📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 তুর্কিস্তানে বিজয়াভিযান

📄 তুর্কিস্তানে বিজয়াভিযান


পূর্বেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, সমকালীন ইসলামি রাষ্ট্রের উত্তর-পূর্ব দিকে বিভিন্ন পৌত্তলিক সম্প্রদায় বসবাস করত। যেমন উত্তরে ককেশাস অঞ্চলের বিভিন্ন জনগোষ্ঠী, উত্তর-পূর্বে মাওয়ারাউন নাহার অঞ্চলে তুর্কি জাতি, পূর্বে তাখারিস্তান ও সিজিস্তানে বসবাসকারী বিভিন্ন সম্প্রদায় এবং দক্ষিণ-পূর্বে সিন্ধু ও পাঞ্জাবে বসবাসকারী বিভিন্ন সম্প্রদায়। অঞ্চলগত ভিন্নতার কারণে এসব অঞ্চলে একাধিক ফ্রন্টে ইসলামি বিজয়াভিযান পরিচালিত হয়। তবে মুসলিম অভিযাত্রীগণ অভিযান শেষে নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন করলেই এসব অঞ্চলের অধিবাসীরা চুক্তি ভঙ্গ করত। তাই ইতিহাসে এসব অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় একাধিকবার বিজয়াভিযান পরিচালনার বিবরণ পাওয়া যায়।
ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব রাযি. ২২ হিজরি সনে আবদুর রহমান বিন রবিআ রাযি.-এর কাছে বার্তা পাঠিয়ে তাকে তুর্কিদের বিরুদ্ধে বিজয়াভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেন। খলিফার নির্দেশনা মোতাবেক আবদুর রহমান বিন রাবিআ তুর্কিস্তান অভিমুখে রওনা হয়ে প্রথমে আল-বাব (Al-Bab) নগরী অতিক্রম করেন। আল-বাবের শাসক শাহবারাজ (Shahrbaraz) মুসলমানদের সঙ্গে সন্ধিচুক্তিতে আবদ্ধ ছিলেন। তিনি আবদুর রহমানকে জিজ্ঞেস করেন, 'আপনি কোথায় যাওয়ার মনস্থ করছেন?' উত্তরে আবদুর রহমান বলেন, 'তুর্কিস্তানের বালানজার (Balanjar) নগরীর শাসকের উদ্দেশে রওনা হয়েছি।' তখন
শাহবারাজ বলেন, 'আমরা তাদের সঙ্গে সন্ধি করে থাকা পছন্দ করি আর আমরা আল-বাবের পশ্চাদ্ভাগে রয়েছি।' শাহবারাজের কথার উত্তরে আবদুর রহমান বলেন, 'আল্লাহ তাআলা আমাদের মাঝে তার রাসুলকে প্রেরণ করেছেন এবং তার জবানে আমাদেরকে সাহায্য ও বিজয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আমরা সর্বদা বিজয়ীই থাকব।'
এরপর আবদুর রহমান তুর্কিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। তিনি দুইশ ফরসখ (প্রায় সাতশ মাইল) দূরে বালানজার নগরীতে অভিযান পরিচালনা করেন। পরবর্তী সময়ে তৃতীয় খলিফা উসমান রাযি.-এর আমলেও তিনি কয়েকবার তুর্কিস্তানে বিজয়াভিযান পরিচালনা করেন।
বিস্ময়ের বিষয় হলো, আল্লাহ তাআলা এ সময় তুর্কিদের অন্তরে মুসলমানদের প্রতি প্রবল ভীতি সঞ্চার করে দিয়েছিলেন। তুর্কিরা আবদুর রহমান বিন রাবিআ সম্পর্কে বলত, 'ফিরেশতারা এই লোকটির সঙ্গে থাকে এবং তার মৃত্যু ঠেকিয়ে রাখে। এ কারণেই সে আমাদের বিরুদ্ধে আক্রমণ করার দুঃসাহস দেখায়।'
তারা এই বিশ্বাস পোষণ করত যে, মুসলমানদের মৃত্যু নেই। একবার উদ্দেশ্যহীন একটি তির জনৈক মুসলিম ব্যক্তির শরীরে বিদ্ধ হয়ে সে মারা গেলে তখন তারা বুঝতে পারে যে, মুসলমানরা অমর নয়। এরপর থেকে তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াই করার সাহস দেখায়।
এরপর যখন আবদুর রহমান বিন রবিআ তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আসেন, তখন তারা অটল-অবিচল থেকে যুদ্ধ করে যায়। আবদুর রহমান বিন রবিআ (তাকে যুননুন নামে ডাকা হতো) এ যুদ্ধে শহিদ হন। এবারের যুদ্ধে তুর্কিদের বিরুদ্ধে মুসলিম বাহিনী পরাভূত হয়। তুর্কিরা মুসলিম সেনাপতি আবদুর রহমান বিন রবিআর লাশ তুলে নিয়ে নিজেদের দেশে সমাধিস্থ করে। দীর্ঘকাল পর্যন্ত (দুর্ভিক্ষের সময়) তুর্কিরা তার সমাধির কাছে এসে বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করত।
তখন থেকে ৭৯ হিজরি সন পর্যন্ত তুর্কিস্তানে বিজয়াভিযানের প্রচেষ্টা স্থগিত থাকে।
৭৯ হিজরিতে (৬৯৮ খ্রিষ্টাব্দে) উবায়দুল্লাহ বিন আবু বাকরা তুর্কি শাসক রডবিলের বিরুদ্ধে যুদ্ধপরিচালনা করেন। রডবিল কখনো মুসলমানদের সঙ্গে তোষামোদপূর্ণ আচরণ করত; আবার কখনো অবাধ্য আচরণ করত।
