📄 দ্বিতীয় হুমকি সেনাপতি আবু মুসলিম খোরাসানি
আবদুল্লাহ বিন আলির বিরুদ্ধে যুদ্ধ শেষে আবু মুসলিম খোরাসানে ফিরে আসার পূর্বেই খলিফা মানসুর তার একটা বিহিত করার মনস্থ করেন। খলিফা এ-ও চাচ্ছিলেন যে, আবু মুসলিম যেন তার মনোবাঞ্ছা বুঝতে না পারেন।
তিনি আবু মুসলিমের কাছে বার্তা পাঠান, আমি তোমাকে মিশর ও শামের গভর্নর নির্বাচিত করেছি। তোমার জন্য খোরাসানের চেয়ে মিশর ও শামই ভালো হবে। এর ফলে তুমি আমিরুল মুমিনিনের কাছে থাকার সুযোগ পাবে এবং তিনি তোমার সাক্ষাতের আগ্রহ করলে তুমি কাছে থেকে দ্রুত তার দরবারে উপস্থিত হতে পারবে।
মানসুরের বার্তা পেয়ে আবু মুসলিম ক্রুদ্ধ হয়ে মন্তব্য করেন—খোরাসান আমার এলাকা, আর তিনি আমাকে খোরাসান বাদ দিয়ে মিশর ও শামের দায়িত্ব দিতে চাচ্ছেন! এরপর তিনি খলিফার নির্দেশ অমান্য করে খোরাসানেই ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন।
খলিফা মানসুর আবু মুসলিমের সঙ্গে চতুরতা ও কৌশলে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। শুরু হয় উভয়ের মধ্যে পত্রযুদ্ধ! একে অপরের উদ্দেশে একের পর এক কয়েকটি পত্র প্রেরণ করেন। একপর্যায়ে মানসুর জারির বিন ইয়াযিদ বিন জারির বিন আবদুল্লাহ বাজালিকে একদল আমিরসহ আবু মুসলিমের কাছে প্রেরণ করেন। তিনি জারিরকে বলেন, আবু মুসলিমের সঙ্গে যথাসম্ভব কোমল ভাষায় কথা বলবে এবং তাকে এ কথা বোঝাবে যে, খলিফা আপনাকে অত্যধিক মর্যাদা ও অবাধ কর্তৃত্ব প্রদানে আগ্রহী। যদি সে এ কথা মেনে নেয়, তাহলে তো ভালো। অন্যথায় তাকে বলবে, আপনি যদি মুসলমানদের ঐক্য বিনষ্ট করে যথেচ্ছ চলতে থাকেন, তাহলে আপনার বিষয়ে আব্বাসি রাজপরিবারের কোনো দায় থাকবে না আর খলিফা নিজে আপনাকে পাকড়াও করতে অগ্রসর হবেন এবং আপনার বিরুদ্ধে লড়াই করবেন। আপনি যদি অথই সমুদ্রে নেমে পড়েন, খলিফা সেখানেও আপনার পশ্চাদ্ধাবন করে আপনাকে পাকড়াও করে হত্যা করবেন; যদি না এর পূর্বেই তার মৃত্যু এসে যায়।
নির্দেশনা মোতাবেক প্রতিনিধিদল আবু মুসলিম খোরাসানির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। তিনি খলিফার আনুগত্য মেনে নিতে বা খলিফার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে অস্বীকৃতি জানান। তখন প্রতিনিধিদল তাকে খলিফার বার্তার শেষ অংশটি জানিয়ে দেয়। আল্লাহর কী কুদরত! খলিফার এবারের হুমকিমূলক এই বার্তা শুনে প্রতাপশালী ও শক্তিধর আব্বাসি সেনাপতি আবু মুসলিম ভীত-প্রকম্পিত হয়ে পড়েন এবং করণীয় নির্ধারণে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েন।
এদিকে খলিফা বার্তাবাহক পাঠিয়ে আবু দাউদ ইবরাহিম বিন খালিদকে খোরাসানের সেনাবাহিনীর দায়িত্ব প্রদান করেন এবং তাকে জানিয়ে দেন যে, আমি যতদিন বেঁচে আছি, ততদিন তুমিই খোরাসানের গভর্নর থাকবে। সবদিকের চাপে নতি স্বীকার করে আবু মুসলিম এবার খলিফা মানসুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সিদ্ধান্ত নেন। মানসুর তার চাতুর্য বজায় রেখে আবু মুসলিমের জন্য নিরাপত্তা ঘোষণা করেন এবং আবু মুসলিম মাদায়েনে প্রবেশ করার সময় আমির-উমারাদের সঙ্গে নিয়ে তাকে উষ্ণ সংবর্ধনা প্রদান করেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি প্রতারণা করে আবু মুসলিমকে হত্যা করার বিষয়ে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ ছিলেন। আবু মুসলিম যখন খলিফার প্রহরীদের প্রহরায় খলিফার সঙ্গে নিশ্চিত মনে কথা বলছিলেন, তখন খলিফার নির্দেশে তাকে হত্যা করা হয়।
