📄 খলিফা মামুনের শাসনামলে জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চায় বিশেষ গুরুত্বারোপ
খলিফা মামুনের শাসনামলেই মুসলিম বিশ্বে ইলমুল কালাম চর্চার সূচনা ও উৎকর্ষ ঘটে। মেধা ও যুক্তিনির্ভর এই শাস্ত্রের মূল আলোচ্য বিষয় হলো আকিদা-বিশ্বাস, ধর্মতত্ত্ব ও ধর্মের মৌলিক নীতিসমূহ। মুতাজিলা সম্প্রদায়ের প্রভাব বিস্তারের সূচনা এবং সম্প্রদায়টির প্রখ্যাত পণ্ডিত ইবরাহিম বিন সাইয়ার (নাযযাম)-এর আত্মপ্রকাশও মামুনের আমলেই হয়। (৯৬)
ইলমুল কালামকে উপজীব্য করেই কুরআন-সুন্নাহর অনুসারী আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর সঙ্গে মুতাজিলা সম্প্রদায়ের বিরোধের সূচনা হয়। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআ আকিদা ও ধর্মীয় বিশ্বাসের ক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহকেই মূল নির্ভরতা মনে করে আর মুতাজিলা সম্প্রদায় এ ক্ষেত্রে কুরআন-সুন্নাহর ওপর যুক্তি ও মুক্তবুদ্ধির দাবিকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে।
এই মৌলিক মতবিরোধকে কেন্দ্র করে উভয় পক্ষের মধ্যে যেসব মাসআলায় মতানৈক্য ঘটে, তার মধ্যে প্রসিদ্ধ একটি হলো—আল্লাহর কালাম কুরআন নিত্য ও শাশ্বত, নাকি মাখলুক ও সৃষ্ট?
মূল মাসআলার বিবরণ ও সমাধান তো অতি সরল। কিন্তু একে কেন্দ্র করে প্রথমে খলিফা মামুন ও তারপর খলিফা মুতাসিমের শাসনামলে খলিফাদ্বয়ের প্রত্যক্ষ মদদে সমকালীন মুসলিম উম্মাহর প্রথিতযশা আলিমগণের ওপর প্রচণ্ড দুর্যোগ নেমে আসে। কারণ, উভয় খলিফা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর মতাদর্শের বিপরীতে গিয়ে মুতাজিলা মতবাদকেই গ্রহণ করেছিলেন, যাদের দাবি ছিল—কুরআন সৃষ্ট।
যেহেতু বৃহত্তর জনসাধারণের সমর্থন ছিল আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর বরেণ্য আলিমগণের পক্ষে, তাই বিরোধী দল জনরোষের ভয়ে নিজেদের মতাদর্শ যথেচ্ছ প্রচার করতে পারত না। মামুন খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করার পর উভয় পক্ষের জন্য তর্কবিতর্কের ক্ষেত্র উন্মুক্ত করে দেন। কালাম শাস্ত্রবিদ, ফিকহ গবেষক, হাদিস বিশারদসহ সকল শ্রেণি ও শাস্ত্রের উলামায়ে কেরামকে তিনি তার দরবারে আহ্বান করতেন এবং তাদের মাঝে বিতর্কসভার আয়োজন করতেন। খলিফা মামুন আশা করেছিলেন যে, এর মাধ্যমে বিরোধপূর্ণ মাসআলাসমূহে সকল আলিম ঐকমত্যে পৌঁছতে সক্ষম হবে এবং পুরো জাতি সেই এক ও অভিন্ন মত গ্রহণ করতে বাধ্য হবে। আর এর ফলে পুরো মুসলিম উম্মাহ বিশেষ করে দ্বীনের মৌলিক বিষয়সমূহ এবং ইমামত ও নেতৃত্বের মাসআলায় ঐক্যবদ্ধ থাকবে।