তার এই দ্বিমুখী আচরণে অতিষ্ঠ হয়ে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ উবায়দুল্লাহ বিন আবু বাকরাকে তার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেন।
উবায়দুল্লাহ একের পর এক যুদ্ধে রডবিলের বিরুদ্ধে জয়লাভ করে বিভিন্ন নগরীতে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে সামনে অগ্রসর হতে থাকেন আর রডবিল ও তার তুর্কি বাহিনী পালিয়ে আরেক নগরীতে আশ্রয় নিতে থাকে। এভাবে তারা নিজেদের প্রধান নগরীর কাছে মাত্র আঠারো ফরসখ দূরত্বে পৌঁছে যায়। এ সময় তুর্কিরা মুসলিম বাহিনীর পেছনের সকল পথ বন্ধ করে দেয় এবং তাদের চলাচলের পথ রুদ্ধ করে দেয়। মুসলিম বাহিনীর নিশ্চিত ধ্বংস জেনে সেনাপতি উবায়দুল্লাহ রডবিলের সঙ্গে সন্ধি করার মনস্থ করেন। কিন্তু মুসলিম বাহিনীর সদস্য সাহাবি শুরায়হ বিন হানি রাযি.-এর বিরোধিতা করে সকলকে লড়াই চালিয়ে যেতে এবং ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে উদ্বুদ্ধ করেন। সেনাপতি উবায়দুল্লাহ তাকে লড়াই করতে নিষেধ করেও ব্যর্থ হন। কিছু সাহসী সৈনিক শুরায়হ রাযি.-এর ডাকে সাড়া দিলে তিনি তাদেরকে নিয়েই তুর্কিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে থাকেন। যুদ্ধে শুরায়হ রাযি.-সহ মুসলিম বাহিনীর প্রায় ত্রিশ হাজার সৈন্য শহিদ হয়। তুর্কি বাহিনী হারায় এর কয়েকগুণ বেশি সৈন্য। বেঁচে থাকা অবশিষ্ট সৈন্যদের নিয়ে উবায়দুল্লাহ রডবিলের রাজ্য থেকে ফিরে আসেন। সংবাদ পেয়ে হাজ্জাজ বিন ইউসুফ খলিফা আবদুল মালিকের কাছে বিস্তারিত জানিয়ে বার্তা পাঠান এবং প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য রডবিলের এলাকায় একটি বিশাল বাহিনী প্রেরণের বিষয়ে খলিফার পরামর্শ চান। খলিফা হাজ্জাজের প্রস্তাবে সম্মতি প্রকাশ করেন। সে বছরই (৮০ হিজরি সনে) উবায়দুল্লাহ বিন আবু বাকরা ইন্তেকাল করায় হাজ্জাজ এবার আবদুর রহমান বিন মুহাম্মাদ ইবনুল আশআছের নেতৃত্বে চল্লিশ হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী প্রস্তুত করেন। হাজ্জাজ ইবনুল আশআছকে কঠিনভাবে অপছন্দ করলেও তার রণদক্ষতা ও সমরনিপুণতার কথা অকুণ্ঠচিত্তে স্বীকার করতেন।
মুসলিম বাহিনীর অগ্রযাত্রার সংবাদ পেয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত রডবিল মুসলিম সেনাপতি ইবনুল আশআছের কাছে দূত প্রেরণ করে ইতিপূর্বে উবায়দুল্লাহর বাহিনীর সঙ্গে কৃত ধৃষ্টতাপূর্ণ আচরণের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমাপ্রার্থনা করে। কিন্তু ইবনুল আশআছ তার কৈফিয়ত প্রত্যাখ্যান করে তার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন।
ইবনুল আশআছ একে একে অনেকগুলো নগরীর উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। তিনি প্রতিটি শহরে নিরাপত্তা-বিধানের জন্য একজন করে প্রশাসক নিযুক্ত করেন। এসব অভিযানে মুসলিম বাহিনী প্রচুর যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ও অনেক যুদ্ধবন্দি লাভ করে। এরপর তিনি তার বাহিনীর সদস্যদের রডবিলের রাজ্যের আরও গভীরে প্রবেশ করতে নিষেধ করে দখলকৃত এলাকাগুলোর উন্নয়নে মনোনিবেশ করতে বলেন এবং পরবর্তী বছর পর্যন্ত অগ্রবর্তী অভিযান মুলতবি করেন। তিনি হাজ্জাজ বিন ইউসুফের কাছে পত্র পাঠিয়ে অর্জিত বিজয় ও আপাতত অভিযান মুলতবি রাখার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে অবহিত করেন। কিন্তু হাজ্জাজ ইবনুল আশআছের সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট না হয়ে বার্তাপ্রেরণের মাধ্যমে তাকে ভীরু-কাপুরুষ বলে অপবাদ দেন। তিনি ইবনুল আশআছকে যুদ্ধবিমুখ বলেও অভিযুক্ত করেন। এরপর হাজ্জাজ আরও দুটি বার্তা প্রেরণ করেন এবং উভয় বার্তায় ইবনুল আশআছকে তীব্র ও অশ্লীল ভাষায় আক্রমণ করেন। হাজ্জাজের পত্র পেয়ে ইবনুল আশআছ বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। তিনি জানতেন যে, হাজ্জাজ তাকে ঘৃণা করেন এবং তাকে সরিয়ে দিতে চান। তাই তিনি তার সৈন্যদের একত্র করে বললেন, হাজ্জাজ ও আমাদের দৃষ্টান্ত হলো যেমন এক ব্যক্তি তার ভাইকে বলেছিল—
