📄 খিলাফতে বনু উমাইয়া সম্পর্কে ড. রাগিব সারজানির পর্যালোচনা
অন্যান্য ইসলামি সালতানাতের ন্যায় উমাইয়া সালতানাতেরও (৪১-১৩২ হিজরি/৬৬১-৭৫০ খ্রিষ্টাব্দ) পৃথিবীর বিভিন্ন ভূখণ্ডের মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর প্রভূত অনুগ্রহ ও বিরাট অবদান রয়েছে। আমরা যদি উমাইয়া শাসনামলে যে পরিমাণ মানুষ ইসলামের পতাকাতলে আশ্রয় নিয়েছে কেবল তাদের সংখ্যার প্রতি দৃষ্টিপাত করি, তাহলে শুধু এতটুকুই বনু উমাইয়ার প্রতি আরোপিত বিভিন্ন মিথ্যা অপবাদ ও অভিযোগ খণ্ডনের জন্য যথেষ্ট বলে বিবেচিত হবে। বনু উমাইয়ার শাসনামলেই লিবিয়া থেকে শুরু করে মরক্কো পর্যন্ত পুরো উত্তর আফ্রিকা ইসলামের ছায়াতলে শামিল হয়েছিল। যদিও এসব অঞ্চলে ইসলামি বিজয়াভিযানের ধারা তৃতীয় খলিফা হজরত উসমান বিন আফফান রাযি.-এর যুগেই সূচিত হয়েছিল; কিন্তু পরবর্তী সময়ে এখানকার অধিবাসীরা ধর্মত্যাগ করেছিল। এরপর উমাইয়া শাসনামলে নতুন করে এসব অঞ্চল বিজিত হয়।
উমাইয়া শাসকবৃন্দ একইসঙ্গে আরবের চতুর্দিকে ইসলামের বিজয়াভিযান অব্যাহত রেখেছিলেন। পশ্চিমে তাদের অভিযান আন্দালুস পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। পূর্ব দিকে মুহাম্মদ বিন কাসিম আস-সাকাফির হাতে বিজিত হয়েছিল সিন্ধু অঞ্চল, কুতায়বা বিন মুসলিম আল-বাহিলির হাতে বিজিত হয়েছিল ট্রান্সঅক্সিয়ানা (মধ্য এশিয়া) অঞ্চল; তার বিজয়াভিযান বিস্তৃত হয়েছিল সুদূর চীন পর্যন্ত, আর মাসলামা বিন আবদুল মালিক আল- মারওয়ানির হাতে বিজিত হয়েছিল উত্তরের বিস্তীর্ণ ককেশাস অঞ্চল।
মানুষ দলে দলে আল্লাহর দ্বীনে প্রবেশ করেছিল। পৃথিবীর সেসব ভূখণ্ডেও ইসলামের সূর্য উদ্ভাসিত হয়েছিল, যেখানকার অধিবাসীগণ হাতেগড়া নিষ্প্রাণ মূর্তি-প্রতিমা, আগুন ও রাজন্যবর্গের পূজা করত। ইসলামের আগমনে এসব ভূখণ্ড থেকে নিশ্চিহ্ন হয়েছিল অসংখ্য ভ্রান্ত বিশ্বাস ও কুসংস্কার। আল্লাহর অনুগ্রহে বনু উমাইয়ার মাধ্যমে মানুষ প্রত্যক্ষ করেছিল
আল্লাহ তাআলার সুস্পষ্ট অনুগ্রহ-কিরণ। এ কারণেই তারা ব্যক্তিগতভাবে ও দলে দলে ইসলামের প্রতি অগ্রসর হয়েছিল। অব্যবহিত পরে তারাই শামিল হয়েছিল ইসলামের সাহসী সৈনিক, বিদগ্ধ আলিম ও দূরদর্শী নেতাদের দলে; অনন্যসাধারণ অবদান রেখেছিল ইসলামের খেদমতের বিস্তৃত অঙ্গনে। বনু উমাইয়া যে চারা রোপণ করেছিল, মুসলিম উম্মাহ তার সুদীর্ঘ ইতিহাসজুড়ে তারই ফল ও ফসল সংগ্রহ করে ধন্য হয়েছে। ফিকহ ও তাফসির, সাহিত্য ও চিকিৎসাবিজ্ঞান, ভূগোল ও প্রকৌশলবিদ্যা, রসায়ন ও দর্শনশাস্ত্র—মোটকথা, জ্ঞানচর্চার বিস্তৃত সব অঙ্গনে যুগে যুগে যারা ছিলেন নেতৃত্বের আসনে, তারা প্রায় সবাই উমাইয়া শাসনামলে বিজিত অঞ্চলসমূহের আলো-বাতাসেই বড় হয়েছেন, বিদ্যা ও জ্ঞানে পরিশীলিত হয়েছেন। হাদিসশাস্ত্রের মহান সেবক বুখারি, মুসলিম, তিরমিজি, নাসায়ি; ইতিহাস ও রিজাল-শাস্ত্রের পথিকৃৎ তাবারি, ইবনে খালদুন, যাহাবি; কিংবা চিকিৎসাশাস্ত্রের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি ইবনে সিনা, ফারাবি, আল-কিন্দি ও আল-বিরুনি; সে এক দীর্ঘ তালিকা, যা গুনে শেষ করা যাবে না!
