📄 চীনভূমিতে অভিযান
বিখ্যাত সেনাপতি কুতায়বা বিন মুসলিম রহ. এরপর পূর্ব দিকে তার অভিযান অব্যাহত রাখেন এবং ৯৬ হিজরি সনে (৭১৫ খ্রিষ্টাব্দে) চীনের কাশগড় অঞ্চল জয় করেন। এরপর তিনি চীন সম্রাটের কাছে কয়েকজন দূত পাঠিয়ে তাকে সতর্ক করেন এবং তাকে ইসলাম গ্রহণ বা জিজিয়া প্রদানের আহ্বান জানান।
কুতায়বার প্রেরিত দূতদের সঙ্গে চীনসম্রাটের যে কথোপকথন হয়, তা নিম্নে তুলে ধরা হলো।
চীন সম্রাট—তোমরা তো আমার রাজ্যের বিশালতা দেখেছ। আমার হাত থেকে কেউ তোমাদের রক্ষা করতে পারবে না। (এই বিশাল রাজ্যে) তোমাদের অবস্থান আমার হাতের তালুতে একটি ডিমের মতো। সুতরাং তোমরা তোমাদের সঙ্গীর (কুতায়বা) কাছে ফিরে যাও এবং তাকে বলো, সে যেন আমার রাজ্য থেকে চলে যায়। আমি তার লালসার বিষয়টি অনুমান করতে পেরেছি, উপলব্ধি করতে পেরেছি তার সৈন্যস্বল্পতার বিষয়টিও। যদি তোমরা না ফেরো, তাহলে আমি তোমাদের বিরুদ্ধে এমন বিশাল এক বাহিনী প্রেরণ করব, যারা তোমাদের শেষ ব্যক্তিটিকেও নিঃশেষ করে ছাড়বে।
কুতায়বার দূত—আপনি কুতায়বাকে এ কথা বলতে বলছেন?! তার সৈন্যসংখ্যা কীকরে অল্প হবে! তার বাহিনীর প্রথমাংশ তো আপনার রাজ্যে আর শেষ অংশ জয়তুনভূমিতে (দারুল খিলাফাহ দামেশকে)! যিনি বিশাল জগৎ জয় করার পরও তা পেছনে ফেলে আপনার রাজ্যে আপনার
বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এসেছেন, তিনি কী করে সম্পদলোভী হতে পারেন?! আর আমাদেরকে নিহত ও নিঃশেষ হওয়ার ভয় দেখাচ্ছেন? আমরা তো ভালো করেই জানি যে, আমাদের প্রত্যেকেরই একটি ‘আজাল’ ও সুনির্ধারিত আয়ু রয়েছে। আর মৃত্যু যখন অবশ্যম্ভাবী, সুতরাং লড়াই করতে করতে শহিদ হওয়াই আমাদের কাছে সবচেয়ে মর্যাদার মৃত্যু। আমরা মৃত্যুকে ভয় করি না, অপছন্দও করি না।
চীন সম্রাট—তাহলে তোমাদের সেনাপতি কী পেলে খুশি হবেন?
কুতায়বার দূত—তিনি তো শপথ করেছেন যে, আপনার দেশের মাটি পদদলিত না করে, আপনার রাজত্ব শেষ না করে এবং আপনার দেশ থেকে জিজিয়া সংগ্রহ না করে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করবেন না।
চীন সম্রাট—আমি তার শপথ পূর্ণ করে এ দেশ থেকে বের হয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করছি। আমি তার কাছে আমার দেশের কিছু মাটি ও চারজন রাজপুত্রকে প্রেরণ করছি। সঙ্গে প্রচুর স্বর্ণ, রেশমি কাপড় এবং এমন অমূল্য কিছু চীনা পরিচ্ছদ পাঠাচ্ছি, যার মূল্য আন্দাজ করাও কঠিন।
কথামতো চীনা সম্রাট এ সবকিছু প্রেরণ করলে কুতায়বা তা গ্রহণ করে নেন। কারণ, এরইমধ্যে তার কাছে খলিফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিকের মৃত্যুসংবাদ এসে পৌঁছেছিল এবং এ কারণে তার যুদ্ধস্পৃহায় ভাটা সৃষ্টি হয়েছিল।
৯৮ হিজরি সনে ইয়াযিদ বিন মুহাল্লাবের নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী জুরজান জয় করে। উক্ত অভিযানের একটি ঘটনা আমাদের সামনে অভিযানে অংশগ্রহণকারী মহান সৈন্যদের সুউচ্চ আত্মিক চেতনা ও সমুন্নত মূল্যবোধের বিষয়টি তুলে ধরে।
ইয়াযিদ বিন মুহাল্লাব এক লক্ষ বিশ হাজার সৈন্য নিয়ে জুরজানে অভিযান চালিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ষাট হাজার ছিল শামের বাহিনীর সদস্য। জুরজান বিজয়ের মাধ্যমেই আশেপাশের অন্যান্য অঞ্চলে অভিযানের পথ
উন্মুক্ত হয়, রাস্তাঘাটে চলাচল শুরু হয়। অত্যন্ত ভীতিপ্রদ এসব পথে ইতিপূর্বে ভুলেও কেউ পা বাড়াত না। অভিযানে ইয়াযিদ বিন মুহাল্লাব প্রচুর গনিমত লাভ করেন, যার মধ্যে অতি মূল্যবান মণি-মুক্তা খচিত একটি রাজমুকুটও ছিল। এ সময় ইয়াযিদ উপস্থিত সৈন্যদের প্রশ্ন করেন, 'তোমরা কি এমন কাউকে চেনো, যিনি এই মুকুটটি দেখার পর এর প্রতি সামান্য আগ্রহও বোধ করবেন না?' সকলে উত্তর দেয়, 'না, আমরা এমন কারও কথা জানি না।' ইয়াযিদ বলেন, 'আল্লাহর শপথ! আমি এমন এক ব্যক্তির কথা জানি, যার সামনে বা যার মতো লোকদের সামনে এই মুকুট পেশ করা হলে এর প্রতি মোটেও আগ্রহী হবেন না।' এরপর তিনি