📄 হারুনুর রশিদের কিছু কীর্তি ও বৈশিষ্ট্য
• তিনি ছিলেন নামাজ-অনুরাগী; প্রচুর নফল নামাজ পড়তেন। (৮০)
• খলিফা হারুনুর রশিদ নিজ শাসনামলে মোট নয়বার হজ আদায় করেন। সনগুলো হলো যথাক্রমে: ১৭০, ১৭৩, ১৭৪, ১৭৫, ১৭৭, ১৮০, ১৮১, ১৮৬ ও ১৮৮ হিজরি সন।
• তিনি যে বছর নিজে হজের সফরে যেতেন, আব্বাসি সাম্রাজ্যের ফুকাহায়ে কেরাম ও তাদের সন্তানদের বড় একটি কাফেলাকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন। আর যে বছর হজে যেতেন না, সে বছর তিনশ মানুষকে পূর্ণ খরচ ও উত্তম পরিচ্ছদ দিয়ে তার পক্ষ থেকে হজে পাঠাতেন।
• প্রসিদ্ধ আছে-তিনি এক বছর হজে যেতেন, আরেক বছর বিজয়াভিযানে বের হতেন।
প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইমাম তাবারি রহ. বলেন—তিনি সশরীরে সাতবার বিজয়াভিযানে অংশগ্রহণ করেছেন আর স্থলে ও নৌপথে জিহাদের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেছেন বিশটি বাহিনী।
খলিফা হারুনুর রশিদের কীর্তি ও অবদান এবং মাহাত্ম্য ও গুণ-বৈশিষ্ট্যের বিবরণ সুদীর্ঘ। বিখ্যাত বুজুর্গ ফুজায়ল বিন ইয়াজ রহ. বলতেন, 'অন্য কারও মৃত্যু আমার কাছে হারুনুর রশিদের মৃত্যু অপেক্ষা কঠিন নয়। কেননা, তার অবর্তমানে আমি বহু কঠিন সংকট ও ফিতনার আশঙ্কা করছি। এজন্য আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করি—তিনি যেন আমার আয়ু হ্রাস করে তার আয়ু বৃদ্ধি করে দেন।'
ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, যখন হারুনুর রশিদের মৃত্যু হয় এবং আশঙ্কাকে সত্যে পরিণত করে বাস্তবেই বিভিন্ন সংকট ও ফিতনা, বিরোধ ও বিশৃঙ্খলা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে; এমনকি কুরআন সৃষ্ট (মাখলুক)-মতবাদ প্রকাশ পায়, তখন আমরা ফুজায়ল বিন ইয়াজ রহ.-এর আশঙ্কা ও দুশ্চিন্তার যথার্থতা অনুধাবন করতে সক্ষম হই।
টিকাঃ
৮০. ঐতিহাসিক ইবনে কাছির রহ. উল্লেখ করেছেন, খলিফা হারুনুর রশিদ প্রতিদিন নিজ সম্পদ হতে এক হাজার দিরহাম সদকা করতেন এবং প্রতিদিন একশ রাকাত নফল নামাজ পড়তেন। দ্রষ্টব্য: ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১০/২১৪।
📄 হারুনুর রশিদের শাসনামলে বারমাকি পরিবারের দুর্যোগ
উমাইয়া শাসনামলের শেষদিকে খোরাসানে যখন আব্বাসি আন্দোলনের প্রচারণা শুরু হয়, তখন খালিদ বিন বারমাক ছিলেন খোরাসানে উক্ত আন্দোলনের অন্যতম প্রধান আহ্বায়ক। এ কারণেই প্রথম আব্বাসি খলিফা আবুল আব্বাস আস-সাফফাহ তাকে আপন মন্ত্রিসভায় (উজির পর্ষদে) স্থান দেন। আপন গুণ-চরিত্র ও কর্মদক্ষতার কারণে আমৃত্যু ১৬৩ হিজরি পর্যন্ত তিনি বিভিন্ন আব্বাসি খলিফার শাসনামলে বিভিন্ন পদে অধিষ্ঠিত থেকে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।
খালিদ বিন বারমাকের পুত্র ইয়াহইয়া ছিলেন গুণ ও আভিজাত্য, ব্যক্তিত্ব ও ভাষাপাণ্ডিত্যে উচ্চস্তরের ব্যক্তি। ১৫৮ হিজরি সন হতে তিনিও আব্বাসি খিলাফতের বিভিন্ন পদে অধিষ্ঠিত হতে থাকেন। পিতার ন্যায় তিনিও আব্বাসি শাসকপরিবারের অত্যন্ত প্রিয়ভাজন ছিলেন। হারুনুর রশিদকে তিনি প্রতিপালন করেছিলেন। এ কারণে হারুনুর রশিদ তাকে সবসময় 'বাবা' সম্বোধন করতেন। ইয়াহইয়াই হাদির অনিচ্ছাসত্ত্বেও হারুনুর রশিদকে খিলাফতের দায়িত্বপ্রাপ্তিতে সহায়তা করেছিলেন।
