📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহ.-এর কীর্তিময় জীবনের কয়েকটি খণ্ডচিত্র

📄 খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহ.-এর কীর্তিময় জীবনের কয়েকটি খণ্ডচিত্র


[এক]
একদিন তিনি তার স্ত্রীর কাছে উপস্থিত হয়ে কিছু আঙুর কেনার জন্য এক দিরহাম চাইলেন। কিন্তু স্ত্রীর কাছে এক দিরহামও ছিল না। খলিফাপত্নী প্রশ্ন করলেন, 'আপনি আমিরুল মুমিনিন; আপনার কোষাগারে কিছু আঙুর কেনার অর্থও নেই?'
খলিফা উত্তর দিলেন, 'কাল (কিয়ামতের দিন) বেড়ি ও শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে জাহান্নামের আগুনে দগ্ধ হওয়ার চেয়ে এই নিঃস্ব অবস্থাই আমার জন্য সহজ।'
[দুই]
খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজের কাছে দুটি প্রদীপ ছিল। তিনি একটি প্রদীপ ব্যবহার করতেন ব্যক্তিগত লেখালেখির সময়, আরেকটি ব্যবহার করতেন রাষ্ট্রীয় নথিপত্র লেখার সময়। দ্বিতীয় প্রদীপটি রাষ্ট্রীয় কোষাগারের তেল ব্যবহার করে জ্বালানো হতো। সেই প্রদীপটির আলোয় তিনি ব্যক্তিগত একটি বর্ণও লিখতেন না।
[তিন]
তিনি রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভাতা বৃদ্ধি করেছিলেন। তিনি বলতেন, 'তাদের যদি সংসারের ব্যয় নির্বাহের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকে, তাহলে তারা নিশ্চিন্তে উম্মাহর খেদমতে আত্মনিয়োগ করতে পারবে।'
[চার]
উজির রজা বিন হাইওয়া বলেন, একদিন রাতে আমি উমর ইবনে আবদুল আজিজের সঙ্গে কথা বলছিলাম। হঠাৎ প্রদীপ নিভে গেল। আমি বললাম-'আমিরুল মুমিনিন, ভৃত্যকে ডেকে দিই; সে বাতিটি ঠিক করে দিক।'
তিনি উত্তর দিলেন-'না, ওকে ঘুমোতে দিন। আমি তার ওপর একসঙ্গে দুটি কাজ চাপাতে চাই না।'
'তাহলে আমিই ঠিক করে দিই'।
'না, অতিথির সেবাগ্রহণ মানবিক শিষ্টাচারবিরোধী।' খলিফা উত্তর দিলেন। তিনি নিজেই উঠে প্রদীপটি ঠিক করলেন এবং তাতে তেল ভরলেন। এরপর এসে আমাকে বললেন, 'আমি যখন উঠেছি, তখন যেমন উমর ইবনে আবদুল আজিজ ছিলাম; এখন বসার সময়ও সেই উমর ইবনে আবদুল আজিজই আছি।'
[পাঁদ]
