📄 উৎপত্তি ও বিকাশ
এটি একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতা যে, ইসলামের সূচনালগ্ন থেকেই ইহুদি জাতি ইসলাম ও মুসলমানদের চরম শত্রু হিসেবে আবির্ভূত হয়। নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায়ই ইহুদিদের হঠকারিতাপূর্ণ বিভিন্ন আচরণের কারণে তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযান পরিচালিত হয় এবং ইহুদিদেরকে মদিনা থেকে নির্বাসিত করা হয়। খন্দকের যুদ্ধে পুরো আরব উপদ্বীপকে মুসলমানদের বিরুদ্ধে একজোট করার পেছনেও ছিল ইহুদি-প্ররোচনা। নবীজির ইন্তেকালের পরও অব্যাহত থাকে ইহুদিদের ষড়যন্ত্র প্রচেষ্টা।
গবেষক ঐতিহাসিকগণের মতে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর রাযি.-এর শাহাদাতের ঘটনা কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা বা ব্যক্তি-আক্রোশের বহিঃপ্রকাশ ছিল না; বরং এ ঘটনা ছিল ইসলামের বিরুদ্ধে ইহুদিদের চলমান গোপন ও সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র এবং সুবিন্যস্ত চক্রান্তের ফসল। তৃতীয় খলিফা উসমান রাযি.-এর খিলাফতের শেষদিকে এই দুষ্কৃতকারী দলটির আহ্বায়করা প্রকাশ্য-কার্যক্রম শুরু করে এবং খলিফা উসমান রাযি. ও তার গভর্নরদের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা ও কুৎসা রটনার মাধ্যমে ইসলামি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করতে সচেষ্ট
হয়। এরই ধারাবাহিকতায় উম্মাহর সর্বস্বীকৃত খলিফা হজরত উসমান রাযি.-কে নির্মমভাবে শহিদ করা হয়। এই ষড়যন্ত্রের মূল উদ্যোক্তা ও প্রথম সারির নেতা ছিল আবদুল্লাহ বিন সাবা। জাতে ইহুদি এই লোকটি আপন মিশন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নিজেকে মুসলমান বলে পরিচয় দিত।
ইসলামের শত্রুদের উপলব্ধি ছিল, ইসলাম ও মুসলমানদের উন্নতি ও সমৃদ্ধির মূল উৎস হচ্ছে বিশ্বাসগত অভিন্নতা এবং নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে ঐক্য ও অবিচ্ছিন্নতা। তাই আবদুল্লাহ বিন সাবা ও তার অনুসারীগণ এই শক্তিমূলে আঘাত হেনে ইসলামের ক্ষতিসাধনে তৎপর হয়। তাদের লক্ষ্য ছিল মিথ্যা ও ভ্রান্ত আকিদার প্রচার, জাল ও বানোয়াট হাদিস তৈরি এবং সাধারণ জনগণকে খলিফাতুল মুসলিমিন ও গভর্নরদের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করে তুলে ইসলামের রুহ ও প্রাণশক্তি নিঃশেষ করে ফেলা এবং মুসলিম উম্মাহকে অনিঃশেষ বিবাদবিসংবাদের জালে আটকে ফেলা।
যেসব লোকজন নিজেদের বিভিন্ন স্বার্থহানির কারণে ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর প্রতি চরম বিদ্বেষ পোষণ করত, তারা এ আন্দোলনকে লুফে নেয় এবং আবদুল্লাহ বিন সাবার দলে যোগ দেয়। নিষ্ঠাবান কিছু মুসলমানও তাদের প্রোপাগান্ডায় প্রবঞ্চিত হয়ে একসময় সাবায়ি চক্রের সঙ্গী হয়। তারপরও হজরত উসমান রাযি.-এর ইন্তেকাল পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহ আকিদাগত বিষয়ে এক ও ঐক্যবদ্ধ ছিল।
চতুর্থ খলিফা হজরত আলি রাযি.-এর খিলাফতকালে মুসলমানদের অন্তর্দ্বন্দ্বের সময় উম্মাহ দু-ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এক দল হজরত আলি রাযি.-এর পক্ষাবলম্বন করে, অপর দল উসমান হত্যার বিচারের দাবিতে মুয়াবিয়া রাযি.-এর পক্ষাবলম্বন করে। প্রথম দল পরিচিত হয় 'শিআনে আলি' বা আলির দল নামে, আর দ্বিতীয় দল 'শিআনে উসমান' বা উসমানের দল নামে। এই শিআনে আলি নামটিই কালের পরিক্রমায় সংক্ষেপে শিয়া নামে পরিচিত হতে থাকে। যেহেতু তখনও পর্যন্ত উভয় দলের উদ্দেশ্য ছিল নির্দোষ ও নিষ্ঠাপূর্ণ, তাই এই মতবিরোধ সত্ত্বেও উভয় দলকেই আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর অন্তর্ভুক্ত গণ্য করা হয়।