খলিফা হওয়ার পর হারুনুর রশিদ ইয়াহইয়াকে প্রধান উজিরের পদ প্রদান করেন। রাষ্ট্রের যাবতীয় নিয়োগ ও বিয়োগদানের ক্ষমতাও তার হাতে তুলে দেওয়া হয়। হারুনুর রশিদ তাকে বলেন, 'আমি জনগণের দায়িত্ব আপনার কাছে দিয়ে দিলাম। আপনি যা ভালো মনে করবেন, তাই কার্যকর করার নির্দেশ দেবেন; যাকে ভালো মনে করবেন, নিয়োগ দেবেন; যাকে প্রয়োজন মনে করবেন, বরখাস্ত করবেন।'
বারমাকি পরিবার খলিফা হারুনুর রশিদের অত্যন্ত প্রিয়পাত্র ও নিকটভাজন ছিল। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে তারা খলিফাকে সহায়তা করত। এ কারণেই ঐতিহাসিকগণ বারমাকি পরিবারকে 'আব্বাসি সাম্রাজ্যের পুষ্প' নামকরণ করেছিলেন। তারা সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিত, সীমান্তশহরগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করত এবং রাষ্ট্রের যাবতীয় স্বার্থরক্ষায় সচেষ্ট থাকত।
কিন্তু হঠাৎ করেই খliফা হারুনুর রশিদ বারমাকি পরিবারের প্রতি রুষ্ট হয়ে ওঠেন এবং তাদের সঙ্গে কঠোর আচরণ শুরু করেন। কিন্তু এর প্রকৃত কারণ কী ছিল, তা সুনিশ্চিত নয়। ঐতিহাসিকগণও এ বিষয়ে বিভিন্নমুখী মত উল্লেখ করেছেন। সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মত হলো, এই গুণী পরিবারটি নিজেদের যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতার কারণে সম্মান ও মর্যাদার শীর্ষতম চূড়ায় অধিষ্ঠিত হয়েছিল। আর সবসময়ই সমাজে হিংসুক ও বক্র হৃদয়ের এমন কিছু লোক থাকে, যারা জাতিকে ঐক্যবদ্ধ দেখতে চায় না; অন্য কেউ আপন চেষ্টা ও পরিশ্রম, ত্যাগ ও সাধনার মাধ্যমে উচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হবে—এটা তারা কিছুতেই মেনে নিতে পারে না। বিদ্বেষ ও বিরাগের বশবর্তী হয়ে তারা নানারকম কূটকৌশলের আশ্রয় নেয় এবং কানকথা, পরনিন্দা ও কুৎসা রটনার মাধ্যমে যোগ্য ব্যক্তিদেরকে অপদস্থ করার চেষ্টা চালিয়ে যায়। এ জাতীয় কারও কানকথায় প্রভাবিত হয়েই হয়তো খলিফা হারুনুর রশিদ বারমাকিদের প্রতি বিক্ষুব্ধ হয়েছিলেন।
এ বিষয়ে অধিক নির্ভরযোগ্য ও সঠিক বর্ণনা সম্ভবত এই যে, জাফর বিন ইয়াহইয়া বারমাকি হারুনুর রশিদের কারাগার থেকে ইদরিসি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা ইদরিস বিন আবদুল্লাহর সহোদর ইয়াহইয়া বিন আবদুল্লাহ বিন হাসানকে পালাতে সহায়তা করেছিলেন। ইয়াহইয়া নবীবংশের লোক হওয়ায় জাফর তার প্রতি হৃদ্যতা পোষণ করতেন। অধিকন্তু কতক ঐতিহাসিকের মতে বারমাকি পরিবার শিয়াঘেঁষা ছিল। হারুনুর রশিদের আস্থাভাজন উজির ফজল বিন রবি (৮১) পূর্ব থেকেই বারমাকি পরিবারের প্রতি বিক্ষুব্ধ ছিলেন এবং তাদের বিরুদ্ধে খলিফাকে খ্যাপিয়ে তোলার জন্য উপযুক্ত সুযোগের প্রতীক্ষায় ছিলেন। তিনি একজন গুপ্তচরকে জাফর বিন ইয়াহইয়ার পেছনে লাগিয়ে রেখেছিলেন। গুপ্তচর মারফত জাফর কর্তৃক ইয়াহইয়াকে কারাগার থেকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করার সংবাদ পাওয়ার পর ফজল বিন রবি কালবিলম্ব না করে তা