📄 আল-মুতাসিম বিল্লাহ আবু ইসহাক মুহাম্মাদ
খলিফা মুতাসিম বিল্লাহ ১৭৯ হিজরি সনে বাগদাদে জন্মগ্রহণ করেন। ভাই মামুনের মৃত্যুর পর ২১৮ হিজরি সনে উনচল্লিশ বছর বয়সে তিনি খলিফা পদে অধিষ্ঠিত হন। রোমান সাম্রাজ্যে অভিযান চলাকালে যখন খলিফা মামুনের মৃত্যু হয়, তখন মুতাসিম বিল্লাহ ভাইয়ের সঙ্গেই ছিলেন। রোমান অঞ্চলেই তার নামে বায়আত গ্রহণ সম্পন্ন হয়। এরপর তিনি বাহিনীসহ বাগদাদে ফিরে আসেন।
মুতাসিম ছিলেন বীর, দুঃসাহসী ও সুউচ্চ সংকল্পশক্তির অধিকারী। নিজে যেমন বীর যোদ্ধা ছিলেন, তেমনই বীরত্ব ও বীর যোদ্ধাদের পছন্দ করতেন। অস্বাভাবিক শক্তির অধিকারী মুতাসিম বিল্লাহ কয়েকজন পুরুষের ভার একাই বহন করতে পারতেন। তিনি দীর্ঘ পদক্ষেপে পথ চলতেন। বড় বড় বীর যোদ্ধারা অক্ষম হওয়ার পর তিনি কয়েকবার লোহাকে দু-টুকরা করতে সক্ষম হন। তার উজির আহমাদ বিন আবু দাউদ বলেন, মুতাসিম নিজ বাহু বের করে দিয়ে আমাকে বলতেন, আবু আবদুল্লাহ, তোমার সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে আমার বাহুতে কামড় দাও। আমি বলতাম, আমিরুল মুমিনিন! আল্লাহর শপথ! আপনার বাহুতে আঘাত করা আমার মনঃপূত নয়। তিনি বলতেন, তাতে আমার কোনো ক্ষতি হবে না। তখন আমি সর্বশক্তি দিয়ে তার বাহুতে কামড় দিতাম; কিন্তু কোনো ক্ষতি হওয়া দূরে থাক, দাঁতের দাগও দেখা যেত না!
অবশ্য স্বাভাবিকভাবে মুতাসিম সদয় স্বভাবের ছিলেন। তবে যখন তিনি ক্রুদ্ধ হতেন, তখন কাউকে হত্যা করতেও দ্বিধা করতেন না।
খলিফা মুতাসিম নিজের সম্পর্কে বলতেন, 'আমি জানি যে, শিষ্টাচার ও শিক্ষায় আমি আমার ভাইদের চেয়ে ক্ষুদ্র। কারণ, আমিরুল মুমিনিন (হারুনুর রশিদ) আমাকে স্নেহ করতেন। শৈশব হতেই আমার খেলাধুলার প্রতি আকর্ষণ ছিল। তাই আমার অন্য ভাইয়েরা যেরূপ জ্ঞান অর্জন করেছেন, আমি তা পারিনি।'
এর কারণ হিসেবে ঐতিহাসিকগণ উল্লেখ করেছেন যে, মুতাসিম শৈশবে একটি বালকের সঙ্গে মকতবে পড়তে যেতেন। বালকটি কিছুদিন পর মারা গেলে খলিফা হারুনুর রশিদ তার পুত্রকে বললেন, 'মুহাম্মাদ! তোমার সঙ্গী তো মারা গেছে।' তখন তিনি উত্তর দিলেন, 'হ্যাঁ, আমার সাইয়িদ! সে মক্তব থেকে নিস্তার পেয়ে গেছে!' মুতাসিমের উত্তর শুনে বিস্ময়ে হতবাক হারুনুর রশিদ বললেন, 'মক্তবের প্রতি তোমার বিতৃষ্ণা এই পর্যায়ে পৌঁছেছে?!' এরপর তার অভিভাবকগণ তাকে আর মক্তবে পাঠাননি। ফলে তার পড়াশোনার পর্ব সেখানেই শেষ হয়ে যায়। বর্ণিত আছে, তিনি কোনোমতে লিখতে পারতেন এবং সামান্য পড়তে পারতেন।
মৃত্যুর পূর্বে খলিফা মামুন মুতাসিম বিল্লাহকে অসিয়ত করে বলেন, জনগণকে 'কুরআন সৃষ্ট'-মতবাদ মেনে নিতে বাধ্য করবে। খুররামিয়া সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় সংকল্প, সতর্কতা ও বীরত্বের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাবে। তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রয়োজনমতো অর্থসম্পদ, অস্ত্রশস্ত্র, পদাতিক ও অশ্বারোহী সৈন্য-কোনোকিছু প্রেরণে দ্বিধা করবে না। যদি যুদ্ধ দীর্ঘায়ত হয়, তাহলে তোমার সঙ্গী ও আপনজনদের সঙ্গে নিয়ে নিজেই তাদের মোকাবিলায় বেরিয়ে পড়বে। আর লড়াই করবে আল্লাহপ্রদত্ত সাওয়াব ও প্রতিদান প্রাপ্তির আশায় নিষ্ঠাপূর্ণ নিয়ত সহকারে।