হজরত আলি রাযি.-এর প্রতি হৃদ্যতা পোষণকারী দলটির মাঝে ধীরে ধীরে আকিদাগত নানা ধরনের প্রান্তিকতা সৃষ্টি হতে থাকে। প্রথমে এই দাবি তোলা হয় যে, নবীজির নিকটাত্মীয় হিসেবে আলি রাযি.-ই অন্য
সবার আগে খলিফা হওয়ার অধিক উপযুক্ত ছিলেন। এরপর পর্যায়ক্রমে আলি রাযি.-কে নবীজির সরাসরি খলিফা দাবি করা, প্রথম তিন খলিফাকে অন্যায়ভাবে ক্ষমতাদখলকারী দাবি করা, আলি রাযি.-কে নবীজির অসিয়তের অধিকারী দাবি করা, আলি রাযি.-কে নবুওয়তের উপযুক্ত দাবি করা, নবীর ন্যায় নিষ্পাপ ও অনুসরণীয় দাবি করা, নবীদের তুলনায় মর্যাদায় শ্রেষ্ঠ দাবি করা, ইলাহ পর্যায়ের দাবি করা, আল্লাহর ন্যায় অদৃশ্যের জ্ঞানী ও সৃষ্টিজগৎ পরিচালনার ক্ষমতাসম্পন্ন দাবি করা ইত্যাদি চরম গর্হিত আকিদাগত বিচ্যুতি এই দলটির মাধ্যমে উম্মতের মাঝে বিস্তার লাভ করতে থাকে।
উপরের আলোচনায় এ বিষয়টি সুস্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হয় যে, শিয়া মতবাদের উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাসের সঙ্গে প্রচলিত বিকৃত খ্রিষ্টবাদের উৎপত্তি ও বিকাশের আশ্চর্যরকম সাদৃশ্য রয়েছে। খ্রিষ্টধর্মে বিকৃতির সূচনা হয়েছিল প্রচণ্ড খ্রিষ্টান বিদ্বেষী ইহুদি সেন্ট পলের মাধ্যমে। সে বাহ্যিকভাবে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করে খ্রিষ্টধর্মে ত্রিত্ববাদের অনুপ্রবেশ ঘটায় এবং কালের পরিক্রমায় একত্ববাদের পরিবর্তে বিকৃত ত্রিত্ববাদই খ্রিষ্টধর্মের মৌলিক আকিদা বিবেচিত হতে থাকে।
বর্তমানে পারিভাষিক অর্থে শিয়া তাদেরকে বলা হয়, যারা হজরত আলি রাযি. ও নবীপরিবারের প্রতি হৃদ্যতার দাবিপূর্বক হজরত আলি রাযি.-কে প্রথম তিন খলিফা হজরত আবু বকর রাযি., হজরত উমর রাযি. ও হজরত উসমান রাযি.-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করে এবং এই শ্রেষ্ঠত্বের দাবিতে আলিবংশের পর্যায়ক্রমিক ইমামতসহ বিশুদ্ধ ইসলামি আকিদাবিরোধী বিভিন্ন বিশ্বাস পোষণ করে।
টিকাঃ
৭১. 'শিয়া সম্প্রদায়ের পরিচিতি' শিরোনামের পরিশিষ্টটি অনুবাদক কর্তৃক সংযোজন করা হয়েছে। শিয়া গোষ্ঠী সম্পর্কে আরও জানতে পাঠ করতে পারেন মাকতাবাতুল হাসান থেকে প্রকাশিতব্য ড. রাগিব সারজানির 'শিয়া'।
৭২. এই দাবি ও দৃষ্টিভঙ্গি আপাতদৃষ্টিতে সরল ও নির্দোষ হলেও তা ছিল ইসলামি শিক্ষার সম্পূর্ণ বিরোধী। কারণ, ইসলামের দৃষ্টিতে বংশপরিচয় নয়, তাকওয়াই শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি। অধিকন্তু পৃথিবীতে ইসলামের আগমন ছিল বংশগত বিভেদ-বিভাজনের মূলোৎপাটনের উদ্দেশ্যে।
📄 ইসমাইলিয়া সম্প্রদায়ের শাখা-উপশাখা
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইসমাইলিয়া সম্প্রদায় ইসমাইল বিন জাফর সাদিককে নিজেদের সপ্তম ইমাম দাবি করত। ১৯৩ হিজরি সনে (৮০৯ খ্রিষ্টাব্দে) ইসমাইলের পুত্র মুহাম্মাদ বিন ইসমাইল ইন্তেকাল করলে ইসমাইলিয়া সম্প্রদায় দাবি করে যে, তিনি আত্মগোপন করে আছেন এবং