একবার তিনি সংবাদ পেলেন—তার জনৈক সঙ্গী মৃত্যুবরণ করেছে। তিনি মৃত ব্যক্তির পরিজনের কাছে গিয়ে তাদেরকে সান্ত্বনা জানালেন। মৃত ব্যক্তির পরিবারস্থ লোকেরা তখন শোকে চিৎকার করে কাঁদছিল। তিনি তাদেরকে বললেন, 'থামো; তোমাদের এই আত্মীয় তোমাদেরকে রিজিক প্রদান করতেন না; তোমাদের যিনি রিজিক দান করেন, তিনি তো চিরঞ্জীব, তার মৃত্যু নেই। তোমাদের এই আত্মীয় তোমাদের কারও গর্ত পূরণ করেননি; তিনি কেবল নিজের গর্তই পূরণ করেছেন। মনে রেখো, তোমাদের প্রত্যেকের জন্যই আছে একটি করে গর্ত; আল্লাহর শপথ! সে অবশ্যই তা পূর্ণ করবে। সুতরাং কেউ যদি কাঁদতে চায়, সে যেন নিজের জন্য কাঁদে। কারণ, আজ তোমাদের সঙ্গী যে গন্তব্যে গমন করেছেন, আগামীকাল সবাই সেখানেই গমন করবে।'
[ছয়]
তিনি তার গভর্নরদের উদ্দেশে প্রেরিত পত্রে লিখতেন, নামাজের সময় হলে সব ধরনের ব্যস্ততা পরিহার করবে। কারণ, যে নামাজে অবহেলা করে, সে ইসলামের অন্যান্য বিধানে আরও বেশি অবহেলা করে তা বিনষ্ট করবে।
[সাত]
তিনি তার গভর্নরদের কাছে উপদেশমূলক বিভিন্ন পত্র প্রেরণ করতেন। কখনো এমনও হতো যে, পত্রপাঠ করে গভর্নর আপন দায়িত্ব হতে অব্যাহতি প্রদান করত। আবার কখনো তার প্রদত্ত উপদেশমালার প্রভাব-তীব্রতার কারণে কর্মকর্তাদের কেউ কেউ দায়িত্বে অব্যাহতি দিয়ে দূর পথ পাড়ি দিয়ে ফিরে আসত। প্রকৃতপক্ষে এর রহস্য হলো—নসিহত ও
উপদেশ যখন বক্তার হৃদয়-গহীন থেকে নিষ্ঠাপূর্ণ আবেগে নিঃসৃত হয়, তখন তা শ্রোতার হৃদয়গভীরে প্রবেশ করে।
একবার তিনি জনৈক গভর্নরকে লিখলেন, আমি তোমাকে জাহান্নামে জাহান্নামিদের অনন্তকাল দীর্ঘ বিনিদ্র রজনীর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। নিজেকে নিয়ে তোমার ব্যস্ততা যেন তোমাকে আল্লাহ হতে বিমুখ না করে আর এরূপ উদাসীন অবস্থা যেন তোমার অন্তিম মুহূর্ত এবং আমাদের আশাভঙ্গের কারণ না হয়।
বর্ণনাকারীগণ বলেন, পত্র পাঠ করার পর সেই গভর্নর নিজেই দায়িত্বে অব্যাহতি প্রদান করে উমর ইবনে আবদুল আজিজের নিকট চলে এলেন। খলিফা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'কী হয়েছে?!'
'আমিরুল মুমিনিন! আপনি তো আপনার পত্র দ্বারা আমার হৃদয়দ্বার উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। আল্লাহর শপথ! আমি আর কখনো কোনো দায়িত্ব গ্রহণ করব না।' গভর্নর উত্তর দিলেন।
[আট]
একবার জনৈক ব্যক্তি তাকে বলল, 'আল্লাহ আপনাকে ইসলামের পক্ষ থেকে উত্তম বিনিময় দান করুন।' উত্তরে তিনি বললেন, 'বরং আল্লাহ ইসলামকে আমার পক্ষ থেকে উত্তম বিনিময় দান করুন।'