মামুনের অসিয়ত মোতাবেক মুতাসিম তার সর্বোচ্চ চেষ্টা ও সম্পদ বাবাক খুররামির আন্দোলন দমনে ব্যয় করেন।
বাবাক খুররামি ছিল সমকালীন ইসলামি বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বীর যোদ্ধা। সে ইসলামি ভূখণ্ডে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল, ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল এবং মুসলমানদের ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলেছিল। বাবাক খুররামি আজারবাইজান ও অন্যান্য অঞ্চলে নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার পর সেখানে জরথুস্ত্রবাদ প্রতিষ্ঠিত করতে সচেষ্ট ছিল। নিজেকে খোদা দাবি করে এই দুষ্ট লোকটি আরব ইসলামি রাষ্ট্রকে পারসিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে চেয়েছিল। এ উদ্দেশ্যে সে ও তার অনুসারীরা ইসলাম ও আরবের বিরুদ্ধে এক তীব্র ও প্রচণ্ড যুদ্ধের সূচনা করে।
খলিফা মুতাসিম বাবাক খুররামিকে দমন করার জন্য তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম সেনাপতি আফশিন (হায়দার বিন কাউস)-কে প্রেরণ করেন। মুতাসিম এ যুদ্ধে প্রচুর অর্থ ব্যয় করলেও কাঙ্ক্ষিত ফল লাভে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। প্রতিদিন যুদ্ধের সংবাদ জানার জন্য খলিফা কিছু দূর পরপর ডাক স্থাপন করেছিলেন। বাবাক খুররামি নামক এই পাপিষ্ঠ বিশ বছরে দুই লক্ষ পঞ্চাশ হাজার লোককে হত্যা করেছিল। আফশিনের হাতে ধৃত হয়েই তার পতন ঘটে।
আফশিনের বাহিনীর উপর্যুপরি আক্রমণে কোণঠাসা হয়ে পড়ে একপর্যায়ে বাবাক খুররামি তার মিত্র বাইজান্টাইন সম্রাট থিওফেল (Theophilos)-এর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে এবং মুসলিম বাহিনীর বিরুদ্ধে তাকে যুদ্ধ করতে প্ররোচিত করে। কিন্তু থিওফেল বাবাকের সাহায্যে রওনা হতে বিলম্ব করেন। বাবাক নিহত হওয়ার পর ২২৩ হিজরি সনে থিওফেল তার বাহিনী নিয়ে আব্বাসি রাষ্ট্রের সীমান্ত নগরী যিবাত্রায় হামলা চালান এবং হত্যাযজ্ঞ চালানোর পাশাপাশি অনেক নারীকে বন্দি করে নিয়ে যান। ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন রহ. লিখেছেন-
খলিফা মুতাসিম এ সংবাদ জানার পর অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে পরিস্থিতি বিবেচনা করলেন। তিনি যখন জানতে পারলেন যে, জনৈকা হাশিমি নারী রোমানদের হাতে বন্দি অবস্থায় 'হায় মুতাসিম!' বলে চিৎকার করেছে, তখন সিংহাসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে গেলেন ও অস্থির চিত্তে বলে উঠলেন, লাব্বাইক! আমি উপস্থিত আছি। এরপর তিনি নাফিরে আম (১০১)-এর ঘোষণা দিলেন এবং যুদ্ধপ্রস্তুতি শুরু করলেন।
থিওফেলকে উপযুক্ত শিক্ষা দিতে সীমান্তের উদ্দেশে রওনা হওয়ার পর মুতাসিম তার উপদেষ্টাদের জিজ্ঞেস করলেন, 'রোমান সাম্রাজ্যের সবচেয়ে দুর্ভেদ্য ও সুরক্ষিত নগরী কোনটি?' তাকে জানানো হলো, 'আম্মুরিয়া'।