ইমাম বায়হাকি রহ. হাকিম রহ. হতে আপন সনদে বর্ণনা করেন যে, হজরত আবদুল্লাহ বিন মুবারক রহ.-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল—আবু মুসলিম ও হাজ্জাজের মধ্যে কে উত্তম? তখন তিনি উত্তর দেন—'আমি বলব না যে, আবু মুসলিম কারও চেয়ে উত্তম ছিলেন। তবে হাজ্জাজ তার চেয়েও নিকৃষ্ট ছিলেন। (আলিমদের) কেউ কেউ তো হাজ্জাজের ঈমান নিয়েই আপত্তি করেছেন এবং তাকে নাস্তিক গণ্য করেছেন। কিন্তু আবু মুসলিম সম্বন্ধে কেউ এ জাতীয় কোনো মন্তব্য করেছেন বলে আমার জানা নেই। বরং এরূপ বর্ণিত আছে যে, আবু মুসলিম আপন কৃতকর্মের কারণে আল্লাহকে ভয় করতেন। আব্বাসি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে তিনি যে রক্তপাত ঘটিয়েছেন, তার জন্য তিনি তাওবা করেছেন বলেও দাবি করতেন। আল্লাহই তার পরিণতি সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো জানেন।
📄 তৃতীয় হুমকি মুহাম্মাদ বিন আবদুল্লাহ বিন হাসান বিন যায়দ
আব্বাসি শাসকপরিবার মনে করত, বনু হাশিম হয়তো সঙ্গোপনে মুহাম্মাদ বিন আবদুল্লাহ বিন হাসান বিন যায়দকে খিলাফতের জন্য নির্বাচিত করেছে। তাদের এই ধারণার উৎস এই ছিল যে, ইতিপূর্বে বনু উমাইয়ার শাসনামলের শেষদিকে অনেকেই উমাইয়া খলিফা মারওয়ানের বায়আত প্রত্যাহার করে মুহাম্মাদ বিন আবদুল্লাহ বিন হাসানের হাতে খিলাফতের বায়আত গ্রহণ করেছিল। স্বয়ং আব্বাসি খলিফা মানসুরও তখন তার হাতে বায়আত গ্রহণ করেছিলেন। উমাইয়াদের পতনের পর আব্বাসি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হলে মানসুর তার পূর্বের বায়আত রক্ষা করেননি। একই কারণে মুহাম্মাদ বিন আবদুল্লাহ বিন হাসান বিন যায়দও প্রথমে সাফফাহ ও পরে মানসুরের নামে বায়আত গ্রহণ করেননি। তিনি মানসুরের আমলে আত্মগোপন করেন আর মানসুর তার সন্ধান অব্যাহত রাখেন। দীর্ঘ প্রচেষ্টার পরও মুহাম্মাদ বিন আবদুল্লাহ বিন হাসান বিন যায়দের সন্ধান না পাওয়ায় মানসুর মুহাম্মাদের পিতা আবদুল্লাহ বিন হাসান বিন যায়দকে গ্রেফতার করেন এবং তার সকল সম্পদ বাজেয়াপ্ত করেন।
মানসুর মুহাম্মাদের সন্ধান অব্যাহত রাখেন এবং এজন্য প্রচুর অর্থ ব্যয় করেন। কিন্তু তার সকল প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়। এরপর তিনি হাসানবংশের সকলকে বন্দি করেন। এ সংবাদ জানতে পেরে মুহাম্মাদ তার মা হিন্দকে বলেন, 'মা! আমি তো আমার কারণে আমার বাপ-চাচাদের জীবন এমন শঙ্কার মুখে ফেলে দিয়েছি, যা থেকে নিষ্কৃতির শক্তি তাদের নেই। তাই আমি তাদের হাতে হাত রাখার (আব্বাসি খলিফার নামে বায়আত গ্রহণ করার) ইচ্ছা করেছি। এর ফলে শীঘ্রই হয়তো তারা মুক্তি পেয়ে যাবেন।' তার মা এ প্রস্তাবে সরাসরি অসম্মতি