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহ.-এর মৃত্যু

📄 খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহ.-এর মৃত্যু


ঐতিহাসিকগণ উমর ইবনে আবদুল আজিজের মৃত্যুর কারণ সম্বন্ধে উল্লেখ করেছেন যে, তার জনৈক ক্রীতদাস বনু উমাইয়ার পক্ষ হতে ষড়যন্ত্র করে তার খাবার বা পানীয়তে বিষ মিশিয়ে দিয়েছিল। বনু উমাইয়ার প্রতি খলিফার কঠোর আচরণ এবং জনগণের কাছ থেকে অন্যায়ভাবে আত্মসাৎকৃত সম্পদ তাদের কাছ থেকে বাজেয়াপ্ত করে জনগণকে ফেরত প্রদান ইত্যাদি বিষয় বনু উমাইয়াকে তার প্রতি বিক্ষুব্ধ করে তুলেছিল।
উমর বিন আবদুল আজিজের বারোজন সন্তান ছিল। মৃত্যুর পূর্বে তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আপনার সন্তানরা তো দরিদ্র ও নিঃস্ব। তাদের জন্য কিছু অসিয়ত করে যাবেন না?
উত্তরে তিনি বলেন,
(إِنَّ وَلِيَّ اللَّهُ الَّذِي نَزَّلَ الْكِتٰبَ وَهُوَ يَتَوَلَّى الصَّلِحِينَ )
আমার অভিভাবক তো আল্লাহ; যিনি কিতাব নাজিল করেছেন আর তিনি পুণ্যবানদের অভিভাবকত্ব করেন।
[সুরা আরাফ: ১৯৬]
আল্লাহর শপথ! আমি তাদেরকে অন্য কারও হক প্রদান করব না। তারা তো দুই অবস্থা হতে মুক্ত নয়। যদি তারা সৎ হয়, তাহলে চিন্তা কীসের! আল্লাহই তো সৎকর্মশীলদের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আর যদি তারা অসৎ হয়, তাহলে আমি তাদের পাপাচারে সহযোগিতা করতে পারি না। এরপর তিনি তার পুত্রদেরকে ডেকে এনে অন্তিম বিদায় জানান এবং তাদেরকে সান্ত্বনা দেন। সবশেষে তিনি তাদেরকে বলেন, 'যাও, আল্লাহই তোমাদের রক্ষা করবেন এবং তোমাদের উত্তম তত্ত্বাবধান করবেন।'
বর্ণনাকারীগণ উল্লেখ করেছেন, আমরা উমর ইবনে আবদুল আজিজের জনৈক পুত্রকে আল্লাহর রাস্তায় আশিটি ঘোড়ায় পূর্ণ যুদ্ধসরঞ্জাম দান করতে দেখেছি। বিপরীতে পূর্বতন খলিফা সুলায়মান বিন আবদুল মালিক তার সন্তানদের জন্য প্রচুর সম্পদ রেখে গিয়েছিলেন। তার জনৈক পুত্রকে আমরা উমর ইবনে আবদুল আজিজের সন্তানদের কাছে হাত পাততে দেখেছি। এর রহস্য হলো—উমর ইবনে আবদুল আজিজ তার সন্তানদের মহান আল্লাহর হাওয়ালা করে গিয়েছিলেন; তাই আল্লাহ তাদেরকে অমুখাপেক্ষী করে দিয়েছেন। আর সুলায়মান ও অন্যান্য শাসক তাদের সন্তানদের রেখে গিয়েছিল সম্পদের হাওয়ালা করে; সন্তানরা তাদের সম্পদ নষ্ট করেছে আর সম্পদ ধ্বংস হয়েছে সন্তানদের প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণে।
এরপর তিনি উপস্থিত পরিবারস্থ লোকদেরকে কামরা হতে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেন। সকলে বের হয়ে গেলেও খলিফাপত্নী ফাতিমা ও তার ভাই মাসলামা বিন আবদুল মালিক দরজায় বসে থাকেন। এ সময় তারা খলিফাকে বলতে শোনেন, 'উজ্জ্বল অবয়ববিশিষ্টদের স্বাগতম! এগুলো তো কোনো মানুষ বা জিনের অবয়ব নয়'!
এরপর তিনি তেলাওয়াত করেন-
تِلْكَ الدَّارُ الْآخِرَةُ نَجْعَلُهَا لِلَّذِينَ لَا يُرِيدُونَ عُلُوًّا فِي الْأَرْضِ وَلَا فَسَادًا وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ)
ওই পরকালীন নিবাস তো আমি সে সকল লোকের জন্যই নির্ধারণ করব, যারা পৃথিবীতে বড়ত্ব দেখাতে ও ফাসাদ সৃষ্টি করতে চায় না। শেষ পরিণাম তো মুত্তাকিদেরই অনুকূলে থাকবে। [সুরা কাসাস : ৮৩]
এরপর খলিফার কণ্ঠস্বর স্তিমিত হয়ে আসে। সকলে ভেতরে প্রবেশ করে দেখতে পায়-তার চক্ষুযুগল বন্ধ, তিনি কিবলামুখী হয়ে আছেন এবং ইন্তিকাল করেছেন।
খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজ রহ. চল্লিশ বছর বয়সে ১০১ হিজরি সনের ২৫ রজব (৭২০ খ্রিষ্টাব্দের ১০ ফেব্রুয়ারি) হিমসের দাইরে সিমআন এলাকায় ইন্তেকাল করেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00