📄 ইসলামি বিজয়াভিযানের পূর্বে আন্দালুসের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি
আবহমানকাল হতেই আন্দালুসভূমি একের পর এক বিদ্রোহে আক্রান্ত ছিল। অবশেষে পশ্চিমা গোথ গোষ্ঠী এ অঞ্চলে স্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করতে সক্ষম হয়। গোথ গোষ্ঠী আন্দালুসে ইউরোপ-ইতিহাসে বিখ্যাত রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করে। ৯১ হিজরিতে (৭১০ খ্রিষ্টাব্দে) মুসলমানদের হাতে গোথ সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। পতনপূর্ব সময়ে আন্দালুসে যে বিশৃঙ্খল ও দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি বিরাজ করছিল, তা যেন আসন্ন পতনের বার্তাই জানান দিচ্ছিল।
আন্দালুসের শাসক নির্বাচনের অধিকার একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির হাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। সেনাপতি ও গির্জার অধিপতিগণ শাসক নির্বাচন করতেন। আর এ ধরনের রাজনৈতিক ব্যবস্থার অনিবার্য পরিণতি হলো একজন শাসকের মৃত্যু ও অপরজনের ক্ষমতাগ্রহণের সময় অরাজকতা, ফিতনা, অস্থিরতা ও শত্রুতা সৃষ্টি হওয়া।
আন্দালুসের সামাজিক পরিস্থিতিও ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল শ্রেণি-বিভেদব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে। আন্দালুস-সমাজ তখন কয়েকটি স্তরে বিভক্ত ছিল।
বংশীয় অভিজাত শ্রেণি: তারা ছিল বিজেতা গোথ জাতির পরবর্তী প্রজন্ম। রাষ্ট্রের অধিকাংশ উর্বর কৃষিভূমি তাদের দখলে ছিল। তারা এসব ভূমি করমুক্ত ভোগ করত। রাষ্ট্রের সামরিক পদসমূহ এবং ধর্মীয় বিষয়াদির নেতৃত্বও তাদের হাতেই থাকত।
ধর্মীয় অভিজাত শ্রেণি: নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানের কারণে তারাও কৃষিভূমির একটি বড় অংশ কোনো প্রকার করপ্রদান ব্যতিরেকে ভোগ করত। রাষ্ট্রপরিচালনায় তারা প্রথম শ্রেণির সঙ্গে শরিক ছিল। প্রকৃত অর্থে তখন রাষ্ট্রপরিচালনার একমাত্র উদ্দেশ্য থাকত অর্থসম্পদে কর আরোপের বিভিন্ন পথ অনুসন্ধান করা এবং শাসকদের সম্পদ বৃদ্ধি করা। ঐতিহাসিকগণ মন্তব্য করেছেন, আন্দালুসের দুই-তৃতীয়াংশ কৃষিভূমি এই দুই শ্রেণির মালিকানাভুক্ত ছিল এবং তা ছিল সম্পূর্ণ খাজনামুক্ত।
ব্যবসায়ী, কৃষিজীবী ও ক্ষুদ্র জমিদার শ্রেণি: ট্যাক্স-খাজনা প্রদান ও শাসকদের অর্থলিপ্সা পূরণ করার দায়িত্ব-বোঝা তাদের কাঁধেই অর্পিত থাকত।
ভূমিদাস শ্রেণি: বড় জমিদারদের স্বার্থরক্ষায় তারা কৃষিকাজ করত। দুর্ভাগা এই শ্রেণির লোকেরা নিজেদের পরিবার-পরিজনসহ মালিকের সম্পদের অন্তর্ভুক্ত বিবেচিত হতো। তাদের নিজস্ব কোনো অধিকার ছিল না। ভূমির মালিকানার সঙ্গে তারাও এক মালিক হতে অন্য মালিকের কাছে স্থানান্তরিত হতো।
যুদ্ধবন্দি দাস শ্রেণি: তাদেরকে ক্রয়-বিক্রয় করা হতো। ন্যূনতম কোনো অধিকারই তাদের ছিল না।