জানান। এরপর তিনি কারাগারে গিয়ে মুহাম্মাদের পিতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাকে সন্তানের ইচ্ছার বিষয়ে অবহিত করেন। পিতা আবদুল্লাহ বলেন, 'কক্ষনো না; বরং আমরা ধৈর্যধারণ করব। আল্লাহর শপথ! আমি আশা করি যে, আল্লাহ তার হাতে আমাদের জন্য কোনো কল্যাণ বয়ে আনবেন। তাকে বলো, সে যেন তার খিলাফতের প্রচারণা চালিয়ে যায় এবং নবোদ্যমে নতুন করে সবকিছু শুরু করে। আমাদের নিষ্কৃতি তো আল্লাহর হাতে।' উম্মে মুহাম্মাদ ফিরে আসেন এবং মুহাম্মাদ আত্মগোপনে থেকেই তার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন।
এরপর খলিফা মানসুর বন্দিদের সঙ্গে কঠোর ও নির্মম আচরণ শুরু করেন এবং তাদেরকে (মদিনার কারাগার) থেকে ইরাকের কারাগারে স্থানান্তরিত করে কঠিন নির্যাতন করেন। বন্দিদের অধিকাংশ কারাগারেই মৃত্যুবরণ করে।
এই বেদনাদায়ক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মুহাম্মাদ বিন আবদুল্লাহ বিন হাসান মদিনায় আত্মপ্রকাশের সিদ্ধান্ত নেন। ১৪৫ হিজরি সনের ১ রজব (৭৬২ খ্রিষ্টাব্দের ২৫ সেপ্টেম্বর) তিনি মদিনায় আত্মপ্রকাশ করলে মদিনাবাসী তার পক্ষে নিজেদের সমর্থন ঘোষণা করে। তিনি হারামের মিম্বরে আরোহণ করে মদিনাবাসীর উদ্দেশে খুতবা প্রদান করেন।
প্রকৃতপক্ষে খলিফা মানসুরের কূটকৌশলের শিকার হয়েই মুহাম্মাদ আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। খলিফার গোপন নির্দেশে বিভিন্ন অঞ্চলের গভর্নর ও সেনাপতিগণ মুহাম্মাদকে বার্তা পাঠিয়েছিল যে, আমরা আপনার পক্ষে আছি; আপনি আত্মপ্রকাশ করুন। এসব বার্তা পেয়ে মুহাম্মাদ মনে করেছিলেন—ইসলামি বিশ্বের অধিকাংশ নগরী তার পক্ষে আছে। এ কারণেই তিনি তার সহোদর ইবরাহিম বিন আবদুল্লাহ (তারা উভয়ে আত্মগোপন করে ছিলেন আর খলিফা উভয়কেই খুঁজছিলেন)-এর সঙ্গে একমত হন যে, একই দিনে তিনি মদিনায় এবং ইবরাহিম বসরায় আত্মপ্রকাশ করবেন, যেন এর মাধ্যমে খলিফার ওপর অধিক চাপ সৃষ্টি করা যায়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে অসুস্থ হয়ে পড়ায় ইবরাহিম আর আত্মপ্রকাশ করেননি।
মুহাম্মাদ নিজেকে মদিনাতেই আবদ্ধ রাখেন। অথচ মদিনা এমন কোনো সামরিক কেন্দ্র ছিল না, যেখানে কোনো নেতার পক্ষে দীর্ঘদিন নিরাপদে অবস্থান করা সম্ভব। কারণ, মদিনার জীবন ও জীবিকাব্যবস্থা ছিল সম্পূর্ণই বাইরের ওপর নির্ভরশীল। তাই অল্প কয়েক দিনের অবরোধেই মদিনাবাসীর দৃঢ়তা ও অবিচলতা ভেঙে পড়া অনিবার্য ছিল।
📄 বাগদাদ নগরী নির্মাণ
খলিফা মানসুর আব্বাসি খিলাফতের মূলকেন্দ্র হিসেবে বাগদাদ নগরীর নির্মাণ শুরু করেন এবং ১৪৬ হিজরি সনে এর নির্মাণকাজ সমাপ্ত করেন। কথিত আছে, মানসুর বাগদাদ নির্মাণে আঠারো লক্ষ দিনার ব্যয় করেছিলেন। (৭৬)
খতিব বাগদাদি রহ. লিখেছেন, মর্যাদা ও আভিজাত্যে, বিশালতা ও জৌলুসে, জ্ঞানী-গুণী ও বোদ্ধামহলের আধিক্যে পৃথিবীতে বাগদাদের সমকক্ষ দ্বিতীয় কোনো নগরী ছিল না। (৭৭)
মানসুর ইসলামি বিশ্বের প্রত্যেক অঞ্চল ও নগরী হতে আলিমদেরকে এনে বাগদাদে সমবেত করেন। আব্বাসি শাসনামলে বাগদাদ পৃথিবীর প্রাণকেন্দ্র, সর্বশ্রেষ্ঠ নগরী এবং ইসলামি সভ্যতা ও সংস্কৃতির সূতিকাগারে পরিণত হয়। একসময় বাগদাদের জনসংখ্যা বিশ লক্ষ ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