খ্রিষ্টানরা আম্মুরিয়া নগরীকে কনস্টান্টিনোপলের চেয়েও অধিক মর্যাদার চোখে দেখত। খলিফা বিরাট সেনাবাহিনী, পর্যাপ্ত অস্ত্রশস্ত্র, অবরোধের প্রয়োজনীয় উপকরণ, দাহ্য পদার্থ ইত্যাদি নিয়ে আম্মুরিয়ার উদ্দেশে রওনা হন। মুসলিম বাহিনী গন্তব্যে পৌঁছে নগরীটি অবরোধ করে।
খলিফার নেতৃত্বে ছয় রমজান হতে শাওয়াল মাসের শেষ পর্যন্ত পঞ্চান্ন দিন স্থায়ী অবরোধ চলাকালে উপর্যুপরি গোলার আঘাতে একপর্যায়ে আম্মুরিয়ার নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেঙে পড়ে এবং মুসলমানরা আম্মুরিয়া জয় করে। অপহৃত হাশেমি মুসলিম নারীকেও এ সময় উদ্ধার করা হয়।
এই অভিযানকে উপজীব্য করেই বিখ্যাত কবি আবু তামাম তার সেই সুবিখ্যাত কাসিদা রচনা করেন; যার প্রথম পঙ্ক্তি হলো—
السَّيْفُ أَصْدَقُ أَنْبَاءً مِنَ الْكُتُبِ فِي حَدِّهِ الْحَدُّ بَيْنَ الْجِدَّ وَاللَّعْبِ
খবর প্রচারে গ্রন্থের চেয়ে তরবারি অধিক কার্যকরী, তীক্ষ্মতা-ধারে তরবারি যে চেষ্টা ও তামাশার ফারাককারী।
আম্মুরিয়ার অভিযান শেষে বাগদাদে প্রত্যাবর্তনের পর খলিফা মুতাসিম আব্বাসি সেনাবাহিনীকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। ইরাকি সেনাবাহিনী ইতিপূর্বে খলিফাদের বিরুদ্ধে বারবার বিদ্রোহ করার কারণে তিনি তাদের ওপর মোটেও আস্থা রাখতে পারছিলেন না। খলিফা এবার তুর্কিনির্ভর সেনাবাহিনী প্রতিষ্ঠা করার মনস্থ করেন। কারণ, তুর্কিরা ছিল যথেষ্ট শক্তি-সামর্থ্যের অধিকারী। তিনি পূর্ববর্তী খলিফা মামুনের চেয়েও অধিক হারে তুর্কি দাস সংগ্রহ করতে থাকেন। খলিফা মুতাসিম নতুন তুর্কি দাসদের বাগদাদেই থাকার ব্যবস্থা করে দেন। অনারব তুর্কিরা কঠোর ও জেদি স্বভাবের ছিল। তারা ঘোড়ায় আরোহণ করে বাগদাদের রাস্তাঘাটে টহল দিত এবং নারী-পুরুষ ও শিশুদের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটাত। ফলে আরব সৈন্যগণ তাদের প্রতিরোধ করতে শুরু করে এবং মাঝেমধ্যেই রক্তপাতের ঘটনা ঘটতে থাকে। বাধ্য হয়ে তুর্কিরা খলিফা মুতাসিমের কাছে অভিযোগ জানায়। তখন তিনি তুর্কি সৈন্যদের সেনাছাউনি হিসেবে নতুন একটি শহর নির্মাণের পরিকল্পনা করেন এবং এর নামকারণ করেন 'সুররা মান রআ'। বর্তমানে নগরীটি সামাররা (১০২) নামে পরিচিত। এরপর থেকে মুতাসিম তার সৈন্যসামন্তসহ এই নগরীতেই বসবাস করতেন। সামাররা বাগদাদ হতে পৃথক ভিন্ন একটি নগরী।
মুতাসিম যেসব সেনাপতির ওপর নির্ভর করতেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলো আফশিন হায়দার বিন কাউস, ইতাখ, আশনাছ, আজিফ বিন আমবাসা, ওয়াসিফ, আবু মুসা বুগা আল-কাবির প্রমুখ। তারা প্রত্যেকেই ছিল তুর্কি। তাদের বীরত্ব ও যুদ্ধদক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে খলিফা মুতাসিম তাদেরকে সেনাপতি নির্বাচিত করেন এবং তাদের হাতেই তার পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া আরব সাম্রাজ্যের লাগাম তুলে দেন। তিনি আরবদেরকে সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব হতে অপসারণ করেন, তাদের নাম রাষ্ট্রীয় দপ্তর হতে বাদ দিয়ে দেন এবং সংগৃহীত তুর্কি সৈন্যদের মাধ্যমে রাষ্ট্রপরিচালনাতে স্বস্তি অনুভব করতে থাকেন।
