📄 স্থান নির্বাচন
মুহাম্মাদ বিন আলি বিন আবদুল্লাহ বিন আব্বাস তার আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে কুফা ও খোরাসানকে নির্বাচন করেন। বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে এ নির্বাচন ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও সুচিন্তিত। যেমন:
১. বনু উমাইয়ার শাসক পরিবারের প্রতি শত্রুতা ও বিদ্বেষ পোষণকারী অধিকাংশ মানুষের অবস্থান ছিল কুফায়।
২. খোরাসানের অবস্থান ছিল উমাইয়া সাম্রাজ্যের পূর্ব প্রান্তে। তাই প্রতিকূল বা অস্থিতিশীল পরিবেশে খোরাসান থেকে পালিয়ে পার্শ্ববর্তী তুর্কি রাষ্ট্রে আশ্রয়গ্রহণ সহজ ছিল।
৩. খোরাসানে বসবাসকারী আরবদের মাঝে তখন সাম্প্রদায়িক (কায়সি-ইয়ামেনি) সংঘাত চলছিল। আব্বাসি আন্দোলনের পুরোধাদের পরিকল্পনা ছিল এ সংঘাতকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করা।
৪. ইসলামি সাম্রাজ্যে খোরাসানের অন্তর্ভুক্তি বেশি পুরোনো নয়। তাই নবীবংশের প্রতি ভালোবাসা ও আবেগের বিষয়টির মাধ্যমে খোরাসানবাসীর অন্তরকে প্রভাবিত করা সম্ভব ছিল।
মুহাম্মাদ বিন আলি বিন আবদুল্লাহ বিন আব্বাস তার আন্দোলনের মূলকেন্দ্র হিসেবে কুফাকে নির্বাচন করেন এবং সেখানে ‘কাবিরুদ-দুআত’ নামক কেন্দ্র স্থাপন করেন আর খোরাসানকে নির্বাচন করেন আন্দোলনের প্রচারণার ক্ষেত্র হিসেবে।
তিনি পুরো বিষয়টিকে পূর্ণ গোপনীয়তার সঙ্গে সম্পাদন করেন। যাবতীয় তথ্য খোরাসান থেকে কুফায় এবং কুফা থেকে হুমায়মায় পৌঁছত।
আন্দোলনের প্রচারকগণ ব্যবসায়ী বা হাজিদের বেশে সফর করত।
খোরাসানে আব্বাসি আন্দোলনের প্রধান আহ্বায়ক ছিলেন আবু ইকরিমা আস-সাররাজ (আবু মুহাম্মাদ আস-সাদিক)। তিনি সেখানকার বিভিন্ন আরব গোত্র হতে বারোজন প্রতিনিধি নির্বাচন করেন। যেসব ঐতিহাসিক দাবি করে যে, আব্বাসি আন্দোলন পারসিকদের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এ তথ্যটি তাদের দাবিকে প্রত্যাখ্যান করে। এই বারোজন প্রতিনিধি প্রধান আহ্বায়কের নির্দেশনায় কাজ করত; কিন্তু মূল ইমামকে চিনত না। প্রত্যেক প্রতিনিধির অধীনে সত্তরজন করে কর্মী ছিল।
ধীরে ধীরে খোরাসানে আন্দোলনের ফল প্রকাশ পেতে থাকে এবং আন্দোলনের নিয়ন্ত্রকগণ গোপন অবস্থান থেকে আত্মপ্রকাশ করতে শুরু করে। পরিস্থিতির নাজুকতা উপলব্ধি করে খোরাসানের তৎকালীন গভর্নর আসাদ বিন আবদুল্লাহ আল-কাসরি খোরাসানের প্রধান আহ্বায়ক আবু ইকরিমা আস-সাররাজ ও তার কয়েকজন সঙ্গীকে গ্রেফতার করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেন। এটি ১০৭ হিজরি সনের (৭২৫ খ্রিষ্টাব্দের) ঘটনা।
গভর্নর আসাদ বিন আবদুল্লাহ আপন অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ১১৮ হিজরি সন (৭৩৬ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত (এর মধ্যে তিনি একবার বরখাস্ত হওয়ার পর গভর্নর পদে পুনর্বহাল হন) আব্বাসি সংগঠনের বেশ কয়েকজন নেতার পরিচয় উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হন এবং যথেষ্ট কঠোরতার মাধ্যমে আন্দোলন দমনে সচেষ্ট হন। ফলে আব্বাসি আন্দোলনের প্রচারণা পুনরায় পূর্ণ গোপনীয়তায় চলে যায়।