টিকাঃ
৭৬. বাগদাদ : ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর রাযি.-এর খিলাফতকালে মুসলিম বাহিনী যখন ইরাক জয় করে, তখন বাগদাদ ছিল ক্ষুদ্র ও অখ্যাত একটি বসতি। উমর রাযি.-এর খিলাফতকালে ইরাকে কুফা ও বসরার মতো গুরুত্বপূর্ণ দুই নগরীর পত্তন হলেও বাগদাদ পূর্বের ন্যায় ছোট ও সাধারণ বসতিই রয়ে যায়। আল-মানসুর খলিফা হওয়ার পর অনিবার্য বিভিন্ন কারণে নতুন দারুল খিলাফাহ ও রাজধানী প্রতিষ্ঠার মনস্থ করেন। তিনি নতুন রাজধানীর স্থান নির্বাচনের জন্য কুফা হতে মসুল পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকা ভ্রমণ করে অবশেষে বাগদাদ এলাকাকে পছন্দ করেন। বাগদাদকে পছন্দ করার কারণ ছিল—এর এক দিকে ছিল দজলা নদী আর অপর দিকে ফুরাত নদী। দজলা নদীর মাধ্যমে চীনের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন সহজ ছিল আর ফুরাত নদীর কারণে শাম অঞ্চলের সঙ্গেও যোগাযোগ রক্ষা সম্ভব ছিল। খলিফা মানসুরের নির্দেশে দজলা নদীর পূর্ব তীরে নির্মিত হয় বাগদাদ নগরী। পরবর্তী সময়ে মানসুর-পুত্র মাহদি নদীর পশ্চিম তীরে সেনাছাউনি স্থাপন করেন এবং ধীরে ধীরে নদীর পশ্চিম তীরও বাগদাদ নগরীর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত অংশের নামকরণ করা হয় 'কারখ' (Karkh) আর পূর্ব তীরে অবস্থিত অংশের নামকরণ করা হয় 'রুসাফা' (Al-Rusafa)। বর্তমানেও এলাকা-দুটির এই নামই প্রচলিত আছে। ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, জনৈক পারস্য সম্রাট তার আস্থাভাজন এক ক্রীতদাসকে উক্ত এলাকা জায়গির হিসেবে দান করেছিলেন। উক্ত ক্রীতদাস 'বাগ' নামক একটি মূর্তির পূজা করত। জায়গির প্রাপ্ত হওয়ার পর সে বলে ওঠে, 'বাগদাদ।' (বাগপ্রদত্ত); অর্থাৎ আমার মূর্তি বাগ আমাকে এ এলাকাটি দান করেছে। এভাবেই এলাকাটির নাম হয়ে যায় বাগদাদ। খলিফা মানসুর প্রাচীন সেই ছোট্ট বসতির স্থানে রাজধানী নগরী নির্মাণ করার পর এর নাম পরিবর্তন করে নতুন নাম রাখেন 'মদিনাতুস সালাম' বা শান্তির নগরী।
৭৭. আবু বকর খতিব বাগদাদি, তারিখু বাগদাদ, ১/৪৪০।
📄 খলিফা মানসুরের গুণ-বৈশিষ্ট্য, চরিত্র ও অন্যান্য বিবরণ
খলিফা মানসুর ছিলেন শক্তিপ্রয়োগ ও কঠোরতা, দৃঢ়তা ও অটলতা এবং সতর্কতা ও চাতুর্যে বনু আব্বাসের শীর্ষতম শাসক। তিনি দিনের শুরুতে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বিষয়ে নির্দেশনা প্রদান, গভর্নরদের কর্মকাণ্ডের খোঁজখবর, গভর্নর ও কর্মকর্তা নিয়োগ-বিয়োগ, সীমান্ত নগরীগুলোর প্রয়োজনীয় রসদ ও নিরাপত্তারক্ষী প্রেরণ, পথঘাটের নিরাপত্তাবিধান, খারাজ ও দরিদ্রদের তত্ত্বাবধান এবং জনকল্যাণমূলক অন্যান্য কাজকর্ম সম্বন্ধে খোঁজখবর নিতেন। জোহর নামাজ আদায় করে বাড়িতে গিয়ে আছর পর্যন্ত বিশ্রাম করতেন। আছর নামাজ আদায় করে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বসতেন এবং তাদের ব্যক্তিগত বিভিন্ন প্রয়োজনের কথা