বর্ণিত আছে—একদিন খলিফা মামুনের উপস্থিতিতে তার দরবারে দুজন শিয়া আলিম বিতর্ক করছিল। তাদের একজন ছিল ইছনা আশারিয়া মতাদর্শী, অপরজন যায়দিয়া মতাদর্শী। বিতর্কের একপর্যায়ে একজন উত্তেজিত হয়ে অপরজনকে বলে উঠল, 'বেটা নিবতি! কালাম শাস্ত্রের তুই কী জানিস?' তখন মামুন বললেন, 'কটুভাষণ হলো মূর্খতা ও ভ্রষ্টতা আর অশ্লীল আচরণ হলো এক ধরনের হীনতা ও নিকৃষ্টতা। আমরা তো ইলমুল কালামের চর্চা বৈধ করে দিয়েছি এবং মতপ্রকাশের ক্ষেত্র উন্মুক্ত করে দিয়েছি। যে ন্যায় ও সত্য কথা বলবে, আমরা সাদরে তার প্রশংসা করব; আর যে মূর্খতা প্রদর্শন করবে, আমরা তাকে বাধা দেবো। সুতরাং আগে তোমরা দুজন মূলনীতি নির্ধারণ করে নাও। কারণ, ইলমুল কালাম তো হলো শাখাগত বিষয়। যখন তোমরা শাখাগত কোনো বিষয়ে তর্ক করবে, তখন পূর্ব-নির্ধারিত মূলনীতির দিকে প্রত্যাবর্তন করে তার সমাধান করে নেবে।'
আলোচ্য ঘটনাটি দ্বারা এ বিষয়টিও প্রমাণিত হয় যে, খলিফা মামুন বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্ক, মুক্তচিন্তা ও মুক্তবুদ্ধির চর্চা সকলের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। কারণ, আলোচ্য ঘটনায় উভয় তার্কিক ছিল শিয়া মতাবলম্বী। উভয়ের মতাদর্শ এই বিন্দুতে এক ও অভিন্ন ছিল যে, বিতর্কে যে-ই জয়ী হবে, সে বনু আব্বাসের ক্ষমতা ও রাজত্বের পতনে অগ্রগামী হবে। এতৎসত্ত্বেও খলিফা মামুন তাদেরকে স্বাধীন মতামত প্রকাশের সুযোগ দিয়েছিলেন।
সরকারি তত্ত্বাবধানে উন্মুক্ত বিতর্কের যে ধারা খলিফা মামুন চালু করেছিলেন, তার কিছু ইতিবাচক প্রভাব যেমন ছিল, ছিল নেতিবাচক প্রভাবও। যেমন:
• এর অন্যতম ইতিবাচক দিক এই ছিল যে, এসব জ্ঞান-বিতর্কের মাধ্যমে দ্বীনি ইলমের এক বিশাল সম্পদভান্ডার গড়ে উঠেছে। মুসলিম উম্মাহ এর মাধ্যমে ইসলামি জীবনব্যবস্থার অপরিহার্য অঙ্গ ইলমুল ফিকহের অমূল্য অনেক জ্ঞানসম্পদ লাভ করেছে।
• মুক্তবুদ্ধি ও দর্শনের মাধ্যমে ইসলামি আকিদাকে প্রমাণ করার জন্য ইলমুল কালামের এই উৎপত্তি ও বিকাশ বিশেষ করে পারসিক নওমুসলিমদের দাওয়াত প্রদানে যথেষ্ট কার্যকরী ছিল। পারসিকরা পূর্ব থেকেই এ পদ্ধতিতে অভ্যস্ত ছিল বিধায় তাদেরই পরিচিত পদ্ধতিতে তাদের সামনে ইসলামকে উপস্থাপন অত্যন্ত উপযোগী বিবেচিত হয়েছিল।
