📄 ১ম অভিযোগ : মদপান ও মদের আসর আয়োজন
ঐতিহাসিকগণ উল্লেখ করেছেন যে, খলিফা হারুনুর রশিদ নাবিজ (খেজুর ভিজিয়ে তৈরি এক ধরনের পানীয়) পান করতেন। বরং ঐতিহাসিকদের অনেকে ইমাম আবু হানিফা রহ. সম্পর্কেও একই কথা উল্লেখ করেছেন। খলিফা হারুনুর রশিদের শাসনামলে ইরাকবাসী হানাফি মাজহাবের অনুসারী ছিল। হানাফি মাজহাবমতে খেজুর ভেজানো পানি দু-অবস্থায় পান করা বৈধ—
* খেজুর ভেজানো পানি ভিজিয়ে রাখার পর বা জ্বাল দেওয়ার পর টগবগ করা ও তেজ আসার পূর্বেই যদি পান করা হয়, তাহলে মাজহাবের সকল উলামায়ে কেরামের ঐকমত্যে তা হালাল।
* জ্বাল দিতে দিতে যদি পানি টগবগ করতে থাকে এবং তেজ আসে, আর তা থেকে যদি এত অল্প পরিমাণ পান করা হয় যে, পানকারীর প্রবল ধারণামতে এর কারণে সে মাতাল হবে না, আর পানও করা হয় আমোদ-প্রমোদের উদ্দেশ্যে নয়; বরং শক্তিবর্ধনের উদ্দেশ্যে, তাহলে তার বিধান বিষয়ে হানাফি ইমামগণের মধ্যে মতানৈক্য আছে। (ইমাম আবু হানিফা একে হালাল বিবেচনা করেন।) হ্যাঁ, যদি এ জাতীয় জ্বাল দেওয়া পানীয় হতে এত বেশি পরিমাণ পান করা হয়, যার কারণে সাধারণত নেশাভাব সৃষ্টি হয়, তাহলে তা সকলের ঐকমত্যে হারাম।
এসব বিধান হলো জ্বাল দেওয়ার ক্ষেত্রে। আর যদি জ্বাল দেওয়ার পরিবর্তে ভিজিয়েই রাখা হয় এবং দীর্ঘ সময় ভিজিয়ে রাখার কারণে উথলে ওঠে এবং তেজ আসে, তাহলে তা অল্প বা অধিক পরিমাণ সর্বাবস্থায়ই হানাফি আলিমগণের ঐকমত্যে হারাম।
এখন প্রশ্ন হলো, খলিফা হারুনুর রশিদ কোন ধরনের নাবিজ পান করতেন? নেশাউদ্রেককারী প্রকারের, নাকি হালাল প্রকারের?
এ বিষয়ে ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন রহ. লিখেছেন—
আর হারুনুর রশিদের মাদকাসক্তি এবং বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে নিয়ে মদের আসর জমানো সম্পর্কে যেসব গালগল্প প্রচলিত আছে, তা সম্পর্কে আমাদের কথা হলো—আল্লাহ মাফ করুন—আমরা তার জীবনচরিতে এ জাতীয় কিছু বিন্দুমাত্র খুঁজে পাইনি। বরং তার জীবনচরিতে দ্বীনদারি ও ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে খিলাফতের দায়িত্বপালন, আলিম-উলামা ও বুজুর্গ ব্যক্তিদের সাহচর্য গ্রহণ, ফুজায়ল বিন ইয়াজ, ইবনুস সাম্মাক প্রমুখের সঙ্গে নিয়মিত দ্বীনি আলোচনা, সুফিয়ান সাওরির সঙ্গে পত্রবিনিময়, বুজুর্গদের নসিহত শুনে অঝোর ধারায় কান্না, মক্কায় কাবা শরিফের তাওয়াফ করার সময় দোয়া এবং তার ইবাদত ও নফলপ্রীতির বিবরণই পাওয়া যায়। (৮৪)
ইবনে খালদুন রহ. আরও লিখেছেন—
প্রকৃতপক্ষে হারুনুর রশিদ ইরাকিদের (ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর) মাজহাবমতে বৈধ খেজুরের নাবিজ পান করতেন। খেজুরের নাবিজ সম্পর্কে তাদের ফতোয়া তো সুপ্রসিদ্ধ। কিন্তু খলিফা হারুনুর রশিদের বিরুদ্ধে মদপানের অভিযোগ তোলার এবং এ সম্পর্কে প্রচলিত ভিত্তিহীন বর্ণনাসমূহের অনুসরণের কোনো অবকাশই নেই। (৮৫)
