের মধ্যেই মরক্কোর ইদরিসিয়া রাষ্ট্র ও আফ্রিকা অঞ্চলের আগলাবিয়া রাষ্ট্রের পতন ঘটাতে সক্ষম হয়। উবায়দি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা উবায়দুল্লাহ আল-মাহদি কায়রোয়ানের নিকটে মাহদিয়া নামে একটি শহর পত্তন করে নগরীটিকে উবায়দি রাষ্ট্রের রাজধানী নির্ধারণ করেন। উবায়দি রাষ্ট্র সম্পর্কে সামনে স্বতন্ত্র পরিচ্ছেদে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।
মুকতাদিরের শাসনামলেই ২৯৩ হিজরি সনে (৯০৬ খ্রিষ্টাব্দে) মসুলে হামদান পরিবারের নেতৃত্বে স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে তা বেশি দিন স্থায়িত্ব লাভ করতে পারেনি। হামদানিয়া রাষ্ট্রের ব্যাপ্তি ছিল ৩৯২ হিজরি সন (১০০২ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত।
📄 খলিফা মুকতাদিরের মর্মান্তিক পরিণতি
অত্যন্ত দুঃখজনক ও নির্মম পন্থায় খলিফা মুকতাদিরের শাসনামলের সমাপ্তি ঘটে। সাধারণ সৈন্যরা তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে, সেনাপতিরা বিরাগভাজন হয়ে যায়। তার শাসনামলের অত্যন্ত প্রভাবশালী সেনাপতি ছিল ‘আল-মুযাফফার’ উপাধিধারী মুনিস আল-খাদিম। সে ছিল সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বিষয়ে মুনিসের সঙ্গে খলিফার দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয় এবং এর জের ধরে মুনিসের অনুগত বাহিনী খলিফাকে হত্যা করে। খলিফাকে হত্যা করার পর মুনিসের সৈন্যরা তার মস্তক দেহ হতে বিচ্ছিন্ন করে এবং একটি কাঠের মাথায় কর্তিত মস্তকটি ঝুলিয়ে তাকবির ধ্বনি দিতে দিতে তাকে অভিসম্পাত করতে থাকে। তারা তার সঙ্গে থাকা সবকিছু এমনকি পরিধেয় পায়জামাও খুলে নিয়ে নেয় এবং বিবস্ত্র অবস্থায় তার মৃতদেহ ফেলে রাখে। অবশেষে জনৈক পথিক হাশিশ ঘাস দিয়ে লাশটি ঢেকে দেয় এবং সেখানেই একটি গর্ত করে তাকে দাফন করে।
৩২০ হিজরি সনে মৃত্যুবরণকারী খলিফা মুকতাদিরের বয়স ছিল আটত্রিশ বছর।