📄 আন্দোলনের আহ্বায়ক নির্বাচনে ভুল সিদ্ধান্তের পরিণতি
পরিস্থিতির দাবি অনুযায়ী আব্বাসি আন্দোলনের পুরোধাগণ উপলব্ধি করতে পেরেছিল যে, খোরাসানে আন্দোলন টিকিয়ে রাখতে এবং জোরদার করতে কিছু পরিবর্তন ও সংস্কার প্রয়োজন। তাই তারা খোরাসানের নতুন প্রধান আহ্বায়ক হিসেবে আম্মার বিন ইয়াযিদ (খাদ্দাশ)-কে নির্বাচন করে। কিন্তু এই নির্বাচন মোটেও সঠিক ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ছিল না। কিছুদিন পরই তার থেকে কুফরি আচরণ প্রকাশ পেতে থাকে! ১১৮ হিজরি সনে সে গভর্নর আসাদ বিন আবদুল্লাহর হাতে নিহত হয়।
📄 সংকটের মুখোমুখি আব্বাসি আন্দোলন
খাদ্দাশের কর্মকাণ্ড জনগণের মাঝে আব্বাসি আন্দোলনের সুনাম নষ্ট করে ফেলে। এর ফলে তারা পরবর্তী নতুন আহ্বায়কের প্রতি আস্থা রাখতে পারেনি। পাশাপাশি গভর্নর আসাদ বিন আবদুল্লাহর সর্বোচ্চ কঠোরতাও এ ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখছিল।
১২২ হিজরি সন পর্যন্ত আব্বাসি আন্দোলন অনেকটা ধীর গতিতেই চলতে থাকে। এরইমধ্যে সৃষ্টি হয় আরেক প্রতিবন্ধকতা। কুফায় যায়দ বিন যায়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে উমাইয়াদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু হয়। বিদ্রোহ চলাকালে ও বিদ্রোহ পরবর্তী সময়ে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে আসা পর্যন্ত আব্বাসি আন্দোলন স্তিমিত রাখা জরুরি ছিল।
১২৫ হিজরি সনে (৭৪৩ খ্রিষ্টাব্দে) আব্বাসি আন্দোলনের প্রধান পুরুষ মুহাম্মাদ বিন আলি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি তার পুত্র ইবরাহিমকে আন্দোলন কার্যক্রম অব্যাহত রাখার অসিয়ত করে যান।
১২৫ হিজরি সনেই (৭৪৩ খ্রিষ্টাব্দে) খliফা হিশাম বিন আবদুল মালিকের মৃত্যু হলে এবং উমাইয়া রাজপরিবার গৃহসংঘাতে জড়িয়ে পড়লে আব্বাসি আন্দোলনে নতুন গতি সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি আব্বাসি আন্দোলনের ইমাম ইবরাহিম বিন মুহাম্মাদের নির্দেশনায় খোরাসানে চলমান গোত্রকেন্দ্রিক সংঘাতকেও কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তখন খোরাসানের গভর্নর ছিলেন নাস্ত্র বিন সাইয়ার। তিনি ছিলেন মুযার গোত্রীয়। অপরদিকে খোরাসানে বসবাসরত অধিকাংশ আরব জনগণ ছিল ইয়ামেনি। তারা তাদের গভর্নরকে অপছন্দ করত। তাই আব্বাসি প্রচারণা ইয়ামেনিদের টার্গেট করে পরিচালিত হতে থাকে। এই সাম্প্রদায়িক সংঘাত ইয়ামেনি, মুযারি, তুর্কি, জ্ঞানী ও আলিমসমাজ এবং সামরিক ব্যক্তিবর্গসহ সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের অবস্থা ও স্বার্থে ব্যাপক প্রভাব ফেলছিল। আর চলমান ঘটনাপ্রবাহের এই সবকিছুই তখন আব্বাসি আন্দোলনকে নতুন করে জেগে উঠতে সহায়তা করেছিল।
১২৮ হিজরি সনে আব্বাসি আন্দোলনের কর্মতৎপরতায় এক শক্তিশালী ব্যক্তির আত্মপ্রকাশ ঘটে, যার নাম আবু মুসলিম খোরাসানি। আবু মুসলিম খোরাসানি পারসিক বংশোদ্ভূত ছিলেন এবং দীর্ঘ কয়েক বছর যাবৎ আব্বাসি আন্দোলনের একজন প্রচারক হিসেবে কাজ করছিলেন। ইমাম ইবরাহিম বিন মুহাম্মাদ তার মধ্যে ব্যতিক্রমী প্রতিভা ও অভিনব দক্ষতার ঝলক দেখতে পেয়ে তাকে খোরাসানে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন এবং আশা প্রকাশ করেন যে, তার দক্ষতার ছোঁয়ায় খোরাসানে আব্বাসি আন্দোলন আরও বিস্তৃত ও বিকশিত হবে।