অতি শীঘ্রই ইমাম মাহদি নামে আত্মপ্রকাশ করে পৃথিবীতে ন্যায়-ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করবেন। এ সময় আব্বাসি খিলাফতের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ইয়ামেন, ইরাক, আরব উপদ্বীপের পূর্বাঞ্চল ও পারস্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ইসমাইলিয়া মতাদর্শের প্রচারকরা ব্যাপক পরিসরে কাজ করতে থাকে। ইরাক ও পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন অঞ্চলে ইসমাইলিয়া মতাদর্শের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে হামদান বিন কারামাত। ২৮৬ হিজরি সনে (৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দে) শামে ইসমাইলিয়া মতাদর্শের প্রচারক (পরবর্তী সময়ে উবায়দি সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা) উবায়দুল্লাহ আল-মাহদি নিজেকে মুহাম্মাদ বিন ইসমাইল তথা হজরত ফাতিমা রাযি.-এর বংশধর এবং একাদশ ইসমাইলি ইমাম দাবি করে। কিন্তু হামদান বিন কারামাতের নেতৃত্বাধীন ইরাক, বাহরাইন ও খোরাসানের ইসমাইলিয়া সম্প্রদায় উবায়দুল্লাহর দাবি প্রত্যাখ্যান করে। এখান থেকেই ইসমাইলিয়া সম্প্রদায় ফাতিমিয়া ও কারামাতিয়া দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। উবায়দুল্লাহ আল-মাহদির অনুসারীরা পরিচিত হয় 'ফাতিমিয়া' নামে আর হামদান বিন কারামাতের অনুসারীরা পরিচিত হয় 'কারামাতিয়া' নামে। কারামাতিয়া গোষ্ঠী বিভিন্ন সময় বাহরাইন, ইয়ামেনসহ বিভিন্ন অঞ্চলে স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। অপরদিকে ফাতিমিরা ২৯৭ হিজরি সনে (৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে) উত্তর আফ্রিকায় উবায়দি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে, যা পরবর্তীকালে মিশর পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে।
ফাতিমিরা পরবর্তী সময়ে দু-ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। এক দলের নাম নিযারিয়া, আরেক দলের নাম মুসতালিয়া। ৪৮৭ হিজরি সনে (১০৯৪ খ্রিষ্টাব্দে) অষ্টম উবায়দি (ফাতিমি) শাসক (অষ্টাদশ ইসমাইলি ইমাম) মুসতানসিরের মৃত্যুর পর উবায়দি রাজপরিবার পরবর্তী শাসক ও ইমাম নির্ধারণ প্রশ্নে দু-ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এক দল তার পুত্র নিযার আল-মুসতাফা লি দ্বীনিল্লাহকে ইমাম দাবি করে, অপর দল তার আরেক পুত্র আহমাদ মুসতালিকে ইমাম দাবি করে। প্রথম দল নিযারিয়া নামে এবং দ্বিতীয় দল মুসতালিয়া নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। এ সময় আহমাদ মুসতালি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে তার ভাই নিযারকে বন্দি করেন। বন্দি অবস্থায় নিযারের মৃত্যুর পর তার পুত্র আল-হাদি বিন নিযার মিশর থেকে
পালিয়ে পারস্যে ইসমাইলি ধর্মপ্রচারক হাসান সাবাহর কাছে চলে যায় এবং নিযারিয়া মতাদর্শের প্রসারে কাজ করতে থাকে। এই হাসান সাবাহই ছিল কুখ্যাত হাশাশিন গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা। কালের পরিক্রমায় যেহেতু কারামাতিয়া ও মুসতালিয়াদের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে, তাই বর্তমানে ইসমাইলিয়া বলে এই নিযারিয়া গোষ্ঠীকেই বোঝানো হয়। বর্তমানে তারা 'আগাখানিয়া' নামে অধিক প্রসিদ্ধ। আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল, ইউরোপ ও ভারতে প্রচুর সংখ্যক আগাখানিয়া মতাদর্শী বসবাস করে। বর্তমানে তাদের প্রধান নেতা ফ্রান্সে বসবাসকারী ও ব্রিটিশ নাগরিকত্বের অধিকারী করিম হুসাইন শাহ (৪র্থ আগাখান), যিনি বিখ্যাত ফোর্বস ম্যাগাজিনের ভাষ্য অনুসারে বিশ্বের শীর্ষ দশ ধনীর একজন।
টিকাঃ
৭৩. এ দাবির বাস্তবতা সম্পর্কে তৃতীয় খণ্ডে আলোচনা করা হবে।