খলিফাকে অবহিত করেন। ফজল বিন রবিকে হতাশ করে খলিফা বলেন, 'ধিক তোমাকে! জাফর কী করে-না করে, তাতে তোমার কী? সে তো আমার নির্দেশেও এ কাজ করতে পারে।' হারুনুর রশিদের উত্তর শুনে ফজল বিন রবি বিরসবদনে ফিরে যান। কিছুক্ষণ পর খলিফার বন্ধু জাফর বিন ইয়াহইয়া বারমাকি উপস্থিত হলে খলিফা তাকে দুপুরের খাবারের দাওয়াত করেন। দুপুরে খেতে বসে উভয়ে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলছিলেন। শেষদিকে খলিফা ইয়াহইয়া বিন আবদুল্লাহর প্রসঙ্গ তুলে জিজ্ঞেস করেন— 'ইয়াহইয়া বিন আবদুল্লাহর কী খবর?'
'আমিরুল মুমিনিন, আগের মতোই কারাগারে শৃঙ্খলিত অবস্থায় আছে।' জাফর সংক্ষেপে উত্তর দেন।
'আমার প্রাণের কসম করে এ কথা বলতে পারবে?' খলিফা প্রশ্ন করেন।
খলিফার প্রশ্ন শুনে জাফর থমকে যান এবং বুঝে ফেলেন যে, নিশ্চয়ই খলিফা ইয়াহইয়ার পলায়নের বিষয়টি জেনে ফেলেছেন। তাই তিনি লুকোছাপা না করে উত্তর দেন, 'না, আমার মালিক! আপনার প্রাণের কসম করে বলতে পারব না। আসলে আমি তাকে ছেড়ে দিয়েছি। আমার বিশ্বাস—তার প্রাণ ও প্রাণশক্তির কিছুই অবশিষ্ট নেই এবং অশুভ কিছু করার ক্ষমতাও তার নেই।'
জাফরের স্বীকারোক্তি শুনে হারুনুর রশিদ মন্তব্য করেন, 'তুমি ভালোই করেছ। আমি তার বিষয়ে যা ভাবছিলাম, তুমি তার বিপরীত কিছু করোনি।'
জাফর বিন ইয়াহইয়া বারমাকি যখন মজলিস ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, খলিফা তার দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থেকে আনমনে বলে ওঠেন— 'তোমাকে যদি হত্যা না করি, আল্লাহ যেন আমাকে আমার নির্বুদ্ধিতা ও বিভ্রান্তির কারণে হিদায়াতের তরবারি দিয়ে হত্যা করেন।'
এরপর জাফরের পরিণতি যা হওয়ার, তা-ই হয়েছিল।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করেই বারমাকি পরিবারের প্রতি এই অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হয় যে, তারা আব্বাসি খিলাফতের মন্ত্রিপরিষদের বিশেষ অবস্থানে অধিষ্ঠিত থেকে সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে কাজ করছে। নিঃসন্দেহে এটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি অভিযোগ। হারুনুর রশিদের মনে এ বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়ে যায় যে, বারমাকিরা খলিফার স্বার্থের ওপর আলাবিদের স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়। খলিফা হারুনুর রশিদের কাছে এ অপরাধ ধর্মত্যাগের অপরাধের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না। এ ঘটনার ফলে খলিফা হারুনুর রশিদ ও বারমাকি পরিবারের মাঝের আস্থার সম্পর্কটি ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর থেকে খলিফা তাদের যেকোনো ত্রুটি জানতে পারলেই উত্তেজিত হয়ে যেতেন এবং সামান্য কারণেও তাদেরকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখতেন। পরিস্থিতি এভাবেই চলছিল।
১৮৭ হিজরি সনে হারুনুর রশিদের হাতে বারমাকিদের চূড়ান্ত পতন ঘটে। জাফর বিন ইয়াহইয়া বিন খালিদ বারমাকি নির্মমভাবে নিহত হন। তার বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় এবং বারমাকি পরিবারের ছোট-বড় সকলে দুর্দশার শিকার হয়। (৮২)
