📄 হারুনুর রশিদের শাসনামলে বিজয়াভিযান
খলিফা হারুনুর রশিদের আমলেই প্রথম নিকফোরাস (Nikephoros I) বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের সম্রাট নির্বাচিত হন। সাম্রাজ্যের অধিপতি হওয়ার পর ১৯০ হিজরি সনে (৮০৬ খ্রিষ্টাব্দে) তিনি হারুনুর রশিদের কাছে নিম্নোক্ত পত্র প্রেরণ করেন।
রোম সম্রাট নিকফোরাসের পক্ষ থেকে আরব-অধিপতি হারুনের প্রতি।
পরকথা, আমার পূর্বে যিনি রোমান সাম্রাজ্যের অধিপতি (৮৩) ছিলেন, তিনি তোমাকে দাবার মন্ত্রী-ঘুঁটির ন্যায় মহান ও শক্তিশালী ভেবেছিলেন আর নিজেকে ভেবেছিলেন সৈন্য-ঘুঁটির ন্যায় অসহায় ও দুর্বল। তাই তিনি তোমার কাছে প্রচুর পরিমাণ অর্থসম্পদ প্রেরণ করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে তো উল্টো তোমারই কর্তব্য ছিল তার কাছে এরূপ অধিক পরিমাণ সম্পদ পাঠানো। আসলে এটি ছিল নারীসুলভ দুর্বলতা ও নির্বুদ্ধিতার ফসল। আমার প্রেরিত এ পত্র পাঠ করামাত্র তুমি তার প্রেরিত সব অর্থসম্পদ ফেরত পাঠাবে এবং আগামীর জন্য নিজের নিরাপত্তা- জামানত হিসেবে আরও সম্পদ পাঠাবে। যদি এর ব্যতিক্রম হয়, তাহলে তরবারিই তোমার ও আমাদের মাঝে ফয়সালা করবে।
পত্র পাঠ করার পর খলিফা হারুনুর রশিদ ক্রোধে অধীর হয়ে যান। কিছুক্ষণ পর তিনি পত্রের উল্টো পিঠে জবাবে লেখেন- বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
আমিরুল মুমিনিন হারুনের পক্ষ থেকে রোমের কুকুর নিকেফোরাসের প্রতি।
কাফিরজাদা, আমি তোমার পত্র পাঠ করেছি। উত্তর স্বচক্ষেই দর্শন করবে; শ্রবণ করার মতো অবকাশ লাভের সুযোগ তোমার হবে না।
এরপর মুসলিম বাহিনী বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যে অভিযান চালিয়ে হিরাক্লিয়া (Heraclea Cybistra) নগরী জয় করে। মুসলিম বাহিনীর আক্রমণে দিশেহারা হয়ে বাইজান্টাইন সম্রাট নিকফোরাস নিয়মিত বার্ষিক জিজিয়া প্রদানের অঙ্গীকার করে সন্ধিচুক্তির প্রস্তাব দেন। এরপর থেকে নিকফোরাস প্রতি বছর তিন লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা জিজিয়া হিসেবে আব্বাসি রাষ্ট্রের কোষাগারে জমা করতেন।
মোটকথা, খলিফা হারুনুর রশিদের শাসনামলে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে মুসলমানদের শ্রেষ্ঠত্বের বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত ছিল। স্বয়ং খলিফা রাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠ সেনাপতিদের নিয়ে রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযানে বের হতেন।