তার বাহিনীর সদস্য (তাবেয়ি) মুহাম্মাদ বিন ওয়াসিকে আহ্বান করেন এবং তাকে রাজমুকুটটি গ্রহণ করতে বলেন। উত্তরে মুহাম্মাদ বলেন, 'আমার এর প্রয়োজন নেই।' তখন ইয়াযিদ তাকে বলেন, 'আমি শপথ করে বলছি, আপনাকে এটা নিতে হবে।' এরপর তিনি মুকুটটি নিয়ে সেখান থেকে উঠে যান। তখন ইয়াযিদ তাকে অনুসরণ করার জন্য এক ব্যক্তিকে নির্দেশ দেন এবং তিনি মুকুটটি নিয়ে কী করেন, তা লক্ষ করতে বলেন। যাওয়ার পথে এক ভিক্ষুক মুহাম্মাদ বিন ওয়াসির কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করলে তিনি তাকে মুকুটটি দিয়ে দেন। সংবাদ পেয়ে ইয়াযিদ লোক পাঠিয়ে ভিক্ষুকটির কাছ থেকে মুকুটটি নিয়ে নেন এবং বিনিময়ে তাকে প্রচুর অর্থ প্রদান করেন।
১১০ হিজরি সনে মাসলামা বিন আবদুল মালিক তুর্কি শাসক খাকানের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন। মাসলামার মোকাবিলায় খাকান সুবিশাল বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হয়। প্রায় এক মাস উভয় বাহিনী আপন আপন অবস্থানে অপেক্ষারত থাকে। অবশেষে শীতকালে আল্লাহ তাআলা খাকানের বাহিনীকে পর্যুদস্ত করেন। মাসলামা যুদ্ধলব্ধ সম্পদ নিয়ে নিরাপদে প্রত্যাবর্তন করেন। শামে ফেরার পথে মাসলামা জুলকারনাইনের পদচিহ্ন অনুসরণ করেন। এ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদেরকে 'কাদামাটির যোদ্ধা' বলা হয়। কারণ, তারা এ অভিযানে কাদামাটি ও চোরাবালিতে ভরা বিভিন্ন স্থান অতিক্রম করে; অনেক পশু তাতে ডুবে যায় এবং বহু সৈনিক কাদামাটিতে আটকে যায়। বহু ঘাত-প্রতিঘাত, প্রতিকূল পরিস্থিতি ও দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে মুসলিম বাহিনী শামে প্রত্যাবর্তন করতে সক্ষম হয়।
১১২ হিজরিতে তুর্কিস্তানে পরিচালিত এক অভিযান সম্পর্কে ঐতিহাসিক ইবনে কাছির রহ. লিখেছেন—
তুর্কিরা মুসলিম বাহিনীর ডানবাহুর ওপর হামলা চালায়। বাহিনীর এ অংশে ছিল তামিম ও আদ্দ গোত্র। তুর্কিদের আক্রমণে এই দুই গোত্রসহ অন্যান্য বিভিন্ন গোত্রের অনেক সৈন্য শহিদ হয়ে যায়। শাহাদাত তো আল্লাহর অনুগ্রহ-দান; তিনি যাকে ইচ্ছা, তাকে এই মহাসম্পদ দান করেন। এ সময় মুসলিম বাহিনীর জনৈক বীর যোদ্ধা চরম রণনিপুণতা প্রদর্শন করে এবং তুর্কি বীর যোদ্ধাদের একটি দলের সঙ্গে একাই লড়াই করে তাদের সকলকে হত্যা করে। এ অবস্থা দেখে খাকানের শাহি ঘোষক ঘোষণা করে, 'তুমি যদি আমাদের দলে চলে আসো, তাহলে আমরা তোমাকে আমাদের সবচেয়ে বড় মূর্তির পরিচালক পদে বরণ করে নেব এবং তোমারও পূজা করব।' তখন সেই মহান যোদ্ধা উত্তর দেন, 'ধিক তোমাদের! আমরা তো তোমাদের বিরুদ্ধে কেবল এ জন্য যুদ্ধ করছি যে, তোমরা এক আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও উপাসনা করবে না। আল্লাহর কোনো শরিক নেই।' এরপর তিনি তুর্কিদের বিরুদ্ধে লড়তে লড়তে শহিদ হয়ে যান। আল্লাহ তার প্রতি দয়া করুন। এই বীর যোদ্ধার শাহাদাতের পর মুসলিম বাহিনীর অন্যান্য বীর যোদ্ধারা অগ্রসর হয় এবং অটল-অবিচল থেকে যুদ্ধ করতে থাকে। তারা একযোগে তুর্কিদের ওপর হামলা চালালে আল্লাহ তাআলা তুর্কিদের পর্যুদস্ত করেন এবং তাদের প্রচুর সৈন্য নিহত হয়। এরপর তুর্কিরা পাল্টা হামলা চালিয়ে মুসলিম বাহিনীর প্রচুর সৈন্যকে হত্যা করে। মুসলিম বাহিনীর মাত্র দু-হাজার সৈন্য ব্যতীত সকলে শহিদ হয়ে যায়। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। মুসলিম সৈন্যদের অনেককে বন্দি করে খাকানের সামনে উপস্থিত করা হলে তার নির্দেশে তাদের প্রত্যেককে হত্যা করা হয়। ইন্না লিল্লাহি...। এ যুদ্ধকে ঘাঁটির যুদ্ধ বলা হয়।
১১৯ হিজরি সনে (৭৩৭ খ্রিষ্টাব্দে) আসাদ বিন আবদুল্লাহ কাসরি রহ. তুর্কি মহারাজ খাকানকে হত্যা করেন। এর বিস্তারিত বিবরণ হলো-
