📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 আলাবি দাবিদার জনৈক হাবশির বিদ্রোহ

📄 আলাবি দাবিদার জনৈক হাবশির বিদ্রোহ


২৫৫ হিজরি সনের রমজান মাসে (৮৬৯ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট মাসে) আলিবংশের দাবিদার বংশপরিচয়হীন এক ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটে। সে নিজেকে আলি বিন মুহাম্মাদ বিন আহমাদ বিন আলি বিন ঈসা বিন যায়দ বিন আলি বিন হুসাইন বিন আলি বিন আবু তালিব বলে পরিচয় দেয় এবং সবাইকে তার হাতে বায়আত গ্রহণের আহ্বান জানায়।
প্রথম তার ফিতনার আত্মপ্রকাশ ঘটে বাহরাইনে। এরপর সে বাদিয়ায় চলে যায়। তারপর ২৫৪ হিজরিতে পৌঁছে যায় বসরায়। এরপর এই আলাবি দাবিদার তার অনুসারীদের নিয়ে বাগদাদে পৌঁছায়। সেখানে সে এক বছর অবস্থান করে মানুষকে গোপনে তার প্রতি উদ্বুদ্ধ করতে থাকে। পরে সে আবারও বসরায় চলে যায় এবং বসরার নিকটবর্তী কসরে কুরশি নামক প্রাসাদে তার সঙ্গীদের নিয়ে অবস্থান করে। বসরায় দ্বিতীয়বার আগমন করার পর সে সেখানে সার ও অন্যান্য পণ্য বহনে নিয়োজিত ক্রীতদাসদের সাহায্য প্রার্থনা করে। ক্রীতদাসরা সংখ্যায় ছিল অনেক। স্বাভাবিকভাবেই তারা শ্রমমুক্ত স্বাধীন জীবনের স্বপ্ন দেখত। আলাবি দাবিদার বিদ্রোহী লোকটি তাদেরকে স্বাধীন জীবনের প্রতিশ্রুতি দানের পাশাপাশি বর্তমান মালিকদের তাদের দাসে পরিণত করার প্রতিশ্রুতি দেয়। স্বাধীন জীবনের স্বপ্নই যাদের কাছে অনেক বড় কিছু, তাদের যখন আরও স্বপ্ন দেখানো হয় যে, কয়েকদিন পর তাদের বর্তমান মালিকরা তাদেরই ক্রীতদাসে পরিণত হবে, তখন পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াবে, তা বলাই বাহুল্য।
আলি বিন মুহাম্মাদ দাবিদার হাবশি বিদ্রোহী এরপর রায়হান বিন সালিহ নামক জনৈক ক্রীতদাসকে অন্যদের প্ররোচিত করার দায়িত্ব দেয়। সে তাকে প্রতিশ্রুতি দেয় যে, ভবিষ্যতে সে-ই হবে আলাবি বাহিনীর প্রধান। সেনাপতি। রায়হানের প্রচেষ্টায় বহু সংখ্যক হাবশি ক্রীতদাস বিদ্রোহী দলে যোগ দেয়। আলি তাদেরকে বক্তৃতার মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ করে, তাদেরকে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি প্রদান করে এবং অঙ্গীকার করে যে, সে তাদের সঙ্গে কখনো প্রতারণা করবে না। ফলে অন্যান্য হাবশি ক্রীতদাসরাও দলে দলে তার পক্ষে সমবেত হতে থাকে।
নতুন এই ফিতনা দমন করার জন্য খলিফা মুতামিদ একের পর এক কয়েকটি বাহিনী প্রেরণ করেন। কিন্তু প্রতিটি বাহিনী বিদ্রোহীদের কাছে পরাজিত হয়। একের পর এক বিজয়ে আলি উন্মাদ হয়ে ওঠে এবং তার অনুসারীদের নিয়ে লুটতরাজ ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে ব্যাপক অরাজকতা চালাতে থাকে। দিনে দিনে সে আব্বাসি সাম্রাজ্যের জন্য মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি বিবেচনায় আবু আহমাদ আল-মুওয়াফফাক তাকে দমনের জন্য বিশাল সৈন্যসমাবেশ ঘটান এবং নিজেই বাহিনীর সেনাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। প্রধান সহকারী হিসেবে তিনি সঙ্গে নেন তার পুত্র আবুল আব্বাসকে। বিদ্রোহী আলিকে দমন করার জন্য জনগণ দলে দলে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে বাহিনীতে যোগদান করে।
একটানা কয়েক বছর আলির বিরুদ্ধে আবু আহমাদের লড়াই অব্যাহত থাকে। আলিকে দমন করতে আবু আহমাদ আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করেন এবং যথেষ্ট ত্যাগ স্বীকার করেন। এমনকি তিনি এক যুদ্ধে তিরবিদ্ধও হন এবং কয়েকদিন অসুস্থ থাকেন। সেনাপতি আহত হয়ে পড়ায় সৈন্যরাও বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু আবু আহমাদ সকলকে উদ্বুদ্ধ করতে থাকেন। একপর্যায়ে তিনি সুস্থ হন এবং আল্লাহ তাআলা তাকে বিজয় দান করেন। দুষ্ট বিদ্রোহীর কর্তিত মস্তক তার সামনে আনা হলে তিনি আল্লাহর শোকর আদায় করতে সিজদাবনত হয়ে পড়েন। ইসলামি বিশ্বের প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের মুসলমানগণ এই বিজয়ে আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। ২৭০ হিজরি সনের সফর মাসে (৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট মাসে) এই ফিতনার পতন ঘটে। অর্থাৎ একটানা চৌদ্দ বছর সে আব্বাসি রাজপরিবারকে নির্ঘুম রেখেছিল।
মুতামিদের আমলে ২৬১ হিজরি সনে (৮৭৪ খ্রিষ্টাব্দে) ট্রান্সঅক্সিয়ানা অঞ্চলে সামানিয়া রাষ্ট্রের আবির্ভাব ঘটে। ৩৮৯ হিজরি সন (৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত একটানা প্রায় একশ সত্তর বছর সামানিয়া রাষ্ট্র টিকে ছিল। একদিকে গজনবি (সুবুক্তগিন) পরিবার, অপরদিকে খাকানি তুর্কিদের হাতে সামানিয়া রাষ্ট্রের পতন ঘটে। সামানিয়া রাষ্ট্র সম্পর্কেও সামনে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।
মুতামিদের শাসনামলে বাহরাইন, ইরাক ও শাম—এই তিন অঞ্চলে কারামাতিয়া সম্প্রদায়ের আত্মপ্রকাশ ঘটে। এ ছাড়াও সে সময় ইয়ামেন ও আফ্রিকা অঞ্চলে উবায়দি সাম্রাজ্যের আহ্বায়কগণ তাদের চিন্তাধারা প্রসারে ব্যস্ত ছিল। অর্থাৎ একই সঙ্গে ইসলামি বিশ্বের প্রতিটি অংশে ইসমাইলি মতাদর্শীরা এমন প্রবল শক্তিরূপে আত্মপ্রকাশ করার প্রেক্ষাপট তৈরি করছিল, যার অনিষ্টতা রোধ করার মতো শক্তি তৎকালীন আব্বাসি খিলাফতের ছিল না। আর কিছুদিন পর বাস্তবেও তা-ই ঘটেছিল।
২৭৯ হিজরি সনের ৯ রজব (৮৯২ খ্রিষ্টাব্দের ৫ অক্টোবর) আব্বাসি খলিফা মুতামিদ পঞ্চাশ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00