📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 দ্রষ্টব্য : শাসকের বিরুদ্ধাচরণের বিধান

📄 দ্রষ্টব্য : শাসকের বিরুদ্ধাচরণের বিধান


বনু উমাইয়ার শাসনামলে খলিফাগণের বিরুদ্ধে প্রচুর বিদ্রোহ-প্রচেষ্টা সংঘটিত হয়েছিল। আর তাই বিষয়গুরুত্বের বিবেচনায় আমরা এখানে শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের বিধান সম্পর্কে সংক্ষেপে হাদিসের বিবরণ ও পূর্বসূরি উলামায়ে কেরামের মতামত তুলে ধরছি।
[এক] ইমাম মুসলিম রহ. সাইদ বিন জুনাদা বিন আবু উমাইয়া হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন—
আমরা একদা উবাদা বিন ছামিত রাযি.-এর খেদমতে উপস্থিত হলাম। তিনি তখন অসুস্থ ছিলেন। আমরা তার জন্য সুস্থতার দোয়া করলাম। এরপর বললাম, আপনি আমাদেরকে নবীজির জবাননিঃসৃত কোনো হাদিস শোনান, যেন আল্লাহ তা দ্বারা আমাদেরকে উপকৃত করেন। তখন তিনি বললেন, নবীজি আমাদেরকে (ইসলামের পথে) আহ্বান করার পর আমরা তার হাতে বায়আত গ্রহণ করেছি। নবীজি যেসব বিষয়ে আমাদের কাছ থেকে বায়আত গ্রহণ করেন, তার মধ্যে ছিল—আমরা অনুরাগে ও বিরাগে, দরিদ্রতা ও সচ্ছলতায়; এমনকি আমাদের ওপর কাউকে প্রাধান্য দেওয়া হলেও সর্বাবস্থায় নবীজির পূর্ণ
আনুগত্য করব এবং নেতৃত্ব নিয়ে যোগ্যপাত্রের সঙ্গে বিরোধিতা ও বিবাদ করব না। তিনি বলেন, যতক্ষণ না তোমরা তার মধ্যে এমন সুস্পষ্ট কুফর দেখতে পাবে, যে বিষয়ে (অর্থাৎ যা কুফরি হওয়ার বিষয়ে) তোমাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট দলিল আছে।
[দুই]
ইমাম মুসলিম রহ. হজরত আওফ বিন মালিক রাযি. হতে বর্ণনা করেন, নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন— خِيَارُ أَئِمَّتِكُمُ الَّذِينَ تُحِبُّوْنَهُمْ وَيُحِبُّوْنَكُمْ، وَيُصَلُّوْنَ عَلَيْكُمْ وَتُصَلُّوْنَ عَلَيْهِمْ، وَشِرَارُ أَئِمَّتِكُمُ الَّذِينَ تُبْغِضُوْنَهُمْ وَيُبْغِضُوْنَكُمْ، وَتَلْعَنُوْنَهُمْ وَيَلْعَنُوْنَكُمْ»
তোমাদের সর্বোত্তম নেতা ও শাসক তারা, যাদেরকে তোমরা ভালোবাসো, আর তারাও তোমাদেরকে ভালোবাসে। তারা তোমাদের জন্য দোয়া করে, তোমরাও তাদের জন্য দোয়া করো। আর তোমাদের নিকৃষ্ট নেতা হচ্ছে তারা, যাদেরকে তোমরা ঘৃণা করো, তারাও তোমাদেরকে ঘৃণা করে। তোমরা তাদেরকে অভিশাপ দাও আর তাঁরাও তোমাদেরকে অভিসম্পাত করে।
নবীজিকে জিজ্ঞেস করা হলো, আল্লাহর রাসুল! আমরা কি তাদেরকে তরবারির মাধ্যমে প্রতিরোধ করব না? নবীজি উত্তর দিলেন— «لَا ، مَا أَقَامُوا فِيْكُمُ الصَّلَاةَ، وَإِذَا رَأَيْتُمْ مِنْ وَلَاتِكُمْ شَيْئًا تَكْرَهُونَهُ، فَاكْرَهُوا عَمَلَهُ، وَلَا تَنْزِعُوْا يَدًا مِنْ طَاعَةٍ