টিকাঃ
৮৪. ইবনে খালদুন, তারিখে ইবনে খালদুন, ১/২৩।
৮৫. প্রাগুক্ত, ১/২৫।
📄 ২য় অভিযোগ : আব্বাসি রাষ্ট্রে মদের অবাধ উৎপাদন ও বিস্তার
হারুনুর রশিদের শাসনামলে মদের অবাধ বিস্তারের যে অভিযোগ প্রচলিত আছে, সে সম্পর্কে আমাদের কথা হলো—যে যুগ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কে এ অভিযোগ তোলা হয়, বাস্তবতা কিন্তু তাকে মোটেই সমর্থন করে না। এটি তো স্বীকৃত সত্য যে, খলিফা হারুনুর রশিদের একান্ত ঘনিষ্ঠজনদের শীর্ষ কাতারে ছিলেন মালিক বিন আনাস রহ., আবু ইউসুফ রহ., শাফেয়ি রহ., ফুজায়ল বিন ইয়াজ রহ. ও আবদুল্লাহ বিন মুবারক রহ.-এর ন্যায় সমকালীন আস্থাভাজন, বিশ্বস্ত ও জগদ্বিখ্যাত ইমামগণ। বিরুদ্ধবাদী ও বাতিলপন্থিরা খলিফা হারুনুর রশিদের আমলে মদের অবাধ বিস্তারের যে চিত্র তুলে ধরে থাকে, বাস্তবেই যদি মদ সে যুগে এত সহজলভ্য হতো, তাহলে কি এসব ক্ষণজন্মা আল্লাহওয়ালা আলিম ও বুজুর্গ নিশ্চুপ থাকতেন? সঙ্গে এ তথ্যটিও যোগ করুন যে, সে যুগে ইসলামি রাষ্ট্রে বিভিন্ন ধরনের পানীয় প্রচলিত ছিল আর সবগুলোকেই ‘শরাব’ বলা হতো। যেমন: পানি, দুধ, শরবত, বিভিন্ন ফলের নির্যাস ইত্যাদি। এগুলো চিনিমিশ্রিত পানি দ্বারা তৈরি হতো এবং তাতে ভায়োলেট ফুল, কলা, গোলাপ, বেরি ফল ইত্যাদির নির্যাস দিয়ে সুবাসিত করা হতো। সব ধরনের পানীয়কেই তখন ‘শরাব’ বা পানীয় নামে অভিহিত করা হতো।
📄 ৩য় অভিযোগ : সংগীত ও আমোদ-প্রমোদের আয়োজন
প্রশ্ন হলো—আব্বাসি খিলাফতকালে সংগীতের রূপ ও পদ্ধতি কেমন ছিল? আর সংগীত সম্পর্কে ইসলামের বিধানই-বা কী?
মৌলিকভাবে ইসলামে সংগীত বৈধ, যদি তা নির্দোষ ও আপত্তিকর কার্যকারণমুক্ত হয়। আপত্তিকর কার্যকারণ দ্বারা আমাদের উদ্দেশ্য এমন বিষয়, যা ফিতনা সৃষ্টি করে; যেমন: কুফরি বাক্য, অশ্লীল বাক্য, কৌতুক বা রং-তামাশা, বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার ইত্যাদি।
‘আন-নুজুমুয যাহিরা’ গ্রন্থকার জামালুদ্দিন আবুল মাহাসিন [মৃত্যু: ৮৭৪ হি.] হারুনুর রশিদের শাসনামলে প্রচলিত প্রসিদ্ধ সংগীতশিল্পীদের আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন—
১৭৪ হিজরি সনে ঈসা বিন জাফর বিন মানসুর-এর ক্রীতদাস মানসুর মৃত্যুবরণ করে। এই মনসুরের উপাধি ছিল যালযাল। মানসুর ছিল সে যুগের সুপ্রসিদ্ধ এক সংগীতশিল্পী। তার সংগীত ও লাঠিতে ছন্দবদ্ধ আঘাতের কথা দৃষ্টান্ত হিসেবে পেশ করা হতো। সে যুগের সংগীত বর্তমানের ন্যায় বাদ্যযুক্ত ছিল না। তখন সংগীত বলে প্রসিদ্ধ বিভিন্ন মাত্রা ও ছন্দে রচিত ধ্বনিসমষ্টিকে বোঝানো হতো। মূলত সে যুগের সংগীত ছিল আমাদের বর্তমান যুগের স্তাবক ও বক্তাদের সুললিত আবৃত্তির ন্যায় এক ধরনের পরিবেশনা। (৮৬)
সে যুগে বিদ্যমান গীতি-কাব্যের কিছু নমুনা নিচে তুলে ধরা হলো।