• কিন্তু ইসলামি আকিদা ও মৌলিক বিশ্বাসসমূহকে প্রমাণ করার জন্য নিছক যুক্তিনির্ভরতা মারাত্মক বিভ্রান্তি ও বিশ্বাসগত বিচ্যুতিও সৃষ্টি করেছিল। কারণ, এটি একটি স্বতঃসিদ্ধ বিষয় যে, মানবিক বিচার-বুদ্ধি একদিকে যেমন সীমিত, অপরদিকে দৃষ্টিগ্রাহ্য বিষয় দ্বারা প্রভাবিত। বিপরীতে আকিদা ও বিশ্বাস অদৃশ্য বিষয়কেন্দ্রিকও হয়, যা কুরআন-সুন্নাহর বিশুদ্ধ ও অকাট্য বিবরণ দ্বারা প্রমাণিত। যুক্তিনির্ভরতা ও মুক্তচিন্তার চর্চার ফলে এ জাতীয় অনেক মাসআলায় বিচ্যুতি ও বিকৃতি ঘটে এবং উম্মাহর মাঝে বিভেদ ও বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হয়।
• এমনই একটি মাসআলা হলো 'খালকুল কুরআন' বা কুরআন সৃষ্ট হওয়ার মাসআলা। তর্কবিতর্কের দীর্ঘ ধারা অতিবাহিত হওয়ার পর খলিফা মামুন এ মাসআলায় সংখ্যাগরিষ্ঠ আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর মতাদর্শের বিরুদ্ধে গিয়ে কুরআন সৃষ্ট হওয়ার মতবাদ গ্রহণ করেন। মামুনের ধারণা ছিল—বিরোধপূর্ণ এ বিষয়ে তার মত সকলের সামনে প্রকাশিত হওয়ার পর উলামায়ে কেরাম তার মতের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করবেন। কিন্তু বাস্তবে ঘটে এর সম্পূর্ণ উল্টো। নিষ্ঠাবান উলামায়ে কেরাম 'খালকুল কুরআন' মতাদর্শের কঠোর সমালোচনা করেন এবং এ ধরনের দাবিকে বিদআত আখ্যায়িত করেন। অবশ্য বিরোধিতা করতে গিয়ে কেউ কেউ সীমালঙ্ঘনও করেন এবং কুরআন সৃষ্ট-মতাদর্শ গ্রহণকারীদের কাফির আখ্যা দেন।
২১২ হিজরি সন হতে পরবর্তী কয়েক বছর এভাবেই চলতে থাকে। ২১৮ হিজরি সনে (৮৩৩ খ্রিষ্টাব্দে) খলিফা মামুন ক্ষমতাপ্রয়োগের মাধ্যমে উলামায়ে কেরামকে কুরআন সৃষ্ট মতবাদ গ্রহণে বাধ্য করার সিদ্ধান্ত নেন। নিঃসন্দেহে এটি ছিল খলিফা মামুনের সম্পূর্ণ ভুল ও অবিবেচনাপ্রসূত একটি সিদ্ধান্ত।
সে বছর মামুন রোমান সাম্রাজ্যে বিজয়াভিযান পরিচালনা করেছিলেন। রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য তিনি তখন তারসুসে (Tarsus) অবস্থান করছিলেন। তিনি সেখান থেকেই বাগদাদের গভর্নর ইসহাক বিন ইবরাহিমের কাছে বার্তা পাঠিয়ে উলামায়ে কেরামকে সমবেত করার নির্দেশ দেন এবং উক্ত মাসআলায় তাদের মতামত যাচাই ও আকিদা পরীক্ষা করতে বলেন। খলিফার নির্দেশ মোতাবেক ইসহাক ত্রিশজন আলিমকে একত্র করেন এবং খালকুল কুরআন বিষয়ে তাদের মতামত যাচাই করেন। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে যে কথোপকথন হয়, তার একটি নমুনা নিম্নে তুলে ধরা হলো।
ইসহাক বিন ইবরাহিম: 'কুরআন সম্পর্কে আপনার কী মত?'
বিশর ইবনুল ওয়ালিদ: 'কুরআন আল্লাহর কালাম।'
'আমি জানতে চাচ্ছি, কুরআন সৃষ্ট কি না?'
'আল্লাহ সকল বস্তুর স্রষ্টা।'
'কুরআন কি বস্তু নয়?'
'হ্যাঁ, একটি বস্তু।'
'তাহলে কুরআনও সৃষ্ট?!'
'স্রষ্টা নয়।'
'তা তো জানতেও চাইছি না। আমার প্রশ্ন হলো—কুরআন কি সৃষ্ট?'