إِحْمِلْ عَبْدَكَ عَلَى الْفَرَسِ؛ فَإِنْ هَلَكَ هَلَكَ، وَإِنْ نَجَا فَلَكَ
ভৃত্যটিকে ঘোড়ায় উঠিয়ে দাও; মারা গেলে তো মারাই গেল আর বেঁচে ফিরে আসলে তোমারই থাকল।
হে আমার সৈন্যরা, যদি তোমরা যুদ্ধে জয়লাভ করো, তাহলে তো হাজ্জাজের ক্ষমতা ও শাসন-পরিধি বৃদ্ধি পাবে আর যদি নিহত হও, তাতেও তার লাভ; তার শত্রুই কমবে। এরপর তিনি বলেন, সকলে আল্লাহর দুশমন হাজ্জাজকে অপসারণ করো এবং তাকে প্রদত্ত আনুগত্যের অঙ্গীকার প্রত্যাহার করে নাও (ইবনুল আশআছ খলিফা আবদুল মালিককে অপসারণের কথা বলেননি) এবং তোমাদের সেনাপতি আবদুর রহমান ইবনুল আশআছের হাতে আনুগত্যের বায়আত গ্রহণ করো। আমি তোমাদের সাক্ষী রেখে বলছি, প্রথম আমি নিজেই হাজ্জাজকে প্রদত্ত অঙ্গীকার প্রত্যাহার করলাম। সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত সৈন্যগণ চিৎকার করে
বলে ওঠে, আমরাও আল্লাহর দুশমন হাজ্জাজের হাতে কৃত বায়আত প্রত্যাহার করলাম।
এরপর ইবনুল আশআছ তুর্কি শাসক রডবিলের সঙ্গে এই মর্মে সন্ধি করেন যে, তিনি যদি হাজ্জাজের বিরুদ্ধে জয়ী হতে পারেন, তাহলে ভবিষ্যতে কখনো রডবিলের ওপর কোনো ট্যাক্স আরোপ করা হবে না। এরপর উভয়ে হাজ্জাজের বিরুদ্ধে অভিযানের উদ্দেশ্যে রওনা হন।
ইবনুল আশআছের এই বিদ্রোহকে কেন্দ্র করে এ সময় তুর্কি অঞ্চলে বিজয়াভিযানের ধারা মুলতবি থাকে।
এরপর বীর সেনানী কুতায়বা বিন মুসলিম আল-বাহিলি রহ.-এর নেতৃত্বে তুর্কিস্তানের মাওয়ারাউন নাহার অঞ্চলে শুরু হয় কার্যকর ইসলামি বিজয়াভিযান। তিনি ৮৭ হিজরি সনে (৭০৬ খ্রিষ্টাব্দে) বুখারার ‘বায়কান্দ’ প্রদেশে অভিযান পরিচালনা করেন। শত্রুপক্ষের বিরাট সৈন্যদল কুতায়বার বাহিনীর মোকাবিলা করে এবং প্রায় দুই মাস কুতায়বাকে অবরুদ্ধ করে রাখে। এ সময় শত্রুপক্ষ মুসলিম বাহিনীর চলাচলের পথ, গিরিপথ ও প্রত্যাবর্তনপথ বন্ধ করে দেয়। মুসলিম বাহিনীর সংবাদ হাজ্জাজের কাছে পৌঁছতে বিলম্ব হওয়ায় তিনি কুতায়বার নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন এবং তুর্কি শত্রুপক্ষের সংখ্যাধিক্যের কারণে মুসলিম বাহিনীর অনিষ্ট আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন। হাজ্জাজ মসজিদে-মসজিদে মুসলিম বাহিনীর নিরাপত্তার জন্য দোয়া করার নির্দেশ প্রদান করেন এবং বিভিন্ন ইসলামি নগরীতে একই নির্দেশসহ বার্তা প্রেরণ করেন। এদিকে কুতায়বা ও তার সঙ্গী যোদ্ধাগণ প্রতিদিন তুর্কিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করত। কুতায়বার সঙ্গে তুনদার নামক জনৈক অনারবি গুপ্তচর ছিল। বুখারাবাসী এই শর্তে তাকে প্রচুর অর্থসম্পদ প্রদান করে যে, সে এর বিনিময়ে কুতায়বাকে বুখারা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করবে। তুনদার কুতায়বার কাছে উপস্থিত হয়ে বলে, আমি আপনার সঙ্গে একান্তে কিছু কথা বলতে চাই। তখন কুতায়বা সবাইকে সামনে থেকে সরিয়ে দেন। বাকি থাকে কেবল যিরার বিন হুসাইন নামক জনৈক ব্যক্তি। এরপর তুনদার বলে, তিনি হাজ্জাজের বরখাস্তের সংবাদ নিয়ে আপনার কাছে ছুটে এসেছেন। সুতরাং আমার মতে আপনি এখন সবাইকে নিয়ে মার্ভ (Merv) ফিরে
গেলে ভালো হবে। কুতায়বা তৎক্ষণাৎ তুনদারকে হত্যা করার জন্য তার জনৈক ভৃত্যকে নির্দেশ দেন। ভৃত্য হুকুম তামিল করার পর তিনি যিরারকে বললেন, আমি আর তুমি ছাড়া এমন আর কেউ নেই, যে তার কথা শুনেছে। আমি আল্লাহর শপথ করে তোমাকে বলছি—যদি আমাদের যুদ্ধ শেষ হওয়ার পূর্বে এ কথা প্রকাশ পায়, তাহলে তোমাকেও তার কাছে পাঠিয়ে দেবো। সুতরাং তুমি নিজের মুখ নিয়ন্ত্রণে রেখো। কারণ, বর্তমান পরিস্থিতিতে এ কথা প্রকাশ পেয়ে গেলে সৈন্যদের মাঝে দুর্বলতা ছড়িয়ে পড়বে আর শত্রুরা উদ্যমী হয়ে উঠবে। এরপর কুতায়বা সকলকে যুদ্ধের জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। সকলে পূর্ণ উদ্যমে তুর্কিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তুর্কিরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। তুর্কিরা কুতায়বার কাছে সন্ধিচুক্তির আবেদন জানালে তিনি প্রচুর অর্থ প্রদানের শর্তে তাদের সঙ্গে চুক্তি করেন। এরপর তিনি মুসলিম বাহিনীর জনৈক সদস্যকে উক্ত এলাকার প্রশাসক নিযুক্ত করে তার সঙ্গে কিছু সৈন্য রেখে যান।
