📄 আল-মাহদি আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ
তৃতীয় আব্বাসি খলিফা মাহদির জন্ম ১২৭ হিজরি সনে। খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণকালে তার বয়স ছিল একত্রিশ বছর।
মাহদির খিলাফত আমল ছিল জনগণবান্ধব। মানসুরের আমলে যারা তার বিরোধী পরিচয়ে কারাগারে বন্দি ছিল, মাহদি তাদেরকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। জুলুম-অত্যাচারের বিচারের জন্য তিনি নিজেই বসতেন। ফলে তার আমলে সভ্যতা ও বসতির বিস্তৃতির পাশাপাশি রাষ্ট্রের জীবনযাত্রা ও জনজীবনও শৃঙ্খলাপূর্ণ ছিল। তার অন্যতম উল্লেখযোগ্য কীর্তি হলো মসজিদে হারামের পরিসর বৃদ্ধি। তিনি মসজিদে হারামকে বেষ্টন করে রাখা অনেকগুলো বাড়ি মসজিদের অন্তর্ভুক্ত করেন এবং মসজিদে নববির দেয়াল থেকে উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিকের নাম মুছে নিজের নাম উৎকীর্ণ করার নির্দেশ দেন।
প্রকৃতপক্ষে পূর্বতন খলিফা মানসুরই পুত্র মাহদির জন্য পরিস্থিতি মজবুত করে দিয়ে গিয়েছিলেন। তিনিই সকলকে তার বশীভূত করে যান এবং পরবর্তীদের জন্য শৃঙ্খলাপূর্ণ সাম্রাজ্যের ব্যবস্থা করে যান।
খলিফা মাহদি তার পুত্রদেরকে নিয়মিত যুদ্ধাভিযানে প্রেরণ করতেন। ১৬৩ হিজরি সনে তিনি পুত্র হারুনুর রশিদকে খোরাসানের এক বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে যুদ্ধাভিযানে প্রেরণ করেন। সঙ্গে পাঠান খালিদ বিন বারমাককে। অভিযানে হারুনুর রশিদ শত্রুপক্ষকে পর্যুদস্ত করে প্রচুর যুদ্ধলব্ধ সম্পদ অর্জন করেন। অভিযান থেকে প্রত্যাবর্তনের পর মাহদি হারুনুর রশিদকে আব্বাসি সাম্রাজ্যের পশ্চিম অংশের গভর্নরপদ প্রদান করেন।
মাহদির খিলাফত আমলে সম্প্রসারণমূলক উল্লেখযোগ্য কোনো অভিযান সংঘটিত হয়নি এবং বড় কোনো নগরী নতুন করে ইসলামি সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়নি। তবে ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযান পরিচালিত হয়েছে, সেগুলোতে নিরঙ্কুশ বিজয় ও প্রচুর যুদ্ধলব্ধ সম্পদ অর্জিত হয়েছে।
১৬৫ হিজরি সনে মাহদি তার পুত্র হারুনুর রশিদকে রোমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য প্রস্তুত করেন এবং তার সঙ্গে আব্বাসি সেনাবাহিনীর বড় একটি অংশকে প্রেরণ করেন। ১৬৬ হিজরি সনে হারুনুর রশিদ রোমান ভূমি থেকে প্রত্যাবর্তন করেন এবং যথেষ্ট জাঁকজমক ও আড়ম্বরের সঙ্গে বাগদাদে প্রবেশ করেন। এ সময় পরাজিত রোমানরা স্বর্ণ ও অন্যান্য জিজিয়া বহন করে বাগদাদে নিয়ে আসে।
১৬৭ হিজরি সনে মাহদি তার আরেক পুত্র মুসা আল-হাদিকে আরেকটি বড় বাহিনীসহ জুরজান অভিমুখে প্রেরণ করেন। ঐতিহাসিকগণ মন্তব্য করেছেন, এত বড় বাহিনী ইতিপূর্বে দেখা যায়নি।
ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, এই বাহিনীকে প্রেরণ করার সময় প্রচণ্ড ঝঞ্ঝাবায়ু প্রবাহিত হতে শুরু করে। তখন মাহদি একটি ঘরে প্রবেশ করে মাটির সঙ্গে নিজের গণ্ডদেশ মিশিয়ে দোয়া করতে থাকেন—হে আল্লাহ, এই শাস্তির লক্ষ্য যদি অন্যান্য মানুষ না হয়ে আমিই হয়ে থাকি, তাহলে এই যে আমি আপনার সামনে দণ্ডায়মান! হে আল্লাহ, আমার বিরুদ্ধে বিধর্মী দুশমনদের আনন্দিত করবেন না।
তিনি এভাবে দোয়া করছিলেন; এরই মধ্যে আবহাওয়া শান্ত হয়ে যায়।
📄 খলিফা আল-মাহদির সুপ্রশাসননীতি
একদিন জনৈক ব্যক্তি একজোড়া পাদুকা নিয়ে মাহদির দরবারে উপস্থিত হয়ে বলল, 'এগুলো নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাদুকা; আপনার জন্য হাদিয়া নিয়ে এসেছি।' মাহদি পাদুকাজোড়া হাতে নিয়ে তাতে চুমু খেলেন, চোখে-মুখে ভক্তিভরে স্পর্শ করলেন এবং লোকটিকে দশ হাজার দিরহাম প্রদান করার নির্দেশ দিলেন। লোকটি চলে গেলে মাহদি বললেন, 'আল্লাহর শপথ! আমি নিশ্চিতভাবেই জানি যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ পাদুকাজোড়া পরিধান করা দূরে থাক, দেখেনওনি। কিন্তু আমি যদি তাকে ফিরিয়ে দিতাম, সে মানুষের কাছে গিয়ে বলত, আমি তাকে নবীজির পাদুকাজোড়া হাদিয়া দিয়েছিলাম; কিন্তু তিনি তা ফিরিয়ে দিয়েছেন। মানুষ তার কথা বিশ্বাসও করত। কারণ, সাধারণ জনগণ এদের প্রতি দুর্বল থাকে। জনসাধারণের ধর্ম হলো শক্তিশালীর বিরুদ্ধে দুর্বলকে সমর্থন করা; এমনকি দুর্বল অত্যাচারী ও অন্যায়কারী হলেও। তাই আমি দশ হাজার দিরহামের বিনিময়ে তার মুখ কিনে নিলাম। আমার কাছে এটিই শ্রেয়তর ও সঠিকতর মনে হয়েছে।'
খলিফা মাহদি ধর্মত্যাগী মুরতাদদের অনুসন্ধান করতেন এবং তাদেরকে হত্যাশাস্তি প্রদান করতেন।
সারকথা, খলিফা মুহাম্মাদ আল-মাহদির কৃতিত্ব ও সৎকর্মের ফিরিস্তি অনেক দীর্ঘ, আলোচ্য গ্রন্থ যা বিস্তারিত আলোচনার ক্ষেত্র নয়। এই মহান খলিফা ১৬৯ হিজরি সনে ইন্তেকাল করেন। ইন্তেকালের পূর্বেই তিনি পুত্র মুসা আল-হাদিকে পরবর্তী খলিফা হিসেবে মনোনীত করে যান।