না, যতক্ষণ তারা তোমাদের সমাজে নামাজ কায়েম করে। যখন তোমরা তোমাদের শাসকদেরকে কোনো অপছন্দনীয় কাজ
করতে দেখবে, তখন তাদের সেই কাজকে অপছন্দ করবে; কিন্তু তাদের আনুগত্য পরিহার করবে না।
[তিন]
ইমাম মুসলিম রহ. ফিতনাকালে মুসলিম জামাতকে আঁকড়ে থাকার অপরিহার্যতাসংক্রান্ত অধ্যায়ে নিম্নোক্ত হাদিসটিও উল্লেখ করেছেন-
مَنْ رَأَى مِنْ أَمِيرِهِ شَيْئًا يَكْرَهُه فَلْيَصْبِرُ، فَإِنَّهُ مَنْ فَارَقَ الْجَمَاعَةَ شِبْرًا، فَمَاتَ، فَمِيْتَةُ جَاهِلِيَّةٌ
যে ব্যক্তি তার শাসকের মাঝে অপছন্দনীয় কিছু প্রত্যক্ষ করে, সে যেন ধৈর্যধারণ করে (নিবৃত্ত থাকে)। কেননা, যে ব্যক্তি জামাত থেকে এক বিঘত (কিঞ্চিৎ) পরিমাণ সরে যায় এবং এ অবস্থায়ই মারা যায়, সে 'জাহিলি মৃত্যু'র শিকার হয়।
[চার]
হজরত আরফাজা বিন শুরাইহ রাযি. বর্ণনা করেন, আমি নবীজিকে বলতে শুনেছি-
إِنَّه سَتَكُوْنُ هَنَاتٌ وَهَنَاتٌ، فَمَنْ أَرَادَ أَنْ يُفَرِّقَ أَمْرَ هُذِهِ الْأُمَّةِ وَهِيَ جَمِيعُ، فَاضْرِبُوهُ بِالسَّيْفِ كَائِنَا مَنْ كَانَ
অচিরেই নানা ধরনের ফিতনা-ফাসাদের উদ্ভব ঘটবে। সুতরাং যে ব্যক্তি সংঘবদ্ধ উম্মতের মাঝে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করতে চেষ্টা করবে, তাকে তরবারি দিয়ে হত্যা করো; সে যে-ই হোক না কেন।
উল্লিখিত হাদিসের ভাষ্যমতে যে ব্যক্তি ন্যায়বান শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে কিংবা মুসলিম উম্মাহর ঐক্য বিনষ্ট করতে চায়, তাকে হত্যা করা বৈধ। যদি হত্যা করা ছাড়া তাকে নিবৃত্ত
করা এবং তার ক্ষতি রোধ করা সম্ভব না হয়, তাহলে তাকে হত্যা করার কারণে কোনো শাস্তি হবে না।
[পাঁচ]
আল্লামা নববি রহ. বলেন—
আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআ এ বিষয়ে একমত যে, অন্যায় ও পাপাচারের কারণে শাসককে বরখাস্ত করা যাবে না। ফাসেক শাসককে অপসারণ না করা এবং তার বিরুদ্ধাচরণ নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ হলো, একে কেন্দ্র করে পরবর্তী সময়ে ফিতনা ও বিশৃঙ্খলা, রক্তপাত ও পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হয়। সুতরাং তাকে বহাল রাখার চেয়ে অপসারণের মধ্যে ক্ষতির দিক বেশি।
[ছয়]
কাজি ইয়ায রহ. বলেন—
এ বিষয়ে আলিমগণের ঐকমত্য রয়েছে যে, কোনো কাফিরকে শাসক হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না এবং বিদ্যমান শাসক হতে কোনো কুফরি আচরণ-উচ্চারণ প্রকাশ পেলে সে অপসারিত হবে। তদ্রূপ শাসক যদি নামাজ পরিত্যাগ করে বা নামাজের প্রতি আহ্বান পরিত্যাগ করে, তাহলেও সে অপসারিত হবে। শাসক যদি কুফরি করে, শরিয়তে বিকৃতি সাধনের চেষ্টা করে কিংবা বিদআতের প্রচলন করে, তাহলে তার কর্তৃত্ব শেষ হয়ে যাবে, তার আনুগত্য বাতিল হয়ে