📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 দ্রষ্টব্য : বিজিত জাতির প্রতি বিজেতা মুসলমানদের উদারতা

📄 দ্রষ্টব্য : বিজিত জাতির প্রতি বিজেতা মুসলমানদের উদারতা


আন্দালুস বিজয়ের সময় মুসলিম বিজেতাগণ আন্দালুসের বিভিন্ন নগরীর প্রশাসক ও রাজন্যবর্গের সঙ্গে যেসব চুক্তি করেছিলেন, তার ধারাগুলো অভিযাত্রী মুসলমানদের দয়া ও উদারতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দলিল। ঐতিহাসিক নথিপত্রে মুসলিম সেনাপতি মুসা বিন নুসায়রের পুত্র আবদুল আজিজ ও গাবদুশ-পুত্র টুডমিরের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি সন্ধিচুক্তির বিবরণ সংরক্ষিত আছে। নিম্নে তার চুম্বকাংশ উল্লেখ করা হলো। ৯৪ হিজরি সনের রজব মাসে (৭১৩ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে) চুক্তিপত্রটি লেখা হয়।
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
এটি আবদুল আজিজের পক্ষ থেকে টুডমিরকে প্রদত্ত নিরাপত্তা-অঙ্গীকারনামা। আবদুল আজিজ তার সঙ্গে সন্ধিচুক্তি করছে এবং মহান আল্লাহর সঙ্গে কৃত অঙ্গীকারের ভিত্তিতে এ প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে যে, যতদিন এ চুক্তি বহাল থাকবে, ততদিন তাকে তার ক্ষমতা হতে অপসারণ করা হবে না এবং তার শাসনভুক্ত অঞ্চলসমূহের কোনো খ্রিষ্টান প্রশাসককেও অপসারণ করা হবে না। এখানকার নাগরিকদের ও তাদের স্ত্রী-সন্তানদেরকে হত্যা বা বন্দি করা হবে না। তাদের ধর্মত্যাগে বাধ্য করা হবে না এবং তাদের গির্জা ও উপাসনালয়গুলোর ক্ষতি করা হবে না।
The Story of Civilization গ্রন্থের লেখক উইলিয়াম দুরান্ত (মৃত্যু: ১৯b১ খ্রি.) লিখেছেন-
'আন্দালুস আরব বিজেতাদের আমলে যেরূপ দৃঢ়তা ও প্রত্যয়, স্বাধীনতা ও ন্যায়পরায়ণতা প্রত্যক্ষ করেছে, তার সুদীর্ঘ ইতিহাসে কখনো তা প্রত্যক্ষ করেনি।' স্যার থমাস আরনল্ড (মৃত্যু: ১৯৩০ খ্রি.) তার The Preaching of Islam গ্রন্থে লিখেছেন—
'প্রকৃতপক্ষে এসব বিজেতা খ্রিষ্টধর্মের প্রতি যে ধর্মীয় উদারনীতি প্রকাশ করেছেন, আন্দালুসে কর্তৃত্ব বিস্তার সহজ হওয়ার ক্ষেত্রে তার বড় ভূমিকা ছিল।'
ইসলামি বিজয়াভিযানের পূর্বে আন্দালুসের রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি আবহমানকাল হতেই আন্দালুসভূমি একের পর এক বিদ্রোহে আক্রান্ত ছিল। অবশেষে পশ্চিমা গোথ গোষ্ঠী এ অঞ্চলে স্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করতে সক্ষম হয়। গোথ গোষ্ঠী আন্দালুসে ইউরোপ-ইতিহাসে বিখ্যাত রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করে। ৯১ হিজরিতে (৭১০ খ্রিষ্টাব্দে) মুসলমানদের হাতে গোথ সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। পতনপূর্ব সময়ে আন্দালুসে যে বিশৃঙ্খল ও দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি বিরাজ করছিল, তা যেন আসন্ন পতনের বার্তাই জানান দিচ্ছিল।
আন্দালুসের শাসক নির্বাচনের অধিকার একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির হাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। সেনাপতি ও গির্জার অধিপতিগণ শাসক নির্বাচন করতেন। আর এ ধরনের রাজনৈতিক ব্যবস্থার অনিবার্য পরিণতি হলো একজন শাসকের মৃত্যু ও অপরজনের ক্ষমতাগ্রহণের সময় অরাজকতা, ফিতনা, অস্থিরতা ও শত্রুতা সৃষ্টি হওয়া।
আন্দালুসের সামাজিক পরিস্থিতিও ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল শ্রেণি-বিভেদব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে। আন্দালুস-সমাজ তখন কয়েকটি স্তরে বিভক্ত ছিল।
বংশীয় অভিজাত শ্রেণি: তারা ছিল বিজেতা গোথ জাতির পরবর্তী প্রজন্ম। রাষ্ট্রের অধিকাংশ উর্বর কৃষিভূমি তাদের দখলে ছিল। তারা এসব ভূমি করমুক্ত ভোগ করত। রাষ্ট্রের সামরিক পদসমূহ এবং ধর্মীয় বিষয়াদির নেতৃত্বও তাদের হাতেই থাকত।
ধর্মীয় অভিজাত শ্রেণি: নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানের কারণে তারাও কৃষিভূমির একটি বড় অংশ কোনো প্রকার করপ্রদান ব্যতিরেকে ভোগ করত। রাষ্ট্রপরিচালনায় তারা প্রথম শ্রেণির সঙ্গে শরিক ছিল। প্রকৃত অর্থে তখন রাষ্ট্রপরিচালনার একমাত্র উদ্দেশ্য থাকত অর্থসম্পদে কর আরোপের বিভিন্ন পথ অনুসন্ধান করা এবং শাসকদের সম্পদ বৃদ্ধি করা। ঐতিহাসিকগণ মন্তব্য করেছেন, আন্দালুসের দুই-তৃতীয়াংশ কৃষিভূমি এই দুই শ্রেণির মালিকানাভুক্ত ছিল এবং তা ছিল সম্পূর্ণ খাজনামুক্ত।
ব্যবসায়ী, কৃষিজীবী ও ক্ষুদ্র জমিদার শ্রেণি: ট্যাক্স-খাজনা প্রদান ও শাসকদের অর্থলিপ্সা পূরণ করার দায়িত্ব-বোঝা তাদের কাঁধেই অর্পিত থাকত।
ভূমিদাস শ্রেণি: বড় জমিদারদের স্বার্থরক্ষায় তারা কৃষিকাজ করত। দুর্ভাগা এই শ্রেণির লোকেরা নিজেদের পরিবার-পরিজনসহ মালিকের সম্পদের অন্তর্ভুক্ত বিবেচিত হতো। তাদের নিজস্ব কোনো অধিকার ছিল না। ভূমির মালিকানার সঙ্গে তারাও এক মালিক হতে অন্য মালিকের কাছে স্থানান্তরিত হতো।
যুদ্ধবন্দি দাস শ্রেণি: তাদেরকে ক্রয়-বিক্রয় করা হতো। ন্যূনতম কোনো অধিকারই তাদের ছিল না।
আন্দালুসে আরেকটি শ্রেণির বসবাস ছিল, নাগরিক জীবনে যাদের বেশ বড় ভূমিকা ছিল। তারা হলো ইহুদি সম্প্রদায়। স্বভাবরীতি অনুযায়ী তারা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধার ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল। শাসক শ্রেণি তাদের প্রভাব-
প্রতিপত্তির কারণে চাপ অনুভব করত এবং তাদেরকে ইহুদি ধর্ম ছেড়ে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করার জন্য চাপপ্রয়োগ করত।
অর্থাৎ সমাজের কর্মী শ্রেণিগুলো সাধারণ নাগরিক অধিকার হতে বঞ্চিত ছিল। নিঃসন্দেহে এটি ছিল চরম অব্যবস্থাপনার একটি চিত্র-মাত্র। শোষিত ও বঞ্চিত এসব মানুষের না ছিল কোনো ধরনের জাতীয় অধিকার, না ছিল উন্নতি-অগ্ৰগতির ন্যূনতম চেতনা।