খাকান এ সময় মুসলিম বাহিনীকে চূড়ান্তরূপে ধ্বংস করার জন্য বিশাল সেনাবাহিনী প্রস্তুত করে। মুসলিম বাহিনীর মনোবল দুর্বল করার উদ্দেশ্যে খাকান প্রচার করে যে, মুসলিম সেনাপতি আসাদ নিহত হয়েছেন। কিন্তু আল্লাহ তার কূট-কৌশলকে বুমেরাং করে দেন এবং তার ফাঁদে তাকেই ধ্বংস করেন। মুসলিম বাহিনীর সদস্যরা আসাদের মৃত্যুসংবাদ শুনে দ্বীনি চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে এবং দুশমনের বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভ ও ক্রোধ আরও বৃদ্ধি পায়। তারা তাদের সেনাপতিহত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার সংকল্প করে। এরপর আসাদ যে স্থানে ছিলেন, তারা সে স্থান অভিমুখে রওনা হয়। সেখানে পৌঁছে তারা আসাদকে জীবিত দেখতে পায়। এরপর আসাদ সবাইকে নিয়ে খাকানের বাহিনীর উদ্দেশে রওনা হন। জাবালে মিল্লহ নামক স্থানে পৌঁছে তিনি বলখ নদী পাড়ি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে ছিল প্রচুর যুদ্ধলব্ধ সম্পদ। সেনাপতি আসাদ এসব সম্পদ ফেলে যেতে চাচ্ছিলেন না। তিনি অশ্বারোহী সৈন্যদের নির্দেশ দেন যে, প্রত্যেকে যেন সামনে একটি এবং ঘাড়ে করে একটি ছাগল বহন করে নিয়ে যায়। নির্দেশ অমান্য করা হলে তিনি হাত কেটে ফেলার হুমকি দেন। তিনি নিজেও একটি ছাগল কাঁধে নিয়ে সবার সঙ্গে নদী পাড়ি দেন।
মুসলিম বাহিনী তখনও ভালো করে নদী পাড়ি দিতে পারেনি, এরই মধ্যে খাকান পেছন দিক থেকে তার বাহিনী নিয়ে উপস্থিত হয়। মুসলিম বাহিনীর যেসব সদস্য তখনও নদী পার হতে পারেনি, খাকানের বাহিনী তাদেরকে হত্যা করে। এরপর খakান মুসলিম বাহিনীর অনুসরণ করে নদী পাড়ি দিয়ে মুসলিম ছাউনির কাছে চলে আসে। মুসলিম বাহিনী নিজেদের ছাউনিতেই অবস্থান করছিল। তারা চতুর্দিক পরিখা ঘেরা একটি স্থানে ছাউনি স্থাপন করেছিল বিধায় খাকানের বাহিনীর পক্ষে মুসলিম বাহিনীর নাগাল পাওয়া সম্ভব ছিল না। রাতের বেলা উভয় পক্ষের সামনে অপর পক্ষের প্রজ্বলিত আগুন দৃষ্টিগোচর হচ্ছিল। প্রত্যুষে খাকান মুসলিম বাহিনীর একটি অংশের ওপর হামলা চালিয়ে অনেককে হত্যা করে, কতক সৈন্যকে বন্দি করে এবং সম্পদবোঝাই কয়েকটি উট নিয়ে যায়।
এরপর আসাদ ও তার বাহিনী সামনে অগ্রসর হয়ে বলখের মান্জ ভূমিতে অবতরণ করে। ততদিনে শীতকালও শেষ হয়ে গেছে। ঈদুল আযহার
দিন আসাদ সকলের সম্মুখে খুতবা প্রদান করেন এবং সম্ভাব্য তিন করণীয় হতে একটি বেছে নেওয়ার বিষয়ে সকলের পরামর্শ চান— ১. মার্ভে ফিরে যাওয়া ২. খাকানের সুবিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া ৩. বলখে সুরক্ষিত অবস্থান গড়ে তোলা। সৈন্যগণ খাকানের মোকাবিলা করার পক্ষে মত দেয়। এরপর আসাদ সকলকে নিয়ে দীর্ঘ সময় নিয়ে দু-রাকাত নামাজ আদায় করেন, তারপর দীর্ঘক্ষণ দোয়া করেন। এরপর তিনি এই বলে রওনা হন যে, ইনশাআল্লাহ তোমরা জয়ী হবে। বাস্তবেও মুসলমানরা যুদ্ধে জয়লাভ করে আর তুর্কি মহারাজ খাকান নিহত হয়।
১২৩ হিজরি সন শুরু হওয়ার পূর্বেই তুর্কিদের সমাজব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। তারা নিজেদের মধ্যে দাঙ্গা-হাঙ্গামায় জড়িয়ে পড়ায় তুর্কিস্তান ধ্বংসপ্রায় অবস্থায় উপনীত হয়। স্বাভাবিকভাবেই গৃহযুদ্ধে ব্যতিব্যস্ত তুর্কিদের তখন মুসলমানদের প্রতি মনোযোগী হওয়ার সুযোগ ছিল না।
টিকাঃ
৬৩. ওয়ালিদের পর খলিফা পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন তার ভাই সুলায়মান বিন আবদুল মালিক। কুতায়বা বিন মুসলিম যেহেতু ইতিপূর্বে সুলায়মানের খিলাফতপ্রাপ্তির বিষয়ে বিরোধিতা করেছিলেন, তাই স্বভাবতই তিনি খলিফা ওয়ালিদের প্রয়াণ ও সুলায়মানের দায়িত্বলাভের সংবাদ পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। কুতায়বা আশঙ্কা করছিলেন যে, সুলায়মান তার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন।
৬৪. ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৯/২৮১-২৮২।
📄 ভারতবর্ষে বিজয়াভিযান
প্রাচীনকাল থেকেই ভারতবর্ষে আরব বণিকগণের আসা-যাওয়া ছিল। খলিফা উমর রাযি.-এর খিলাফত আমলে সাহাবি হাকাম বিন উমায়র তাগলাবি রাযি.-এর নেতৃত্বে মুসলমানরা প্রথম সিন্ধুর মাকরান অঞ্চল জয় করে।
উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিকের শাসনামলে ৯০ হিজরি সনে সরনদ্বীপ থেকে একটি আরব বণিক কাফেলা ইরাকে ফেরার মনস্থ করলে সেখানে আগে থেকেই বসবাসরত একদল আরব বণিক সপরিবারে হজব্রত পালন ও ইরাকে দারুল খিলাফাহ পরিদর্শনের জন্য তাদের সঙ্গী হয়। এ ছাড়াও যেসব আরব বণিক সরণদ্বীপেই মারা গেছে, তাদের অনেকের স্ত্রী-সন্তানও কাফেলায় শরিক হয়। এ সময় তৎকালীন সরনদ্বীপের রাজা মুসলমানদের সঙ্গে সুসম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে সমকালীন উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিক ও ইরাকের গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফের জন্য দাস-দাসী, মণি-মুক্তাসহ বহুমূল্য ও দুর্লভ বিভিন্ন উপহারসামগ্রী ইরাকে প্রেরণ করেন। সব মিলে আঠারোটি
বড় বড় জাহাজ সরনদ্বীপ থেকে ইরাক অভিমুখে রওনা হয়। পথিমধ্যে সিন্ধুর দেবল বন্দর অতিক্রম করার সময় কাফেলাটি একদল দস্যু কর্তৃক আক্রান্ত হয়। দস্যুরা জাহাজগুলো দখল করে সব সম্পদ লুট করে নেয় এবং দাস-দাসী ও আরব নারী-পুরুষদের দেবলে নিয়ে যায়।
কয়েকজন বণিক কোনোমতে পালিয়ে ইরাকে পৌঁছে হাজ্জাজ বিন ইউসুফকে বিস্তারিত অবহিত করে। বিগত কয়েক বছর যাবৎ বিভিন্ন আরব বণিক কাফেলার ওপর এসব জলদস্যুর উপর্যুপরি আক্রমণ এবং সিন্ধুর রাজা কর্তৃক উমাইয়া খিলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহকারীদের সহায়তাদানের কারণে আগে থেকেই হাজ্জাজ রাগান্বিত ছিলেন। এবার সিন্ধুর জলদস্যুদের হাতে মুসলিম নারীদের অপহৃত হওয়ার সংবাদ শুনে তিনি ক্রোধে অধীর হয়ে যান। তবে মুসলিম নারীদের উদ্ধার করার জন্য হাজ্জাজ প্রথমে কূটনৈতিক পথ অবলম্বনের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি মাকরানে নিযুক্ত প্রশাসক মুহাম্মাদ বিন হারুনের মাধ্যমে সিন্ধুর রাজা দাহিরের কাছে একটি প্রতিনিধিদল প্রেরণ করেন এবং মুসলিম নারী ও আরব ব্যবসায়ীদের মুক্তি দেওয়ার এবং জাহাজগুলো ফিরিয়ে দেওয়ার অনুরোধ করে একটি বার্তা প্রেরণ করেন। কিন্তু সিন্ধুর ব্রাহ্মণ রাজা দাহির প্রতিনিধিদলকে কঠোর ভাষায় জানিয়ে দেন যে, তিনি এসব জলদস্যুর খোঁজখবর রাখেন না এবং তার পক্ষে তাদেরকে পাকড়াও করা সম্ভব নয়।
এরইমধ্যে হাজ্জাজ বিশ্বস্ত সূত্রে নিশ্চিত হন যে, অপহৃত আরব নারী-পুরুষগণ দেবলের কারাগারে বন্দি আছে। এর ফলে বিদ্রোহীদের সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি সিন্ধুরাজ নিজেই যে আরবদের বিরুদ্ধে জলদস্যুদের এসব অভিযানে সরাসরি জড়িত, তা-ও প্রমাণিত হয়। এরপর সিন্ধুরাজের প্রদত্ত নেতিবাচক উত্তর জানতে পেরে হাজ্জাজের ক্রোধ চরমে পৌঁছায়। সিন্ধুরাজ দাহিরের অসদুদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে হাজ্জাজ এবার সিন্ধু অভিমুখে অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন।
৯০ হিজরি সনে হাজ্জাজ উবায়দুল্লাহ বিন নাবহানের নেতৃত্বে সমুদ্রপথে একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। কিন্তু দাহিরের বাহিনীর হাতে সেনাপতি উবায়দুল্লাহসহ অধিকাংশ অভিযাত্রী শহিদ হলে অভিযানটি ব্যর্থ হয়। এ সংবাদ পেয়ে সামান্য হতোদ্যম না হয়ে হাজ্জাজ ৯১ হিজরি সনে বুদায়ল
বিন তহফা আল-বাজালির নেতৃত্বে আরেকটি বাহিনী দেবল অভিমুখে প্রেরণ করেন। মাত্র তিনশ অশ্বারোহী সৈন্যের এ বাহিনীটি ইরান হয়ে মাকরানে পৌঁছলে হাজ্জাজের নির্দেশে মাকরানের গভর্নর মুহাম্মাদ বিন হারুন আরও তিন হাজার সৈন্য সরবরাহ করেন। মুসলিম বাহিনী দেবলে পৌঁছলে সিন্ধুরাজ দাহির তার পুত্রের নেতৃত্বে হাতির পাল ও বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত বিশাল এক বাহিনী মুসলমানদের মোকাবিলায় প্রেরণ করেন। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলতে থাকা প্রচণ্ড রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর সদস্যরা প্রবল বিক্রমে লড়াই করলেও দিনের শেষ ভাগে সেনাপতি বুদায়ল শহিদ হন এবং আরব বাহিনী পরাজিত হয়। জীবিত মুসলিম সৈন্যদের বন্দি করে পাঠিয়ে দেওয়া হয় দেবলের কারাগারে।