যাবে এবং মুসলিম উম্মাহর কর্তব্য হবে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা, তাকে অপসারণ করা এবং সম্ভব হলে কোনো ন্যায়বান শাসক নিয়োগ করা। যদি এ দায়িত্ব (ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব না হয়ে) কেবল একটি দলের পক্ষে সম্ভব হয়, তাহলে উক্ত দলের দায়িত্ব যেকোনো মূল্যে কাফির শাসককে অপসারণ করা। অপরদিকে বিদআতে লিপ্ত শাসকের ক্ষেত্রে অপসারণের সামর্থ্য আছে বলে মনে হলে তাকে অপসারণ
করা ওয়াজিব; আর সামর্থ্যহীনতা সুনিশ্চিত হলে এ চেষ্টা করা ওয়াজিব নয়।
[সাত]
উলামায়ে কেরাম আরও বলেন, এর মাধ্যমে (ফাসেক শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করা) অনুপযুক্ত স্থানে মুসলিম উম্মাহর শক্তি ব্যয় থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। উম্মাহর ওপর দ্বীন কর্তৃক আরোপিত আনুগত্যের কারণে দায়িত্বশীল শাসক উম্মাহর দিক থেকে নিশ্চিন্ত থাকেন। তিনি উম্মাহর নিরাপত্তাচিন্তা করতে পারেন; উম্মাহর কাছ থেকে আত্মরক্ষার চিন্তা তাকে করতে হয় না। অপরদিকে জনগণও আল্লাহর ফয়সালা ও তাকদিরে সন্তুষ্ট থাকে এবং ধৈর্যধারণ করে। যদিও এ ক্ষেত্রে জনগণকে সমূহ ক্ষতি পোহাতে হয়; কিন্তু তাদের ব্যস্ততা থাকে আপন দ্বীন নিয়ে এবং তাদের লক্ষ্য থাকে শত্রুর সম্মুখে ঐক্যবদ্ধ থাকা।
ওপরের আলোচনার সারনির্যাস হলো- • শাসকের আচরণ-উচ্চারণে সুস্পষ্ট কুফরি পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা যাবে।
• অন্যায়-পাপাচার, জুলুম-নিপীড়ন ইত্যাদি কারণে শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা যাবে না। তবে জালিম শাসকের সামনে হকের কথা বলতে হবে। এ সময় দ্বীনের দাবি বিদ্রোহ নয়; বরং নসিহত ও কল্যাণকামিতা।
• শাসকের সুস্পষ্ট কুফরি প্রকাশ পেলে বিদ্রোহ করা বৈধ হবে, যদি বিদ্রোহ করার শক্তিসামর্থ্য থাকে। বিদ্রোহে সফল হওয়ার সুচিন্তিত ও সুনিশ্চিত শক্তি থাকতে হবে, যেন বিদ্রোহের কারণে আরও বড় কোনো ফিতনা সৃষ্টি না হয়।
• ফাসেকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ অবৈধ হলেও তার অন্যায় ও পাপকাজের আনুগত্য করা যাবে না এবং জুলুম-নির্যাতনের ক্ষেত্রে তাকে সহায়তা করা যাবে না।

টিকাঃ
৩৮. সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৭০৯।
৩৯. সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৮৫৫।
৪০. সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৮৪৯।
৪১. সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৮৫২।
৪২. আবু জাকারিয়া ইয়াহইয়া নববি, শরহু সহিহ মুসলিম, ১২/২২৯।
৪৩. প্রাগুক্ত, ১২/২২৯।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00