আব্বাসি রাজপরিবারের পরবর্তী প্রজন্ম ধীরে ধীরে তুর্কিদের কর্তৃত্বাধীন হয়ে পড়ে। তুর্কিরা তাদের সঙ্গে যথেচ্ছ আচরণ করত এবং রাজপরিবারকে নিয়ন্ত্রণ করত। অথচ তারা সুপ্রসিদ্ধ কোনো বংশপরিচয়ের অধিকারী ছিল না, তাদের অন্তর্জগৎ পরিচ্ছন্ন ও নিষ্ঠাপূর্ণও ছিল না। এ কারণেই ঐতিহাসিকগণ মন্তব্য করেছেন—মুতাসিম-পরবর্তী আব্বাসি শাসকগণ যেসব বিদ্রোহ-বিশৃঙ্খলা, অস্থিতিশীল পরিস্থিতি ও প্রশাসন-দুর্বলতার শিকার হয়েছেন এবং তুর্কিদের হাতে আরব জাতি নিগৃহীত হয়েছে, তার মূল দায়ভার এক মুতাসিমের কাঁধেই বর্তায়। আব্বাসি রাষ্ট্রের স্বার্থ ও কল্যাণের প্রতি তুর্কিদের আত্মনিবেদনের পরিমাণ, খলিফার প্রতিরক্ষার দায়িত্ব পালনে তাদের উপযুক্ততা এবং তাদের বংশমূল ও পরিচিতি ইত্যাদি বিষয়ে সঠিক ধারণা না থাকা সত্ত্বেও খলিফা মুতাসিম তাদের প্রতি আস্থা রাখতেন। আর তাই স্বীকার করতেই হবে যে, মুতাসিম যদিও দুঃসাহসী বীর যোদ্ধা ছিলেন; কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও পরিকল্পনা প্রণয়নে তিনি মোটেও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ছিলেন না।
বর্ণিত আছে, তুর্কি দাসদের অসদাচরণে অতিষ্ট হয়ে একবার বাগদাদবাসী মুতাসিমের কাছে অভিযোগ জানিয়ে বলল, ‘আপনি আমাদের এখান থেকে অন্য কোথাও স্থানান্তর করুন; অন্যথায় আমরা আপনার বিরুদ্ধে লড়াই করব।’ খলিফা তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা কীভাবে আমার বিরুদ্ধে লড়াই করবে? আমার সেনাছাউনিতে আছে আশি হাজার বর্মধারী সৈন্য!’ জনগণ উত্তর দিলো, ‘আমরা রাতের তির ও ভোরের তির (অর্থাৎ আল্লাহর দরবারে দোয়া ও রোনাজারি) নিয়ে আপনার বিরুদ্ধে লড়াই করব।’ উত্তর শুনে মুতাসিম বললেন, ‘এর প্রতিরোধ করার সামর্থ্য আমাদের নেই।’
এ ঘটনার পরই তিনি নতুন নগরী সামাররা প্রতিষ্ঠা করে সেখানে চলে যান।
টিকাঃ
১০১. জরুরি অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে মুসলিম শাসক যদি যুদ্ধাভিযান পরিচালনা করার জন্য মূল সেনাবাহিনীর পাশাপাশি সাধারণ জনগণকেও ব্যাপকভাবে বাহিনীতে শরিক হতে নির্দেশ দেন, তাহলে তাকে 'নাফিরে আম' বলে।
১০২. সামাররা: বর্তমান বাগদাদ নগরী হতে ১২৫ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত একটি নগরী। ২২১ হিজরিতে (৮৩৬ খ্রিষ্টাব্দে) খলিফা মুতাসিম বিল্লাহ নগরীটি নির্মাণ করেন। তখন এর নাম ছিল সুররা মান রআ (যে দেখবে, সে-ই আনন্দিত হবে!)। মুতাসিম বিল্লাহ আব্বাসি খিলাফতের দারুল খিলাফাহ বাগদাদ থেকে সামাররায় স্থানান্তর করেন।
📄 মুতাসিমের আমলে ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহ.-এর ঈমানি পরীক্ষা
প্রয়াত খলিফা মামুনের অসিয়ত মোতাবেক খলিফা মুতাসিম জনগণকে ‘কুরআন সৃষ্ট’-মতবাদ মেনে নিতে চাপ প্রয়োগ করেন। বিশেষ করে বিখ্যাত ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহ.-এর ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। ইমাম-পুত্র আবদুল্লাহ বিন আহমাদ আপন পিতার সূত্রে এর বিস্তারিত বিবরণ উল্লেখ করেছেন। নিম্নে তা উল্লেখ করা হলো।
ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহ. বলেন, আমাকে যখন কয়েদখানা থেকে বের করে মুতাসিমের কাছে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলো, তখন শিকল-বেড়ির পরিমাণ আরও বাড়িয়ে দেওয়া হলো। শিকলের ভারে আমি হাঁটতে পারছিলাম না। তাই আমি শিকলগুলোকে পাজামার সঙ্গে জড়িয়ে নিয়ে হাতে ধরে চলতে লাগলাম। এরপর প্রহরীরা আমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি বাহন নিয়ে এলে আমি তাতে আরোহণ করলাম। শিকলের ভারে ভারসাম্য রাখতে না পেরে আমি প্রায় পড়েই যাচ্ছিলাম। আমাকে সাহায্য করার মতো কেউ সেখানে ছিল না। আল্লাহই আমাকে রক্ষা করলেন।
এরপর আমরা মুতাসিমের প্রাসাদে উপস্থিত হলাম। সেখানে পৌঁছার পর আমাকে একটি অন্ধকার প্রকোষ্ঠে আটকে রাখা হলো। আমার কাছে আলো জ্বালানোর মতো কিছু ছিল না। আমি অজু করার মনস্থ করলাম। পানির জন্য হাত বাড়াতেই আমি পানির একটি পাত্র পেয়ে গেলাম। এরপর তা দিয়ে অজু করে নামাজ আদায়ের জন্য দণ্ডায়মান হলাম। আমার কিবলা জানা ছিল না। ভোরের আলো উদ্ভাসিত হওয়ার পর বুঝতে পারলাম যে, আমি সঠিক দিকে ফিরেই নামাজ আদায় করেছি। আল্লাহর জন্যই যাবতীয় প্রশংসা।
সকালে আমাকে মুতাসিমের দরবারে তলব করা হলো। দরবারে উপস্থিত হয়ে উজির ইবনে আবু দাউদকে খলিফার পাশেই উপবিষ্ট দেখতে পেলাম। আমাকে দেখে খলিফা সভাসদদের বললেন, 'তোমরা কি মনে করেছিলে যে, তিনি তরুণ? তিনি তো বয়োবৃদ্ধ।' আমি খলিফার কাছে পৌঁছে তাকে সালাম করলাম। তিনি আমাকে বললেন, 'আরও কাছে আসুন।' এভাবে কয়েকবার বলে তিনি আমাকে তার একেবারে কাছে নিয়ে গেলেন। এরপর আমাকে বসার নির্দেশ দেওয়া হলে আমি বসলাম। ভারী শিকলগুলো আমার শরীরেই ছিল। কিছুক্ষণ নীরবেই কেটে গেল। এরপর আমি বললাম, 'আমিরুল মুমিনিন! আপনার চাচাতো ভাই (১০৩) আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষকে কীসের প্রতি আহ্বান করেছিলেন?' খলিফা উত্তর দিলেন, 'আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই—এ কথার সাক্ষ্যের দিকে।' আমি বললাম, 'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য নেই।' এরপর উজির ইবনে আবু দাউদ কিছু কথা বলল, আমি তা কিছুই বুঝিনি। কারণ, আমি তার বক্তেব্যের বিষয় সম্বন্ধে অবগত ছিলাম না।
কিছুক্ষণ পর মুতাসিম আমাকে বললেন, 'আপনি যদি আমার পূর্ববর্তী খলিফা কর্তৃক বন্দি না হতেন, তাহলে আমি আপনার বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতাম না।' এরপর তিনি দরবারে উপস্থিত জনৈক সভাসদকে বললেন, 'আবদুর রহমান! আমি কি তোমাকে এই দুর্যোগ দমনের নির্দেশ দিইনি?' আমি বললাম, 'আল্লাহু আকবার! (আপনি একে দুর্যোগ বলছেন?!) এ তো মুসলমানদের নিষ্কৃতির পথ।' এরপর খলিফা তাকে বললেন, 'আবদুর রহমান! তার সঙ্গে কথা বলো। তার সামনে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করো।' আবদুর রহমান আমাকে প্রশ্ন করল, 'আপনি কুরআন সম্পর্কে কী বিশ্বাস পোষণ করেন?' আমি উত্তর না দিয়ে নিশ্চুপ রইলাম। মুতাসিম আমাকে বললেন, 'উত্তর দিন।' আমি পাল্টা প্রশ্ন করলাম, 'আপনি ইলম সম্পর্কে কী বিশ্বাস পোষণ করেন?' তিনি কোনো উত্তর দিলেন না। এবার আমি বললাম, 'কুরআন আল্লাহর ইলমের অন্তর্ভুক্ত আর যে বিশ্বাস করে যে, আল্লাহর ইলম মাখলুক ও সৃষ্ট, সে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহকেই অস্বীকার করে।' আমার কথা শুনে খলিফা চুপ করে রইলেন।