প্রত্যাবর্তনের উদ্দেশ্যে অল্পদূর পথ অতিক্রম করতেই তিনি সংবাদ পান যে, বিজিত অঞ্চলের তুর্কিরা চুক্তি ভঙ্গ করে মুসলিম প্রশাসককে হত্যা করেছে এবং অন্যান্য সৈন্যদের (লাঞ্ছিত করতে) নাক কর্তন করেছে। কুতায়বা তৎক্ষণাৎ বায়কান্দ ফিরে আসেন এবং এক মাস পর্যন্ত তুর্কিদের অবরোধ করে রাখেন। এ সময় তারা পুনরায় সন্ধি চুক্তি করতে চাইলে তিনি তাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। অবরোধ দীর্ঘায়ত করে একসময় তিনি পুনরায় বায়কান্দ জয় করেন। এরপর তিনি বিদ্রোহীদের হত্যা করেন, তাদের সন্তানদের দাসে পরিণত করেন এবং তাদের সম্পদ যুদ্ধলব্ধ সম্পদে পরিণত করেন। মুসলমানদের সঙ্গে কৃত সন্ধিচুক্তি ভঙ্গ করতে তুর্কিদের জনৈক এক-চক্ষুহীন ব্যক্তি প্ররোচিত করেছিল। তাকে বন্দি করে কুতায়বার সামনে উপস্থিত করা হলে সে কুতায়বাকে বলে, 'আমাকে ছেড়ে দিন; বিনিময়ে আপনাকে চীনে তৈরি অতি মূল্যবান পাঁচটি বস্ত্র দেবো, যার মূল্য হাজার হাজার মুদ্রা।' সঙ্গে থাকা সেনাপতিগণ কুতায়বাকে উক্ত প্রস্তাব গ্রহণ করার পরামর্শ দিলে তিনি বলেন, 'না, আল্লাহর শপথ! আমি দ্বিতীয়বার তোমাকে মুসলমানদের ভীত-সন্ত্রস্ত করার সুযোগ দেবো না।' এরপর তার নির্দেশে লোকটির শিরশ্ছেদ করা হয়।
নিঃসন্দেহে এ ঘটনা মহান বিজেতা কুতায়বা বিন মুসলিম রহ.-এর নিষ্ঠা ও নির্মোহতার এক অনন্যসাধারণ উদাহরণ।

টিকাঃ
৬১. তুর্কিস্তান : মধ্য এশিয়ার একটি ঐতিহাসিক অঞ্চল। অঞ্চলটির সীমানা উত্তরে উরাল পর্বতমালা ও সাইবেরিয়া অঞ্চল হতে দক্ষিণে তিব্বত, কাশ্মীর, আফগানিস্তান ও ইরানের সীমান্ত পর্যন্ত এবং পূর্বে গোবি মরুভূমি (The Gobi Desert) হতে পশ্চিমে কাস্পিয়ান সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। পরবর্তীকালে সুবিশাল ও সুবিস্তৃত এ অঞ্চলটি পূর্ব তুর্কিস্তান ও পশ্চিম তুর্কিস্তান নামে দু-ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। পূর্ব তুর্কিস্তান বর্তমানে চীনের দখলে আছে এবং সেখানে উইঘুরসহ অন্যান্য মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর অমানবিক ও বর্ণনাতীত রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন চলছে। অপরদিকে পশ্চিম তুর্কিস্তান বর্তমানে পাঁচটি দেশে বিভক্ত—তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান ও কাজাখস্তান। পশ্চিম তুর্কিস্তানের কিছু অংশ আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলেও আছে। উল্লেখ্য, ঐতিহাসিক মাওয়ারাউন নাহার অঞ্চল ছিল তুর্কিস্তানেরই অংশ। আরও জানতে দেখুন মাকতাবাতুল হাসান থেকে প্রকাশিত ড. রাগিব সারজানির 'তুর্কিস্তানের কান্না'।
৬২. ইবনুল আশআছের পরিণতি সম্পর্কে পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 বুখারা বিজয়

📄 বুখারা বিজয়


মুসলমানরা বায়কান্দ থেকে প্রচুর যুদ্ধলব্ধ সম্পদ লাভ করে। এর মধ্যে ছিল স্বর্ণ-রুপার তৈরি অনেক পাত্র, স্বর্ণের তৈরি মূর্তি ইত্যাদি। কেবল সাবাক নামক একটি মূর্তির ভেতর পাওয়া যায় একলক্ষ পঞ্চাশ হাজার স্বর্ণমুদ্রা। মুসলিম বিজেতারা রাজন্যবর্গের কোষাগার হতেও প্রচুর সম্পদ ও অস্ত্রশস্ত্র লাভ করে। পাওয়া যায় প্রচুর দাস-দাসীও। সেনাপতি কুতায়বা বার্তাবাহক পাঠিয়ে হাজ্জাজ বিন ইউসুফকে বিস্তারিত অবহিত করেন এবং যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সৈন্যদেরকে প্রদানের বিষয়ে জানতে চান। হাজ্জাজ অনুমতি দিলে কুতায়বা যুদ্ধলব্ধ সম্পদ সৈন্যদের মধ্যে বণ্টন করে দেন। বাহিনীর প্রত্যেক সদস্য প্রচুর সম্পদের অধিকারী হয় এবং শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য প্রচুর অস্ত্রেরও অধিকারী হয়। অস্ত্র ও সম্পদে মুসলিম বাহিনী এক শক্তিশালী বাহিনীতে পরিণত হয়।
