📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ 📄 আল-মুহতাদি বিল্লাহ আবু ইসহাক মুহাম্মাদ

📄 আল-মুহতাদি বিল্লাহ আবু ইসহাক মুহাম্মাদ


খলিফা মুহতাদি বিল্লাহর জন্ম ২১৯ হিজরি সনে। ২৫৫ হিজরি সনের রজব মাসে ছত্রিশ বছর বয়সে তিনি তার চাচাতো ভাই মুতায বিল্লাহর স্থলাভিষিক্ত হন।
মুহতাদি বিল্লাহ পূর্ববর্তী খলিফা মুতায কর্তৃক বাগদাদে নির্বাসিত ও বন্দি ছিলেন। তুর্কিরা তাকে মুতায বিল্লাহর স্থলাভিষিক্ত করার জন্য উপস্থিত করে। তিনি যখন সামাররায় আসছিলেন, পথিমধ্যে তুর্কি মামলুকরা তার সাক্ষাৎ পায় এবং তাকে খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের অনুরোধ জানায়। কিন্তু তিনি মুতাযের সাক্ষাৎলাভ এবং তার কথা শ্রবণ করার পূর্বে দায়িত্ব গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান। মুতাযের সাক্ষাৎলাভের পর যখন তিনি তাকে উল্লিখিত অবস্থায় দেখতে পান, তখন তাকে জড়িয়ে ধরেন এবং তার এই দুরবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেন। মুহতাদি বিল্লাহ মুতায ও তুর্কিদের মধ্যে সমঝোতা সৃষ্টিরও চেষ্টা করেন। কিন্তু মুতায তাকে নিবৃত্ত করে বলেন, 'আমার এই সমঝোতার প্রয়োজন নেই আর তারা আমার প্রতি সন্তুষ্ট হবেও না।'
মুহতাদি বিল্লাহ ছিলেন বনু আব্বাসের অন্যতম নেককার, বুজুর্গ ও ন্যায়পরায়ণ খলিফা। (১০৮) তিনি জুলুম-অত্যাচার অপছন্দ করতেন। প্রজাদের মাঝে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে তিনি চার দরজাবিশিষ্ট একটি বিচারালয় নির্মাণ করেন এবং এর নামকরণ করেন 'ন্যায়বিচার ভবন'। তিনি সেখানে বসে জনসাধারণ ও বিশিষ্টজন সকলের অভিযোগ শুনতেন। তিনি সৎকাজের আদেশ করতেন, অসৎ কাজে বাধা প্রদান করতেন। তিনি মদ্যপান ও গানবাদ্যও নিষিদ্ধ করেন। মুহতাদি বিল্লাহর ধার্মিকতা ও সংযমশীলতা দেখে সৈন্যগণ সান্ত্বনা লাভ করত। কিন্তু তুর্কিদের পারস্পরিক দ্বন্দ্বের কারণে আব্বাসি সাম্রাজ্যের অবস্থা ছিল পূর্বের ন্যায় অস্থিতিশীল।
রাষ্ট্রের স্বার্থে খলিফা মুহতাদি বিল্লাহ জনৈক সেনাপতির প্রতি প্রসন্ন ছিলেন। একে কেন্দ্র করে তুর্কিরা এবার তাকে অপসারণের মনস্থ করে। এ সংবাদ যখন জনসাধারণের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তারা কিছু কাগজের টুকরা মসজিদে ও রাস্তাঘাটে ছড়িয়ে দেয়। কাগজগুলোতে লেখা ছিল— বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
হে মুসলিম সম্প্রদায়, উমর ইবনুল খাত্তাবের সঙ্গে তুল্য তোমাদের ন্যায়পরায়ণ খলিফার কল্যাণের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করো। আল্লাহ যেন তাকে শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয়ী করেন এবং জালিমদের মোকাবিলায় তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান। মামলুকরা তাকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি গ্রহণের জন্য চাপ প্রয়োগ করছে এবং কয়েকদিন যাবৎ বিভিন্ন শাস্তি দিচ্ছে। অমুক অমুক এর পেছনে কলকাঠি নাড়ছে। যারা নিয়ত ও কর্মে নিষ্ঠার পরিচয় দেবে ও দোয়া করবে, আল্লাহ তাদের প্রতি রহম করুন এবং নবীজির প্রতি শান্তি বর্ষিত করুন।
