📄 মুসতাঈন বিল্লাহ আবুল আব্বাস আহমাদ
খলিফা মুসতাইনের জন্ম ২২০ হিজরি সনে বাগদাদে। আটাশ বছর বয়সে তিনি খলিফা পদে অধিষ্ঠিত হন। বুগা আস-সাগির, বুগা আল-কাবির ও আতামিশ প্রমুখ তুর্কি সেনাপতিদের নির্দেশনায় মুসতাইনকে খলিফা নির্বাচিত করা হয়। কারণ, পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিতে পারেন—এই আশঙ্কায় তুর্কিরা মুতাওয়াককিলের কোনো পুত্রকে খলিফা পদে অধিষ্ঠিত করতে রাজি ছিল না। তাই তারা তাদেরকে বাদ দিয়ে মুতাওয়াককিলের ভাই মুহাম্মাদের পুত্র আহমাদকে মুসতাইন বিল্লাহ উপাধি দিয়ে খলিফা নির্বাচিত করে। আব্বাসি সাম্রাজ্যের প্রথম দুই খলিফা সাফফাহ ও মানসুরের পর মুসতাইন বিল্লাহ আহমাদই প্রথম খলিফা, যার পিতা খলিফা ছিলেন না। তিনিই প্রথম আব্বাসি খলিফা, যিনি আপন চাচাতো ভাইয়ের পর খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
মুসতাইন বিল্লাহ দায়িত্ব গ্রহণের পর খলিফা পদের প্রভাব-প্রতিপত্তি আরও দুর্বল হয়ে পড়ে এবং তুর্কি মামলুকরাই সাম্রাজ্য পরিচালনা করতে থাকে। খলিফার উজিরও তারাই নির্ধারণ করত। কোনো উজিরের প্রতি বিরাগভাজন হলে তারা তাকে বরখাস্ত করত এবং তার ধন-সম্পদ বাজেয়াপ্ত করত।
এরপর তুর্কি সেনাপতি আতামিশ উজির পদ গ্রহণ করে এবং রাষ্ট্রীয় সকল কর্মকাণ্ডের একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে যায়। এ কারণে ওয়াছিফ, বুগা প্রমুখ তুর্কি সেনাপতিগণ তার প্রতি বিরাগভাজন হয়ে পড়ে। তাদের প্ররোচনায় সেনাবাহিনী আতামিশকে হত্যা করে এবং তার বাড়ি লুট করে।
আতামিশের মৃত্যুর পর খলিফা মুসতাইন বিল্লাহ আবু সালিহ আবদুল্লাহ বিন মুহাম্মাদকে উজির নিযুক্ত করেন, বুগা আস-সাগিরকে প্রদান করেন ফিলিস্তিনের গভর্নরের দায়িত্ব আর ওয়াছিফকে প্রদান করেন আহওয়াজের গভর্নরের দায়িত্ব। ২৫১ হিজরি সনে বুগা আল-কাবির, ওয়াছিফসহ অন্য কয়েকজন তুর্কি সেনাপতি একজোট হয়ে তুর্কি সেনাপতি বাগিরকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। যেসব তুর্কি সেনাপতি সরাসরি মুতাওয়াককিল-হত্যায় অংশগ্রহণ করেছিল, বাগির ছিল তাদের অন্যতম। বাগির ততদিনে বিস্তৃত জায়গিরের মালিক হয়ে গিয়েছিল এবং তার অনুসারী ও কর্মীদের সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছিল। তাকে হত্যা করার পর তার যাবতীয় সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়।
খলিফা মুসতাইনের শাসনামলেই যায়দিয়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। তিবরিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় হাসান বিন যায়দ বিন মুহাম্মাদ বিন ইসমাইল বিন হাসান বিন যায়দ বিন হাসান বিন আলি বিদ্রোহ করেন এবং তিবরিস্তানে যায়দিয়া রাষ্ট্র (ব্যাপ্তিকাল: ২৫০-৩০০ হিজরি) নামে নতুন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন।
২৫১ হিজরি সনেই বাগদাদ ও সামাররার সেনাবাহিনীর মধ্যে বিরাট সংঘাতের ঘটনা ঘটে। সামাররাবাসী প্রয়াত খলিফা মুতাওয়াককিলের পুত্র মুতায-এর হাতে বায়আতের দাবি তোলে। মুতায তখন বন্দি ছিলেন। তাকে জেলখানা থেকে বের করে আনা হয়। বিপরীতে বাগদাদবাসী মুসতাইনের বায়আতে ঐক্যবদ্ধ থাকে। মুসতাইন তার নায়েব মুহাম্মাদ বিন আবদুল্লাহ বিন তাহিরকে বাগদাদ নগরী সুরক্ষিত করার নির্দেশ দেন। বাগদাদের চারপাশে নিরাপত্তা-প্রাচীর নির্মাণ করা হয়, পরিখা খনন করা হয় এবং প্রাচীরের ওপর মিনজানিক ও অন্যান্য বিশালাকার বিভিন্ন যুদ্ধাস্ত্র স্থাপন করা হয়। ওদিকে মুতায ইবনে তাহিরের কাছে বার্তাবাহক পাঠিয়ে তাকে তার দলে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি তাকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, মুতাওয়াককিলের জীবদ্দশায় তিনি মুতাযের বায়আতের অঙ্গীকার করেছিলেন। কিন্তু ইবনে তাহির মুতাযের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে।
তুর্কিরা এবার মুতাযের শিবিরে যোগ দেয়। উভয় দলের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে প্রচণ্ড যুদ্ধ ও ধ্বংসাত্মক ফিতনা। উভয় পক্ষেই প্রচুর মানুষ হতাহত হয়।
পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটলে ইবনে তাহির খলিফা মুসতাইনের বিপক্ষে চলে যায় এবং তাকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি গ্রহণে চাপ প্রয়োগ করে। নিরুপায় হয়ে খলিফা অব্যাহতি গ্রহণে সম্মত হন। এরপর ইবনে তাহির বাগদাদ হতে একদল আমিরকে মুসতাইনের পদত্যাগের সংবাদ নিয়ে সামাররায় মুতাযের কাছে প্রেরণ করে। তারা সামাররায় উপস্থিত হলে মুতায তাদেরকে অভিনন্দন জানান এবং মূল্যবান পুরস্কারে ভূষিত করেন।
আব্বাসি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে এই গৃহবিবাদের কারণে স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। রোমানরা এ সময় বিভিন্ন যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীকে পরাজিত করে এবং সীমান্ত অঞ্চলের দুই মহান মুসলিম সেনাপতি উমর বিন আবদুল্লাহ আল-আকতা ও আলি বিন ইয়াহইয়া আল-আরমানিকে হত্যা করে।
খলিফা মুসতাইন অব্যাহতি গ্রহণের কিছুদিন পরই তার ভাই ও নতুন খলিফা মুতায বিল্লাহর প্রেরিত ঘাতকের হাতে নিহত হন। এ সময় তার বয়স ছিল বত্রিশ বছর।