৮৯ হিজরি সনে কুতায়বা বুখারা সীমান্তে বুখারাবাসীর বিরুদ্ধে প্রচণ্ড লড়াই করেন। কিন্তু প্রবল চেষ্টার পরও তিনি বুখারায় প্রবেশ করতে ব্যর্থ হন। বাধ্য হয়ে তিনি মার্ভে ফিরে আসেন। তখন হাজ্জাজের বার্তাবাহক পত্র নিয়ে তার কাছে উপস্থিত হয়। পত্রে বুখারা বিজয়ের প্রচেষ্টা ছেড়ে চলে আসায় কুতায়বাকে কঠিন ভাষায় তিরস্কার করা হয়। পাশাপাশি হাজ্জাজ কুতায়বাকে বুখারা নগরীর নকশা প্রেরণ করার নির্দেশ দেন। কুতায়বা বুখারার নকশা প্রেরণ করলে ফিরতি পত্রে হাজ্জাজ লেখেন, তুমি পুনরায় বুখারা জয়ের চেষ্টা করো, নিজের গোনাহর জন্য আল্লাহর কাছে তাওবা করো এবং অমুক অমুক স্থান দিয়ে নগরীতে প্রবেশের চেষ্টা করো। যুদ্ধের সময় প্রতারণা পরিহার করে চলবে।
৯০ হিজরি সনে (৭০৯ খ্রিষ্টাব্দে) কুতায়বা বিন মুসলিম রহ. বুখারায় অবস্থানরত তুর্কি বাহিনীকে পরাজিত করে বুখারা জয় করেন। বুখারার আশেপাশের বিভিন্ন নগরীর প্রশাসকগণ বার্ষিক কর প্রদানের শর্তে তার সঙ্গে সন্ধিচুক্তি করে। কিন্তু কিছুদিন পরই তারা চুক্তি ভঙ্গ করে। বুখারার শাসক ওয়ারদান আশেপাশের প্রশাসকগণকে চুক্তি ভঙ্গ করতে এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে প্ররোচিত করে বলে, 'আরবরা হলো ডাকাতের ন্যায়; কিছু সম্পদ পেলেই তারা চলে যাবে। এই কুতায়বা তো রাজা নয়, তার রাজা হওয়ার আশাও নেই, সে এসেছে তার রাজার
চাহিদা পূরণ করতে। তাকে কিছু সম্পদ দিলে সে তুষ্ট হয়ে নিজ বাহিনী নিয়ে ফিরে যাবে।'
ওয়ারদানের প্ররোচনায় সকল প্রশাসক মিলে এক বিশাল বাহিনী সমবেত করতে সক্ষম হয়। ইতিপূর্বে এ অঞ্চলের ইতিহাসে এরূপ বিশাল সৈন্যসমাবেশ ঘটেনি। কুতায়বা প্রচণ্ড হামলা চালিয়ে এই বিশাল বাহিনীকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলেন এবং প্রতিপক্ষের অনেক সৈন্যের ইহলীলা সাঙ্গ করেন। এভাবে তিনি পুনরায় পুরো অঞ্চল মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে সক্ষম হন। এরপর তিনি তুর্কি শাসক নাইজাক খানের পশ্চাদ্ধাবন করেন। নাইজাক খান পালিয়ে এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে যেতে থাকলে তিনিও তার অনুসরণ করেন। অবশেষে এক দুর্গে তাকে দু-মাস অবরুদ্ধ রাখলে সে মৃতপ্রায় অবস্থায় উপনীত হয়। এরপর কুতায়বা তার সঙ্গীদের সঙ্গে পরামর্শ করে নাইজাক খান ও তার সঙ্গীদের হত্যা করেন।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 সমরকন্দ বিজয়

📄 সমরকন্দ বিজয়


কুতায়বার নেতৃত্বে ইসলামের বিজয়যাত্রা অব্যাহত গতিতে এগিয়ে চলতে থাকে। একের পর এক নগরী জয় করে একসময় তিনি মুসলমানদের পুরোনো শত্রু প্রতাপশালী তুর্কি শাসক রডবিলের রাজ্য সিজিস্তানে পৌঁছান। রডবিলের রাজ্যে মুসলিম বাহিনী পা রাখতেই রডবিলের দূতগণ কুতায়বার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে প্রচুর অর্থের বিনিময়ে সন্ধির প্রস্তাব দিলে তিনি সম্মত হয়ে চুক্তি করেন।
৯৩ হিজরি সনে (৭১১ খ্রিষ্টাব্দে) কুতায়বা রহ. সমরকন্দ জয় করেন। তীব্র লড়াইয়ের পর সমরকন্দবাসী তার সঙ্গে সন্ধি চুক্তি করে। কুতায়বা সমরকন্দে একটি মসজিদ নির্মাণ করে তাতে নামাজ আদায় করেন এবং খুতবা প্রদান করেন। এরপর তিনি সমরকন্দে বিদ্যমান সকল মূর্তি একত্র করার নির্দেশ দেন। মূর্তিগুলো একটির ওপর একটি রাখা হলে বিশাল প্রাসাদসম ভবনের রূপ ধারণ করে। তিনি মূর্তিগুলো ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেন। তার নির্দেশ শুনে সমরকন্দবাসী চিৎকার ও কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। নেতৃস্থানীয় জনৈক মূর্তিপূজারি কুতায়বাকে বলে, 'এখানে এমন কিছু প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী মূর্তি আছে, যেগুলো যে-ই ধ্বংস করার চেষ্টা করবে, সে নিজেই ধ্বংস হয়ে যাবে।' সুগদ (Sogdia)-এর শাসক ঘুরাক
(Ghurak) সেখানে উপস্থিত হয়ে কুতায়বাকে বলে, 'আমি আপনার কল্যাণকামী ও শুভাকাঙ্ক্ষী; আপনি দয়া করে এমন ভুল করবেন না।' তখন কুতায়বা দাঁড়িয়ে হাতে একটি আগুনের মশাল নিয়ে বলেন—'আমি নিজ হাতে মূর্তিগুলোতে আগুন ধরাব; তোমরা সকলে মিলে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করো, পরে আর সুযোগ পাবে না।' এরপর তিনি 'আল্লাহু আকবার' বলে মূর্তিগুলোতে আগুন লাগিয়ে দেন। অল্প সময়ের মধ্যে সবগুলো মূর্তি পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