আন্দালুসে আরেকটি শ্রেণির বসবাস ছিল, নাগরিক জীবনে যাদের বেশ বড় ভূমিকা ছিল। তারা হলো ইহুদি সম্প্রদায়। স্বভাবরীতি অনুযায়ী তারা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধার ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল। শাসক শ্রেণি তাদের প্রভাব-
প্রতিপত্তির কারণে চাপ অনুভব করত এবং তাদেরকে ইহুদি ধর্ম ছেড়ে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করার জন্য চাপপ্রয়োগ করত।
অর্থাৎ সমাজের কর্মী শ্রেণিগুলো সাধারণ নাগরিক অধিকার হতে বঞ্চিত ছিল। নিঃসন্দেহে এটি ছিল চরম অব্যবস্থাপনার একটি চিত্র-মাত্র। শোষিত ও বঞ্চিত এসব মানুষের না ছিল কোনো ধরনের জাতীয় অধিকার, না ছিল উন্নতি-অগ্ৰগতির ন্যূনতম চেতনা।
📄 বালাতুশ শুহাদার যুদ্ধ
মুসা বিন নুয়ায়রের পরিকল্পনা ছিল পিরেনিজ পর্বতমালা (Pyrenees Mountains) পাড়ি দিয়ে ফ্রান্স (তৎকালীন গাল রাষ্ট্র) ভূমিতে ইসলামের সুমহান দাওয়াত পৌছে দেওয়া; এরপর রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপল জয়ের উদ্দেশ্যে আরও পূর্ব দিকে অগ্রসর হওয়া। কিন্তু খলিফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিক এই দুঃসাহস পছন্দ করেননি। মুসা বিন নুয়ায়র ও তারিক বিন যিয়াদের প্রতি অপ্রসন্ন ও শক্ৰভাবাপন্ন দরবারের কিছু লোকের চক্রান্ত ও কুৎসা রটনায় প্রভাবিত হয়ে খলিফা তাদের উভয়কে দামেশকে তলব করেন। ফলে দীর্ঘদিনের জন্য সমকালীন ইসলামি বিশ্বের এই পশ্চিম অংশে বা ইসলামি প্রতীচ্যে বিজয়ভিযানের ধারা বন্ধ হয়। ১০০ হিজরি সনে (৭১৯ খ্রিষ্টাব্দে) খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহ. সামাহ বিন মালিক খাওলানির তাকওয়া ও চরিত্রগুণের কারণে তাকে আন্দালুসের প্রশাসক নিযুক্ত করেন। সামাহ বিন মালিক ফ্রান্সে বিজয়ভিযান শুরু করার জন্য আপন সৈন্যদের উদ্বুদ্ধ করেন। তিনিই আন্দালুসের রাজধানী সেভিল থেকে কর্ডোভায় স্থানান্তর করেন। (আন্দালুসে উমাইয়া শাসনের শেষ সময় পর্যন্ত কর্ডোভাই ছিল আন্দালুসের রাজধানী)।
সামাহ ফ্রাস্ভূমিতে অগ্রসর হয়ে প্রথমে দক্ষিণ ফ্রান্সের সিবতামানিয়া অঞ্চল জয় করেন এবং নারবোন (Narbonne)-কে ফ্রান্সে তার সামরিক অভিযানের ঘাঁটি নির্ধারণ করেন। এখনো নারবোনে সামাহ বিন মালিকের নামে একটি সড়ক আছে। এরপর তিনি পশ্চিমে অগ্রসর হয়ে আকুইটেইন (Aquitaine) অঞ্চলের প্রধান নগরী তুলুশায় পৌঁছান। সেখানে তিনি প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হন। একপর্যায়ে তার কাছে সহায়ক বাহিনী এসে পৌঁছায়; কিন্তু এ যুদ্ধে তিনি শহিদ হন। এটি ১০২ হিজরি সনের ঘটনা।
(৭২১ খ্রিষ্টাব্দের) ঘটনা। তখন মুসলিম বাহিনী তুলুশা থেকে দক্ষিণে সরে আসে।