১২৯ হিজরি সনে ইমামের পক্ষ থেকে আবু মুসলিমের কাছে প্রকাশ্যে প্রচারণা চালানোর নির্দেশনা আসে। নির্দেশনা মোতাবেক আবু মুসলিম কাজ শুরু করেন। খোরাসানের তৎকালীন গভর্নর তখন অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও গোলযোগ দমনে ব্যতিব্যস্ত ছিলেন। ঈদুল ফিতরের দিন আবু মুসলিম জনগণকে নিয়ে ঈদের নামাজ আদায় করেন।
📄 বনু উমাইয়া-বনু আব্বাসের প্রথম সশস্ত্র সংঘাত
খোরাসানেই উভয় শক্তির মধ্যে প্রথম সশস্ত্র সংঘাতের ঘটনা ঘটে। যুদ্ধে আবু মুসলিম গভর্নর নাস্ত্র বিন সাইয়ারের বাহিনীর বিরুদ্ধে জয়লাভ করেন এবং তার অনুসারীর সংখ্যা বেড়ে যায়। এ সময় পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য আবু মুসলিম অত্যন্ত সূক্ষ্ম একটি কৌশল কাজে লাগান। তিনি ইয়ামেনি ও মুযারি উভয় গোত্রের লোকদের কাছে ভিন্ন ভিন্ন বার্তা পাঠিয়ে উভয় দলকে নিজের পক্ষে টানার চেষ্টা করেন এবং বলেন, আমাদের ইমাম আমাকে আপনাদের সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। সুতরাং আমি আপনাদের বিষয়ে তার নির্দেশনা অমান্য করব না।
ধীরে ধীরে টানটান উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। শেষ উমাইয়া খলিফা মারওয়ান বিন মুহাম্মাদ হুমায়মায় অবস্থানকারী আব্বাসি আন্দোলনের ইমাম ইবরাহিম বিন মুহাম্মাদের খোঁজে বাহিনী প্রেরণ করেন। তারা তাকে আটক করে দামেশকে খলিফার কাছে পাঠিয়ে দিলে খলিফা তাকে কারাবদ্ধ রাখার নির্দেশ দেন।
১৩১ হিজরি সনে আবু মুসলিমের বাহিনী ইরাকি বাহিনীর বিরুদ্ধে জয়লাভ করে। এরপর আবু মুসলিম কুফার উদ্দেশে রওনা হন। কুফায় ততদিনে আব্বাসি আন্দোলনের প্রচারক মুহাম্মাদ বিন খালিদ বিন আবদুল্লাহ আল-ক্বাসরি প্রকাশ্যে আন্দোলন শুরু করেছিলেন।
১৩২ হিজরি সনে (৭৪৯ খ্রিষ্টাব্দে) আব্বাসি ইমাম ইবরাহিম বিন মুহাম্মাদ উমাইয়া খলিফা মারওয়ান বিন মুহাম্মাদের কারাগারে ইন্তেকাল করেন। তিনি তার অবর্তমানে তার ভাই আবদুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ (আস-সাফফাহ)-এর নামে 'খিলাফত'-এর অসিয়ত করে যান। ১৩২ হিজরি সনের রবিউস সানি মাসে (৭৪৯ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে) বনু আব্বাস আস-সাফফাহর হাতে খিলাফতের বায়আত গ্রহণ করে।
একই বছরের ১১ জুমাদাল উখরা (৭৫০ খ্রিষ্টাব্দের ২৫ জানুয়ারি) আস-সাফফাহ উমাইয়াদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য বাহিনী প্রেরণ করেন। আব্বাসি বাহিনী উমাইয়াদের সমূলে নিঃশেষ করে ফেলে এবং একমাত্র আন্দালুস বাদে পুরো ইসলামি বিশ্বে বনু আব্বাসের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।
একই বছরের জিলহজ মাসে (৭৫০ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট মাসে) শেষ উমাইয়া খলিফা মারওয়ান বিন মুহাম্মাদ আব্বাসি খলিফা আস-সাফফাহর প্রেরিত বাহিনীর হাতে নিহত হন এবং এর মাধ্যমে উমাইয়া খিলাফতের চূড়ান্ত পতন নিশ্চিত হয়।