জনগণের এই কর্মতৎপরতার সংবাদ পেয়ে তুর্কিরা গণবিদ্রোহের আশঙ্কা করে। তারা এবার খলিফার কাছে বার্তা পাঠায় যে, আমরা আপনার জন্য নিজেদের জান-প্রাণ বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত আছি। পাশাপাশি তারা খলিফাকে নিজেদের আর্থিক দুরবস্থা ও ভাতাপ্রাপ্তিতে বিলম্বের বিষয়ে অবহিত করে এবং বড় বড় তুর্কি সেনাপতিরা যে বিভিন্ন জায়গির কুক্ষিগত রেখে সাধারণ সৈন্যদের বঞ্চিত করছে, সে বিষয়ে অভিযোগ জানায়। মুহতাদি তাদেরকে সদাচরণের প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো— খলিফার কাছে তখন তুর্কি সৈন্যদের প্রয়োজন পূরণের মতো যথেষ্ট সম্পদ ছিল না। তুর্কি সৈন্যরা বারবার নিজেদের দাবি জানাতে থাকে এবং তাদের প্রয়োজন পূরণের দাবিতে খলিফার দরবার-দ্বারে অবস্থান গ্রহণ করতে থাকে।
এটি ছিল সেনাপতিদের প্রতি সেনাসদস্যদের অবিন্যস্ত ও বিশৃঙ্খল এক বিদ্রোহ। যদি কোনো শক্তিশালী খলিফা এ সময় বিদ্যমান থাকতেন এবং এই বিদ্রোহের সদ্ব্যবহার করতেন, তাহলে নিশ্চিত করেই আব্বাসি রাজপরিবার তুর্কিদের প্রভাব থেকে নিষ্কৃতি পেতে পারত। কিন্তু মুহতাদি বিল্লাহ তা করেননি। তিনি মনে-প্রাণে সৈন্যদের পক্ষে থাকলেও বাহ্যিক আচরণে ছিলেন সেনাপতিদের পক্ষে। সম্ভবত তিনি কৌশলে তুর্কি সেনাপতিদের প্রভাব থেকে নিষ্কৃতি পেতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু তুর্কিরা তার মনোবাসনা উপলব্ধি করে ফেলে। একে কেন্দ্র করে আবারও আব্বাসি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে যুদ্ধের ঘটনা ঘটে। যুদ্ধের এক পক্ষে ছিল তুর্কিদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধকামী সাধারণ জনগণ ও তুর্কি ব্যতীত অন্যান্য মামলুকগণ, অপর পক্ষে ছিল তুর্কি সৈন্যগণ। খলিফা মুহতাদি বিল্লাহ নিজে গলায় কুরআন ঝুলিয়ে বের হয়ে আসেন এবং তাকে সহায়তা করার জন্য সকলকে আহ্বান জানান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তুর্কিরাই জয়লাভ করে।
২৫৬ হিজরি সনের ১৪ রজব (৮৭০ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ জুন) তুর্কিরা মুহতাদিকে বন্দি করে এবং তাকে তার গৃহে আটকে রাখে। তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগে অস্বীকৃতি জানালে তুর্কিরা তাকে জোরপূর্বক খিলাফতের দায়িত্ব হতে অপসারণ করে। ২৫৬ হিজরি সনের ১৮ রজব (৮৭০ খ্রিষ্টাব্দের ২১ জুন) মুহতাদি বিল্লাহ ইন্তেকাল করেন। এ সময় তার বয়স ছিল সাঁইত্রিশ বছর।

টিকাঃ
১০৮. খতিব বাগদাদি রহ. লিখেছেন, খলিফা মুহতাদি বিল্লাহ খলিফা হওয়ার পর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রতিদিন রোজা রেখেছেন। দ্রষ্টব্য: আবু বকর খতিব বাগদাদি, তারিখু বাগদাদ, ৪/১১৮।

ফন্ট সাইজ
15px
17px