অবশ্য বারমাকি পরিবারের প্রতি কঠোর আচরণের কারণে খলিফা হারুনুর রশিদ পরবর্তীকালে অনুতপ্ত হয়েছিলেন। তিনি বলতেন, 'যারা আমাকে বারমাকিদের বিরুদ্ধে প্ররোচিত করেছে, আল্লাহ তাদের অভিসম্পাত করুন। তাদের অবর্তমানে আমি কোনো স্বাদ-শান্তি খুঁজে পাচ্ছি না। আল্লাহর শপথ! আমার অর্ধেক জীবন ও অর্ধেক রাজত্বের বিনিময়েও যদি তাদেরকে পূর্বাবস্থায় ফিরে পেতাম, তবে তাই করতাম।'
টিকাঃ
৮১. খলিফা হারুনুর রশিদ ফজল বিন রবির যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতায় অত্যন্ত মুগ্ধ ছিলেন। কিন্তু খলিফা-মাতা খাইজুরান তাকে কোনো পদ প্রদান করতে খলিফাকে নিষেধ করেন। ১৭৩ হিজরি সনে খলিফা-মাতার ইন্তেকাল হলে খliফা তাকে উজির পদে নিয়োগ দান করেন। ফজল বিন রবি ইয়াহইয়া বিন আবদুল্লাহ বিন হাসানকে অপছন্দ করতেন এবং সর্বদা খলিফাকে সতর্ক করতেন যে, ইয়াহইয়া সুযোগ পেলেই নিজেকে খলিফা দাবি করবেন। উল্লেখ্য, ফজল বিন রবির পিতা রবি বিন ইউনুস ছিলেন পূর্বতন খলিফা আল-মানসুরের হাজিব।
৮২. খলিফা এ সময় ইয়াহইয়া বিন খালিদ ও তার জীবিত তিন পুত্র ফজল, মুসা ও মুহাম্মাদকে বন্দি করে রাক্কার কারাগারে প্রেরণ করেন। ইয়াহইয়া বিন খালিদ ১৯০ হিজরি সনের মুহাররম মাসে সত্তর বছর বয়সে কারাগারে ইন্তেকাল করেন। খলিফা হারুনুর রশিদের ইন্তেকালের পাঁচ মাস পূর্বে ১৯৩ হিজরি সনের মুহাররম মাসে ফজলও বন্দি অবস্থায় রাক্কার কারাগারে পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। হারুনুর রশিদের মৃত্যুর পর তার পুত্র আমিন খলিফা হলে তিনি মুসা ও মুহাম্মাদকে মুক্তিদান করেন।
📄 বারমাকি পরিবারের বংশলতিকা
খালিদ বিন বারমাক (মৃত্যু: ১৬৩ হি.)
ইয়াহইয়া বিন খালিদ (মৃত্যু: ১৯০ হি.)
ফজল (মৃত্যু: ১৯৩ হি.) (উদ্ধত ও রূঢ় স্বভাববিশিষ্ট ছিলেন)।
জাফর (মৃত্যু: ১৮৭ হি.) (খলিফা হারুনুর রশিদ তাকে অত্যন্ত ভালো জানতেন। কোমল স্বভাবের জাফরকে খলিফা ১৭৬ হি. সনে মিশরের গভর্নর নিযুক্ত করেন)।
মুসা (দুঃসাহসী যোদ্ধাপুরুষ ছিলেন; তবে প্রসিদ্ধি কম ছিল)।
মুহাম্মদ (উচ্চাভিলাষী ছিলেন; তারও তেমন প্রসিদ্ধি ছিল না)।
১৮-৪ হিজরি সনে হারুনুর রশিদ তার পুত্র ও ভাবী খলিফা মুহাম্মাদ আল-আমিনের পর পরবর্তী দ্বিতীয় খলিফা হিসেবে আবদুল্লাহ আল-মামুনের নামে জনগণের বায়আত গ্রহণ করেন এবং আল-মামুনের তত্ত্বাবধানের ভার ইয়াহইয়ার পুত্র জাফরের হাতে সোপর্দ করেন।
📄 হারুনুর রশিদের শাসনামলে বিজয়াভিযান
খলিফা হারুনুর রশিদের আমলেই প্রথম নিকফোরাস (Nikephoros I) বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের সম্রাট নির্বাচিত হন। সাম্রাজ্যের অধিপতি হওয়ার পর ১৯০ হিজরি সনে (৮০৬ খ্রিষ্টাব্দে) তিনি হারুনুর রশিদের কাছে নিম্নোক্ত পত্র প্রেরণ করেন।
রোম সম্রাট নিকফোরাসের পক্ষ থেকে আরব-অধিপতি হারুনের প্রতি।