৯৪ হিজরি সনে কুতায়বা রহ. শাশ ও ফারগানা অঞ্চলও জয় করেন।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 চীনভূমিতে অভিযান

📄 চীনভূমিতে অভিযান


বিখ্যাত সেনাপতি কুতায়বা বিন মুসলিম রহ. এরপর পূর্ব দিকে তার অভিযান অব্যাহত রাখেন এবং ৯৬ হিজরি সনে (৭১৫ খ্রিষ্টাব্দে) চীনের কাশগড় অঞ্চল জয় করেন। এরপর তিনি চীন সম্রাটের কাছে কয়েকজন দূত পাঠিয়ে তাকে সতর্ক করেন এবং তাকে ইসলাম গ্রহণ বা জিজিয়া প্রদানের আহ্বান জানান।
কুতায়বার প্রেরিত দূতদের সঙ্গে চীনসম্রাটের যে কথোপকথন হয়, তা নিম্নে তুলে ধরা হলো।
চীন সম্রাট—তোমরা তো আমার রাজ্যের বিশালতা দেখেছ। আমার হাত থেকে কেউ তোমাদের রক্ষা করতে পারবে না। (এই বিশাল রাজ্যে) তোমাদের অবস্থান আমার হাতের তালুতে একটি ডিমের মতো। সুতরাং তোমরা তোমাদের সঙ্গীর (কুতায়বা) কাছে ফিরে যাও এবং তাকে বলো, সে যেন আমার রাজ্য থেকে চলে যায়। আমি তার লালসার বিষয়টি অনুমান করতে পেরেছি, উপলব্ধি করতে পেরেছি তার সৈন্যস্বল্পতার বিষয়টিও। যদি তোমরা না ফেরো, তাহলে আমি তোমাদের বিরুদ্ধে এমন বিশাল এক বাহিনী প্রেরণ করব, যারা তোমাদের শেষ ব্যক্তিটিকেও নিঃশেষ করে ছাড়বে।
কুতায়বার দূত—আপনি কুতায়বাকে এ কথা বলতে বলছেন?! তার সৈন্যসংখ্যা কীকরে অল্প হবে! তার বাহিনীর প্রথমাংশ তো আপনার রাজ্যে আর শেষ অংশ জয়তুনভূমিতে (দারুল খিলাফাহ দামেশকে)! যিনি বিশাল জগৎ জয় করার পরও তা পেছনে ফেলে আপনার রাজ্যে আপনার
বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এসেছেন, তিনি কী করে সম্পদলোভী হতে পারেন?! আর আমাদেরকে নিহত ও নিঃশেষ হওয়ার ভয় দেখাচ্ছেন? আমরা তো ভালো করেই জানি যে, আমাদের প্রত্যেকেরই একটি ‘আজাল’ ও সুনির্ধারিত আয়ু রয়েছে। আর মৃত্যু যখন অবশ্যম্ভাবী, সুতরাং লড়াই করতে করতে শহিদ হওয়াই আমাদের কাছে সবচেয়ে মর্যাদার মৃত্যু। আমরা মৃত্যুকে ভয় করি না, অপছন্দও করি না।
চীন সম্রাট—তাহলে তোমাদের সেনাপতি কী পেলে খুশি হবেন?
কুতায়বার দূত—তিনি তো শপথ করেছেন যে, আপনার দেশের মাটি পদদলিত না করে, আপনার রাজত্ব শেষ না করে এবং আপনার দেশ থেকে জিজিয়া সংগ্রহ না করে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করবেন না।
চীন সম্রাট—আমি তার শপথ পূর্ণ করে এ দেশ থেকে বের হয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করছি। আমি তার কাছে আমার দেশের কিছু মাটি ও চারজন রাজপুত্রকে প্রেরণ করছি। সঙ্গে প্রচুর স্বর্ণ, রেশমি কাপড় এবং এমন অমূল্য কিছু চীনা পরিচ্ছদ পাঠাচ্ছি, যার মূল্য আন্দাজ করাও কঠিন।
কথামতো চীনা সম্রাট এ সবকিছু প্রেরণ করলে কুতায়বা তা গ্রহণ করে নেন। কারণ, এরইমধ্যে তার কাছে খলিফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিকের মৃত্যুসংবাদ এসে পৌঁছেছিল এবং এ কারণে তার যুদ্ধস্পৃহায় ভাটা সৃষ্টি হয়েছিল।
৯৮ হিজরি সনে ইয়াযিদ বিন মুহাল্লাবের নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী জুরজান জয় করে। উক্ত অভিযানের একটি ঘটনা আমাদের সামনে অভিযানে অংশগ্রহণকারী মহান সৈন্যদের সুউচ্চ আত্মিক চেতনা ও সমুন্নত মূল্যবোধের বিষয়টি তুলে ধরে।
ইয়াযিদ বিন মুহাল্লাব এক লক্ষ বিশ হাজার সৈন্য নিয়ে জুরজানে অভিযান চালিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ষাট হাজার ছিল শামের বাহিনীর সদস্য। জুরজান বিজয়ের মাধ্যমেই আশেপাশের অন্যান্য অঞ্চলে অভিযানের পথ
