📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 মুতাওয়াক্কিল আলাল্লাহ আবুল ফজল জাফর

📄 মুতাওয়াক্কিল আলাল্লাহ আবুল ফজল জাফর


খলিফা মুতাওয়াককিলের জন্ম ২০৫ হিজরি সনে। সাতাশ বছর বয়সে তিনি খলিফা পদে অধিষ্ঠিত হন। আব্বাসি রাজপরিবারের অন্যান্য সদস্যের তুলনায় মুতাওয়াককিল এ দিক থেকে ব্যতিক্রমী ছিলেন যে, তিনি হজরত আলি রাযি. ও তার বংশধরগণের (আলাবি) প্রতি প্রচণ্ড বিদ্বেষী ছিলেন। এ ধরনের মতাদর্শকে আকিদার পরিভাষায় 'নছব' বলা হয়, যা আলিপ্রীতি-নির্ভর শিয়া মতবাদের সম্পূর্ণ উল্টো। খলিফা মুতাওয়াককিল ২৩৬ হিজরি সনে হজরত হুসাইন বিন আলি রাযি.-এর সমাধি ও আশেপাশের সকল ঘরবাড়ি ধ্বংস করার নির্দেশ দেন। খলিফার নির্দেশে ঘোষণা করে দেওয়া হয়-তিন দিন পর যাদেরকে সেখানে পাওয়া যাবে, তাদেরকে পাতাল কয়েদখানায় পাঠিয়ে দেওয়া হবে। ফলে সেখানে একজন ব্যক্তিও অবশিষ্ট ছিল না। এরপর খলিফার নির্দেশে জায়গাটিকে চাষাবাদের স্থানে পরিণত করা হয়।
খলিফা মুতাওয়াককিল ইসলামি সাম্রাজ্যের সকল নগরীতে ইলমুল কালাম সম্পর্কীয় আলোচনা নিষিদ্ধ করে এবং খালকুল কুরআনের মতাদর্শ নিষিদ্ধ করে বার্তা প্রেরণ করেন। তিনি ঘোষণা করেন, যে ব্যক্তি এ বিষয়ে আলোচনা করবে, তার ঠিকানা হবে পাতালের জিন্দানখানা। তিনি সকলকে কেবল কুরআন-সুন্নাহর প্রতি মনোনিবেশ করতে নির্দেশ দেন। খলিফা মুতাওয়াককিল আহমাদ বিন হাম্বল রহ.-কে অত্যন্ত সম্মান করতেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে তার পরামর্শ নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলের পরামর্শেই খলিফা মুতাওয়াককিল ইবনে আবু দাউদের পরিবর্তে ইয়াহইয়া বিন আকছামকে 'কাজিউল কুজাত' পদে নিয়োগ দান করেন। ইয়াহইয়া বিন আকছাম ছিলেন সমকালীন আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর বিশিষ্ট আলিমগণের অন্যতম। ঐতিহাসিক ইবনে কাছির রহ. লিখেছেন-
খলিফা মুতাওয়াককিল তার প্রজাদের কাছে প্রিয় ছিলেন। তিনি আহলুস সুন্নাহর পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। ... বিদআতের সয়লাবের পর তিনি সুন্নাহকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। আল্লাহ তার প্রতি দয়ার আচরণ করুন। (১০৬)

টিকাঃ
১০৬. প্রাগুক্ত, ১০/৩৫৭।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 দ্রষ্টব্য : একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা : বিলম্বে হলেও জালিমের পতন সুনিশ্চিত

📄 দ্রষ্টব্য : একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা : বিলম্বে হলেও জালিমের পতন সুনিশ্চিত


