📄 ইয়াযিদ বিন আবদুল মালিক বিন মারওয়ান
[রজব ১০১ হিজরি-শাবান ১০৫ হিজরি] [ফেব্রুয়ারি ৭২০ খ্রিষ্টাব্দ-জানুয়ারি ৭২৪ খ্রিষ্টাব্দ]
খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণকালে ইয়াযিদ বিন আবদুল মালিকের (২য় ইয়াযিদ) বয়স ছিল উনত্রিশ বছর। খিলাফতের দায়িত্ব লাভের পূর্বে ইয়াযিদ নিয়মিত উলামায়ে কেরামের সাহচর্য গ্রহণ করতেন। দায়িত্ব গ্রহণ করার পর তিনি পূর্ববর্তী খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহ.-এর পদাঙ্ক অনুসরণের সংকল্প করেন। কিন্তু তার চারপাশে সঙ্গী হিসেবে যারা ছিল, তারা মোটেও সৎ ছিল না। তারা খলিফাকে ভুল পথে পরিচালিত করে এবং তার সামনে অন্যায়-অনাচারকে সুদৃশ্যরূপে উপস্থাপন করে।
📄 ইয়াযিদ বিন মুহাল্লাবের বিদ্রোহ (১০১ হিজরি)
ইয়াযিদ বিন মুহাল্লাব ছিলেন উমাইয়া রাজপরিবারের অন্যতম নিষ্ঠাবান ও অনুগত সেনাপতি। হাজ্জাজ বিন ইউসুফ তাকে হঠাৎ করেই খোরাসানের গভর্নরের দায়িত্ব হতে বরখাস্ত করেন। অথচ তিনি হাজ্জাজের প্রতি অনুরাগী ছিলেন। এরপর সুলায়মান বিন আবদুল মালিকের খিলাফতকালে তাকে ইরাকের গভর্নর নিয়োগ করা হয়। উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহ.-এর যুগে দ্বিতীয়বার তাকে বরখাস্ত করা হয়। উমর ইবনে আবদুল আজিজ তাকে কারাবদ্ধ করে রাখেন এবং তার কাছ থেকে সরকারি কোষাগারের অর্থ উদ্ধার করেন। ইয়াযিদ বিন মুহাল্লাব রাষ্ট্রীয় কোষাগার হতে প্রচুর সম্পদ আত্মসাৎ করেছিলেন। ইয়াযিদ বিন আবদুল মালিকের শাসনামলে তিনি জেলখানা থেকে পালাতে সক্ষম হন এবং ইরাকে পৌঁছে উমাইয়া খিলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ডাক দেন।
📄 হাসান বসরি রহ.-এর বিরোধিতা
বসরাবাসী ইবনে মুহাল্লাবের হাতে তার পূর্ণ আনুগত্যের এবং কুরআন-সুন্নাহর অনুসরণের বায়আত গ্রহণ করে। তারা আরও অঙ্গীকার করে যে, বাইরের কোনো শক্তিকে তারা ইরাকে যুদ্ধ করার সুযোগ দেবে না এবং ইরাকে নতুন কোনো ফাসেক হাজ্জাজের আগমনের সুযোগও তারা দেবে না।
এ সময় বসরার বিশিষ্ট তাবেয়ি আলিম হাসান বসরি রহ. বসরাবাসীকে ইবনে মুহাল্লাবের আহ্বানে সাড়া দিতে কঠোরভাবে নিষেধ করেন এবং এর সমূহ ক্ষতির আশঙ্কা সবার সামনে তুলে ধরেন। তিনি সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, ইতিপূর্বে ইবনুল আশআছের বিদ্রোহের সময় দীর্ঘকাল ধরে ইরাকজুড়ে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি বিরাজ করেছিল এবং প্রচুর প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছিল। হাসান বসরি ভাষণ ও বক্তৃতার মাধ্যমে মানুষের সামনে ফিতনার ভয়াবহতা তুলে ধরেন এবং তাদেরকে নিবৃত্ত থাকার নির্দেশ দেন।
কিন্তু বিদ্রোহ-বিশৃঙ্খলা যেন ইরাকবাসীর অস্থিমজ্জায় মিশে ছিল! যখনই কেউ বিদ্রোহের ডাক দিত, ইরাকবাসী অতি উৎসাহের সঙ্গে তাতে সাড়া দিত। তারপর প্রতিপক্ষ যখন বিদ্রোহ দমনে শক্তি প্রয়োগ করত, তখন তারা নেতাকে ফেলে দ্রুত ছত্রভঙ্গ হয়ে যেত। ইবনে মুহাল্লাবের আহ্বানেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে।
খলিফা ইয়াযিদ বিন আবদুল মালিক ইবনে মুহাল্লাবের বিদ্রোহ দমন করার জন্য মাসলামা বিন আবদুল মালিকের নেতৃত্বে শামের সৈন্যদের একটি বিশাল বাহিনী প্রেরণ করেন। বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ছিল এক লক্ষ বিশ হাজার। যুদ্ধের শুরুর দিকে ইরাকের বিদ্রোহী বাহিনী ধৈর্য ও অবিচলতার পরিচয় দিয়ে বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করায় ইবনে মুহাল্লাব নিজের বিজয়ের ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতিও বদলে যেতে থাকে এবং যুদ্ধপরিস্থিতি মাসলামার বাহিনীর অনুকূলে চলে যায়। এ সময় ইরাকি বাহিনীর মাঝে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে সেতুটি পাড়ি দিয়ে তারা যুদ্ধক্ষেত্রে এসেছে, তা জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। তখন তারা পরাজয় মেনে নিয়ে দ্রুত পলায়ন করতে থাকে। পলায়নরত সৈন্যদের ইয়াযিদ ইবনে মুহাল্লাব জিজ্ঞেস করেন, কী হয়েছে? তোমরা এভাবে পালাচ্ছ কেন? যুদ্ধক্ষেত্র তো আমাদের নিয়ন্ত্রণেই আছে। তাকে
জানানো হয় যে, আমাদের প্রত্যাবর্তনের পথ রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। কারণ, পেছনের সেতুটিতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। ক্রুদ্ধ ইবনে মুহাল্লাব তাদেরকে অভিসম্পাত করতে থাকেন এবং অবশিষ্ট সঙ্গীদের নিয়ে যুদ্ধ অব্যাহত রাখেন। কিছুক্ষণ পর আরও কিছু সৈন্য চুপিসারে সরে পড়ে।
ইবনে মুহাল্লাব গুটিকয়েক সঙ্গীকে নিয়ে তারপরও সামনে অগ্রসর হতে থাকেন এবং প্রতিপক্ষের যাকেই সামনে পান, তাকেই পরাভূত করতে থাকেন। একপর্যায়ে তিনি মাসলামার বাহিনীর এক সৈন্যের হাতে নিহত হন। তার কর্তিত মস্তক খলিফার কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
ইয়াযিদ বিন মুহাল্লাবের বিদ্রোহ দমনকে খলিফা ইয়াযিদ বিন আবদুল মালিকের চার বছর ব্যাপ্ত খিলাফতকালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কীর্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
খলিফা ইয়াযিদ বিন আবদুল মালিক ১০৫ হিজরি সনের শাবান মাসে ইন্তেকাল করেন। এ সময় তার বয়স ছিল তেত্রিশ বছর।