উপস্থিত সভাসদরা খলিফাকে বলতে লাগল, 'আমিরুল মুমিনিন! এই লোক তো আপনাকে ও আমাদেরকে কাফির সাব্যস্ত করেছে।' খলিফা তাদের কথার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করলেন না।
এরপর আবদুর রহমান তার নতুন যুক্তি উপস্থাপন করে বলল, 'আল্লাহ ছিলেন; কিন্তু কুরআন ছিল না।' আমি বললাম, 'আল্লাহ ছিলেন; কিন্তু ইলম ছিল না?' আমার উত্তর শুনে তিনি আবারও চুপসে গেলেন।
এরপর তারা পরস্পর বিক্ষিপ্ত কথাবার্তা বলতে লাগল। আমি বললাম, 'আমিরুল মুমিনিন! আমাকে কুরআন-হাদিস হতে খালকুল কুরআনের স্বপক্ষে কোনো দলিল দিন। তাহলে আমি তা মেনে নেব।' আমার কথা শুনে উজির ইবনে আবু দাউদ বলে উঠল, 'আপনি তো কুরআন-সুন্নাহ ছাড়া অন্য কোনো কথাই মানতে চাচ্ছেন না!' আমি বললাম, 'ইসলাম কি কুরআন-সুন্নাহ ছাড়া প্রতিষ্ঠিত হতে পারে?!' এরপর দীর্ঘ তর্কবিতর্ক চলল।
একপর্যায়ে ইবনে আবু দাউদ বলল, 'আমিরুল মুমিনিন! আল্লাহর শপথ, এই লোক নিজে তো ভ্রান্ত, এখন অন্যদেরকেও বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট করছে এবং এক বিদআতের সূচনা করেছে। আপনার দরবারে অনেক বিচারক ও ফকিহ-আলিম উপস্থিত আছেন। তাদেরকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করুন।' খলিফা তাদেরকে বললেন, 'এ বিষয়ে তোমাদের কী অভিমত?' উপস্থিত সকলে ইবনে আবু দাউদের পক্ষেই কথা বলল।
এভাবে পরপর তিন দিন আমাকে খলিফার দরবারে উপস্থিত করা হলো এবং প্রতিদিন তারা আমার সঙ্গে বিতর্কে লিপ্ত হলো। প্রতিটি বিতর্কে আমার উপস্থাপিত দলিল-প্রমাণে তারা নির্বাক ও পরাভূত হলো।
সবাই চুপ হয়ে গেলে ইবনে আবু দাউদ কথা বলতে শুরু করল। ইলম ও ইলমুল কালামে লোকটি ছিল উপস্থিত লোকদের মধ্যে সবচেয়ে অজ্ঞ। বিতর্কে বিভিন্ন মাসআলা নিয়ে আলোচনা হলো। কিন্তু তাদের কাছে কুরআন-সুন্নাহ থেকে উল্লেখ করার মতো কোনো দলিল ছিল না। তাই তারা কুরআন-সুন্নাহর উদ্ধৃতিসমূহ অস্বীকার করতে লাগল এবং এ জাতীয় দলিলসমূহকে প্রত্যাখ্যান করল। আমি তাদের মুখে এমন সব বক্তব্যও শুনতে পেলাম, ভাবতেও পারিনি যে, কেউ এ ধরনের কথা বলতে পারে। ইবনে গাউস আমাকে দেহ-সাব্যস্তকরণসহ নানা অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা শোনাল। আমি তাকে বললাম, 'আপনি কী বলতে চাচ্ছেন, আমি বুঝতে পারছি না। আমি কেবল এতটুকু জানি যে, আল্লাহ তাআলা একক ও অমুখাপেক্ষী; তার কোনো সদৃশ নেই।' এরপর সে-ও চুপ হয়ে গেল।