বুদায়ল বিন তহফার ন্যায় মহান ও দক্ষ একজন সেনাপতির মৃত্যু হাজ্জাজকে আরও ব্যথিত করে তোলে। তিনি এবার অপহৃতদের উদ্ধারের পাশাপাশি সিন্ধু জয় করে সেখানে ইসলামের পতাকা উড্ডীন করার সংকল্প করেন। হাজ্জাজ খলিফা ওয়ালিদের কাছে বার্তা পাঠিয়ে বিস্তারিত অবহিত করেন এবং সিন্ধু অভিমুখে বৃহৎ আকারের বাহিনী প্রেরণ করে অপহৃতদের উদ্ধার, রাজা দাহিরকে উপযুক্ত শিক্ষাদান ও সিন্ধুবিজয়ের অনুমতি প্রার্থনা করেন। কিন্তু দারুল খিলাফাহ থেকে বহু দূরে অবস্থিত অত্যন্ত দুর্গম ও বিস্তৃত এ অঞ্চলে অভিযান পরিচালনা করলে প্রচুর অর্থব্যয়ের পাশাপাশি বহু প্রাণহানির আশঙ্কা আছে বলে খলিফা তাতে অসম্মতি প্রকাশ করেন। হাজ্জাজ আবারও বার্তা পাঠিয়ে তার সামরিক পরিকল্পনা বিস্তারিত তুলে ধরেন এবং আরব বাহিনীর বিজয়ের নিশ্চয়তা প্রদানের পাশাপাশি এ কথাও উল্লেখ করেন যে, সিন্ধু জয়ের পর অভিযান খরচের কয়েক গুণ সম্পদ ইসলামি রাষ্ট্রের কোষাগারে ফেরত আসবে। অবশেষে সর্বদিক বিবেচনা করে খলিফা সিন্ধু অভিযানের অনুমতি প্রদান করেন।
৯২ হিজরি সনে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ তার চাচাতো ভাই ও জামাতা মুহাম্মাদ বিন কাসিম আস-সাকাফির নেতৃত্বে সিন্ধু অভিমুখে একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। মুহাম্মাদ বিন কাসিম তখন সদ্য সতেরো বছর বয়সে উপনীত রণকুশলী এক বীর যোদ্ধা। ইরাকের প্রশাসন ও সাধারণ জনগণের আবেগপূর্ণ বিদায়ী অভিবাদনে সিক্ত হয়ে মুসলিম বাহিনী দেবল অভিমুখে রওনা হয়। সিরাজে পৌঁছে মুহাম্মাদ বিন কাসিম তার বাহিনীকে পুনঃবিন্যস্ত করেন এবং বাহিনীর একটি অংশকে নৌপথে দেবলের উদ্দেশে।
পাঠিয়ে দেন। এরপর তিনি মূল বাহিনীকে নিয়ে ৯২ হিজরি সনের শেষদিকে স্থলপথে মাকরানে পৌঁছান।
এদিকে রাজা দাহির আরব বাহিনীর মাকরানে পৌঁছার সংবাদ পেয়ে সসৈন্য রাজধানী থেকে বেরিয়ে এসে মাকরানে মুসলিম বাহিনীর মোকাবিলা করার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু সিন্ধুর প্রবীণ নেতৃবৃন্দ তাকে নিজে যুদ্ধে বের হতে নিষেধ করে। তারা দাহিরকে অভয় দিয়ে বলে যে, ইতিপূর্বে যেমন রাজার অংশগ্রহণ ছাড়াই উবায়দুল্লাহ বিন নাবহান ও বুদায়ল বিন তহফার বাহিনীকে পরাজিত করা হয়েছে, এবার তেমনই দেবলের মাটিতে মুহাম্মাদ বিন কাসিমের বাহিনীকে পর্যুদস্ত করা হবে।
মুহাম্মাদ বিন কাসিম মাকরান থেকে রওনা হওয়ার পর সিন্ধু নদের পশ্চিমে অবস্থিত বিভিন্ন এলাকা জয় করে সামনে অগ্রসর হতে থাকেন। দেবলের অবস্থান ছিল সিন্ধু নদের পূর্ব পাশে। মুহাম্মাদ বিন কাসিমের নেতৃত্বাধীন স্থল বাহিনী দেবলে পৌঁছতেই নির্ধারিত সময়ে সিরাজ থেকে রওনা হওয়া অস্ত্র ও রসদবোঝাই নৌবহরও দেবলে পৌঁছে যায়। দেবলে পৌঁছেই সেনাপতি মুহাম্মাদ বিন কাসিম নগরদুর্গের চারপাশে পরিখা খনন করে সৈন্য মোতায়েন করেন। এরপর তিনি 'আরুস' নামক বিরাটাকার একটি কামানসহ বিভিন্ন কামান স্থাপন করেন। আরুস কামানটি পরিচালনা করতে পাঁচশ সৈন্যের প্রয়োজন হতো।
মুসলিম বাহিনী আক্রমণ শুরু করলে দুর্গ থেকে জনৈক ব্রাহ্মণ বের হয়ে এসে নিরাপত্তা প্রার্থনা করে। মুহাম্মাদ বিন কাসিম তাকে নিরাপত্তা প্রদান করলে সে জানায় যে, তাদের জ্যোতির্বিদদের বিশ্বাস অনুযায়ী সিন্ধু একদিন মুসলমানদের হাতে বিজিত হবে। তবে দেবল দুর্গের প্রধান মন্দিরের শীর্ষদেশে স্থাপিত সবুজ রঙের বিশেষ পতাকাটি যতদিন উড়তে থাকবে, ততদিন সিন্ধুর পতন ঘটবে না। মুহাম্মাদ বিন কাসিম তাদের এই ভ্রান্ত আকিদাকে মানসিকভাবে কাজে লাগানোর মনস্থ করেন। তিনি কামান পরিচালনাকারী বাহিনীর সেনাপতি জুউবাকে পতাকাটি ভূপাতিত করার নির্দেশ দিলে জুউবা গোলার আঘাতে মন্দিরের কোনো ক্ষতি করা ছাড়াই পতাকাটি ভূপাতিত করেন। এর ফলে দেবলবাসীর মনোবল পুরোপুরি ভেঙে পড়ে।