শুনতেন। এশার নামাজ আদায় করার পর বিভিন্ন অঞ্চল ও সীমান্তনগরী থেকে আগত চিঠিপত্র পাঠ করতেন এবং তার সঙ্গে অবস্থানরত উপদেষ্টাগণের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি নিয়ে পরামর্শ করতেন। রাতের এক-তৃতীয়াংশ অতিবাহিত হলে উপদেষ্টারা চলে যেত, তিনি শয্যাগ্রহণ করতেন। রাতের দুই-তৃতীয়াংশ শেষ হলে তিনি শয্যাত্যাগ করে অজু করতেন এবং সুবহে সাদিক পর্যন্ত নামাজে নিমগ্ন থাকতেন। সুবহে সাদিকের পর বের হয়ে মসজিদে যেতেন এবং ফজর নামাজ পড়াতেন। এরপর ফিরে এসে প্রাসাদে বসতেন।
খলিফা মানসুর যৌবনে ইলমের বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে ইলম অর্জন করেন এবং হাদিস ও ফিকহশাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। ঐতিহাসিকগণ মানসুরের জীবনী আলোচনা করতে গিয়ে নিচের চমকপ্রদ ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন, যা দ্বারা ইলমের প্রতি তার প্রবল অনুরাগের বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়।
একদিন তাকে প্রশ্ন করা হলো, 'আমিরুল মুমিনিন! এমন কোনো দুর্লভ বস্তু কি আছে, যার স্বাদ আপনি আজও উপভোগ করতে পারেননি?'
খলিফা উত্তর দিলেন, 'হ্যাঁ, একটি জিনিস আছে।'
সভাসদগণ বিস্ময়ভরা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, 'কী সেই বস্তু?!'
'হাদিসের তালিবে ইলম যখন তার শায়খকে প্রশ্ন করে, "মুহতারাম, আল্লাহ আপনার প্রতি দয়া করুন; আপনি কার নাম যেন বললেন?” খলিফা উত্তর দিলেন।
অর্থাৎ হাদিস-শিক্ষার্থী যখন তার শিক্ষকের কাছে রাবি ও বর্ণনাকারীর নাম জানতে চায়, তখন শিক্ষক যে আত্মিক স্বাদ অনুভব করেন, খলিফা জীবনে তা কখনো লাভ করেননি বলে অনুতাপ করছেন!
পরদিন আব্বাসি রাজদরবারের সকল উজির, লিপিকার ও সচিবগণ দরবারে সমবেত হয়ে শিক্ষার্থীদের মতো বসে পড়ল এবং খলিফাকে নিবেদন করল, 'আমিরুল মুমিনিন যদি অনুগ্রহ করে আমাদেরকে কিছু হাদিস লিখিয়ে দিতেন।'
মানসুর উত্তর দিলেন, 'তোমরা তো হাদিসের প্রকৃত শিক্ষার্থী নও (যাদের ইলমের পিপাসা ও জিজ্ঞাসা আমাকে আত্মিক তৃপ্তি দান করবে)! হাদিসের শিক্ষার্থী তো তারা, যাদের পরিচ্ছদ হবে ধূলিমলিন, পদযুগল হবে অধিক পদচারণায় ভগ্ন-ছিন্ন, মাথার চুল হবে এলোমেলো-প্রলম্বিত; ইলমের অন্বেষণে যারা ছুটে বেড়ায় পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে, পাড়ি দেয় দূরদূরান্তের পথ; কখনো ইরাকে, কখনো হিজাযে; আবার কখনো শামে, কখনো-বা ইয়ামেনে। তারাই হলো হাদিসের বর্ণনাকারী ও শিক্ষার্থী।'
ঐতিহাসিকগণ মানসুরের কীর্তি ও অবদান, ধৈর্য ও সহনশীলতা, মার্জনা ও সুশাসন, নিজ পুত্র মাহদিকে ওলিয়ে আহদ (ভবিষ্যৎ খলিফা) ঘোষণার পূর্বে দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত হিসেবে গড়ে তোলা ইত্যাদি অনেক গুণ- বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু আবু মুসলিম খোরাসানি ও আপন চাচা আবদুল্লাহ বিন আলিকে নিরাপত্তাপ্রতিশ্রুতি প্রদানের পরও তাদের সঙ্গে কৃত প্রতারণা তার কর্মজীবনের অন্যতম অন্যায় হিসেবে ইতিহাসের পাতায় চিহ্নিত হয়ে থাকবে।