📄 আন্দোলনের আহ্বায়ক নির্বাচনে ভুল সিদ্ধান্তের পরিণতি
পরিস্থিতির দাবি অনুযায়ী আব্বাসি আন্দোলনের পুরোধাগণ উপলব্ধি করতে পেরেছিল যে, খোরাসানে আন্দোলন টিকিয়ে রাখতে এবং জোরদার করতে কিছু পরিবর্তন ও সংস্কার প্রয়োজন। তাই তারা খোরাসানের নতুন প্রধান আহ্বায়ক হিসেবে আম্মার বিন ইয়াযিদ (খাদ্দাশ)-কে নির্বাচন করে। কিন্তু এই নির্বাচন মোটেও সঠিক ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ছিল না। কিছুদিন পরই তার থেকে কুফরি আচরণ প্রকাশ পেতে থাকে! ১১৮ হিজরি সনে সে গভর্নর আসাদ বিন আবদুল্লাহর হাতে নিহত হয়।
📄 সংকটের মুখোমুখি আব্বাসি আন্দোলন
খাদ্দাশের কর্মকাণ্ড জনগণের মাঝে আব্বাসি আন্দোলনের সুনাম নষ্ট করে ফেলে। এর ফলে তারা পরবর্তী নতুন আহ্বায়কের প্রতি আস্থা রাখতে পারেনি। পাশাপাশি গভর্নর আসাদ বিন আবদুল্লাহর সর্বোচ্চ কঠোরতাও এ ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখছিল।
১২২ হিজরি সন পর্যন্ত আব্বাসি আন্দোলন অনেকটা ধীর গতিতেই চলতে থাকে। এরইমধ্যে সৃষ্টি হয় আরেক প্রতিবন্ধকতা। কুফায় যায়দ বিন যায়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে উমাইয়াদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু হয়। বিদ্রোহ চলাকালে ও বিদ্রোহ পরবর্তী সময়ে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে আসা পর্যন্ত আব্বাসি আন্দোলন স্তিমিত রাখা জরুরি ছিল।
১২৫ হিজরি সনে (৭৪৩ খ্রিষ্টাব্দে) আব্বাসি আন্দোলনের প্রধান পুরুষ মুহাম্মাদ বিন আলি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি তার পুত্র ইবরাহিমকে আন্দোলন কার্যক্রম অব্যাহত রাখার অসিয়ত করে যান।
১২৫ হিজরি সনেই (৭৪৩ খ্রিষ্টাব্দে) খliফা হিশাম বিন আবদুল মালিকের মৃত্যু হলে এবং উমাইয়া রাজপরিবার গৃহসংঘাতে জড়িয়ে পড়লে আব্বাসি আন্দোলনে নতুন গতি সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি আব্বাসি আন্দোলনের ইমাম ইবরাহিম বিন মুহাম্মাদের নির্দেশনায় খোরাসানে চলমান গোত্রকেন্দ্রিক সংঘাতকেও কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তখন খোরাসানের গভর্নর ছিলেন নাস্ত্র বিন সাইয়ার। তিনি ছিলেন মুযার গোত্রীয়। অপরদিকে খোরাসানে বসবাসরত অধিকাংশ আরব জনগণ ছিল ইয়ামেনি। তারা তাদের গভর্নরকে অপছন্দ করত। তাই আব্বাসি প্রচারণা ইয়ামেনিদের টার্গেট করে পরিচালিত হতে থাকে। এই সাম্প্রদায়িক সংঘাত ইয়ামেনি, মুযারি, তুর্কি, জ্ঞানী ও আলিমসমাজ এবং সামরিক ব্যক্তিবর্গসহ সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের অবস্থা ও স্বার্থে ব্যাপক প্রভাব ফেলছিল। আর চলমান ঘটনাপ্রবাহের এই সবকিছুই তখন আব্বাসি আন্দোলনকে নতুন করে জেগে উঠতে সহায়তা করেছিল।
১২৮ হিজরি সনে আব্বাসি আন্দোলনের কর্মতৎপরতায় এক শক্তিশালী ব্যক্তির আত্মপ্রকাশ ঘটে, যার নাম আবু মুসলিম খোরাসানি। আবু মুসলিম খোরাসানি পারসিক বংশোদ্ভূত ছিলেন এবং দীর্ঘ কয়েক বছর যাবৎ আব্বাসি আন্দোলনের একজন প্রচারক হিসেবে কাজ করছিলেন। ইমাম ইবরাহিম বিন মুহাম্মাদ তার মধ্যে ব্যতিক্রমী প্রতিভা ও অভিনব দক্ষতার ঝলক দেখতে পেয়ে তাকে খোরাসানে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন এবং আশা প্রকাশ করেন যে, তার দক্ষতার ছোঁয়ায় খোরাসানে আব্বাসি আন্দোলন আরও বিস্তৃত ও বিকশিত হবে।