'যা বলেছি, তার চেয়ে ভালো কিছু বলতে পারব না। আমি ইতিপূর্বে আমিরুল মুমিনিনের সঙ্গে অঙ্গীকার করেছি যে, এ বিষয়ে কোনো কথা বলব না। যা বলেছি, তার বাইরে আমার আর কিছুই বলার নেই।'
গভর্নর ইসহাক উলামায়ে কেরামের প্রত্যেকের উত্তর নাম ধরে ধরে হুবহু লিখে খলিফা মামুনের কাছে পাঠিয়ে দেন। খলিফা তাদের উত্তর পেয়ে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হন এবং চাপপ্রয়োগের মাধ্যমে সকলকে বাধ্য করার জন্য ইসহাককে নির্দেশ দেন। ইসহাকের চাপে সকলে নতি স্বীকার করলেও আহমাদ বিন হাম্বল রহ. ও মুহাম্মাদ বিন নুহ রহ. আপন নীতিতে অটল-অবিচল থাকেন। গভর্নর ইসহাক তাদের দুজনকে বন্দি করে খলিফার কাছে পাঠিয়ে দেন।
ঐতিহাসিক ইবনে কাছির রহ. বলেন—
পরীক্ষায় যখন আহমাদ বিন হাম্বলের পালা এলো, ইসহাক তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি কি মানেন যে, কুরআন মাখলুক ও সৃষ্ট?' আহমাদ উত্তর দিলেন, 'কুরআন আল্লাহর কালাম; আমি এর বেশি কিছু বলব না।'(৯৭)
এরপর ইবনে কাছির রহ. বলেন—
উপস্থিত অনেকে অনিচ্ছাসত্ত্বেও মৌখিকভাবে 'খালকুল কুরআন'-এর স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। কেননা, যারা এর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে রাজি না হতো, প্রশাসকবর্গ তাদেরকে আপন দায়িত্ব হতে অপসারণ করত, বাইতুল মালে ভাতা চালু থাকলে তা বন্ধ করে দিত। দিত, ফিকহবিদ হলে ফতোয়া প্রদান এবং হাদিসবিশারদ হলে হাদিসের দরস দান নিষিদ্ধ করে দিত। এভাবে একটি মারাত্মক ফিতনা, জঘন্য দুর্যোগ ও কঠিন বিপর্যয় সৃষ্টি করা হয়। (৯৮)
এটি ইতিহাসের এক গৌরবময় অধ্যায় যে, খালকুল কুরআনের মাসআলায় যারাই নমনীয়তা অবলম্বন করে খলিফা মামুনের পক্ষাবলম্বন করেছে, মুহাদ্দিসিনে কেরাম তাদেরকে উপেক্ষা করেছেন, তাদের স্তর-মর্যাদা অবনমিত করেছেন এবং এ বিষয়টিকে একটি ত্রুটি ও দোষ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। কারণ, যে আলিম আকিদা ও বিশ্বাসের প্রশ্নে নির্যাতন ও নিপীড়নে অটল-অবিচল থাকতে পারে না, সে কিছুতেই মান্যবর আলিমদের কাতারে গণ্য হতে পারে না। এ কারণেই আমরা দেখি, ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলের ন্যায় যারা শত নির্যাতনের মুখেও অটল-অবিচল ছিলেন, তারা সুউচ্চ সম্মান ও মর্যাদা এবং অসাধারণ কবুলিয়াত ও জনপ্রিয়তা লাভ করেছেন এবং ইতিহাসের পাতায় স্মরণীয় ও বরণীয় হয়ে আছেন।
আপন কর্মপন্থার স্বপক্ষে খলিফা মামুনের যুক্তি এই ছিল যে, তিনি এর মাধ্যমে মতবিরোধপূর্ণ মাসআলাসমূহে উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করতে চাচ্ছেন। (৯৯) অথচ বাস্তবতা হলো—মামুনের শাসনামলে ঐক্য ও সম্প্রীতি দূরে থাক; অতি সহজ, সাধারণ ও তুচ্ছ 'খালকুল কুরআন'-এর মাসআলাতেও মতবিরোধ বিরাটাকার ধারণ করেছিল এবং একে কেন্দ্র করে উম্মাহর হকপন্থি উলামায়ে কেরামের ওপর নির্যাতন-নিপীড়নের খড়গ নেমে এসেছিল। কিন্তু মামুন তারপরও আপন অবস্থানে অটল ছিলেন। তিনি বলতেন, 'অতি ক্ষুদ্র মাসআলাও যখন কোনো মৌলিক বিশ্বাসে পরিণত হয় বা নেতৃত্বের কারণ হয়, তখন তাকে কেন্দ্র করে বিরোধ ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। অপরদিকে অতি জটিল কোনো বিষয়েও কঠিন বিরোধ হলে তাতে কোনো সমস্যা হয় না, যদি তা কোনো মৌলিক আকিদা বা নেতৃত্ব-নির্ধারণী বিষয় না হয়।'