উন্মুক্ত হয়, রাস্তাঘাটে চলাচল শুরু হয়। অত্যন্ত ভীতিপ্রদ এসব পথে ইতিপূর্বে ভুলেও কেউ পা বাড়াত না। অভিযানে ইয়াযিদ বিন মুহাল্লাব প্রচুর গনিমত লাভ করেন, যার মধ্যে অতি মূল্যবান মণি-মুক্তা খচিত একটি রাজমুকুটও ছিল। এ সময় ইয়াযিদ উপস্থিত সৈন্যদের প্রশ্ন করেন, 'তোমরা কি এমন কাউকে চেনো, যিনি এই মুকুটটি দেখার পর এর প্রতি সামান্য আগ্রহও বোধ করবেন না?' সকলে উত্তর দেয়, 'না, আমরা এমন কারও কথা জানি না।' ইয়াযিদ বলেন, 'আল্লাহর শপথ! আমি এমন এক ব্যক্তির কথা জানি, যার সামনে বা যার মতো লোকদের সামনে এই মুকুট পেশ করা হলে এর প্রতি মোটেও আগ্রহী হবেন না।' এরপর তিনি তার বাহিনীর সদস্য (তাবেয়ি) মুহাম্মাদ বিন ওয়াসিকে আহ্বান করেন এবং তাকে রাজমুকুটটি গ্রহণ করতে বলেন। উত্তরে মুহাম্মাদ বলেন, 'আমার এর প্রয়োজন নেই।' তখন ইয়াযিদ তাকে বলেন, 'আমি শপথ করে বলছি, আপনাকে এটা নিতে হবে।' এরপর তিনি মুকুটটি নিয়ে সেখান থেকে উঠে যান। তখন ইয়াযিদ তাকে অনুসরণ করার জন্য এক ব্যক্তিকে নির্দেশ দেন এবং তিনি মুকুটটি নিয়ে কী করেন, তা লক্ষ করতে বলেন। যাওয়ার পথে এক ভিক্ষুক মুহাম্মাদ বিন ওয়াসির কাছে সাহায্যপ্রার্থনা করলে তিনি তাকে মুকুটটি দিয়ে দেন। সংবাদ পেয়ে ইয়াযিদ লোক পাঠিয়ে ভিক্ষুকটির কাছ থেকে মুকুটটি নিয়ে নেন এবং বিনিময়ে তাকে প্রচুর অর্থ প্রদান করেন।
১১০ হিজরি সনে মাসলামা বিন আবদুল মালিক তুর্কি শাসক খাকানের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন। মাসলামার মোকাবিলায় খাকান সুবিশাল বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হয়। প্রায় এক মাস উভয় বাহিনী আপন আপন অবস্থানে অপেক্ষারত থাকে। অবশেষে শীতকালে আল্লাহ তাআলা খাকানের বাহিনীকে পর্যুদস্ত করেন। মাসলামা যুদ্ধলব্ধ সম্পদ নিয়ে নিরাপদে প্রত্যাবর্তন করেন। শামে ফেরার পথে মাসলামা জুলকারনাইনের পদচিহ্ন অনুসরণ করেন। এ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদেরকে 'কাদামাটির যোদ্ধা' বলা হয়। কারণ, তারা এ অভিযানে কাদামাটি ও চোরাবালিতে ভরা বিভিন্ন স্থান অতিক্রম করে; অনেক পশু তাতে ডুবে যায় এবং বহু সৈনিক কাদামাটিতে আটকে যায়। বহু ঘাত-প্রতিঘাত, প্রতিকূল পরিস্থিতি ও দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে মুসলিম বাহিনী শামে প্রত্যাবর্তন করতে সক্ষম হয়।
১১২ হিজরিতে তুর্কিস্তানে পরিচালিত এক অভিযান সম্পর্কে ঐতিহাসিক ইবনে কাছির রহ. লিখেছেন—
তুর্কিরা মুসলিম বাহিনীর ডানবাহুর ওপর হামলা চালায়। বাহিনীর এ অংশে ছিল তামিম ও আদ্‌দ গোত্র। তুর্কিদের আক্রমণে এই দুই গোত্রসহ অন্যান্য বিভিন্ন গোত্রের অনেক সৈন্য শহিদ হয়ে যায়। শাহাদাত তো আল্লাহর অনুগ্রহ-দান; তিনি যাকে ইচ্ছা, তাকে এই মহাসম্পদ দান করেন। এ সময় মুসলিম বাহিনীর জনৈক বীর যোদ্ধা চরম রণনিপুণতা প্রদর্শন করে এবং তুর্কি বীর যোদ্ধাদের একটি দলের সঙ্গে একাই লড়াই করে তাদের সকলকে হত্যা করে। এ অবস্থা দেখে খাকানের শাহি ঘোষক ঘোষণা করে, 'তুমি যদি আমাদের দলে চলে আসো, তাহলে আমরা তোমাকে আমাদের সবচেয়ে বড় মূর্তির পরিচালক পদে বরণ করে নেব এবং তোমারও পূজা করব।' তখন সেই মহান যোদ্ধা উত্তর দেন, 'ধিক তোমাদের! আমরা তো তোমাদের বিরুদ্ধে কেবল এ জন্য যুদ্ধ করছি যে, তোমরা এক আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারও উপাসনা করবে না। আল্লাহর কোনো শরিক নেই।' এরপর তিনি তুর্কিদের বিরুদ্ধে লড়তে লড়তে শহিদ হয়ে যান। আল্লাহ তার প্রতি দয়া করুন। এই বীর যোদ্ধার শাহাদাতের পর মুসলিম বাহিনীর অন্যান্য বীর যোদ্ধারা অগ্রসর হয় এবং অটল-অবিচল থেকে যুদ্ধ করতে থাকে। তারা একযোগে তুর্কিদের ওপর হামলা চালালে আল্লাহ তাআলা তুর্কিদের পর্যুদস্ত করেন এবং তাদের প্রচুর সৈন্য নিহত হয়। এরপর তুর্কিরা পাল্টা হামলা চালিয়ে মুসলিম বাহিনীর প্রচুর সৈন্যকে হত্যা করে। মুসলিম বাহিনীর মাত্র দু-হাজার সৈন্য ব্যতীত সকলে শহিদ হয়ে যায়। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। মুসলিম সৈন্যদের অনেককে বন্দি করে খাকানের সামনে উপস্থিত করা হলে তার নির্দেশে তাদের প্রত্যেককে হত্যা করা হয়। ইন্না লিল্লাহি...। এ যুদ্ধকে ঘাঁটির যুদ্ধ বলা হয়।
১১৯ হিজরি সনে (৭৩৭ খ্রিষ্টাব্দে) আসাদ বিন আবদুল্লাহ কাসরি রহ. তুর্কি মহারাজ খাকানকে হত্যা করেন। এর বিস্তারিত বিবরণ হলো-
