📄 আল-আমিন আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ
খলিফা আল-আমিনের জন্ম ১৭০ হিজরি সনে বাগদাদে। তিনি তেইশ বছর বয়সে ১৭৩ হিজরি সনে পিতার স্থলাভিষিক্ত হন।
খলিফা আমিনের শাসনামল বেশি দীর্ঘ হতে পারেনি। খলিফা ও তার ভাই মামুনের মধ্যকার দুঃখজনক বিরোধ ও সংঘাতকে কেন্দ্র করে একদিকে আমিনের খিলাফতের অবসান ঘটে, অপরদিকে মুসলিম উম্মাহর মাঝেও ভাঙন সৃষ্টি হয়।
মামুন বয়সে বড় হওয়া সত্ত্বেও খলিফা হারুনুর রশিদ আপন উত্তরাধিকারী হিসেবে তার পরিবর্তে আমিনের নামে বায়আত গ্রহণ করেছিলেন। আমিনকে প্রাধান্যদানের একমাত্র কারণ ছিল, তিনি ছিলেন হারুনুর রশিদের প্রিয়তমা স্ত্রী জুবায়দার পুত্র।
পরে অবশ্য হারুনুর রশিদ আপন ভুলের প্রতিকার বিধানের চেষ্টা করেন। কিন্তু ভুল সংশোধন করতে গিয়ে তিনি এমন এক সিদ্ধান্ত নেন, যার ফলে ক্ষতির মাত্রা আরও বৃদ্ধি পায়। তিনি প্রথমে আমিনের পরবর্তী খলিফা বা দ্বিতীয় ওলিয়ে আহদ হিসেবে মামুনের নাম ঘোষণা করেন; এরপর মামুনকে খোরাসান ও রায় অঞ্চলের স্বতন্ত্র ক্ষমতা প্রদান করেন। ফলে আব্বাসি সাম্রাজ্যে আমিন ও মামুন দুই ভাইয়ের অধীনে আলাদা আলাদা সেনাবাহিনী তৈরি হয়। হারুনুর রশিদ এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ না থেকে তার আরেক পুত্র কাসিমকে তৃতীয় ওলিয়ে আহদ ঘোষণা করেন এবং তাকে জাযিরা ও আর্মেনিয়া অঞ্চলের প্রশাসনক্ষমতা প্রদান করেন।
ফলে খলিফা হওয়ার পর আমিন ইসলামি সাম্রাজ্যের একটি খণ্ডিত অংশের কর্তৃত্ব লাভ করেন। আব্বাসি সাম্রাজ্যের বিরাট অংশ এবং সেখানকার জনগণ ও সেনাবাহিনীর কর্তৃত্ব তখন তার অপর দুই ভাইয়ের হাতে। খলিফা আমিনের মনে হচ্ছিল—তিনি যেন দু-ডানাকাটা এক পাখি!
খলিফা হারুনুর রশিদের দরবারে উজির ফজল বিন রবি-এর উপস্থিতিও পরিস্থিতি জটিলকরণে বড় ভূমিকা রেখেছিল। ফজলই হারুনুর রশিদকে এসব সিদ্ধান্ত নিতে এবং বারমাকি পরিবারকে নির্মূল করতে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। হারুনুর রশিদের মৃত্যুর পর ফজল এবার নতুন খলিফা আমিনের পক্ষাবলম্বন করেন। আমিনের যদিও ভাইদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ-বিগ্রহে জড়ানোর ইচ্ছা ছিল না; কিন্তু ফজল তাকে মামুনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে প্ররোচিত করেন। নিজের স্বার্থহানির ভয়ই মূলত ফজলকে এরূপ করতে উৎসাহ যুগিয়েছিল।
উজির ফজল বিন রবির প্ররোচনায় দুই ভাইয়ের মধ্যকার বিরোধ একসময় যুদ্ধে গড়ায়। বাস্তব কথা হলো, খলিফা আমিনের রাষ্ট্রপরিচালনার যথেষ্ট প্রশাসনিক যোগ্যতা ছিল না। তিনি আমোদ-প্রমোদেই অধিক ব্যস্ত থাকতেন। তার বিশ্বাস ছিল যে, তিনি সহজেই তার ভাইকে পরাভূত করতে পারবেন। অপরদিকে মামুন আপন কর্মদক্ষতা ও সুষ্ঠু প্রশাসনিক যোগ্যতার মাধ্যমে তার দরবারে সমকালীন খ্যাতনামা জ্ঞানী-গুণী, আলিম-উলামা ও ফুকাহায়ে কেরামকে সমবেত করতে সক্ষম হন। তিনি তাদের সাহচর্য অবলম্বন করতেন এবং তাদের পরামর্শ গ্রহণ করতেন। ফলে আলিমসমাজের অন্তরে তার প্রতি প্রীতি ও হৃদ্যতা তৈরি হয়।
সংক্ষেপ কথা, মামুনের জনৈক সেনাপতির হাতে আমিনের হত্যার মাধ্যমে এই সংঘাতের সমাপ্তি ঘটে এবং জনগণ মামুনের নামে বায়আত গ্রহণ করে।
ষষ্ঠ আব্বাসি খলিফা আমিন ১৯৮ হিজরি সনে আটাশ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।