খলিফা হারুনুর রশিদের শাসনামলে ১৭২ হিজরি সনে (৭৮৮ খ্রিষ্টাব্দে) মাগরিবে ইদরিসিয়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ইদরিসিয়া রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা হলেন ইদরিস বিন আবদুল্লাহ বিন হাসান। তিনি আল-হাদির আমলে ফাখখের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যান এবং মাগরিবে আপন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। ইদরিসিয়া রাষ্ট্রই ছিল আলাবিদের প্রতিষ্ঠিত প্রথম রাষ্ট্র। হারুনুর রশিদ তার খিলাফতকালের শুরুর দিকে আলাবিদের সঙ্গে সদাচরণ করতেন; কিন্তু ইদরিসিয়া রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠা তাকে শঙ্কিত করে তোলে। এরপর থেকে তিনি কাউকে আলাবিদের প্রতি আন্তরিক দেখলে তাকে কঠিন শাস্তি দিতেন।
হারুনুর রশিদের শাসনামলেই ১৮৪ হিজরি সনে (৮০০ খ্রিষ্টাব্দে) আফ্রিকায় আগলাবিয়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। আগলাবিয়া রাষ্ট্র সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা সামনে আসবে।
টিকাঃ
৮৩. নিকফোরাসের পূর্বে রোমান সাম্রাজ্যের অধিপতি ছিলেন সম্রাজ্ঞী ইরিন (Irene of Athens)। রোমান নেতৃবৃন্দ তাকে অপসারণ করে নিকফোরাসকে তার স্থলাভিষিক্ত করেছিল।
📄 হারুনুর রশিদের মৃত্যু
খলিফা হারুনুর রশিদ মৃত্যুর পূর্বে এক আশ্চর্য স্বপ্ন দেখেছিলেন। বিস্ময়কর সেই স্বপ্নই তার জীবনে বাস্তব হয়েছিল।
তিনি স্বপ্নে দেখেন, একটি হাতে কিছু লাল মাটি; আর অদৃশ্য হতে কেউ বলছে, এটি আমিরুল মুমিনিনের কবরের মাটি। পরে তিনি যখন খোরাসানের উদ্দেশে রওনা হন এবং পথিমধ্যে তুস এলাকায় পৌঁছান, তখন সেখানেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি তার ভৃত্যকে বলেন, 'তুমি এই এলাকার কিছু মাটি নিয়ে এসো।' ভৃত্য হাতে করে কিছু লাল বর্ণের মাটি নিয়ে আসে। লাল মাটি দেখেই খলিফা বলে ওঠেন, 'আল্লাহর শপথ! এ হাতই আমি দেখেছি আর এ মাটিই সেই হাতে ছিল!' এরপর তিনি সেখানে তার জন্য কবর খনন করার এবং কবরের পাশে পূর্ণ কুরআন খতম করার নির্দেশ দেন। অসুস্থ অবস্থায় খলিফাকে কবরটি দেখতে নিয়ে যাওয়া হলে তিনি কবরের দিকে তাকিয়ে বলেন, 'হে আদমসন্তান, এখানেই তোমার আগামীর নিবাস!' এ কথা বলেই তিনি কাঁদতে থাকেন। এর তিনদিন পরই তিনি ইন্তেকাল করেন।
খলিফা হারুনুর রশিদ ১৯৩ হিজরি সনের জুমাদাল উখরা মাসে চুয়াল্লিশ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।
📄 হারুনুর রশিদের শাসনামলে প্রাচুর্য
খলিফা হারুনুর রশিদ মাঝেমধ্যে ভাসমান মেঘমালার দিকে তাকিয়ে বলতেন, 'যেখানে ইচ্ছা গিয়ে বৃষ্টি বর্ষণ করো; তোমার সেচে উৎপাদিত ফসলের খারাজ (কর) আমার কোষাগারেই জমা হবে।' তার শাসনামলে আব্বাসি সাম্রাজ্যের বার্ষিক রাজস্ব সাত কোটি দেড় লক্ষ দিনারে পৌঁছেছিল। পরবর্তী সময়ে আল-মামুনের শাসনামলে রাজস্ব আরও বৃদ্ধি পায়।
📄 হারুনুর রশিদের ওপর আরোপিত কিছু অভিযোগের অপনোদন
আব্বাসি সাম্রাজ্যের খলিফাগণ বিশেষ করে হারুনুর রশিদের ওপর মদপান, সংগীত-বিনোদন ও দাসীদের মজলিসে অংশগ্রহণের অভিযোগ আরোপ করা হয়ে থাকে। নিঃসন্দেহে এসব অভিযোগ সম্পূর্ণই মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বিষয়টি আমরা কিছুটা বিস্তারিত আলোচনা করার ইচ্ছা করেছি।