এরপর মুহাম্মাদ বিন কাসিম দুর্গ জয়ে মনোনিবেশ করেন। তার নির্দেশে মুসলিম বাহিনী চারদিক থেকে একযোগে দুর্গের ওপর আক্রমণ শুরু করে।
করে। এর ফাঁকে কয়েকজন দুঃসাহসী সৈনিক দুর্গপ্রাচীরে মই স্থাপন করে প্রাচীরের ওপর উঠতে সক্ষম হন এবং ভেতরে প্রবেশ করে দুর্গের প্রবেশদ্বার উন্মুক্ত করে দেন। যেহেতু এই দুর্গেই মুসলিম বণিক ও নারীদের বন্দি করে রাখা হয়েছিল, তাই হাজ্জাজ বিন ইউসুফ সেনাপতি মুহাম্মাদ বিন কাসিমকে এই দুর্গের সকল সৈন্যদের হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে অন্য সকল নগরী জয় করার ক্ষেত্রে তিনি কঠোরভাবে কাউকে হত্যা করতে নিষেধ করেছিলেন এবং কেউ যদি আত্মসমর্পণের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে মুসলিম বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করে, কেবল তাকেই হত্যা করার অনুমতি দিয়েছিলেন। মুসলমানরা দুর্গটি জয় করার পর দুর্গপ্রধান রাতের অন্ধকারে পালিয়ে রাজা দাহিরের কাছে চলে যায়। এরপর মুহাম্মাদ বিন কাসিম অপহৃত নারী ও বন্দি বণিকদের কারাগার থেকে মুক্ত করেন।
৯৩ হিজরি সনের রজব মাসে দেবল নগরী ও দেবল দুর্গ বিজিত হয়। দেবল জয়ের পর সেনাপতি মুহাম্মাদ বিন কাসিম যুদ্ধলব্ধ সম্পদের এক-পঞ্চমাংশ দামেশকে পাঠিয়ে দেন। তিনি দেবলের অভ্যন্তরে একটি জায়গা নির্দিষ্ট করে সেখানে চার হাজার আরবের বসবাসের ব্যবস্থা করেন এবং সেখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন।
বন্দরনগরী দেবল জয় করার পর মুহাম্মাদ বিন কাসিম দেবল হতে প্রায় পঁচিশ ফরসখ দূরে অবস্থিত নেরুন নগরী জয়ের মনস্থ করেন। মুসলিম বাহিনী ছয় দিন পর নেরুনে পৌঁছে নগরীটি অবরোধ করে। নগরীর বৌদ্ধ প্রশাসক তখন অনুপস্থিত ছিলেন। এদিকে মুহাম্মাদ বিন কাসিম প্রয়োজনীয় আহারদ্রব্য ও রসদের স্বল্পতায় চিন্তিত ছিলেন। এরইমধ্যে নগরপ্রশাসক রাজধানী থেকে নেরুনে উপস্থিত হন এবং তার দূতকে প্রয়োজনীয় আহারদ্রব্যসহ মুহাম্মাদ বিন কাসিমের কাছে প্রেরণ করেন। দূত মুসলিম সেনাপতি মুহাম্মাদ বিন কাসিমকে হাজ্জাজ বিন ইউসুফের স্বহস্তে লিখিত একটি পত্রও হস্তান্তর করে। পত্রে হাজ্জাজ উল্লেখ করেছিলেন যে, নেরুনের প্রশাসক ও নেরুনবাসী মুহাম্মাদ বিন কাসিম সিন্ধুতে আগমনের পূর্বেই হাজ্জাজের সঙ্গে এক গোপন চুক্তির মাধ্যমে আরবদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছে। এরপর নেরুন-প্রশাসক আরব বাহিনীর জন্য নগরদ্বার উন্মুক্ত করে দেন এবং নিজে মুহাম্মাদ বিন কাসিমের কাছে উপস্থিত হয়ে দুর্লভ ও অতিমূল্যবান প্রচুর উপঢৌকন
প্রদান করেন। মুহাম্মাদ বিন কাসিম নগরীটির প্রশাসনব্যবস্থা নতুন করে বিন্যস্ত করেন, জনৈক আরবকে নগরীটির প্রশাসক নিযুক্ত করেন এবং সাবেক বৌদ্ধ প্রশাসককে নিজের রাজনৈতিক উপদেষ্টার দায়িত্ব প্রদান করেন। মুহাম্মাদ বিন কাসিম নেরুনেও একটি মসজিদ নির্মাণ করেন।
এরপর মুহাম্মাদ বিন কাসিম সেওয়ান অভিমুখে অগ্রসর হন এবং অবরোধের পর নগরীটি জয় করেন। সেওয়ানের জনগণ তাদের প্রশাসককে মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে সন্ধিচুক্তি করার অনুরোধ করলেও সে তা প্রত্যাখ্যান করে এবং রাতের আঁধারে পালিয়ে চলে যায়। মুহাম্মাদ বিন কাসিম সেওয়ানে প্রবেশ করে সেখানেও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে আরবদের নিয়োগ দেন। সেওয়ান অভিযান চলাকালে সেখানকার কিছু অধিবাসী মুসলিম অভিযাত্রীদের নামাজের বিনম্রতা প্রত্যক্ষ করে ইসলাম গ্রহণ করে।
এরপর মুহাম্মাদ বিন কাসিম বোদিহা অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হন। সংবাদ পেয়ে বোদিহার প্রশাসক কাকা রাতের আঁধারে মুসলিম শিবিরের ওপর হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু তার প্রেরিত সৈন্যরা রাতের অন্ধকারে পথ হারিয়ে ফেলে। সারা রাত বিস্তীর্ণ মরুভূমিতে উদ্ভ্রান্তের ন্যায় ঘোরার পর সকালে তারা ফিরে গিয়ে প্রশাসক কাকাকে বিস্তারিত অবহিত করে।