এরপর আন্দালুসের প্রশাসক নিযুক্ত হন উক্ত যুদ্ধে সামাহর অধীনেই যুদ্ধরত আবদুর রহমান আল-গাফিকি। এটি ছিল আবদুর রহমানের প্রথম শাসনামল, যা অল্প কয়েক মাস ব্যাপ্ত ছিল। ১০৩ হিজরিতে আফ্রিকার তৎকালীন গভর্নর ইয়াযিদ বিন আবু মুসলিম আন্দালুসের প্রশাসক হিসেবে আমবাসা বিন সুহাইম কালবিকে নিয়োগ দেন। আমবাসার শাসনামলের প্রথম চার বছর কেটে যায় আন্দালুসের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলাবিধানে এবং আরব-বার্বার সাম্প্রদায়িক বিরোধ নিরসনে। এরপর তিনি ফ্রান্সে বিজয়াভিযান শুরু করেন এবং উপকূলীয় পথ ধরে অগ্রসর হয়ে রোন (Rhone) নদী পর্যন্ত পৌঁছে যান। এ সময় তিনি ভ্যালেন্স (Valence), ফীনি, লিওঁ (Lyon), শ্যালন (Chalons-en-Champagne) প্রভৃতি নগরী জয় করেন। এরপর তার বাহিনীর একটি অংশ উত্তরে ডিজন (Dijon) ও ল্যাড্রেজ (Langres)-এর দিকে অগ্রসর হয়, অপর একটি অংশ উতুন (Autun)-এর দিকে অগ্রসর হয়ে সেন্স (Sens) নগরী পর্যন্ত পৌঁছে যায়। মুসলিম বাহিনী কোনো নগরীতেই প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়নি; বরং প্রতিটি নগরীর নাগরিকেরা নিরাপত্তা প্রার্থনা করে সন্ধিচুক্তি করে। তবে সেন্স নগরীর যোদ্ধাগণ প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলে ইসলামি অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে সক্ষম হয়।
এ সময় আমবাসা উপলব্ধি করেন যে, তিনি ফ্রান্সের অভ্যন্তরে উপযুক্ত পরিমাণের চেয়ে বেশি ভেতরে চলে এসেছেন। এর ফলে আন্দালুস থেকে রসদ সরবরাহ-ব্যবস্থা (Line of supply) বিচ্ছিন্ন হয়ে মুসলিম বাহিনীর সমূহ ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। তাই তিনি এবার প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু ফ্রাঙ্কদের একটি বিরাট সৈন্যদল মুসলিম বাহিনীর ওপর অতর্কিতে হামলা চালায়। এ হামলায় তিনি শহিদ হন। অবশিষ্ট সৈন্যদল নারবোনে ফিরে আসে। এটি ১০৭ হিজরি সনের (৭২৫ খ্রিষ্টাব্দের) ঘটনা।
আমবাসার পর আন্দালুসের প্রশাসক নিযুক্ত হন আযরা আল-ফিহরি। তিনিও ১১০ হিজরি পর্যন্ত ব্যাপ্ত তার শাসনামলে একাধিকবার ফ্রান্সে বিজয়াভিযান পরিচালনা করেন এবং রোন নদীর অববাহিকা পর্যন্ত পৌঁছে যান।
এরপর আবদুর রহমান আল-গাফিকি দ্বিতীয়বারের মতো আন্দালুসের প্রশাসক নিযুক্ত হন। ফ্রান্সে অভিযান পরিচালনার জন্য তিনি বিরাট প্রস্তুতি গ্রহণ করেন এবং আফ্রিকা ও আন্দালুসের স্বেচ্ছাসেবী যোদ্ধাদের জন্য এ অভিযানে অংশগ্রহণের সুযোগ উন্মুক্ত করে দেন। ফলে ফ্রান্স অভিযানের জন্য বিরাট এক বাহিনী প্রস্তুত হয়ে যায়। বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ছিল সত্তর হাজার, মতান্তরে এক লক্ষ। ১১৩ হিজরি সনে রোনসেসভেল্স গিরিপথ (Roncesvalles Pass) ধরে মুসলিম বাহিনী পিরেনিজ পর্বতমালা পাড়ি দেয়। এরপর আবদুর রহমান ফ্রাঙ্কদের বিভ্রান্ত করার জন্য পূর্ব দিকের পথ ধরেন এবং দক্ষিণ ফ্রান্সের দিকে রওনা হন। প্রথমে তিনি আর্লস (Arles) নগরী পুনঃবিজয় করেন। ইতিপূর্বে বিজিত এ নগরীটির নাগরিকরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল। এরপর তিনি আকুইতেইন গমন করে নগরীটি জয় করে নেন। তারপর মুসলিম বাহিনী অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখে পয়টিয়ার্স (Poitiers) নগরীতে পৌঁছে যায়।