খলিফা মুতাওয়াককিলের অন্যতম আস্থাভাজন ব্যক্তি আবদুল আজিজ বিন ইয়াহইয়া আল-কাত্তানি একদিন খলিফার দরবারে উপস্থিত হলেন। তিনি খলিফাকে বললেন, 'আমিরুল মুমিনিন! আমি (পূর্বতন খলিফা) ওয়াসিকের চেয়ে বিস্ময়কর কাউকে জীবনে দেখিনি। তিনি আহমাদ বিন নছর আল-খুযায়িকে হত্যা করেন; অথচ দাফন পর্যন্ত তার জবানে কুরআনের তেলাওয়াত জারি ছিল!' ভাই ওয়াসিক সম্পর্কে আবদুল আজিজের মন্তব্য শুনে মুতাওয়াককিল শঙ্কিত ও মর্মাহত হয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ পর উজির মুহাম্মাদ বিন আবদুল মালিক বিন যাইয়াত দরবারে উপস্থিত হলে খলিফা তাকে বললেন, 'আহমাদ বিন নছরের হত্যার (বৈধতার) বিষয়ে আমার অন্তরে দ্বিধা আছে।' উজির উত্তর দিলেন, 'আমিরুল মুমিনিন! খলিফা ওয়াসিক যদি তাকে কাফির অবস্থায় (অর্থাৎ কুফরি কর্মের শাস্তি হিসেবে) হত্যা না করে থাকেন, তাহলে আল্লাহ যেন আমাকে আগুনে দগ্ধ করেন।' এরপর দরবারে উপস্থিত হলেন হারছামা। খলিফা তাকেও মনের দ্বিধার কথা ব্যক্ত করলে তিনি উত্তর দিলেন, 'খলিফা ওয়াসিক তাকে কাফির অবস্থায় হত্যা না করে থাকলে আল্লাহ যেন আমার দেহকে খণ্ডবিখণ্ড করে দেন।' এরপর দরবারে উপস্থিত হলেন কাজি আহমাদ বিন আবু দাউদ। খলিফা তাকেও মনের খটকার কথা জানালে তিনি উত্তর দিলেন, 'ওয়াসিক যদি তাকে কাফির অবস্থায় হত্যা না করে থাকেন, তাহলে আল্লাহ যেন আমাকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে দেন।'
মুতাওয়াককিল বলেন, 'ইবনে যাইয়াতকে তো আমি নিজেই আগুনে দগ্ধ করেছি (১০৭)। আর হারছামা পালিয়ে গিয়েছিল। পথে বনু খুযাআর বসতি অতিক্রম করার সময় গ্রামের এক ব্যক্তি তাকে চিনে ফেলে এবং চিৎকার করে বলে, হে বনু খুযাআ! এই ব্যক্তিই তোমাদের জ্ঞাতিভাই আহমাদ বিন নছরকে হত্যা করেছিল। তখন তারা তাকে খণ্ডবিখণ্ড করে ফেলে। আর ইবনে আবু দাউদকে আল্লাহ তাআলা তার দেহাভ্যন্তরেই বন্দি করে দেন অর্থাৎ পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে দেন। মৃত্যুর চার বছর পূর্বে সে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে যায়।'
মুতাওয়াককিলের শাসনামলেই ইয়ামেনের সানআ নগরীতে ইয়া'ফারিয়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রতিষ্ঠাতা ইয়া'ফার বিন আবদুর রহিম। ২৪৭ হিজরি সন হতে ৩৮৭ হিজরি সন (৮৬১-৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত দীর্ঘ ১৪০ বছর এই রাষ্ট্র বিদ্যমান ছিল।
দিনে দিনে আব্বাসি সাম্রাজ্যে তুর্কি মামলুকদের প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছিল। খলিফা মুতাওয়াককিল এ সময় সুস্পষ্ট অনুভব করেন যে, তুর্কিরা রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছে এবং প্রশাসনিক ও সামরিক কর্মকাণ্ডে স্বেচ্ছাচারিতা প্রদর্শন করছে। এ কারণে তিনি তুর্কিদের ক্ষমতা হ্রাসকরণে উদ্যোগী হন। উদ্যোগ বাস্তবায়ন শুরু হয় ইতাখকে দিয়ে। এক কৌশলের মাধ্যমে তিনি তাকে হত্যা করেন।
মুতাওয়াককিল তুর্কিদের বিরুদ্ধে আরবদের শক্তিকে কাজে লাগানোর লক্ষ্যে আব্বাসি সাম্রাজ্যের রাজধানী সামাররা হতে দামেশকে স্থানান্তরের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কিছুদিন দামেশকে অবস্থানের পরই অসুস্থবোধ করায় তিনি বাধ্য হয়ে সামাররায় ফিরে আসেন। এ সময় এ কথা ছড়িয়ে পড়ে যে, খলিফা ওয়াসিফ, বুগা ও অন্যান্য তুর্কি সেনাপতিকে হত্যা করার মনস্থ করেছেন। কিন্তু খলিফা নিজের মনোবাসনা বাস্তবায়ন করতে পারেননি। তুর্কিরা তার পূর্বেই প্রতারণা করে তাকে সরিয়ে দেয়।
মুতাওয়াককিল তার পরবর্তী প্রথম খলিফা হিসেবে পুত্র আবু আবদুল্লাহর (মুতায বিল্লাহ) নাম ঘোষণা করেছিলেন। এ কারণে তার আরেক পুত্র আল-মুনতাসির বিল্লাহ ভাই আবু আবদুল্লাহ ও পিতার প্রতি ক্রুদ্ধ হন।
তুর্কিরা যেহেতু খলিফা মুতাওয়াককিলের তুর্কি-বিরাগ সম্পর্কে জেনে ফেলেছিল, তাই স্বাভাবিকভাবেই তারা ছিল মুনতাসিরের পক্ষে। তুর্কিদের সহায়তায় মুনতাসির অসুস্থ মুতাওয়াককিলের গৃহে প্রবেশ করে তাকে হত্যা করেন। মুতাওয়াককিলের হত্যাঘটনার মধ্য দিয়েই আব্বাসি সাম্রাজ্যের প্রতাপ ও সমৃদ্ধির যুগের সমাপ্তি ঘটে এবং নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হয়, যাকে আমরা অভিহিত করতে পারি তুর্কিদের প্রত্যক্ষ প্রভাব-নিয়ন্ত্রিত আব্বাসি খলিফাদের শাসনামল হিসেবে।

টিকাঃ
১০৭. মুতাওয়াককিল তাদের এই দুঃসাহস প্রত্যক্ষ করে নিজেই তাদেরকে শান্তিপ্রদানের মনস্থ করেছিলেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00