১২৯ হিজরি সনে ইমামের পক্ষ থেকে আবু মুসলিমের কাছে প্রকাশ্যে প্রচারণা চালানোর নির্দেশনা আসে। নির্দেশনা মোতাবেক আবু মুসলিম কাজ শুরু করেন। খোরাসানের তৎকালীন গভর্নর তখন অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও গোলযোগ দমনে ব্যতিব্যস্ত ছিলেন। ঈদুল ফিতরের দিন আবু মুসলিম জনগণকে নিয়ে ঈদের নামাজ আদায় করেন।
📄 বনু উমাইয়া-বনু আব্বাসের প্রথম সশস্ত্র সংঘাত
খোরাসানেই উভয় শক্তির মধ্যে প্রথম সশস্ত্র সংঘাতের ঘটনা ঘটে। যুদ্ধে আবু মুসলিম গভর্নর নাস্ত্র বিন সাইয়ারের বাহিনীর বিরুদ্ধে জয়লাভ করেন এবং তার অনুসারীর সংখ্যা বেড়ে যায়। এ সময় পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য আবু মুসলিম অত্যন্ত সূক্ষ্ম একটি কৌশল কাজে লাগান। তিনি ইয়ামেনি ও মুযারি উভয় গোত্রের লোকদের কাছে ভিন্ন ভিন্ন বার্তা পাঠিয়ে উভয় দলকে নিজের পক্ষে টানার চেষ্টা করেন এবং বলেন, আমাদের ইমাম আমাকে আপনাদের সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। সুতরাং আমি আপনাদের বিষয়ে তার নির্দেশনা অমান্য করব না।
ধীরে ধীরে টানটান উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। শেষ উমাইয়া খলিফা মারওয়ান বিন মুহাম্মাদ হুমায়মায় অবস্থানকারী আব্বাসি আন্দোলনের ইমাম ইবরাহিম বিন মুহাম্মাদের খোঁজে বাহিনী প্রেরণ করেন। তারা তাকে আটক করে দামেশকে খলিফার কাছে পাঠিয়ে দিলে খলিফা তাকে কারাবদ্ধ রাখার নির্দেশ দেন।
১৩১ হিজরি সনে আবু মুসলিমের বাহিনী ইরাকি বাহিনীর বিরুদ্ধে জয়লাভ করে। এরপর আবু মুসলিম কুফার উদ্দেশে রওনা হন। কুফায় ততদিনে আব্বাসি আন্দোলনের প্রচারক মুহাম্মাদ বিন খালিদ বিন আবদুল্লাহ আল-ক্বাসরি প্রকাশ্যে আন্দোলন শুরু করেছিলেন।
১৩২ হিজরি সনে (৭৪৯ খ্রিষ্টাব্দে) আব্বাসি ইমাম ইবরাহিম বিন মুহাম্মাদ উমাইয়া খলিফা মারওয়ান বিন মুহাম্মাদের কারাগারে ইন্তেকাল করেন। তিনি তার অবর্তমানে তার ভাই আবদুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ (আস-সাফফাহ)-এর নামে 'খিলাফত'-এর অসিয়ত করে যান। ১৩২ হিজরি সনের রবিউস সানি মাসে (৭৪৯ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে) বনু আব্বাস আস-সাফফাহর হাতে খিলাফতের বায়আত গ্রহণ করে।
একই বছরের ১১ জুমাদাল উখরা (৭৫০ খ্রিষ্টাব্দের ২৫ জানুয়ারি) আস-সাফফাহ উমাইয়াদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য বাহিনী প্রেরণ করেন। আব্বাসি বাহিনী উমাইয়াদের সমূলে নিঃশেষ করে ফেলে এবং একমাত্র আন্দালুস বাদে পুরো ইসলামি বিশ্বে বনু আব্বাসের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।
একই বছরের জিলহজ মাসে (৭৫০ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট মাসে) শেষ উমাইয়া খলিফা মারওয়ান বিন মুহাম্মাদ আব্বাসি খলিফা আস-সাফফাহর প্রেরিত বাহিনীর হাতে নিহত হন এবং এর মাধ্যমে উমাইয়া খিলাফতের চূড়ান্ত পতন নিশ্চিত হয়।