খালকুল কুরআনের মাসআলায় যদি খলিফা মামুনের স্খলন না ঘটত এবং যদি তিনি খোলাফায়ে রাশিদিনের অন্যান্য সদস্যের তুলনায় আলি রাযি.-এর শ্রেষ্ঠত্বের দাবি না করতেন, তাহলে নিঃসন্দেহে তিনি ইসলামের শ্রেষ্ঠতম খলিফাদের কাতারে অন্তর্ভুক্ত হতেন। ঐতিহাসিক ইবনে কাছির রহ. তার বিভিন্ন কীর্তি ও চরিত্রগুণের বিবরণদানের পর লিখেছেন—
তার কর্মকাণ্ডে শিয়াবাদ ও মুতাজিলা মতবাদের প্রভাব ছিল এবং তার বিশুদ্ধ সুন্নাহ সম্পর্কে অজ্ঞতা ছিল। (১০০)
খলিফা মামুন ২১৮ হিজরি সনে আটচল্লিশ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন এবং মৃত্যুর পূর্বেই ভাই আল-মুতাসিম বিল্লাহকে পরবর্তী খলিফা ঘোষণা করে যান।
টিকাঃ
৯৬. হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দীর শুরুতে উমাইয়া খিলাফতের শেষদিকে বসরায় ভ্রান্ত মুতাজিলা মতাদর্শের উৎপত্তি হয়। আব্বাসি আমলে বিশেষ করে খলিফা মামুন, মুতাসিম ও ওয়াসিকের শাসনামলে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করায় মুতাজিলা মতাদর্শ উৎকর্ষ ও বিস্তৃতি লাভ করে এবং ধর্মীয় ও রাজনৈতিক উভয় অঙ্গনে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। মুতাজিলা মতাদর্শীরা কুরআন-সুন্নাহর বর্ণনার ওপর নিজেদের বিবেক-বুদ্ধি ও মুক্তচিন্তার দাবিকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে এবং কোনো আয়াত বা হাদিস বাহ্যত মুক্তচিন্তার বিরোধী মনে হলে নির্দ্বিধায় তা প্রত্যাখ্যান করে। ওয়াসিল বিন আতাকে (মৃত্যু: ১৩১ হিজরি) মুতাজিলা মতাদর্শের জনক বিবেচনা করা হয়।
৯৭. ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১০/২৭৬।
৯৮. প্রাগুক্ত, ১০/২৭৭।
৯৯. প্রকৃতপক্ষে মামুনের এ চিন্তাধারা ছিল সম্পূর্ণই বাস্তবতাবিবর্জিত। শাখাগত মাসআলা ও যেসব বিষয়ে একাধিক মত গ্রহণের অবকাশ থাকে, সেসব ক্ষেত্রে পুরো উম্মাহকে এক মত ও পথে আনতে বাধ্য করা অসম্ভব একটি বিষয়। এটি সুন্নাতুল্লাহ ও মহান আল্লাহর রীতিরও বিরোধী। সালাফ ও উম্মাহর পূর্বসূরি মনীষীগণ শাখাগত মাসআলায় একাধিক মতের উপস্থিতিকে দূষণীয় মনে করতেন না এবং উম্মাহকে এ জাতীয় বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে বাধ্য করা বৈধও মনে করতেন না। বরং তারা বলতেন, 'যে ব্যক্তির শাখাগত মাসআলাতে মতভিন্নতার ইলম নেই, সে ফিকহের ঘ্রাণও পাবে না।' এ বিষয়ে প্রশস্তিদায়ক অবগতির জন্য অধ্যয়ন করা যেতে পারে—মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক, উম্মাহর ঐক্য : পথ ও পন্থা।
১০০. ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১০/২৭৮।