মুসলিম বাহিনীর অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে ফ্রাঙ্ক সেনাপতি (আকুইতেইন-নৃপতি) ডিউক ওডো (Odo the Great) ফ্রাঙ্ক সাম্রাজ্যের আদেশ-নিষেধের অধিকর্তা চার্লস মার্টিল (Charles Martel)-এর কাছে সাহায্যের ফরিয়াদ জানান। চার্লস ওডোর আবেদনে সাড়া দেন। ইতিপূর্বে ডিউকের পদের প্রতি চার্লসের আগ্রহ থাকায় তার ও ওডোর মাঝে চরম দ্বন্দ্ব বিরাজ করছিল এবং এ কারণে মুসলিম বাহিনী দক্ষিণ ফ্রান্সে অভিযান পরিচালনা করলেও চার্লস তাতে গুরুত্ব দেননি। এবার তিনি ওডোর ডাকে সাড়া দেওয়ায় ফ্রান্সে খ্রিষ্টান শক্তি মুসলিম বাহিনীর মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধ শক্তিতে পরিণত হয়।
ফ্রাঙ্করা চার্লস মার্টিলের কাছে সমবেত হয়ে বলে, শেষে আমাদের এ কী লাঞ্ছনা?! আমরা আরব জাতির কথা শুনতাম এবং আশঙ্কা করতাম যে, তারা পূর্ব দিক থেকে আসবে। এখন দেখি তারা পশ্চিম দিক থেকে এসে আন্দালুস দখল করে নিয়েছে। আরও ভয়াবহ বিষয় হলো, তারা সংখ্যায় ও শক্তিতে অতি অল্প হওয়া সত্ত্বেও আত্মরক্ষার জন্য ঢাল ব্যবহার না করেই এসব বিজয় অর্জন করছে।
উত্তরে চার্লস মার্টিল বলেন, 'আমার মতামত হলো তাদের এই অগ্রযাত্রায় তোমরা বাধা দেবে না। কারণ, তারা হলো প্রবহমান স্রোতের ন্যায়; সামনে যা পাবে, সব ভাসিয়ে নিয়ে অগ্রসর হবে। তাদের আছে এমন
অটল-অবিচল ইচ্ছাশক্তি, যার কারণে সংখ্যাধিক্যের কোনো প্রয়োজন নেই; আছে এমন ইস্পাত-কঠিন মনোবল হৃদয়, যার কারণে ঢালের আত্মরক্ষার প্রয়োজন নেই। তাদেরকে সুযোগ দাও; যখন তাদের হাত যুদ্ধলব্ধ সম্পদে পূর্ণ হয়ে যাবে, (এ দেশে) আবাসনের ব্যবস্থা হয়ে যাবে, তারা পরস্পর নেতৃত্ব নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জড়িয়ে পড়বে এবং একে অন্যের বিরুদ্ধে সাহায্য প্রার্থনা করবে, তখন তোমরা অতি সহজেই তাদেরকে পরাভূত করতে পারবে।'
'নাফহুত তিব' গ্রন্থকার মাক্কারি রহ. বলেন—
আল্লাহর শপথ! চার্লস মার্টিল যা বলেছিলেন, ঠিক তাই ঘটেছিল। শাম হতে আগত মুসলিম ও বালাদি মুসলিম, বার্বার ও আরব, মুযারি ও ইয়ামেনি ইত্যাদি জাতিগত সংঘাতের ফিতনা ছড়িয়ে পড়েছিল পুরো আন্দালুসজুড়ে। আপন মুসলিম ভাইয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভ করতে মুসলমানরা সাহায্য কামনা করছিল পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন শত্রুগোষ্ঠীর কাছে।
আবদুর রহমান আল-গাফিকির বাহিনীর অধিকাংশ সৈন্য ছিল বার্বার জাতিগোষ্ঠীর। কারণ, আফ্রিকা ও আন্দালুসের অনেক আরব তখন পারস্পরিক জাতিগত সংঘাতে জড়িয়ে ছিল। অনেকে ব্যস্ত ছিল কৃষিজীবনে। আর তার বাহিনীতে সীমিত সংখ্যক যে আরব সৈন্য ছিল, তার অধিকাংশই ছিল ইয়ামেনি। কারণ, আবদুর রহমান নিজে ছিলেন ইয়ামেনি বংশোদ্ভূত।
যদি আমরা যুদ্ধের উভয় পক্ষের শক্তির দিকে তাকাই, তাহলে দেখতে পাব—বস্তুগত দিক থেকে ফ্রাঙ্কদের পাল্লা ভারী ছিল। একে তো তারা ছিল সংখ্যায় অধিক, অধিকন্তু ফ্রান্সের পথ-ঘাট ও স্থান সম্পর্কে তারা ছিল অধিক অবগত; আবার রসদ ও সামরিক সাহায্যপ্রাপ্তির উৎসও ছিল তাদের নিকটে। বিপরীতে মুসলিম বাহিনী উমাইয়া রাষ্ট্রের মূলকেন্দ্র থেকে অনেক দূরে চলে এসেছিল।