আমি তাদেরকে পরকালে আল্লাহর দিদার সংক্রান্ত হাদিসটি শোনালাম। তারা হাদিসটির সনদকে দুর্বল সাব্যস্ত করার এবং কতক মুহাদ্দিসের উক্তির মাধ্যমে রেওয়ায়েতটিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করল। কিন্তু অসম্ভব! এত দূরবর্তী স্থান থেকে তারা এর নাগাল কীভাবে পাবে?! বিতর্ক চলাকালে খলিফা বারবার আমার প্রতি কোমল আচরণ দেখাতে লাগলেন এবং আমাকে বললেন, 'আহমাদ! আপনি আমার এই আহ্বানে সাড়া দিন (অর্থাৎ কুরআন সৃষ্ট-মতবাদ মেনে নিন), আমি আপনাকে আমার বিশিষ্টজনদের অন্তর্ভুক্ত করে নেব, আর প্রতিদিন আপনি খলিফার দরবার-গালিচার স্পর্শে ধন্য হবেন।' আমি খলিফাকে উত্তর দিলাম, 'আমিরুল মুমিনিন! তারা আমাকে কুরআনের কোনো আয়াত বা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোনো হাদিস দ্বারা দলিল দিক, আমি তাদের আহ্বানে সাড়া দেবো।’ দলিল-প্রমাণে পরাভূত হয়ে এবার তারা খলিফাকে উত্তেজিত করার চেষ্টা করল। বাগদাদের নায়েব ইসহাক বিন ইবরাহিম বলল, ‘আমিরুল মুমিনিন! এটা খিলাফতের নীতি হতে পারে না যে, আপনি তাকে এভাবেই ছেড়ে দেবেন আর সে দু-দুজন খলিফাকে পরাভূত করে নিশ্চিন্তে চলে যাবে।’ খলিফা মুতাসিম স্বভাবগতভাবে কোমল ছিলেন। কিন্তু এ কথা শুনে খলিফার গায়রত ও আত্মমর্যাদাবোধ জেগে উঠল এবং তিনি ক্রোধাগ্নিত হয়ে উঠলেন। তিনি মনে করলেন, নিশ্চয়ই তার সদ্সদ্গুণ সত্যের ওপর আছেন। এবার তিনি আমাকে বললেন, ‘আল্লাহ আপনাকে অভিসম্পাত করুন। আমি আশা করেছিলাম, আপনি আমার আহ্বানে সাড়া দেবেন; কিন্তু আপনি তা করলেন না।’
এরপর খলিফা সভাসদদের নির্দেশ দিলেন, ‘যাও, তাকে বিবস্ত্র করে মাটিতে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাও।’ খলিফার নির্দেশে আমাকে বিবস্ত্র করা হলো এবং মাটিতে ছেঁচড়ানো হলো। এরপর নির্যাতনকারী ও প্রহারকারীদেরকে আহ্বান করা হলো। আমি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলাম। আমার পরিচ্ছদে প্রিয় নবীজির কয়েকটি কেশ মোবারক বাঁধা ছিল। তারা তা আমার কাছ থেকে নিয়ে গেল। আমি নিজেকে প্রহারকারীদের মাঝে আবিষ্কার করলাম। আমি খলিফাকে বললাম, ‘আমিরুল মুমিনিন! আজ যেমন আমি আপনার সামনে দণ্ডায়মান, আপনাকেও তেমনই একদিন আল্লাহর দরবারে দাঁড়াতে হবে; সেদিনের কথা স্মরণ করুন।’ আমার মনে হলো, এ কথা শুনে খলিফা একটু থমকে গেলেন।
কিন্তু উপস্থিত সভাসদরা খলিফাকে উত্তেজিত করতে লাগল। তারা তাকে ক্রমাগত বলতে লাগল, ‘আমিরুল মুমিনিন! এই লোক পথভ্রষ্ট, বিভ্রান্তকারী ও কাফির।’ তাদের কথায় উত্তেজিত হয়ে খলিফা আমাকে শাস্তিদানের নির্দেশ দিলেন। একটি চেয়ার এনে আমাকে তার ওপর দাঁড় করানো হলো। কেউ একজন আমাকে চাবুকের কোনো একটি কাঠ দ্বারা নির্দেশ দিল। আমি তার নির্দেশের মর্মার্থ বুঝতে পারলাম না। আমার দু-হাত দু-দিকে ছড়িয়ে দেওয়া হলো। প্রহারকারীদের শাস্তি শুরু করার আদেশ করা হলো। তাদের হাতে চাবুক ছিল। প্রথমজন তার চাবুক দিয়ে আমাকে দুটি আঘাত করল। এরপর দ্বিতীয় প্রহারকারী এসেও দুটি আঘাত করল। এভাবে একের পর এক প্রহারকারী এসে আমাকে আঘাত করতে লাগল। মুতাসিম প্রহারকারীদেরকে বলছিলেন, 'আল্লাহ তোর হাত কেটে দিন; আরও জোরে মার।' প্রহারের মাঝে আমি কয়েকবার চেতনা হারিয়ে ফেললাম। মার থেমে গেলে আমার চেতনা ফিরে আসত। মুতাসিম পাশে দাঁড়িয়ে আমাকে তাদের মতাদর্শ গ্রহণ করার আহ্বান জানাতে লাগলেন। কিন্তু আমি তার আহ্বানে সাড়া দিলাম না। উপস্থিত সভাসদরা বলছিল, 'ধিক তোমাকে! স্বয়ং খলিফা তোমার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। তারপরও তুমি...?!'