نُرَاعِ بِذِكْرِ الْمَوْتِ سَاعَةَ ذِكْرِهِ * وَنَفْتُرُ بِالدُّنْيَا فَنَلْهُمْ وَنَلْعَبُ وَنَحْنُ بَنُو الدُّنْيَا خُلِقْنَا لِغَيْرِهَا * وَمَا كَانَ مِنْهَا فَهُوَ شَيْءٌ مُحَبَّبُ
মরণের ভয়ে আপনারে ভুলি মরণের স্মরণে ভুলে যাই সব দুনিয়ার ঘোরে আমোদ-প্রমোদ বিনোদ বিহারে পড়ে থাকি মায়ায়-প্রবঞ্চনায় সেই দুনিয়ার চরণে। জগৎ-সংসারের অধিবাসী মোরা, জগতের লাগি সৃজিত নয়, পৃথিবী যতই আবেদনময়ী, হোক না যত আনন্দময়।
الْمَرْءُ فِي تَأَخُرِ مُدَّتِهِ * كَالتَّوْبِ يَبْلَى بَعْدَ جِدَّتِهِ عَجَبًا لِمُتَنَبِّةٍ يُضَيِّعُ مَا * يَحْتَاجُ فِيهِ لِيَوْمِ رَقْدَتِهِ
পোশাক যেমন পুরাতন হয়, মিলিয়ে যায় তার নতুন ভাঁজ মানুষেরও তেমন জীর্ণ বয়সে হারিয়ে যায় সব যৌবন-সাজ। তবুও মানুষ অলস-উদাস, বিস্ময় জাগে দেখে তার আশ- সজাগ জীবনে হেলায় হারায় নিদ্রাজীবনের পাথেয়-বিলাস!
টিকাঃ
৮৬. জামালুদ্দিন ইউসুফ আবুল মাহাসিন, আন-নুজুমুয যাহিরা ফি মুলুকি মিসর ওয়াল কাহিরা, ২/৭৮।
📄 ৪র্থ অভিযোগ : দাসীসংসর্গ উপভোগ ও প্রচুর দাসী গ্রহণ
হ্যাঁ, এটি ঐতিহাসিক স্বীকৃত সত্য যে, খলিফা হারুনুর রশিদের কাছে প্রচুর দাসী ছিল।
'শুবুহাতুন ফিল আছরিল আব্বাসিল আউয়াল' গ্রন্থের লেখক ড. মুআইয়য়াদ ফাযিল লিখেছেন—
ক্রীতদাসী সংক্রান্ত আলোচনাটি হলো আমাদের এবং তাদের চিন্তা-ধারণার মধ্যে ভিন্নতার আরেকটি দৃষ্টান্ত। (৮৭) খলিফাদের প্রতি অপবাদ আরোপ করা হয়েছে যে, তারা দাসীদের মধ্য হতে বাছাই করে নিজেদের জন্য প্রণয়িনী ও রক্ষিতা গ্রহণ করতেন এবং তাদের সৌন্দর্য ও গুণকীর্তন করে গীতি-গদ্যের আসর জমাতেন। মূলত সংগীত ও দাসী সম্পর্কে আমাদের ধারণা ও কল্পনায় যে ভাব ও মর্ম বিদ্যমান আছে, তা-ই আমাদেরকে এ ধরনের চিত্র কল্পনা করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। আমরা একে খলিফা-চরিত্রের জন্য অশোভনীয় ও অপরাধ বিবেচনা করেছি। যদি আমরা দাসীগ্রহণ সম্পর্কে শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি লক্ষ করতাম, তাহলে জানতে পারতাম যে, দাসীগ্রহণ মূলত স্বত্বাধিকার, যার ভিত্তিতে মালিক দাসীকে উপভোগ ও তার সেবা গ্রহণের অধিকার লাভ করে। মালিকের জন্য আপন স্ত্রীদের মাঝে যেমন সমতাবিধান আবশ্যক, দাসীদের ক্ষেত্রে তা আবশ্যক নয়।
ইবনে কুদামা রহ. 'কিতাবুল মুগনি' গ্রন্থে লিখেছেন- একজন পুরুষের জন্য প্রচুর সংখ্যক দাসী গ্রহণের অধিকার আছে। আর পুরুষ তার অধীনস্থ দাসীদের কাছে যেভাবে ইচ্ছা গমন করতে পারে।
নিম্নের ঘটনাগুলোর মাধ্যমে ইসলামি ইতিহাসের এই শ্রেষ্ঠতম ও মহান খলিফাদের ব্যক্তিত্বের প্রকৃত রূপ কিছুটা হলেও উপলব্ধি করা যাবে বলে আশা করা যায়।
টিকাঃ
৮৭. 'আমাদের' মানে ইসলামি চিন্তাধারা লালনকারী ঐতিহাসিকগণ, আর 'তাদের' মানে ইসলামি শিক্ষা ও চিন্তা-চেতনা হতে দূরে অবস্থানকারী বস্তুবাদী ঐতিহাসিকগণ।