টিকাঃ
৫৭. বিখ্যাত আমেরিকান দার্শনিক উইলিয়াম দুরান্ত (William James Will Durant) ও তার স্ত্রী এরিয়েল দুরান্ত (Ariel Durant) এই সুবিশাল ইতিহাস বিশ্বকোষটি রচনা করেন। এগারো খণ্ডে সমাপ্ত গ্রন্থটিতে পৃথিবীর সূচনালগ্ন থেকে ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত বিগত কালের বিভিন্ন সভ্যতার ইতিহাস আলোচনা ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দ হতে ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত দীর্ঘ চল্লিশ বছরের প্রচেষ্টায় মানে ও পরিমাণে সমৃদ্ধ এ বিশ্বকোষটি রচনা করা হয়। আরব রাষ্ট্রসমূহের জোট সংগঠন 'আরব লীগে'র শাখাসংগঠন 'অ্যালেসকো'=(The Arab League Educational, Cultural and Scientific Organization [ALECSO]) গ্রন্থটির আরবি সংস্করণ 'কিসসাতুল হাযারা' (قصة الحضارة) নামে প্রকাশ করেছে।
৫৮. বিখ্যাত ব্রিটিশ প্রাচ্যবিদ স্যার থমাস আরনল্ড (Thomas Walker Arnold) রচিত এ গ্রন্থটির আরবি অনুবাদ ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে (الدعوة إلى الإسلام) ইসলামের প্রতি আহ্বান) নামে প্রকাশিত হয়েছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00