১১৪ হিজরি সনের শাবান মাসের শেষদিকে (৭৩২ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে) ফ্রান্সের তুর্ক্স (Tours) নগরীর কাছে উভয় বাহিনী মুখোমুখি হয়।
প্রথম আট দিন উভয় পক্ষ যুদ্ধে না জড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকে। এরপর শুরু হয় যুদ্ধ। উভয় পক্ষ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে এবং অটল-অবিচল থেকে যুদ্ধ চালিয়ে যায়। দ্বিতীয় দিনও পরিস্থিতি একইরকম ছিল। তবে ধীরে ধীরে যুদ্ধের পাল্লা মুসলিম বাহিনীর দিকে হেলে পড়ছিল। এ সময় ফ্রাঙ্করা একটি কৌশলের আশ্রয় নেয়। ফ্রাঙ্ক বাহিনীর একটি অংশ মুসলিম বাহিনীর সারি ভেদ করে সামনে অগ্রসর হয় এবং মুসলিম বাহিনীর অবস্থানস্থলের পেছনে যেখানে মুসলমানরা পূর্বে অর্জিত যুদ্ধলব্ধ সম্পদ গচ্ছিত রেখেছিল, সেখানে পৌঁছে যেতে সক্ষম হয়। এর ফলে মুসলিম বাহিনীর মাঝে অস্থিরতা সৃষ্টি হয় এবং মুসলিম সৈন্যরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। সেনাপতি আবদুর রহমান তার সৈন্যদের যুদ্ধক্ষেত্রে অবিচল রাখার এবং যুদ্ধলব্ধ সম্পদের জন্য অস্থির না হতে দেওয়ার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও তার চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এরইমধ্যে প্রতিপক্ষের নিক্ষিপ্ত তিরের আঘাতে তিনি শহিদ হয়ে যান।
সেনাপতির ইন্তেকালের পরও মুসলিম বাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে অটল-অবিচল থেকে সেদিনের যুদ্ধ শেষ করে। রাতের অন্ধকার ছেয়ে এলে যখন সেদিনের মতো যুদ্ধ বন্ধ হয়ে যায়, তখন অন্ধকারের সুযোগ কাজে লাগিয়ে মুসলিম বাহিনী দ্রুত দক্ষিণে সরে পড়ে। এটি ১১৪ হিজরির রমজান মাসের শুরুর দিকের ঘটনা।
ভোরবেলা ফ্রাঙ্ক বাহিনী মুসলিম বাহিনীর কাউকে দেখতে না পেয়ে অতি সন্তর্পণে মুসলিম বাহিনীর ছাউনির দিকে অগ্রসর হয়। ছাউনির কাছে গিয়ে তারা অবাক বিস্ময়ে আবিষ্কার করে যে, পুরো ছাউনি সৈন্যশূন্য; আর মুসলিম বাহিনীর অর্জিত যুদ্ধলব্ধ সম্পদে ছাউনি টইটম্বুর! তারা একে মুসলিম বাহিনীর কোনো কৌশল মনে করে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং মুসলমানদের পশ্চাদ্ধাবনের পরিবর্তে ছাউনি ধ্বংসকরণ ও সম্পদ লুণ্ঠন করেই ক্ষান্ত থাকে। ফ্রাঙ্ক বাহিনীর কেউ ভাবতেও পারেনি যে, মুসলিম বাহিনী যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করতে পারে। তাদের আশঙ্কা ছিল—প্রত্যাবর্তনের পথে মুসলিম বাহিনী তাদের জন্য কোনো ফাঁদ পেতে রেখেছে।
মুসলিম বাহিনী দ্রুত দক্ষিণে প্রত্যাবর্তন করে তাদের সামরিক ঘাঁটি নারবোনে ফিরে আসে।
প্রখ্যাত বৃটিশ ঐতিহাসিক এডওয়ার্ড গিবন (Edward Gibbon) বলেন, আরবরা যদি তুরসের যুদ্ধে জয়লাভ করত, তাহলে আজ অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজে কুরআন তিলাওয়াত ও তাফসির চর্চা হতো।
