📄 খলিফা ওয়াসিকের গর্হিত ও অমার্জনীয় এক অপরাধ
পূর্বতন দুই খলিফার মতো ওয়াসিকের মন-মস্তিষ্কেও মুতাজিলা চিন্তাধারা প্রভাব বিস্তার করেছিল। বরং ওয়াসিক যেন এ ক্ষেত্রে এককাঠি অগ্রসর ছিলেন। তিনি রাতদিন খালকুল কুরআনের আকিদা প্রচার করতেন। একে কেন্দ্র করেই তার শাসনামলে অত্যন্ত গর্হিত এক ঘটনা সংঘটিত হয়। হত্যা করা হয় বিশিষ্ট আলিম আহমাদ বিন নছর বিন মালিক রহ.-কে। আহমাদ বিন নছর ছিলেন জ্ঞানী, ধার্মিক, সৎকর্মপরায়ণ ও কল্যাণকর্মে তৎপর এক মহান আলিম। তিনি ছিলেন সমকালীন আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর সেসব সুমহান আলিমের একজন, যারা সমাজে সৎ কাজের আদেশ করতেন, অসৎ কাজে বাধা প্রদান করতেন। তিনি খালকুল কুরআনের মাসআলায় খলিফার বিরোধী ছিলেন। ২০১ হিজরি সনে তদানীন্তন খলিফা মামুন যখন বাগদাদের পরিবর্তে মার্ভে অবস্থান করছিলেন, তখন বাগদাদে সৃষ্ট ফিতনা নিরসনে জনগণ যার হাতে বায়আত গ্রহণ করেছিল, সেই নছর বিন মালিক ছিলেন আহমাদ বিন নছরের পিতা।
খলিফা ওয়াসিক আহমাদ বিন নছরকে রাজদরবারে তলব করেন এবং তার সঙ্গে খালকুল কুরআন বিষয়ে বিতর্ক করেন। খলিফা তাকে আপন মতাদর্শে আশ্বস্ত করতে ব্যর্থ হলে নিজ হাতে তাকে হত্যা করেন। এরপর খলিফার নির্দেশে এই মহান আলিমের কর্তিত মস্তক ২৩১ হিজরি সনের ২৮ শাবান হতে ২৩৭ হিজরি সনের ৩ শাওয়াল (৮৪৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ এপ্রিল হতে ৮৫২ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ মার্চ) পর্যন্ত বাগদাদে ঝুলিয়ে রাখা হয়। আহমাদ বিন নছর রহ. আপন আকিদা ও নীতির প্রশ্নে আমৃত্যু অটল ছিলেন। ঐতিহাসিক ইবনে কাছির রহ. লিখেছেন—
ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহ. একদিন তার আলোচনা করতে গিয়ে মন্তব্য করেন, 'আল্লাহ তাআলা তার প্রতি রহম করুন। আল্লাহর জন্য আপন জান কুরবানিতে তিনি কত উদার ছিলেন! দ্বীনের খাতিরে তিনি নিজের প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন।' জাফর বিন মুহাম্মাদ আস-সাইগ রহ. বলেন, আমার চোখ যদি সেই দৃশ্য দর্শন না করে থাকে, তাহলে যেন অন্ধ হয়ে যায়! আমার কান যদি সেই শব্দ শ্রবণ না করে থাকে, তাহলে যেন বধির হয়ে যায়! যখন আহমাদ বিন নছরের শিরশ্ছেদ করা হচ্ছিল, তখন তার কর্তিত মস্তক থেকে 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'-এর ধ্বনি ভেসে আসছিল। তার মস্তক যখন শূলে ঝুলন্ত ছিল, তখন জনৈক ব্যক্তি সেখান থেকে নিম্নোক্ত আয়াতের তেলাওয়াত শুনতে পান—
(الَمْ أَحَسِبَ النَّاسُ أَنْ يُتْرَكُوا أَنْ يَقُولُوا آمَنَّا وَهُمْ لَا يُفْتَنُونَ )
আলিফ-লাম-মীম। মানুষ কি মনে করে যে, 'আমরা ঈমান এনেছি'—এ কথা বললেই পরীক্ষা না করে তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হবে? [সুরা আনকাবুত : ১-২](১০৫)
ওয়াসিকের পরবর্তী খলিফা মুতাওয়াককিল ছিলেন আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর প্রতি অনুরাগী। তিনি খলিফা হওয়ার পর ২৩৭ হিজরি সনে (৮৫২ খ্রিষ্টাব্দে) আহমাদ বিন নছরের কর্তিত মস্তক শূল থেকে নামিয়ে ফেলার এবং দেহ ও মস্তক একত্র করে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। তার এই সিদ্ধান্তে মুসলিম জনসাধারণ অত্যন্ত আনন্দিত হয় এবং তার জানাজায় বিপুল সংখ্যক মানুষ উপস্থিত হয়। জনগণ সেদিন তার জানাজার খাটিয়া এবং তার লাশ স্পর্শ করার জন্য প্রতিযোগিতা করছিল।
খলিফা ওয়াসিক ২৩২ হিজরি সনের ২৪ জিলহজ (৮৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ১১ আগস্ট) ইন্তেকাল করেন। এ সময় তার বয়স ছিল ছত্রিশ বছর। মৃত্যুর পূর্বে তিনি তার পরবর্তী খলিফা হিসেবে কাউকে নির্ধারিত করে যেতে পারেননি। তাই তার মৃত্যুর পর সমকালীন আব্বাসি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ সমবেত হয় এবং সকলে মিলে প্রয়াত খলিফার ভাই জাফর মুতাওয়াককিল আলাল্লাহ-কে পরবর্তী খলিফা নির্বাচিত করে। খলিফা নির্বাচনে যারা বিশেষ ভূমিকা পালন করে, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কাজি আবু দাউদ, উজির মুহাম্মাদ বিন আবদুল মালিক, তুর্কি সেনাপতি ইতাখ প্রমুখ।
টিকাঃ
১০৫. প্রাগুক্ত, ১০/৩১১।