আমি কিছুতেই তাদের মতাদর্শ গ্রহণে রাজি হলাম না। তারা পুনরায় আমাকে প্রহার করা শুরু করল। প্রহার শেষে আবারও আহ্বান, আবারও প্রত্যাখ্যান। এরপর শুরু হলো তৃতীয়বারের প্রহার। খলিফা আবারও আমাকে তার মতাদর্শ মেনে নিতে আহ্বান করলেন। কিন্তু প্রচণ্ড প্রহারের কারণে আমি তখন তার কথা কিছুই বুঝছিলাম না। এরপর তারা আবার আমাকে মারতে লাগল। এ পর্যায়ে আমার বোধ ও অনুভূতিশক্তি লোপ পেল। তখন আমি আর প্রহারের কোনো আঘাতই অনুভব করছিলাম না। আমার অবস্থা দেখে খলিফা সন্ত্রস্ত হয়ে পড়লেন।
এরপর খলিফার নির্দেশে আমাকে মুক্ত করে দেওয়া হলো। আমি শুধু এতটুকু অনুভব করতে পারলাম যে, আমি কোনো একটি কামরায় আছি এবং আমার পায়ের শৃঙ্খল খুলে দেওয়া হয়েছে। সেদিন ছিল ২২১ হিজরি সনের ২৫ রমজান (৮৩৬ খ্রিষ্টাব্দের ১১ সেপ্টেম্বর)। এরপর খলিফার পক্ষ থেকে আমাকে আপন পরিবারের কাছে প্রত্যাবর্তনের অনুমতি প্রদান করা হলো।
সেদিন ইমাম আহমাদকে ত্রিশের অধিক মতান্তরে আশিটি দোররা মারা হয়েছিল। প্রতিটি চাবুকাঘাত ছিল অত্যন্ত বেদম ও তীব্র।
খলিফার দরবার হতে যখন ইমামকে বাগদাদের নায়েব ইসহাক বিন ইবরাহিমের গৃহে আনা হয়, তখন তিনি রোজাদার ছিলেন। এ সময় রোজা ভাঙার জন্য তার সামনে ছাতু পরিবেশন করা হলে তিনি রোজা ভাঙতে অস্বীকৃতি জানান এবং এ অবস্থায়ই রোজা পূর্ণ করেন। (১০৪)
বর্ণিত আছে, ইমাম আহমাদকে যখন প্রহার করার জন্য দাঁড় করানো হয়, তখন তার পায়জামার ফিতা ছিঁড়ে গিয়েছিল। তিনি তখন সতর উন্মুক্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কায় আল্লাহর কাছে দোয়া করেন, 'হে সাহায্যপ্রার্থীদের সহায়তাকারী, হে জগৎসমূহের প্রভু, আমি যদি তোমার সন্তুষ্টির জন্য ন্যায় ও সত্যের পথে অটল থেকে থাকি, তাহলে আমার সতর উন্মুক্ত করো না।' এরপর তার পায়জামা পূর্বের ন্যায় ঠিক হয়ে যায়।
ইমাম আহমাদ যখন আপন গৃহে প্রত্যাবর্তন করেন, তখন অস্ত্রোপচারকারী চিকিৎসক এসে তার দেহ হতে নিষ্প্রাণ গোশত কেটে ফেলে এবং তার চিকিৎসা শুরু করে। ইমাম আহমদ রহ.-এর প্রতি কৃত আচরণের কারণে খলিফা মুতাসিম অত্যন্ত অনুতপ্ত হয়েছিলেন। তাই খলিফার নির্দেশে নায়েব ইসহাক প্রতিদিন তার চিকিৎসার খোঁজখবর নিতেন। কিছুদিন পর ইমাম সাহেব সুস্থ হলে খলিফা মুতাসিম অত্যন্ত আনন্দিত হন। মুসলিম জনসাধারণও তাদের প্রাণপ্রিয় ইমামের সুস্থতায় আনন্দিত হয়। আল্লাহ তাআলা তাকে সুস্থতা দান করার পর তিনি তাকে কষ্টপ্রদানকারী বিদআতি ব্যতীত সবাইকে ক্ষমা করে দেন।
ইমাম আহমাদ রহ. বলতেন, 'তোমার কারণে তোমার মুসলমান ভাই আজাবের শিকার হলে তোমার কী লাভ হবে?!'
খলিফা মুতাসিম ২২৭ হিজরি সনের ১৭ রবিউল আউয়াল (৮৪২ খ্রিষ্টাব্দের ৪ জানুয়ারি) আটচল্লিশ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন এবং মৃত্যুর পূর্বেই তিনি নিজ পুত্র হারুনকে পরবর্তী খলিফা ঘোষণা করে যান।
টিকাঃ
১০৩. আব্বাসি রাজপরিবারের ঊর্ধ্বতন পুরুষ আব্বাস রা. নবীজির চাচা ছিলেন। সেদিকে সম্বন্ধ করে ইমাম আহমাদ রহ. খলিফাকে নবীজির চাচাতো ভাই সম্বোধন করেছেন।
১০৪. ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১০/৩৩৯-৩৪১।