আফ্রিকার তৎকালীন গভর্নর উবায়দা বিন আবদুর রহমান মুসলিম বাহিনীর দুর্যোগের সংবাদ পেয়ে দ্রুত আবদুল মালিক বিন কাতান ফিহরির নেতৃত্বে সাহায্যবাহিনী প্রেরণ করেন এবং আবদুল মালিককে আন্দালুসে আবদুর রহমান আল-গাফিকির স্থলাভিষিক্ত নির্ধারণ করেন। এরপর তিনি খলিফা হিশাম বিন আবদুল মালিকের কাছে দুর্যোগের সংবাদ প্রেরণ করেন। সংবাদ পেয়ে খলিফা তাকে ফ্রান্সে বিজয়াভিযান চালানোর এবং যুদ্ধের মাধ্যমে সবদিক থেকে ফ্রান্সে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেন।
আবদুল মালিক বিন কাতান ফিহরি প্রথমে উত্তর আন্দালুসে গমন করেন এবং মুসলমানদের দখলে থাকা দুর্গগুলোর নিরাপত্তা দৃঢ়করণে পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ওদিকে ফ্রান্সে ডিউক ওডোর প্রতিপত্তি লোপ পাওয়ায় সিবতমানিয়ায় তখন বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্য ছড়িয়ে পড়েছিল এবং জনগণ সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছিল। তখন মার্সেই (Marseille)-এর ডিউক মোন-সহ ফ্রাঙ্কদের অনেকে চার্লস মার্টিলের বিরুদ্ধে নারবোনের মুসলিম প্রশাসক ইউসুফ বিন আবদুর রহমান ফিহরির সঙ্গে মিত্রতা করে। উভয়ে মিলে রোন নদী অতিক্রম করে আর্লস নগরীতে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর তারা সামনে অগ্রসর হয়ে প্রভিন্স (Provence) নগরীও জয় করে নেন। মুসলমানরা এরপর চার বছর সেখানে শাসন করে। এ সময় কেউ তাদের বিরুদ্ধাচরণ করেনি।
১১৬ হিজরি সনে (৭৩৪ খ্রিষ্টাব্দে) খলিফা হিশাম বিন আবদুল মালিক আন্দালুসের প্রশাসক আবদুল মালিক বিন কাতান ফিহরিকে বরখাস্ত করেন এবং তার স্থানে উকবা ইবনুল হাজ্জাজ সালুলিকে নিযুক্ত করেন। উকবা ছিলেন একজন সুদক্ষ বীর সেনানী।
উকবার একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল—অমুসলিম কোনো ব্যক্তি বন্দি হলে তিনি তাকে হত্যা করতেন না; বরং তার সামনে ইসলামের পরিচয় ও
মাহাত্ম্য তুলে ধরে তাকে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দিতেন। তার হাতে এক হাজার মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে।
তিনি সৈন্যপরিচালনায় তার পূর্ববর্তী (অপসারিত) প্রশাসক আবদুল মালিক বিন কাতান ফিহরির সহায়তাও গ্রহণ করেন। উকবা সালুলি ফ্রান্সের পূর্বাঞ্চলেও একাধিক অভিযান পরিচালনা করেন। এসব অভিযানের কিছু সফল হয়, কিছু বাধাগ্রস্ত হয়। অবশেষে ১২৩ হিজরি সনে (৭৪১ খ্রিষ্টাব্দে) তিনি শহিদ হন।
টিকাঃ
৫৯. যেসব আরব হিজায থেকে আগমন করে আন্দালুসের প্রথম বিজয়াভিযানে অংশগ্রহণ করেছিল এবং দক্ষিণ আন্দালুসে আবাস স্থাপন করেছিল, পরবর্তীকালে আন্দালুসে হিজরতকারী অন্যান্য আরবদের থেকে পার্থক্যকরণের জন্য তাদেরকে বালাদি বলা হতো।
৬০. নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন- لأَنْ يَهْدِيَ اللهُ بِكَ رَجُلًا خَيْرٌ لَكَ مِنْ أَنْ يَكُونَ لَكَ حُمْرُ النَّعَمِ
আল্লাহ যদি তোমার মাধ্যমে একজন ব্যক্তিকেও হিদায়াত দান করেন, তবে তা তোমার জন্য লাল বর্ণের উটের চেয়েও উত্তম। [সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৩৪৯৮]