ইসলামি বিজয়াভিযানে প্রথমে বিজিত হয়েছে দেশ, এরপর বিজিত হয়েছে নাগরিকদের অন্তঃদেশ। এভাবে একের পর এক অঞ্চলের আবাসভূমি ও হৃদয়ভূমি বিজিত হয়েছে উমাইয়া শাসনামলে আর সূচিত হয়েছে কালান্তরব্যাপী বিস্তৃত সেবার এক অনন্য ধারা।
উমাইয়া আমলে বিজয়াভিযান ও আল্লাহর পথে লড়াই ছিল মুসলমানদের সহজাত আকর্ষণের বিষয়। মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে দলে দলে রণ-কাফেলায় শরিক হতো আপন প্রতিপালকের সন্তুষ্টি অর্জনের প্রত্যাশায় এবং ‘রাব্বুল আলামিনের’ দাওয়াত পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে। অধিকন্তু উমাইয়া শাসনামলেই ইসলামি শরিয়তের দ্বিতীয় উৎস সুন্নাতে নববি সংকলিত হয় এবং উমাইয়া শাসনভুক্ত অঞ্চলে ইসলামি আইনব্যবস্থা কার্যকর করা হয়।
সুবিখ্যাত আলিম ইমাম ইবনে হাযম রহ. উমাইয়া শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে সুস্পষ্ট মন্তব্য করেছেন। বনু উমাইয়ার শাসনব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেছেন—
উমাইয়া শাসনামলে মুসলিম সাম্রাজ্য ছিল একটি নির্ভেজাল আরব রাষ্ট্র। উমাইয়া শাসকবৃন্দ নিজেদের জন্য কোনো রাজকীয় নগরীর
পত্তন করতেন না, বিলাসী জীবনযাপনের জন্য রাজপ্রাসাদ নির্মাণ বা সম্পদ কুক্ষিগতকরণে ঝাঁপিয়ে পড়তেন না। খিলাফতলাভের পূর্বে তারা যে বাড়িতে বাস করতেন, পরবর্তী সময়েও তারা সেখানেই বসবাস করতেন। আপন প্রজাদেরকে তারা 'হে আমার মাওলা', 'হে সায়্যিদ' ইত্যাদি সম্বোধন ব্যবহার করতে দিতেন না। তারা অধীনস্থদের তুচ্ছতাপ্রকাশক শব্দে আহ্বান করতেন না। তাদের বার্তার সূচনা এভাবে হতো না-'খলিফার পক্ষ হতে দাসের প্রতি'। সম্মানপ্রদর্শনের উদ্দেশ্যে হস্তদ্বয়ে, পদযুগলে বা সম্মুখভূমিতে চুম্বনের কোনো রীতি তাদের দরবারে প্রচলিত ছিল না। শাসনভূমির বিভিন্ন অংশে আমির-প্রশাসক নিয়োগ-বিয়োগের ক্ষেত্রে তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য থাকত সঠিক ও নিষ্ঠাপূর্ণ আনুগত্য প্রতিষ্ঠিত থাকা। এ কারণেই তারা আন্দালুস, সিন্ধু, খোরাসান, আর্মেনিয়া, ইয়ামেনসহ বিভিন্ন অঞ্চলে কখনো কখনো এক প্রশাসককে বরখাস্ত করে অন্য একজনকে দায়িত্ব প্রদান করেছেন, প্রয়োজনে সেনাবাহিনী প্রেরণ করেছেন এবং তাদের দৃষ্টিতে উপযুক্ত ব্যক্তিকে দায়িত্ব দিয়েছেন। তৎকালে পৃথিবীর যে বিস্তৃত অঞ্চল তারা শাসন করেছেন, অন্য কোনো শাসকগোষ্ঠী তা পারেনি। একপর্যায়ে কালের পরিক্রমায় আব্বাসিরা মুসলিম প্রাচ্যে তাদের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে এবং রাষ্ট্রক্ষমতা বনু উমাইয়ার হস্তচ্যুত হয়। ...