তখন কাকা তার সেনাপতিদের নিয়ে মুসলিম শিবিরে আগমন করেন এবং মুহাম্মাদ বিন কাসিমের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। এরপর মুহাম্মাদ বিন কাসিম কাকার সহায়তায় একটি ক্ষুদ্র বাহিনী পাঠিয়ে এ অঞ্চলের বিদ্রোহীদের দমন করেন। মুহাম্মাদ বিন কাসিম এখানেও কয়েকটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন এবং আরব বসতি স্থাপন করেন।
বোদিহা জয়ের পর মুহাম্মাদ বিন কাসিম নেরুনে ফিরে আসেন এবং সেখান থেকে আশবাহার অভিমুখে অগ্রসর হন। কয়েকদিন অবরোধ করে রাখার পর আশবাহারবাসী আত্মসমর্পণ করলে মুহাম্মাদ বিন কাসিম তাদেরকে নিরাপত্তাদান করেন। এরপর তিনি সামনে অগ্রসর হয়ে সিন্ধু নদের পশ্চিম তীরে পৌঁছান। নদের পূর্ব প্রান্তে রাওয়ার এলাকায় রাজা দাহিরের বাহিনী অবস্থান করছিল। মুহাম্মাদ বিন কাসিম নদ পার হওয়ার পূর্বে কয়েকটি ক্ষুদ্র বাহিনী গঠন করে তাদেরকে আশেপাশের বিভিন্ন এলাকায় মোতায়েন করে মুসলিম বাহিনীর পৃষ্ঠদেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। এরপর তিনি সঙ্গে করে নিয়ে আসা কাঠের তক্তা দিয়ে দ্রুত
একটি অস্থায়ী সেতু তৈরি করেন। মুসলিম বাহিনী এই অস্থায়ী সেতু ব্যবহার করে সিন্ধু নদ পার হয়। মুসলিম বাহিনীর নৌবহর আগে থেকেই বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়ে স্থলবাহিনীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করছিল। নদ পাড়ি দিয়েই আরব সৈন্যগণ প্রতিপক্ষের ওপর তিরবর্ষণ শুরু করে। প্রচণ্ড যুদ্ধের পর দাহিরের বাহিনী পরাজিত হয় এবং বেঁচে যাওয়া সৈন্যরা কোনোমতে পালিয়ে রাজার কাছে পৌঁছায়।
মুহাম্মাদ বিন কাসিম সিন্ধু নদ পাড়ি দিয়ে পশ্চিম প্রান্তে চলে আসায় এবং রাজধানীর আশেপাশের বিভিন্ন নগরীতে একে একে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করায় রাজা দাহির প্রচণ্ড উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। তিনি এবার সিন্ধুতে আশ্রয়গ্রহণকারী বিদ্রোহী আরবদের সর্দার মুহাম্মাদ বিন হারিস আল-আলাফিকে মুসলিম বাহিনীর মোকাবিলা করার অনুরোধ করেন। কিন্তু সম্মুখ সমরে মুহাম্মাদ বিন হারিসও পরাজিত হয়ে পলায়ন করে। এরপর দাহির তার পুত্র জয়সিংহের নেতৃত্বে একটি বিরাট বাহিনী প্রেরণ করলে তারাও পরাজিত হয়। এরপর মুহাম্মাদ বিন কাসিম তার বাহিনী নিয়ে আরও অগ্রসর হয়ে জয়পুরে শিবির স্থাপন করেন। কাছেই রাজা দাহিরও শিবির স্থাপন করেছিলেন।
শুরু হয় উভয় পক্ষের চূড়ান্ত লড়াই। প্রথম দিন দু-পক্ষের বিভিন্ন ক্ষুদ্র অংশের মধ্যে বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ চলতে থাকে। পরদিন শুরু হয় আসল যুদ্ধ। রাজা দাহির একশ হাতিসহ পাঁচ হাজার রাজপুতদের একটি বিশেষ বাহিনী, দশ হাজার অশ্বারোহী সৈন্য, ত্রিশ হাজার পদাতিক সৈন্য ও অসংখ্য স্বেচ্ছাসেবী সৈন্য নিয়ে মুসলিম বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। রাজা নিজে লৌহবর্ম পরিধান করে একটি বিশালাকার সাদা হাতিতে আরোহণ করেছিলেন এবং তার সঙ্গে দুজন ভৃত্য ছিল। ভৃত্যরা তাকে তির সরবরাহ করছিল।
৯৩ হিজরি সনের ৯ রমজান (৭১২ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ জুন) উভয় পক্ষের মধ্যে প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু হয়। প্রথমদিকে প্রতিপক্ষের হাতিগুলোর কারণে মুসলিম বাহিনী প্রচণ্ড দুর্ভোগের সম্মুখীন হয় এবং কয়েকজন সেনাপতি ও সুদক্ষ যোদ্ধা শহিদ হয়ে যান। এরপর মুসলমান যোদ্ধারা প্রচণ্ড বিক্রমে লড়াই করে প্রতিপক্ষের নয়টি হাতি হত্যা করতে সক্ষম হয়। প্রথম দিন যুদ্ধের ফলাফল ছিল উভয় পক্ষে দোদুল্যমান।