পরকথা, আমার পূর্বে যিনি রোমান সাম্রাজ্যের অধিপতি (৮৩) ছিলেন, তিনি তোমাকে দাবার মন্ত্রী-ঘুঁটির ন্যায় মহান ও শক্তিশালী ভেবেছিলেন আর নিজেকে ভেবেছিলেন সৈন্য-ঘুঁটির ন্যায় অসহায় ও দুর্বল। তাই তিনি তোমার কাছে প্রচুর পরিমাণ অর্থসম্পদ প্রেরণ করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে তো উল্টো তোমারই কর্তব্য ছিল তার কাছে এরূপ অধিক পরিমাণ সম্পদ পাঠানো। আসলে এটি ছিল নারীসুলভ দুর্বলতা ও নির্বুদ্ধিতার ফসল। আমার প্রেরিত এ পত্র পাঠ করামাত্র তুমি তার প্রেরিত সব অর্থসম্পদ ফেরত পাঠাবে এবং আগামীর জন্য নিজের নিরাপত্তা- জামানত হিসেবে আরও সম্পদ পাঠাবে। যদি এর ব্যতিক্রম হয়, তাহলে তরবারিই তোমার ও আমাদের মাঝে ফয়সালা করবে।
পত্র পাঠ করার পর খলিফা হারুনুর রশিদ ক্রোধে অধীর হয়ে যান। কিছুক্ষণ পর তিনি পত্রের উল্টো পিঠে জবাবে লেখেন- বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
আমিরুল মুমিনিন হারুনের পক্ষ থেকে রোমের কুকুর নিকেফোরাসের প্রতি।
কাফিরজাদা, আমি তোমার পত্র পাঠ করেছি। উত্তর স্বচক্ষেই দর্শন করবে; শ্রবণ করার মতো অবকাশ লাভের সুযোগ তোমার হবে না।
এরপর মুসলিম বাহিনী বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যে অভিযান চালিয়ে হিরাক্লিয়া (Heraclea Cybistra) নগরী জয় করে। মুসলিম বাহিনীর আক্রমণে দিশেহারা হয়ে বাইজান্টাইন সম্রাট নিকফোরাস নিয়মিত বার্ষিক জিজিয়া প্রদানের অঙ্গীকার করে সন্ধিচুক্তির প্রস্তাব দেন। এরপর থেকে নিকফোরাস প্রতি বছর তিন লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা জিজিয়া হিসেবে আব্বাসি রাষ্ট্রের কোষাগারে জমা করতেন।
মোটকথা, খলিফা হারুনুর রশিদের শাসনামলে বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে মুসলমানদের শ্রেষ্ঠত্বের বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত ছিল। স্বয়ং খলিফা রাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠ সেনাপতিদের নিয়ে রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযানে বের হতেন।
খলিফা হারুনুর রশিদের শাসনামলে ১৭২ হিজরি সনে (৭৮৮ খ্রিষ্টাব্দে) মাগরিবে ইদরিসিয়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। ইদরিসিয়া রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা হলেন ইদরিস বিন আবদুল্লাহ বিন হাসান। তিনি আল-হাদির আমলে ফাখখের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যান এবং মাগরিবে আপন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। ইদরিসিয়া রাষ্ট্রই ছিল আলাবিদের প্রতিষ্ঠিত প্রথম রাষ্ট্র। হারুনুর রশিদ তার খিলাফতকালের শুরুর দিকে আলাবিদের সঙ্গে সদাচরণ করতেন; কিন্তু ইদরিসিয়া রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠা তাকে শঙ্কিত করে তোলে। এরপর থেকে তিনি কাউকে আলাবিদের প্রতি আন্তরিক দেখলে তাকে কঠিন শাস্তি দিতেন।
হারুনুর রশিদের শাসনামলেই ১৮৪ হিজরি সনে (৮০০ খ্রিষ্টাব্দে) আফ্রিকায় আগলাবিয়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। আগলাবিয়া রাষ্ট্র সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা সামনে আসবে।
টিকাঃ
৮৩. নিকফোরাসের পূর্বে রোমান সাম্রাজ্যের অধিপতি ছিলেন সম্রাজ্ঞী ইরিন (Irene of Athens)। রোমান নেতৃবৃন্দ তাকে অপসারণ করে নিকফোরাসকে তার স্থলাভিষিক্ত করেছিল।