এতৎসত্ত্বেও আমরা এ দাবি করছি না যে, উমাইয়া শাসকগণ যাবতীয় ভুলত্রুটি হতে মুক্ত ছিলেন। ভুলত্রুটি ও অপূর্ণতা তো মানবিক বৈশিষ্ট্যেরই অংশ। এ কথা নিঃসন্দেহে সত্য যে, বনু উমাইয়ার শাসন-ইতিহাসে অনেক ভুলত্রুটি রয়েছে; তদ্রূপ এ কথাও সত্য যে, মুসলিম উম্মাহর প্রতি উমাইয়া সালতানাতের যে অনুগ্রহ-অবদান, তা বিবেচনা করলে সেসব ভুলত্রুটিকে উপেক্ষা করা যায়; বরং তা ধুয়ে মুছে যায়। বনু উমাইয়ার শাসনামল ৪১ হিজরি থেকে ১৩২ হিজরি (৬৬১-৭৫০ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত বিরানব্বই বছর স্থায়ী ছিল। উমাইয়া সালতানাতের প্রথম খলিফা ছিলেন বিশিষ্ট সাহাবি হজরত মুয়াবিয়া বিন আবু সুফিয়ান রাযি.। মুয়াবিয়া রাযি.
সেই সুমহান সাহাবি, যিনি অনেক সমালোচকের বচন-আঘাত ও কলম- আঁচড় থেকে নিষ্কৃতি পাননি। তারা তার জীবনেতিহাস ও খিলাফত নিয়ে মিথ্যাচার করেছে, আরোপ করেছে নানা অপবাদ। হায়! ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য এ মহান সাহাবি যে অনন্যসাধারণ খেদমত আঞ্জাম দিয়েছেন, তার প্রতি অপবাদ আরোপের পূর্বে আমরা যদি তার এক- দশমাংশও আঞ্জাম দিতে পারতাম! ....
হজরত মুয়াবিয়া রাযি.-এর পর একের পর এক অন্যান্য উমাইয়া শাসক রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। তাদের মধ্যে প্রসিদ্ধতম ছিলেন আবদুল মালিক বিন মারওয়ান ও তার পরবর্তী বংশধরগণ; যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ওয়ালিদ, সুলায়মান, ২য় ইয়াযিদ ও হিশাম। এদের মাঝেই অতিক্রান্ত হয়েছেন সুমহান খলিফা উমর বিন আবদুল আজিজ রহ.। তিনিও সেই বনু উমাইয়ারই সন্তান, একশ্রেণির সমালোচক যাদের সমালোচনায় সদা মুখর। তিনিই সেই মহান খলিফা, যার শাসনামলে পৃথিবী লাভ করেছিল ন্যায় ও দয়া, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির দিশা। তাই তো ঐতিহাসিকগণ তাকে খোলাফায়ে রাশিদিনের 'পঞ্চম সদস্য' বলে গণ্য করেছেন।
উমাইয়া সালতানাতের ইতিহাসে মন্দ যা কিছু, তা মূলত ছড়িয়ে আছে তাদের শেষ সাত বছরের ইতিহাসে। এ সাত বছরের ইতিহাস বিভিন্ন ট্রাজেডি এবং ইসলামি মানহাজ হতে বিচ্যুতির নানা ধরনের ঘটনা- দুর্ঘটনায় ভরপুর। কুদরতের নিয়ম মেনেই তখন 'সুন্নাতুল্লাহ' কার্যকর হয়, উমাইয়া সালতানাতের পতন ঘটে আর বনু আব্বাসের শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়।
টিকাঃ
৬৮. 'খিলাফতে বনু উমাইয়া সম্পর্কে ড. রাগিব সারজানির পর্যালোচনা' শিরোনামের আলোচনাটি অনুবাদক কর্তৃক 'আন্দালুসের ইতিহাস' গ্রন্থ থেকে সংযোজন করা হয়েছে।
৬৯. ইবনে হায্য, রাসাইলু ইবনি হায্য, ২/১৪৬।
৭০. ড. রাগিব সারজানি, আন্দালুসের ইতিহাস, ১/৫২-৫৬।