দ্বিতীয় দিন ১০ রমজান উভয় পক্ষ নতুন করে যুদ্ধ শুরু করে। একদিকে লক্ষাধিক পৌত্তলিক সৈন্য, আরেকদিকে এক আল্লাহয় বিশ্বাসী হাজার দশেক সৈন্য। যুদ্ধ শুরুর পূর্বে মুহাম্মাদ বিন কাসিম সকলকে যুদ্ধক্ষেত্রে অটল-অবিচল থাকার উপদেশ দেন এবং সর্বক্ষণ আল্লাহকে স্মরণ করতে বলেন। যুদ্ধ শুরু হতেই মুসলিম বাহিনী প্রতিপক্ষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। মুসলিম বাহিনীর কামান থেকে বর্ষিত গোলায় প্রতিপক্ষের হাতিগুলো প্রচন্ডরকম ভীত হয়ে পড়ে এবং হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটতে শুরু করে। যুদ্ধের একপর্যায়ে মুসলিম বাহিনী সাময়িক পিছু হটলেও মুহাম্মাদ বিন কাসিম উচ্চৈঃস্বরে সকলকে আহ্বান করে প্রতিপক্ষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। অবশেষে আল্লাহ তাআলা মুসলিম বাহিনীকে বিজয় দান করেন। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতেই মুহাম্মাদ বিন কাসিমের নির্দেশে তিরন্দাজ বাহিনী দাহিরের হাতি লক্ষ্য করে অগ্নিশর নিক্ষেপ করলে হাতির হাওদায় আগুন লেগে যায়। দাহির পালাতে উদ্যত হলে মুসলিম বাহিনী তার পশ্চাদ্ধাবন করে এবং তিরবৃষ্টি শুরু করে। এরইমধ্যে আমর বিন খালিদ আল-কিলাবি নামক জনৈক মুসলিম সৈন্য দাহিরকে হত্যা করেন।
এরপর মুহাম্মাদ বিন কাসিমের বাহিনী একে একে রাজধানী আরোর, বাহরুর, দলিলা ও ব্রাহ্মণাবাদসহ সিন্ধু অঞ্চলের অন্যান্য নগরীও জয় করে। সিন্ধু বিজয় শেষে মুহাম্মাদ বিন কাসিম তার বাহিনী নিয়ে পার্শ্ববর্তী পাঞ্জাব রাজ্যের রাজধানী মুলতানের দিকে অগ্রসর হয়ে মুলতানও জয় করেন। এরপর তিনি কির্জ জয় করেন এবং কনৌজ জয়ের লক্ষ্যে অগ্রসর হন। এরই মধ্যে দামেশক থেকে নতুন খলিফা সুলায়মান বিন আবদুল মালিক বার্তা পাঠিয়ে মুহাম্মাদ বিন কাসিমকে বরখাস্ত করেন এবং ইরাকে প্রত্যাবর্তনের নির্দেশ দেন। মুহাম্মাদ বিন কাসিমের অপসারণের মধ্য দিয়ে সিন্ধুতে বিজয়াভিযান স্থগিত হয়ে যায়।
মুহাম্মাদ বিন কাসিম মাত্র বারো হাজার সৈন্য নিয়ে সিন্ধুতে পৌঁছেছিলেন। এরপর অভিযান চলাকালে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ আরও চার হাজার সৈন্য প্রেরণ করেন। এই সীমিত সামরিক শক্তি নিয়েই তিনি সিন্ধুর বিস্তীর্ণ এলাকা জয় করতে সক্ষম হন। এর পেছনে যেমন তার রণকুশলতা ও সামরিক দক্ষতা বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল, তেমনই সিন্ধুবাসীর সঙ্গে মুসলিম অভিযাত্রীদের অনুপম উদার আচরণও বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। মুলতান অভিযানের সময় আরব বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ছিল প্রায় পঞ্চাশ
হাজার। অর্থাৎ সিন্ধুর অনেক নাগরিক এ অভিযানে মুসলিম বাহিনীর পক্ষে যুদ্ধ করেছিল। নিঃসন্দেহে এটি ইসলামের অনন্যসাধারণ চারিত্রিক উদারতার এক অনন্য অবদান।
খলিফা ওয়ালিদের মৃত্যুর পর খলিফা সুলায়মান বিন আবদুল মালিক, উমর বিন আবদুল আজিজ ও ইয়াযিদ বিন আবদুল মালিকের শাসনামলে এ অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য কোনো তৎপরতা পরিচালিত হয়নি। ১০৫ হিজরি সনে হিশাম বিন আবদুল মালিক খলিফা নির্বাচিত হওয়ার পর নতুন করে সিন্ধু অঞ্চলে বিজয়াভিযান শুরু হয়। ১০৭ হিজরি সনে জুনায়দ বিন আবদুর রহমানের নেতৃত্বে একটি বাহিনী সিন্ধুতে অভিযান পরিচালনা করে। মুহাম্মাদ বিন কাসিমের প্রস্থানের পর যেসব অঞ্চল বিদ্রোহ করেছিল, তিনি একে একে সেগুলো পুনরায় জয় করেন। এরপর তিনি পার্শ্ববর্তী ভারতবর্ষের উত্তর গুজরাটের বিভিন্ন নগরীও জয় করেন। ১১১ হিজরি সনে সেনাপতি জুনায়দ বিন আবদুর রহমান সিন্ধু অঞ্চল ত্যাগ করলে আবারও সিন্ধু অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। আরবরা সিন্ধুবাসীর সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, নিজেরাও অন্তর্দ্বন্দ্বের শিকার হয়। ১১২ হিজরি সনে হাকাম বিন আওয়ানা আল-কালবি সিন্ধুর গভর্নর নিযুক্ত হওয়ার পর এ অঞ্চলে পুনরায় শান্তি ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন।
টিকাঃ
৬৫. সরনদ্বীপ: বর্তমানে শ্রীলঙ্কা নামে পরিচিত দ্বীপরাষ্ট্রটিই হলো অতীতের সরনদ্বীপ। অঞ্চলটি সিলন নামেও পরিচিত ছিল।
৬৬. দেবল: পাকিস্তানের বৃহত্তম নগরী করাচীই তখন দেবল নামে পরিচিত ছিল।