খাকান এ সময় মুসলিম বাহিনীকে চূড়ান্তরূপে ধ্বংস করার জন্য বিশাল সেনাবাহিনী প্রস্তুত করে। মুসলিম বাহিনীর মনোবল দুর্বল করার উদ্দেশ্যে খাকান প্রচার করে যে, মুসলিম সেনাপতি আসাদ নিহত হয়েছেন। কিন্তু আল্লাহ তার কূট-কৌশলকে বুমেরাং করে দেন এবং তার ফাঁদে তাকেই ধ্বংস করেন। মুসলিম বাহিনীর সদস্যরা আসাদের মৃত্যুসংবাদ শুনে দ্বীনি চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়ে ওঠে এবং দুশমনের বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভ ও ক্রোধ আরও বৃদ্ধি পায়। তারা তাদের সেনাপতিহত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার সংকল্প করে। এরপর আসাদ যে স্থানে ছিলেন, তারা সে স্থান অভিমুখে রওনা হয়। সেখানে পৌঁছে তারা আসাদকে জীবিত দেখতে পায়। এরপর আসাদ সবাইকে নিয়ে খাকানের বাহিনীর উদ্দেশে রওনা হন। জাবালে মিল্লহ নামক স্থানে পৌঁছে তিনি বলখ নদী পাড়ি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে ছিল প্রচুর যুদ্ধলব্ধ সম্পদ। সেনাপতি আসাদ এসব সম্পদ ফেলে যেতে চাচ্ছিলেন না। তিনি অশ্বারোহী সৈন্যদের নির্দেশ দেন যে, প্রত্যেকে যেন সামনে একটি এবং ঘাড়ে করে একটি ছাগল বহন করে নিয়ে যায়। নির্দেশ অমান্য করা হলে তিনি হাত কেটে ফেলার হুমকি দেন। তিনি নিজেও একটি ছাগল কাঁধে নিয়ে সবার সঙ্গে নদী পাড়ি দেন।
মুসলিম বাহিনী তখনও ভালো করে নদী পাড়ি দিতে পারেনি, এরই মধ্যে খাকান পেছন দিক থেকে তার বাহিনী নিয়ে উপস্থিত হয়। মুসলিম বাহিনীর যেসব সদস্য তখনও নদী পার হতে পারেনি, খাকানের বাহিনী তাদেরকে হত্যা করে। এরপর খakান মুসলিম বাহিনীর অনুসরণ করে নদী পাড়ি দিয়ে মুসলিম ছাউনির কাছে চলে আসে। মুসলিম বাহিনী নিজেদের ছাউনিতেই অবস্থান করছিল। তারা চতুর্দিক পরিখা ঘেরা একটি স্থানে ছাউনি স্থাপন করেছিল বিধায় খাকানের বাহিনীর পক্ষে মুসলিম বাহিনীর নাগাল পাওয়া সম্ভব ছিল না। রাতের বেলা উভয় পক্ষের সামনে অপর পক্ষের প্রজ্বলিত আগুন দৃষ্টিগোচর হচ্ছিল। প্রত্যুষে খাকান মুসলিম বাহিনীর একটি অংশের ওপর হামলা চালিয়ে অনেককে হত্যা করে, কতক সৈন্যকে বন্দি করে এবং সম্পদবোঝাই কয়েকটি উট নিয়ে যায়।
এরপর আসাদ ও তার বাহিনী সামনে অগ্রসর হয়ে বলখের মান্জ ভূমিতে অবতরণ করে। ততদিনে শীতকালও শেষ হয়ে গেছে। ঈদুল আযহার
দিন আসাদ সকলের সম্মুখে খুতবা প্রদান করেন এবং সম্ভাব্য তিন করণীয় হতে একটি বেছে নেওয়ার বিষয়ে সকলের পরামর্শ চান— ১. মার্ভে ফিরে যাওয়া ২. খাকানের সুবিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া ৩. বলখে সুরক্ষিত অবস্থান গড়ে তোলা। সৈন্যগণ খাকানের মোকাবিলা করার পক্ষে মত দেয়। এরপর আসাদ সকলকে নিয়ে দীর্ঘ সময় নিয়ে দু-রাকাত নামাজ আদায় করেন, তারপর দীর্ঘক্ষণ দোয়া করেন। এরপর তিনি এই বলে রওনা হন যে, ইনশাআল্লাহ তোমরা জয়ী হবে। বাস্তবেও মুসলমানরা যুদ্ধে জয়লাভ করে আর তুর্কি মহারাজ খাকান নিহত হয়।
১২৩ হিজরি সন শুরু হওয়ার পূর্বেই তুর্কিদের সমাজব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। তারা নিজেদের মধ্যে দাঙ্গা-হাঙ্গামায় জড়িয়ে পড়ায় তুর্কিস্তান ধ্বংসপ্রায় অবস্থায় উপনীত হয়। স্বাভাবিকভাবেই গৃহযুদ্ধে ব্যতিব্যস্ত তুর্কিদের তখন মুসলমানদের প্রতি মনোযোগী হওয়ার সুযোগ ছিল না।

টিকাঃ
৬৩. ওয়ালিদের পর খলিফা পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন তার ভাই সুলায়মান বিন আবদুল মালিক। কুতায়বা বিন মুসলিম যেহেতু ইতিপূর্বে সুলায়মানের খিলাফতপ্রাপ্তির বিষয়ে বিরোধিতা করেছিলেন, তাই স্বভাবতই তিনি খলিফা ওয়ালিদের প্রয়াণ ও সুলায়মানের দায়িত্বলাভের সংবাদ পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। কুতায়বা আশঙ্কা করছিলেন যে, সুলায়মান তার বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণ করবেন।
৬৪. ইবনে কাছির দিমাশকি, আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ৯/২৮১-২৮২।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00